প্রথম পাতা > অপরাধ, ইতিহাস, নারী, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ, সমাজ > ‘ইজ্জতের বিনিময়ে’ শব্দগুচ্ছ যুদ্ধাপরাধকে সহনীয় করে দেয়!

‘ইজ্জতের বিনিময়ে’ শব্দগুচ্ছ যুদ্ধাপরাধকে সহনীয় করে দেয়!

rape-3-artনীচে সাংবাদিক আফসান চৌধুরী ইজ্জতহানির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নিজের ইজ্জত খুইয়েছেন । পাকিস্তান আমলে এ ভূখন্ডে বাংলা কথ্যভাষায় প্রচুর উর্দু শব্দ ব্যবহৃত হতো । ধর্ষণ শব্দের সাথে সাধারণ মানুষ অতোটা পরিচিত ছিলো না এমনকি সাহিত্যিকরাও ধর্ষণ শব্দ তেমন একটা ব্যবহার করতেন না তদস্থলে ইজ্জতহানি শব্দের বহুল প্রচলন ছিলো । এখানে আজগুবি নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা টেনে এনে পান্ডিত্য জাহির করার কোনো প্রয়োজন নেই ।

উদিসা ইসলাম : ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মাবোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতার কথা সবাই বলে থাকেন। এই কথায় ব্যবহৃত ইজ্জতের বিনিময়ে শব্দগুচ্ছ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, অ্যাকটিভিস্ট ও অ্যাকাডেমিশিয়ানরা। তারা বলছেন, নারীর ওপর হওয়া নির্যাতনের সঙ্গে ইজ্জত হারানো বা সম্ভ্রমহীন হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। ধর্ষণের মতো মারাত্মক যুদ্ধাপরাধকে সহনীয় করে তোলা হয় এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। তাদের যুক্তি, ধর্ষণের শিকার হলে নারী যদি ইজ্জতহীন হন, তবে নিহত হওয়া পুরুষ বীর হবেন কীভাবে? তাদের ক্ষেত্রে ইজ্জত যায় না কেন?

আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ মনে করেন, ইজ্জত শব্দ ব্যবহার না করে নির্যাতনের শিকার বলাটা বেশি যুক্তিযুক্ত। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন নারীর ইজ্জত চলে যাওয়ার অর্থ তিনি ইজ্জতহীন, মানে তার সম্মান নেই। এটা নেতিবাচক উপস্থাপন। কিন্তু কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে বললে সেটার ভিন্ন অর্থ দাঁড়ায়। তুরিন আরও বলেন, পুরুষ মার খেলে ইজ্জত থাকে, কিন্তু নারী ধর্ষণের শিকার হলে তার ইজ্জত থাকে না। সুনির্দিষ্টভাবে নারীকেই সম্ভ্রম বা ইজ্জত হারানোর কথা শুনতে হয়। ইজ্জত শব্দে আমার আপত্তি আছে। ধর্ষণের শিকার নারী ইজ্জত হারান। কিন্তু যে পুরুষ নিহত হয়েছেন তাকে বীর বলছি। সেখানে ইজ্জত হারানো বলছি না কেন? এটা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। নারী ধর্ষণের শিকার হলে ধরেই নেওয়া হয়, সে সব হারিয়েছে। এ শব্দ থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরিন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইজ্জত হারানো শব্দের ব্যবহারে আমার তীব্র আপত্তি আছে। একাত্তরের পর তিনবার সনদ পরিবর্তন হয়েছে। শুরু থেকেই বীর/বীরাঙ্গনা শব্দের চল ছিল। ঠিক তৃতীয় দফায় এসে শব্দগুলো পাল্টে যায়। মনে রাখা দরকার, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শব্দের বদল মানে কিন্তু সমাজের মনে বদল আনা।

জোবাইদা আরও বলেন, মাবোনের ইজ্জত বলার মধ্যে দিয়ে ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধকে সহনীয় করে ফেলা হচ্ছে। এটা আমরা মাথায়ই রাখি না। দ্বিতীয়ত, বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হলেই সুবিধাদি দিতে হবে বলে যারা কথা তোলেন, তাদের কথাতেই বোঝা যায় যুদ্ধকালীন ধর্ষণের শিকার নারীদের তারা মর্যাদাবান মনেই করেন না। তা ছাড়া নারীর ইজ্জত বা সম্ভ্রম যাওয়ার কথা বলা হলে তার ভূমিকাও ওই একটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। এই ইজ্জত যাওয়া শব্দের ব্যবহারের কারণে মায়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ব্রেভ মাদার হিসেবে আর দাঁড়াতে দেওয়া হয় না।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী একটু ভিন্নমত পোষণ করেন এ ব্যাপারে। তিনি মনে করেন, একাত্তর সালের পটভূমিতে মানুষ শব্দ হিসেবে ধর্ষণ ব্যবহারে বিব্রত বোধ করতো । তাই ওই সময় ধর্ষণে বদলে ইজ্জত শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ওই সময় মানুষ ইজ্জত শব্দটি দিয়ে ধর্ষণ বোঝাতে চেয়েছে। এটা শব্দের রাজনীতি।

ইজ্জত শব্দের ব্যবহারের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণ সমাজে যখন গ্রামের বাইরের কারো সঙ্গে যৌনকর্ম সংগঠিত হতো, তখন সেটাকে সমাজে বাইরের একজনের প্রবেশ বলে গণ্য করা হতো। এটাকে নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝতে হবে। ওই সমাজের জন্য যতটুকু খাদ্য থাকতো সেটা বাইরের লোকের জন্য না। কিন্তু বাইরের লোকের সাথে যৌনকর্ম সংঘটিত হওয়ায় সন্তান জন্ম নিলে তখন ইজ্জত শব্দ দিয়ে বাইরের লোকের প্রবেশ ঠেকানো বুঝানো হতো। আমাদের দেশে এই গবেষণাগুলো ঠিকমতো হয় নাই। ধর্ষণ রিক্রিয়েশনের বিষয় না, প্রক্রিয়েশনের বিষয়।

ইজ্জত, সম্ভ্রম বা ধর্ষণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি বা আলোচনার সুযোগ নেই উল্লেখ করে আফসান চৌধুরী বলেন, এসব কিছু না বলে তাদের যখন মুক্তিযোদ্ধা বলার কথা উঠল তখন মুক্তিযোদ্ধারাই আপত্তি তুললেন, এরা যদি মুক্তিযোদ্ধা হয় তাহলে আমরা কারা? ওরা কি যুদ্ধ করেছে? এগুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় কারণ এগুলো কিছু সুবিধা দিয়েছে। ফলে আমার মনে হয়, বিচ্ছিন্নভাবে ইজ্জত শব্দটা নিয়ে আপত্তি তোলার কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধের পর এভাবেই মানুষ কথা বলতো। আমার মূল কথা হলো ইতিহাসটা জানা দরকার, এটাই কেউ জানতে চায় না।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: