আর্কাইভ

Archive for ডিসেম্বর 10, 2016

বিশ্ব মানবাধিকার দিবস ২০১৬

human-rights-day

world-human-rights-day

our-human-rights

Advertisements

চোরের মা’র বড় গলাঃ মার্কিন নির্বাচনে রাশান ‘সাইবার হামলা’?

সাইবার হামলায় ওস্তাদ মার্কিনীরা (সিআইএ) বানোয়াট ‘সাইবার হামলা’র অভিযোগ তুলেছে রাশানদের বিরুদ্ধে ! উদ্দেশ্য, সিরিয়ায় রাশানদের কাছে নাকানি-চুবানি খেয়ে ভিন্নভাবে প্রতিশোধ নেয়া ।

রাশিয়াকে কেন শিক্ষা দিতে চাইছেন ওবামা?

আরশাদ আলী : সাইবার হামলা কিংবা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে রাশিয়া মার্কিন নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে; এই অভিযোগ নতুন নয়। তবে শুক্রবার মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সাইবার আক্রমণে রুশ সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ফের বিষয়টি নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গন। আগের মতোই নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ বা প্রভাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ট্রাম্পের অন্তবর্তী দলের পক্ষ থেকে সিআইএকে ইঙ্গিত করে দাবি করা হয়েছে, সেই গোয়েন্দা সংস্থা এই অভিযোগ তুলছে যারা ইরাকে মানবধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যে দাবি করেছিল। এর বিপরীতে ডোমোক্র্যাটদের চাপে বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা তার মেয়াদকালেই সিআইএএর তদন্তের পুরো প্রতিবেদন গভীরভাবে যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তার ঘনিষ্ঠজনরা মনে করছেন, ক্ষমতা ছাড়ার আগে রাশিয়াকে শিক্ষা দিতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করবেন ওবামা।

তবে কেন ওবামা রাশিয়াকে শিক্ষা দিতে চাইছেন, এই প্রশ্নে ভিন্নমত রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে। কেউ বলছেন, তিনি চাপে পড়ে এটা করছেন। কেউ বলছেন, তিনি দেরিতে হলেও একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেউবা আবার বলছেন, নিতান্তই রাজনৈতিক কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজ প্রশাসনের ব্যর্থতা ঢাকতে চাইছেন।

নির্বাচনি প্রচারণার সময় ওঠা অভিযোগ পুনরায় মার্কিন রাজনীতিতে আলোড়ন তোলে শুক্রবার। ওই দিন স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য রাশিয়া সাইবার হামলা চালিয়েছিল বলে দাবি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জড়িত যেসব ব্যক্তি উইকিলিকসের হাতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্যদের হাজার হাজার নথি তুলে দিয়েছিলেন, তাদেরও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা শনাক্ত করতে পেরেছে। ওই কর্মকর্তাদের দাবি, যেসব ব্যক্তি ওই কথিত হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত, তারা নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারির সমালোচনা সামনে এনে রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের জয়ের পথ সুগম করার কাজ করছিলেন।

এক জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, মার্কিন গোয়েন্দারা ধারণা করছে, এখানে রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল, এক প্রার্থীকে ঘায়েল করে অপরজনকে সমর্থন করা, ট্রাম্পের জয়ে সাহায্য করা।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, গত সপ্তাহে এ সম্পর্কিত সিআইএর একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন বিশিষ্ট সিনেটরদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তখন ওই সিআইএ গোয়েন্দা কর্মকর্তা সিনেটরদের এ সম্পর্কে অবহিত করেন।

একই দিন হোয়াইট হাউসের সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইউনিটের পরিচালক লিসা মোনাকো ক্রিশ্চিয়ান জানিয়েছেন, রাশিয়ার সাইবার হামলার অভিযোগ পুনরায় খতিয়ে দেখার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন বারাক ওবামা। আর হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এরিক শুলজ জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। সেজন্য তিনি এর তদন্ত করতে বলেছেন। যদিও হোয়াইট হাউস মুখপাত্রের দাবি, এর মধ্য দিয়ে মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে না। কারণ আমেরিকা তাদের নির্বাচন পদ্ধতির স্বচ্ছতা এবং অখণ্ডতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

প্রশাসনিক নেতৃত্ব গ্রহণের অল্প কিছুদিন বাকি থাকতে সিআইএএর সমালোচনা ও রুশ সাইবার হামলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।শুক্রবার ক্ষমতা হস্তান্তরের অন্তবর্তী টিমের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে রাশিয়া সাইবার হামলা চালিয়ে নির্বাচনে জয়ী হতে ও ফল প্রভাবিত করেছে যে অভিযোগ ওঠেছে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। স্বাক্ষরবিহীন এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই অভিযোগ যারা তুলছেন তারাই বলেছিলেন সাদ্দাম হোসেনের কাছে মানববিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। নির্বাচন শেষ হয়েছে অনেক দিন আগে। যা ছিলো ইতিহাসের অন্যতম বড় ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের ব্যবধানের জয়। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও মহান করে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

ডেমোক্র্যাট দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনি প্রচারের সময়ও অভিযোগ করা হয়েছিল, দলটির ন্যাশনাল কনভেনশন ও শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার ইমেইল হ্যাক করেছে রাশিয়ার হ্যাকাররা এবং তা উইকিলিকসের মাধ্যমে ফাঁস করা হয়েছে। নির্বাচিন প্রচারণার সময় হিলারির প্রচারণা টিমের চেয়ারম্যান জন পডেস্টার ইমেইলও ফাঁস হয়। পদত্যাগ করেন দলটির চেয়ারম্যান। অবশ্য টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেও রুশ হ্যাকারদের জড়িত থাকার অভিযোগ খারিজ করেছিলেন ট্রাম্প। বলেছিলেন, আমি এটা মনে করি না। আমি বিশ্বাস করি না তারা হস্তক্ষেপ করেছে। অভিযোগকে ডেমোক্র্যাটদের সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো জানাচ্ছে, বিভিন্ন খবরে জানা যাচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নির্বাচনে রুশ সাইবার প্রভাবের বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, যা ট্রাম্পকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। ওবামা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার আগেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন চেয়েছেন। ফলে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার আগ মুহূর্তেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের বিষয়টির বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের আশা করা হচ্ছে।

তবে বিস্তারিত চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের কতটুকু জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। যদিও হোয়াইট হাউস মুখপাত্র জানিয়েছেন, যতটুকু সম্ভব প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, অবশ্যই ধারণা করতে পারেন এ ধরনের তদন্ত প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্শকাতর ও রাষ্ট্রীয় গোপন বিষয় থাকতে পারে। তবে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ করে কংগ্রেসকে অবহিত করা হবে।তিনি জানিয়েছেন, এর সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসে সাইবার হামলার অভিযোগ নতুন নয়। ২০০৮ সালে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সিনেটর জন ম্যাককেইন ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ওবামা চীনা হ্যাকারদের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন বলে মনে করেন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ওই সময় চীনা হ্যাকাররা দুই প্রার্থীর পলিসি পেপার ও শীর্ষ উপদেষ্টাদের ইমেইল হ্যাক করেছিল। ২০১২ সালেও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মিট রমনির ব্যক্তিগত হটমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

চলতি বছরের অক্টোবরে ওবামা প্রশাসন মার্কিন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে রাশিয়া সাইবার হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, ডেমোক্র্যাটিক দলের ন্যাশনাল কমিটি, ডেমোক্রেটিক দলের কংগ্রেস প্রচারণা ও অপর রাজনৈতিক সংস্থায় সাইবার হামলা চালিয়েছে মস্কো নিয়ন্ত্রিত হ্যাকাররা। হ্যাক করা গোপন ও ব্যক্তিগত তথ্যগুলো উইকিলিকস ও অপর সন্দেহজনক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফাঁস করা হয়। হিলারির প্রচারণা টিমের প্রধান জন পডেস্টা ও বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ইমেইল হ্যাক করারও অভিযোগ ওঠে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ জানায়, সাইবার হামলায় রাশিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয়টি ট্রাম্প বার বার প্রত্যাখ্যান করায় ওবামা এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, ওবামা শঙ্কিত কারণ তিনি যদি কোনও উদ্যোগ না নেন তাহলে রাশিয়া বিনা বিচারে পার পেয়ে যাবে। এছাড়া ক্যাপিটাল হিলের দীর্ঘ একমাস ধরে চলে আসা চাপও ছিলো।

সেপ্টেম্বরে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ও সিনেট গোয়েন্দা কমিটির সদস্য ডিয়ানে ফেইনস্টেইন এক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সাইবার হামলার মাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলেন। গত কয়েক মাস ধরেই যা নিয়ে ছিলো মার্কিন রাজনীতিতে উত্তেজনা। তবে নির্বাচনের ডামাঢোলে তা প্রচারের আলোয় আসেনি খুব একটা। গত সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটিক দলের হাউস কমিটির শীর্ষ পদধারী হুইপ স্টেনি হয়ার ওবামার কাছে একটি চিঠি লিখলে তা পুনরায় আলোচনায় চলে আসে। চিঠিতে তিনি কংগ্রেসকে নির্বাচনে রাশিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে জানানোর আহ্বান করবেন।

হোয়াইট হাউসের পুনঃতদন্তের বিষয়ে শুক্রবার কংগ্রেসে সংখ্যালঘিষ্ঠদের নেতার পক্ষে তার মুখপাত্র বলেছেনআমেরিকান জনগণের জানার অধিকার রয়েছে তাদের নির্বাচন নিয়ে কারা ছেলেখেলা করেছেন। নির্বাচনে হ্যাকিংয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আলাদা কমিশন গঠনের কথাও জানানো হয়েছে।

এছাড়া ওবামা প্রশাসনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি ও সাবকমিটির চেয়ারম্যানও সাইবার হামলা নিয়ে শুনানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সব রিপাবলিকানরা তা মনে করছেন না। অনেকে মনে করছেন, ওবামার হঠাৎ করে মস্কোর ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান ওয়ে ওঠার পেছনে রাজনীতি রয়েছে। হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান ডেভিন নুনেস বলেনে, আগেও বহুবার বলেছি, গোয়েন্দারা পুতিনের পদক্ষেপ সম্পর্কে ধারণা করতেই ব্যর্থ হয়েছেন।

নুয়ানেসের মতে, রাশিয়ার সাইবার হামলায় হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।কারণ বহু বছর ধরেই নিবিড়ভাবে রাশিয়ার পদক্ষেপগুলো নজরদারি করছে তারা। ওবামা প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে ইন্টেলিজেন্স কমিটির পরামর্শ উপেক্ষা করে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় স্থাপনে মশগুল ছিলো। হঠাৎ করে নিশ্চই তাদের ভ্রম কাটেনি।

রাশিয়া বিশেষজ্ঞ রবার্ট আমস্টারডাম যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, পররাষ্ট্রনীতিতে নিদারুণ ব্যর্থ ওবামা প্রশাসন নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে রাশিয়ার দিকে আঙুল তুলছে। কারণ ওবামা প্রশাসনের ব্যর্থ নীতির কারণেই ট্রাম্পের উত্থান ঘটেছে।

কন্ডোলিসা রাইসের অধীনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করা এলিয়ট কোহেন মনে করেন, ওবামার পদক্ষেপটি অবশ্যই ভালো। তবে তা অনেক পরে নেওয়া হলো।

অ্যামেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ভাইসপ্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল প্লেটকা বলেন, এ পদক্ষেপটা চূড়ান্ত অর্থে রাজনৈতিক। রাশিয়া নতুন করে কোনও কিছুতে হস্তক্ষেপ করেনি। এটা তারা করেই আসছে। ইউরোপ ও সিরিয়ায় রাশিয়া যা করছে সেক্ষেত্রে ওবামার সিদ্ধান্ত ভিন্ন।পুতিন ও লাভরভের কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়ে তারা (ওবামা প্রশাসন) এখন হতাশ।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট, ডেইলি বিস্ট, এক্সপ্রেস, পলিটিকো, এনবিসি নিউজ।

Russia’s Involvement in the Email Leaks: The CIA’s Absence of Conviction

I have watched incredulous as the CIA’s blatant lie has grown and grown as a media story – blatant because the CIA has made no attempt whatsoever to substantiate it. There is no Russian involvement in the leaks of emails showing Clinton’s corruption. Yes this rubbish has been the lead today in the Washington Post in the US and the Guardian here, and was the lead item on the BBC main news. I suspect it is leading the American broadcasts also.

A little simple logic demolishes the CIA’s claims. The CIA claim they “know the individuals” involved. Yet under Obama the USA has been absolutely ruthless in its persecution of whistleblowers, and its pursuit of foreign hackers through extradition. We are supposed to believe that in the most vital instance imaginable, an attempt by a foreign power to destabilise a US election, even though the CIA knows who the individuals are, nobody is going to be arrested or extradited, or (if in Russia) made subject to yet more banking and other restrictions against Russian individuals? Plainly it stinks. The anonymous source claims of “We know who it was, it was the Russians” are beneath contempt.

As Julian Assange has made crystal clear, the leaks did not come from the Russians. As I have explained countless times, they are not hacks, they are insider leaks – there is a major difference between the two. And it should be said again and again, that if Hillary Clinton had not connived with the DNC to fix the primary schedule to disadvantage Bernie, if she had not received advance notice of live debate questions to use against Bernie, if she had not accepted massive donations to the Clinton foundation and family members in return for foreign policy influence, if she had not failed to distance herself from some very weird and troubling people, then none of this would have happened.

The continued ability of the mainstream media to claim the leaks lost Clinton the election because of “Russia”, while still never acknowledging the truths the leaks reveal, is Kafkaesque.

I had a call from a Guardian journalist this afternoon. The astonishing result was that for three hours, an articlewas accessible through the Guardian front page which actually included the truth among the CIA hype:

The Kremlin has rejected the hacking accusations, while the WikiLeaks founder Julian Assange has previously said the DNC leaks were not linked to Russia. A second senior official cited by the Washington Post conceded that intelligence agencies did not have specific proof that the Kremlin was “directing” the hackers, who were said to be one step removed from the Russian government.
Craig Murray, the former UK ambassador to Uzbekistan, who is a close associate of Assange, called the CIA claims “bullshit”, adding: “They are absolutely making it up.”
“I know who leaked them,” Murray said. “I’ve met the person who leaked them, and they are certainly not Russian and it’s an insider. It’s a leak, not a hack; the two are different things.
“If what the CIA are saying is true, and the CIA’s statement refers to people who are known to be linked to the Russian state, they would have arrested someone if it was someone inside the United States.
“America has not been shy about arresting whistleblowers and it’s not been shy about extraditing hackers. They plainly have no knowledge whatsoever.”

বাকী অংশের জন্য এখানে দেখুনঃ

http://www.globalresearch.ca/russias-involvement-in-the-email-leaks-the-cias-absence-of-conviction/5561721

More Russia Bashing Over Nonexistent Cyberattacks

On October 7, a joint Department of Homeland Security/Director of National Intelligence (DHS/DNI) statement charged Russia with cyberattacks “intended to interfere with the US election process.”

It was a Big Lie. No evidence was cited because none exists. Accusations without proof are baseless. It had nothing to do with hacking DNC emails or interfering in America’s presidential election in any other way – nor meddling in the internal affairs of any country, longstanding US practice.

The DHS/DNI joint statement, claiming “confiden(ce)” about Russia cyberattacking “US political organizations” was politically motivated lying.

No matter. Obama ordered US intelligence agencies to review nonexistent Russian interference in the 2016 election process, completing a report before he leaves office on January 20.

It’s likely already written – a fictional account of what never happened. Interviewed by Time magazine after being named its person of the year, Trump said “I don’t believe it. I don’t believe (Russia) interfered…(S)ome guy in New Jersey” may have done it. He called charges politically motivated, adding they “became a laughing point, not a talking point…Any time I do something, they say ‘Oh, Russia interfered.’ “ Putin and other Russian officials categorically debunked the false charges.

Obama administration homeland security advisor Lisa Monaco claimed “a new threshold” was likely crossed, calling it necessary “to conduct some after-action…”

Deputy White House press secretary Eric Schultz said Obama considers completing the report on his watch “a major priority.” He’s got nothing better to do than bash Russia.

Last month, the White House declared the November election “free and fair from a cybersecurity perspective.” If so, why investigate nonexistent Russian hacking? Why conduct a recount scam in three states? Why accuse Moscow of election interference when it’s known none occurred? It’s all about Russia bashing, longstanding plans calling for regime change, installing pro-Western puppet governance, etc.

It also points to powerful interests backing Hillary “remain(ing) intent upon undermining Trump’s accession to the White House (because he’s) not entirely in the pocket of the lobby groups,” according to Michel Chossudovsky.

Wanting to get along with Vladimir Putin, including cooperating with him in combating terrorism, conflicts with powerful interests wanting adversarial relations maintained, along with supporting ISIS and other terrorist groups, using them as imperial foot soldiers.

On Friday, Trump’s transition team released a statement, debunking notions of Russia interfering in America’s political process, saying “(t)hese are the same people (who) said Saddam Hussein had weapons of mass destruction. The election ended (weeks ago). It’s now time to move on and ‘Make America Great Again.’ “

Stephen Lendman lives in Chicago. He can be reached at lendmanstephen@sbcglobal.net

‘ইজ্জতের বিনিময়ে’ শব্দগুচ্ছ যুদ্ধাপরাধকে সহনীয় করে দেয়!

rape-3-artনীচে সাংবাদিক আফসান চৌধুরী ইজ্জতহানির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নিজের ইজ্জত খুইয়েছেন । পাকিস্তান আমলে এ ভূখন্ডে বাংলা কথ্যভাষায় প্রচুর উর্দু শব্দ ব্যবহৃত হতো । ধর্ষণ শব্দের সাথে সাধারণ মানুষ অতোটা পরিচিত ছিলো না এমনকি সাহিত্যিকরাও ধর্ষণ শব্দ তেমন একটা ব্যবহার করতেন না তদস্থলে ইজ্জতহানি শব্দের বহুল প্রচলন ছিলো । এখানে আজগুবি নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা টেনে এনে পান্ডিত্য জাহির করার কোনো প্রয়োজন নেই ।

উদিসা ইসলাম : ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মাবোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতার কথা সবাই বলে থাকেন। এই কথায় ব্যবহৃত ইজ্জতের বিনিময়ে শব্দগুচ্ছ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, অ্যাকটিভিস্ট ও অ্যাকাডেমিশিয়ানরা। তারা বলছেন, নারীর ওপর হওয়া নির্যাতনের সঙ্গে ইজ্জত হারানো বা সম্ভ্রমহীন হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। ধর্ষণের মতো মারাত্মক যুদ্ধাপরাধকে সহনীয় করে তোলা হয় এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। তাদের যুক্তি, ধর্ষণের শিকার হলে নারী যদি ইজ্জতহীন হন, তবে নিহত হওয়া পুরুষ বীর হবেন কীভাবে? তাদের ক্ষেত্রে ইজ্জত যায় না কেন?

আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ মনে করেন, ইজ্জত শব্দ ব্যবহার না করে নির্যাতনের শিকার বলাটা বেশি যুক্তিযুক্ত। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন নারীর ইজ্জত চলে যাওয়ার অর্থ তিনি ইজ্জতহীন, মানে তার সম্মান নেই। এটা নেতিবাচক উপস্থাপন। কিন্তু কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে বললে সেটার ভিন্ন অর্থ দাঁড়ায়। তুরিন আরও বলেন, পুরুষ মার খেলে ইজ্জত থাকে, কিন্তু নারী ধর্ষণের শিকার হলে তার ইজ্জত থাকে না। সুনির্দিষ্টভাবে নারীকেই সম্ভ্রম বা ইজ্জত হারানোর কথা শুনতে হয়। ইজ্জত শব্দে আমার আপত্তি আছে। ধর্ষণের শিকার নারী ইজ্জত হারান। কিন্তু যে পুরুষ নিহত হয়েছেন তাকে বীর বলছি। সেখানে ইজ্জত হারানো বলছি না কেন? এটা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। নারী ধর্ষণের শিকার হলে ধরেই নেওয়া হয়, সে সব হারিয়েছে। এ শব্দ থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরিন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইজ্জত হারানো শব্দের ব্যবহারে আমার তীব্র আপত্তি আছে। একাত্তরের পর তিনবার সনদ পরিবর্তন হয়েছে। শুরু থেকেই বীর/বীরাঙ্গনা শব্দের চল ছিল। ঠিক তৃতীয় দফায় এসে শব্দগুলো পাল্টে যায়। মনে রাখা দরকার, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শব্দের বদল মানে কিন্তু সমাজের মনে বদল আনা।

জোবাইদা আরও বলেন, মাবোনের ইজ্জত বলার মধ্যে দিয়ে ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধকে সহনীয় করে ফেলা হচ্ছে। এটা আমরা মাথায়ই রাখি না। দ্বিতীয়ত, বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হলেই সুবিধাদি দিতে হবে বলে যারা কথা তোলেন, তাদের কথাতেই বোঝা যায় যুদ্ধকালীন ধর্ষণের শিকার নারীদের তারা মর্যাদাবান মনেই করেন না। তা ছাড়া নারীর ইজ্জত বা সম্ভ্রম যাওয়ার কথা বলা হলে তার ভূমিকাও ওই একটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। এই ইজ্জত যাওয়া শব্দের ব্যবহারের কারণে মায়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ব্রেভ মাদার হিসেবে আর দাঁড়াতে দেওয়া হয় না।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী একটু ভিন্নমত পোষণ করেন এ ব্যাপারে। তিনি মনে করেন, একাত্তর সালের পটভূমিতে মানুষ শব্দ হিসেবে ধর্ষণ ব্যবহারে বিব্রত বোধ করতো । তাই ওই সময় ধর্ষণে বদলে ইজ্জত শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ওই সময় মানুষ ইজ্জত শব্দটি দিয়ে ধর্ষণ বোঝাতে চেয়েছে। এটা শব্দের রাজনীতি।

ইজ্জত শব্দের ব্যবহারের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণ সমাজে যখন গ্রামের বাইরের কারো সঙ্গে যৌনকর্ম সংগঠিত হতো, তখন সেটাকে সমাজে বাইরের একজনের প্রবেশ বলে গণ্য করা হতো। এটাকে নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝতে হবে। ওই সমাজের জন্য যতটুকু খাদ্য থাকতো সেটা বাইরের লোকের জন্য না। কিন্তু বাইরের লোকের সাথে যৌনকর্ম সংঘটিত হওয়ায় সন্তান জন্ম নিলে তখন ইজ্জত শব্দ দিয়ে বাইরের লোকের প্রবেশ ঠেকানো বুঝানো হতো। আমাদের দেশে এই গবেষণাগুলো ঠিকমতো হয় নাই। ধর্ষণ রিক্রিয়েশনের বিষয় না, প্রক্রিয়েশনের বিষয়।

ইজ্জত, সম্ভ্রম বা ধর্ষণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি বা আলোচনার সুযোগ নেই উল্লেখ করে আফসান চৌধুরী বলেন, এসব কিছু না বলে তাদের যখন মুক্তিযোদ্ধা বলার কথা উঠল তখন মুক্তিযোদ্ধারাই আপত্তি তুললেন, এরা যদি মুক্তিযোদ্ধা হয় তাহলে আমরা কারা? ওরা কি যুদ্ধ করেছে? এগুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় কারণ এগুলো কিছু সুবিধা দিয়েছে। ফলে আমার মনে হয়, বিচ্ছিন্নভাবে ইজ্জত শব্দটা নিয়ে আপত্তি তোলার কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধের পর এভাবেই মানুষ কথা বলতো। আমার মূল কথা হলো ইতিহাসটা জানা দরকার, এটাই কেউ জানতে চায় না।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

রোকেয়ার উত্তরসূরী

rokeya-stampরোখসানা চৌধুরী : বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনই এই উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদী যিনি ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ করেছিলেন একই সঙ্গে। কোনো বিশেষ ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থকে নয়, বরং সকল ধর্ম ও তার ধারকবাহকপ্রহরীরূপী পুরুষকে। অথচ তাঁর নাম নিয়েই ঘটে গেছে সবচেয়ে বড় বিভ্রাট। উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদীর নামের তিনচতুর্থাংশই কৃত্রিমভাবে আরোপিত। পিতৃপ্রদত্ত নামটি ছিল মোসাম্মৎ রুকাইয়া খাতুন। বিয়ের পর তিনি মিসেস আর. এস. হোসেন নামে লিখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তার বিদ্রোহী সত্তাকে আড়াল করে একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম ভদ্রমহিলা অবয়ব প্রদানের অভিপ্রায়ে বেগম রোকেয়া নামে তাঁকে পরিচিত করা হয়। বর্তমানে বেগম রোকেয়া এবং রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনদুটি নামই জনসমাজে প্রচলিত, যার একটি নামও তাঁর প্রকৃত পরিচয় বহন করে না। নামজনিত এই বিভ্রাট অত্র অঞ্চলের অবিকশিত, বিভ্রান্ত নারীবাদী ভাবনার প্রতীক হয়ে ধরা দেয়। রোকেয়াপরবর্তী দীর্ঘ শূন্যতার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রোকেয়াদর্শনের মূল আলোকপাত ঘটেছে প্রধানত তিনটি গ্রন্থে. সুলতানার স্বপ্ন, . পদ্মরাগ এবং ৩. অবরোধবাসিনী।
সুলতানার স্বপ্ন আখ্যানটি নারীবাদী বিশ্বের বা রাষ্ট্রের ভবিষৎ মেনিফেস্টো। পদ্মরাগ উপন্যাস বাস্তবতার সাথে সাযুজ্যতা রেখে তৎকালীন সম্ভাব্য স্বাধীন মনুষ্য অবয়বধারী নারীর রূপরেখা। অবরোধ ও পর্দাপ্রথা সম্পর্কে বেগম রোকেয়ার ভাবনা নিয়ে যত বিভ্রান্তি তার মোক্ষম উত্তর অবরোধবাসিনী গ্রন্থখানি স্বয়ং। তাঁর সমগ্র রচনাবলী এবং জীবনদর্শনে যে বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়েছে তা মোটের উপর নিম্নরূপ

. অবরোধপ্রথার অবলুপ্তি
. দপ্তর ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীপুরুষের সমন্বিত উদ্যোগ
. নারীর বিজ্ঞাননির্ভর কর্ম পরিকল্পনা
. নারীপুরুষের জড়তামুক্ত সহাবস্থান
. নারীর আত্মপ্রত্যয়ী ঋজু লিঙ্গনিরপেক্ষ শরীরী ভাষা (body language)
. দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত নারীর পরিবর্তিত বেশভূষা
. দেশজাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ছুৎমার্গবিহীন একত্রবাস তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্ময়কর প্রকাশ
. ক্ষুদ্র ও কৃষিশিল্পের সম্প্রসারণে নারীপুরুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক অলোচনা

স্থান স্বল্পতার জন্য রোকেয়ারচনার চুম্বক অংশবিশেষ পাঠকের জন্য বর্তমান প্রবন্ধে উপস্থাপন করা গেল:

. ধর্ম প্রসঙ্গে

যখনই কোন ভগ্নি মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন তখনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।তবেই দেখিতেছেন, এই ধর্মগ্রন্থগুলো পুরুষ রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। কোন স্ত্রী মুনির বিধানে হয়তো তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। ধর্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বর প্রেরিত কিনা কেহই নিশ্চিত বলিতে পারে না। যদি ঈশ্বর কোন দূত রমনী শাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত বোধ হয় কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না। এখন আমাদের আর ধর্মের নামে নতমস্তকে নরের অযথা প্রভূত্ব সহা উচিৎ নহে। আরও দেখ, যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ় সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক।

কেহ বলিতে পারেন যে, তুমি সামাজিক কথা কহিতে গিয়া ধর্ম লইয়া টানাটানি কর কেন? তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, ধর্ম শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমনীর উপর প্রভূত্ব করিতেছেন। তাই ধর্ম লইয়া টানাটানি করিতে বাধ্য হইলাম। (রোকেয়া, কাদির, ১৯৭৩, পৃ. ১১১৩)

. পুরুষের স্বরূপ উন্মোচনে

. কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য। (ডেলিশিয়াহত্যা, রোর, ১৬২)

. নারীস্থানে স্বয়ং শয়তানকেই (পুরুষ জাতি) শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, দেশে আর শয়তানী থাকিবে কি রূপে? (সুলতানার স্বপ্ন, ১৩৪)

. তাহারা কিছুই করিবে নাতাহারা কোন ভালো কাজের উপযুক্ত নহে। তাহাদিগকে ধরিয়া অন্তঃপুরে বন্দি করিয়া রাখুন। (, ১৩৫)

. নারী যাহা দশ বৎসরে করিতে পারে, পুরুষ তাহা শতবর্ষেও করিতে অক্ষম।

. ডাকাতি, জুয়াচুরি, পরস্বাপহরণ, পঞ্চমকার আদি কোন পাপের লাইসেন্স তাহাদের নাই। (রোর, ৩৩৪)

. নারীর উদ্দেশ্যে

. আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি (রোর, ২৭৭)। প্রাণীজগতের কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয় নহে। (রোর, ৮৪)

. আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলিএগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ। কারাগারে বন্দীগণ পায়ে লৌহনির্মিত বেড়ি পরে, আমরা স্বর্ণরৌপ্যের বেড়ি অর্থাৎ মল পরি। উহাদের হাতকড়ি, লৌহনির্মিত, আমাদের হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্মিত চুড়ি। কুকুরের গলে যে গলবন্ধ (dog-collar) দেখি উহারই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয়া চিক নির্মিত হইয়াছে। গোস্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া নাকাদড়ি পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের নোলক পরাইয়াছেন!! নোলক হইতেছে স্বামীর অস্তিত্বের (সধবার) নিদর্শন।

. স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দৈর্ঘ মাপেন, স্ত্রী তখন বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ প্রস্থ মাপেন। (পৃ. ২৮)

প্রশ্ন জাগে, রোকেয়ার এই সব বিস্ফোরকভাবনার উৎস কোথায়? ভাই ও স্বামীর সহায়তায় সামান্য বাংলাইংরেজী শিখবার যে ইতিহাস প্রচলিত তাতে অন্তত এই ধরণের র‌্যাডিক্যাল ভাবনার জন্ম নেয়াটা অসম্ভব বলেই মনে হয়। তাই হয়তো রোকেয়া প্রসঙ্গে ঐ সময়ে রবীন্দ্রনাথের নীরব থাকাটাও সঙ্গত বলে মনে হতে থাকে আমাদের। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হই না আর। কারণ, রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য সমকালীন বিশিষ্ট লেখকেরা রোকেয়া সম্পর্কে বিস্ময়কর নীরবতা পালন করেছেন। ঠাকুর পরিবারের মেয়েরা শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি বেশভূষার পরিবর্তন, একাকী বিলেত ভ্রমণ পর্যন্ত ঠাকুর পরিবারের বিদ্রোহ সীমায়িত ছিল। নারীপুরুষের সমতার কাছাকাছি কোন ধারণা তাদের পক্ষে থেকে উত্থাপিত হয়নি। বরং শিক্ষাকে তারা গ্রহণ করেছিলেন সমাজ ও পরিবারে নারীর ঐতিহ্যিক ভূমিকাকে আরো বেশি নিপুণভাবে পরিবেশন করতে। (রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া, গোলাম মুরশিদ পৃ. ১৮৬)

তাই রবীন্দ্ররচনাতেও সত্যিকার অর্থে কোনো উদ্যোগী নারীর প্রতিচ্ছবি চোখে পড়ে না। বিনোদিনী, চারু, সুচরিতা, ললিতা, লাবণ্যকেতকী, কুমুদিনীএরা প্রত্যেকেই লেখালেখি, সামাজিক সাংগঠনিক কাজের মত সৃজনশীল কাজের সাথে জড়িত থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই হৃদয়ঘটিত জটিলতার আবর্তনে ঘুরপাক খেতে খেতে জীবনের সকল সম্ভাবনা পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।

বেগম রোকেয়া যখন লিখছেন, তখন তার সামনে উদাহরণস্বরূপ রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর ছিলেন। যারা ঠিক নারীবাদী না হলেও নারীমুক্তির পথে প্রধান প্রধান বাধাগুলো অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে উপমহাদেশে রোকেয়ার কোন পূর্বসূরী ছিল না। পূর্বসূরী না থাকাটা যৌক্তিক কারণেই মেনে নেয়া যায়। কিন্তুু আজকের একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে ভাবতে হচ্ছে, সেই রোকেয়ার যথার্থ উত্তরসূরী কোথায়? রোকেয়াভাবমূর্তিকে মহিমান্বিত করলেও বাংলাদেশের সমাজ বা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে নিদেনপক্ষে নারী আন্দোলন কিংবা নারীর জীবন যাপনে প্রতিফলন কোথায়? যদিও আশান্বিত হবার মত পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছিলো।

সুফিয়া কামাল সরাসরি রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলামের সদস্যরূপে, স্বপ্রতিষ্ঠিত রোকেয়া সদনের পরিচালনায়, পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে প্রত্যক্ষভাবে রোকেয়াপদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত শিখা গোষ্ঠির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বে জাতীয় মহিলা পরিষদ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নারী পুর্নবাসন, মেয়েদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করবার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ধর্মে ও পরিবারে নারীর অধস্তন অবস্থান, ধর্মীয় আইনে নারীর সন্তান ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার ইত্যাদি নারীমুক্তি প্রসঙ্গে মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা পরবর্তীসময়ে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ও মৌলবাদের আগ্রাসন ঘটে। খোদ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের নানা অনুষঙ্গকে বিতর্কিত করে তোলা হয়। স্বাভাকিভাবেই নারী মুক্তি অথবা নারী অধিকার প্রসঙ্গটি আন্দোলনের মূল ধারা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাধীনতার পর ধর্ষিতা বা নির্যাতিতা হবার বাইরে আর কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এমনকি সশস্ত্র নারী মুক্তিযোদ্ধারাও অধিকাংশই অপরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেছেন। বীর প্রতীক তারামন বিবিকে খুঁজে বের করে সম্মানিত করা হয়েছে স্বাধীনতার ২৫ বছর পর। তাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি অথবা উল্টো দিক থেকে নারীর জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে গভীর ভাবনায় খুব বেশি ইতিবাচক মনে হবার কথা না। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একাত্তর পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা দেশটির প্রশাসকগণ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায়। কিন্তুু পরিবারের অর্থনীতি, একই সাথে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সামলে তুলতে যে নারী ঘর থেকে বেরিয়ে এলোরাষ্ট্র সেই নারীর জন্য রাস্তাঘাট, যানবাহন, কর্মক্ষেত্রকোথাও নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা ভেবে দেখেনি। নারী যেপুরুষের (পিতা, স্বামী অথবা ভাই) ঘর থেকে বের হয় অথবা যেপুরুষের সাথে চলতে হয় (রাস্তাঘাট বা যানবাহন) এবং যাদের সাথে পরিবারের চাইতেও অধিক সময় ব্যয় করে (দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান) সেই পুরুষেরা আজও নারীকে তাদের অপ্রস্তুুত মানসিকতায় মাংসপিণ্ড ব্যতীত সহকর্মী ভাববার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ইভটিজিং, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপসহ নারীর প্রতি সহিংসতার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়ে আছে এভাবেই, যাকে মূল থেকে উৎপাটনের পরিকল্পনা করা হয়নি কখনোই। তাই নারী ঘরেবাইরে নিরাপত্তা, সম্মান, বা ন্যূনতম মানবিক অধিকারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তবে লড়াইটি অসংগঠিত, বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তএকথা প্রাজ্ঞজনেরাও স্বীকার করছেন।

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম (যুদ্ধাপরাধীদের বিচার), নীলিমা ইব্রাহিম (মুক্তিযুদ্ধে আহতনির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন) কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যূতে ফলপ্রসু অবদান রেখেছেন। কিন্তু এইসব ধারাবাহিকতাহীন বিবিধ আন্দোলন অথবা দেশজুড়ে গৃহকর্মীদের পোশাকশিল্প কারখানায় কর্মীরূপে রূপান্তরনারীমুক্তি কিংবা নারীর অধিকার প্রসঙ্গে রোকেয়া বর্ণিত নারীর সার্বিক জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। যেমনভাবে বেগম রোকেয়ার পরে আর কোনও লেখকের (নারী বা পুরুষ) রচনায় যথাযথ রূপে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের সাথে দ্বন্দ্বসংশিষ্টতার প্রেক্ষাপটে নারীর সম্ভাব্য স্বাধীন, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন অবয়বকে নিরূপণ করা যায়নি।

নব্বই দশকে এমত বিরাজমান স্থবির সময়ের মাঝপথে তসলিমা নাসরিনের আগমন পুরো পরিস্থিতিকে পাল্টে দেয়। ধর্ম, সমাজ ও পুরুষতন্ত্রকে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে তার প্রকাশিত আক্রমণাত্মক বক্তব্য নিয়ে দেশ ও বহির্বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মৌলবাদী ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রকাশ্যে তার হত্যামূল্য নির্ধারণ করলে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন। তার গ্রন্থগুলি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভের পাশাপাশি বাজেয়াপ্তও হয়। প্রশ্ন হচ্ছে তসলিমা নাসরীন যা যা বলেছিলেন, তা কি খুব অসম্ভব, উদ্ভট, আকস্মিক আবিষ্কৃত নতুন কোনো তত্ত্ব? ধর্ম, নারী এবং সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে তার আগেপরে ড. আহমদ শরীফ, . হুমায়ুন আজাদ, আরজ আলী মাতুব্বরসহ আরো বহু মনীষীই বিদ্বেষ, কটূক্তি, বিরুদ্ধভাব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাদের দেশত্যাগ করতে হয়নি। আমজনতার সমাবেশে এঁদের নাম পর্যন্ত অনেকে অবগত নন। প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে বেগম রোকেয়া একশ বছর আগেই মত প্রকাশ করেছেন। পার্থক্য হল রোকেয়াকে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর তসলিমা নাসরিন বক্তব্যকে আরো বেশি তথ্যপ্রমাণ সহকারে উপস্থাপন করাতে তার মাথার মূল্য ধার্য হয়ে গেছে।

বলে রাখা ভালো, বর্তমান আলোচনাটি তসলিমা নাসরীনকে নিয়ে নয়, তার রচনা কুশলতার বিচার নিয়েও নয়। কেবল একটি প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশে নারীবাদের উদ্ভববিকাশের আশ্চর্য পরস্পরহীনতার যোগসূত্র অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হওয়া যায়। অর্থাৎ রোকেয়া যদি তার রচনা প্রত্যাহার না করতেন, তবে মাথার মূল্য নির্ধারণের আগেই অজানা অন্ধকারে তাকে হারিয়ে যেতে হত। এই আশ্চর্য মূল্য নির্ধারণের দুর্ভেদ্য বেষ্টনীকে অতিক্রম করা যায়নি বলেই কি নারীবাদের সহজস্বাভাবিক বিবর্তন ঘটেনি অত্র অঞ্চলে? তসলিমা নাসরীনের আগমন ও উপস্থিতি তাই পূর্বাপর সংযোগবিচ্ছিন্ন। বেগম রোকেয়ার মতই। এক শতাব্দী আগের প্রেক্ষাপট বলেই তাকে মহিমার দৃষ্টিতে বিচার করা সম্ভব হচ্ছে।

কথা হচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের নারী গ্রন্থে এবং বেগম রোকেয়ার রচনাতেও যতখানি পুরুষবিদ্বেষ এবং ধর্ম বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে, ততখানি নয় তসলিমা নাসরীনে। একটি সাক্ষাৎকারে (৭১টিভি, ৮ আগষ্ট ২০১৪) তিনি সেই কথা স্বীকারও করেছেন। অথচ রোকেয়া নারীজীবন সম্পর্কে যেখানে থেমে গিয়েছিলেন, তসলিমা নাসরিন অন্য সব কিছুর সঙ্গে নারীর সেই অকথিত যৌনজীবন সম্পর্কে মুখ খুললেন। অপ্রস্তুত বাঙালি সমাজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত চমকে গেল। মূলত তসলিমা নাসরিনের বিবৃত নারীবাদের সমালোচনা হিসেবে দুটি বিষয়কে গণ্য করেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ কিংবা সমাজ তাত্ত্বিকেরা।

. দেশকালসমাজইতিহাসের প্রেক্ষিতে বাঙালি নারী মুক্তির বিষয়টি সমন্বিত করে দেখতে না পারা।

. ভাবনাসমূহের বিচ্ছিন্নতা, ব্যক্তিগত ক্ষোভের তীব্রতা সামগ্রিক বিষয়টির তত্ত্বীয় রূপদানে ব্যর্থতা।

তবে তাঁর এইসব সীমাবদ্ধতাকে সমাজের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দিক নির্দেশনার অপরিপক্কতার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ (নারী,পুরুষ ও সমাজ/পৃ.১২৩)। তাছাড়া, তার রচনাবলীর সামগ্রিক নিবিড় পাঠেরও অভাব রয়েছে বলে বোধ হয়। যেভাবে রোকেয়ারচনার বিদ্রোহী প্রতিবাদী অংশগুলো আজো জনসমাজে অজানিতই রয়ে গেছে। অর্ধশিক্ষিত জাতি, যারা আজো বিনোদন খুঁজে পায় দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান গ্রন্থে, অথবা ধর্মীয় গ্রন্থের (মাকছুদুল মোমেনীন) দাম্পত্য জীবন অংশে, তারা যে নারী রচিত গ্রন্থে নারীর যৌনজীবন সম্পর্কে উন্মুক্ত আলোচনায় গোপন আনন্দ খুঁজবে আর প্রকাশ্যে তার মৃত্যুদণ্ড দাবি করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে, বিচ্ছিন্নভাবে হলেও নারীর প্রধান দুটি শত্রু মৌলবাদ ও পুঁজিবাদকে চিহ্নিত করতে তিনি ভুল করেন নি।

দীর্ঘ গণআন্দোলন এবং সশস্ত্র একটি জনযুদ্ধের পরেও স্বাধীন দেশে নারীমুক্তির বিষয়টি কখনো গুরুত্ব পায়নি। তাই দেখা যায় অতীত ইতিহাসেও প্রীতিলতা কিংবা ইলা মিত্র অথবা একাত্তরের বীরযোদ্ধা তারামনদের যুদ্ধক্ষেত্রেও জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নারীকে মানসিকভাবে ভেঙেচুরে দেবার জন্য ধর্ষণ নামক নির্যাতনটিকে ক্রমাগত ব্যবহার করা হয়। ইলা মিত্রসহ অগনিত নারী যার শিকার ছিলেন। তারামন এবং আরো অনেককেই প্রথমে পরীক্ষাস্বরূপ রান্নার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে তারা যুদ্ধে যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে জয় করার যুদ্ধটি নারীর প্রথম যুদ্ধ। তা সংসারই হোক কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র। এতগুলো যুদ্ধে উত্তীর্ণ হওয়ার মাঝপথে মানসিক দাসত্বের কাছে পরাজিত হয়ে সংসারের একটি নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবরূপে নারী ঘরে ফিরে যায়। এই ফিরে যাওয়ার মিছিলটিই দীর্ঘ এবং হতাশাব্যঞ্জক।

বেগম রোকেয়া এবং হুমায়ুন আজাদের রচনার যেখানে সাদৃশ্য দেখা যায় তা হলো তারা দুজনেই নারী মুক্তির ক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়নকে এতটা জোরালোভাবে প্রাধান্য দেন যেখানে পুরুষের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই ম্রিয়মান হয়ে পড়বে। উনিশশতক পূর্ব নারীর মত পুরুষের অস্তিত্ব সেখানে আবছায়ার আড়ালে ঝাপসা হয়ে থাকবে।

. নন্দনকাননতুল্য নারীস্থানে নারীর পূর্ণ আধিপত্য। পুরুষেরা মর্দানায় থাকিয়া রন্ধন করেন, শিশুদের খেলা দেন (সুলতানার স্বপ্ন/পৃ. ১১৩)

. পুরুষেরা বড় বড় কলকারখানায় যন্ত্রাদি পরিচালিত করেন; খাতাপত্র রাখেন– …তাহারা কেরানী ও মুটে মজুরের কাজ করিয়া থাকেন। (সুলতানার স্বপ্ন/পৃ. ১১৪) এদিক থেকে দুজনার ভাবনাই প্রবলভাবে র‌্যাডিক্যাল। হুমায়ুন আজাদ মাতৃত্বকে নারী মুক্তির পথে প্রতিবন্ধকরূপে উপস্থাপন করেছেন।

. নিজের ভবিষ্যতের জন্য নারীকে ত্যাগ করতে হবে পিতৃ ও পুরুষতন্ত্রের সমস্ত শিক্ষা ও দীক্ষা; ছেড়ে দিতে হবে সুমাতা, সুগৃহিনী, সতীর ধারণা; … তাকে কান ফিরিয়ে নিতে হবে পুরুষতন্ত্রের সমস্ত মধুর বচন থেকে, তাকে বর্জন করতে হবে পুরুষতন্ত্রের প্রিয় নারীত্ব। তাকে সাবধান হতে হবে পুরুষতন্ত্রের সমস্ত মহাপুরুষ সম্বন্ধে, সন্দেহের চোখে দেখতে হবে সবাইকে। কেননা কেউ তার মুক্তি চায়নি। (নারী/হু. আজাদ পৃ. ৩২৬)

. নারীর গর্ভধারণ একান্ত পাশবিক কাজ। নারীকে কি চিরকালই ধারণ করে যেতে হবে গর্ভ, পালন করে যেতে হবে পশুর ভূমিকা? …পুরুষতন্ত্রের শিক্ষার ফলে নারী আজো মনে করে গর্ভধারনেই তার জীবনের সার্থকতাগর্ভবতী হওয়ার মধ্যে জীবনের কোনা সার্থকতা, মহত্ত্ব, পূণ্য নেই। আমূল নারীবাদীরা মনে করেন মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর নয়, পুরুষকে উদ্ভাবন করতে হবে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প পথ; এবং কয়েক শ বছর পর গর্ভধারণ যে আদিম পাশবিক কাজ বলে গণ্য হবে তাতে সন্দেহ নেই। (/পৃ৩২০)

রোকেয়া পদ্মরাগ কিংবা সুলতানার স্বপ্নে যেভাবে নারীকে প্রশাসনিক দাপ্তরিক কাজে ব্যাপৃত দেখান সেখানে কোথাও নারীর মাতৃরূপটির উপস্থিতি নেই। অথবা ঘরেবাইরে নারীর একাধিক ভূমিকা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যেসব জটিলতা সৃষ্টি হয়ে থাকে সেই বিষয়গুলো সঙ্গত কারণেই তিনি দৃষ্টি এড়িয়ে গেছেন। নারী মুক্তির পথে বিবাহসংসারপুরুষতান্ত্রিক সমাজের সকল শৃঙ্খলকে তিনি উপেক্ষা করতে বলেছেন। তবে কি ধরে নেয়া যায়, র‌্যাডিক্যাল নারীবাদীদের মত তিনিও নারীপুরুষের জীববৈজ্ঞানিক বৈষম্যে বিশ্বাসী ছিলেন? রোকেয়া একটি বিষয়েই সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করে গেছেন। তা হল নারীর যৌনজীবন। হয়তো লেখালেখির শুরুতেই ধর্ম বিষয়ক বিদ্রোহ প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হয়ে সতর্ক হয়েছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় অবরোধ ও পর্দাপ্রথা নিয়ে ক্রমাগত স্ববিরোধী বক্তব্য প্রকাশে। নিদেনপক্ষে তিনি নারীশিক্ষার প্রকল্পটি চালু রাখতে মরণপণ করেছিলেন। (অন্যত্র জানা যায়, তিনি মেয়েদের জন্য কলেজ খুলতেও আগ্রহী ছিলেন।) তাই শেষ জীবনে অনেক রকমের আপোসকামিতার সঙ্গে সমঝোতা করতে থাকা এই যুগান্তরী মহামানবীর তীব্র ক্ষোভ অপ্রকাশিতও থাকেনি।

. আমার স্কুলটা আমার প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয়। একে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি সমাজের অযৌক্তিক নিয়ম কানুনগুলিও পালন করছি। (সওগত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনকে।)

. তবু পর্দা করছি কেন জানেন? বুড়ো হয়ে গেছি, মরে যাব। ইস্কুলটা এতদিন চালিয়ে এলাম, আমার মরার সঙ্গে সঙ্গে এও যদি মরে সেই ভয়ে। (ইব্রাহিম খাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকার)

. জীবনের ২৫ বছর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইতেছি। (রোর/৩৮০)

. হাড়ভাঙ্গা গাধার খাটুনিইহার বিনিময় কি জানিস? … ভাড় লিপকে হাত কালি অর্থাৎ উনুন লেপন করিলে উনুন তো বেশ পরিষ্কার হয়, কিন্তু যে লেপন করে তাহারই হাতে কালিতে কালো হইয়া যায়। আমার হাড়ভাঙা খাটুনির পরিবর্তে সমাজ বিস্ফারিত নেত্রে আমার খুঁটিনাটি ভুল ভ্রান্তির ছিদ্র অন্বেষণ করিতেই বদ্ধপরিকর। (রোর/পত্র/পৃ.৪৯৯)

বিদ্যাসাগর পরাধীন দেশে বিধবা বিবাহ আইন পাস করিয়েছিলেন (১৮৫৬) কিন্তু তার সার্থক প্রয়োগ দেখে যেতে পারেননি। এত বছর পর বিধবা বিবাহে কোন সামাজিক বা আইনি বাধা না থাকলেও যেনতেন ভাবে বিবাহ, সন্তান ও সংসারই যে নারীজীবনের প্রধান লক্ষ্য ও গন্তব্যসেই শৃঙ্খল থেকে নারী আজো বের হতে পারেনি। যেখানে এক শতাব্দী আগেই রোকেয়া উচ্চারণ করেছিলেন নারীমুক্তির অমোঘ বাণী:আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসার ধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে। (পদ্মরাগ/রোর/৪৫৩)

রোকেয়ারচনায় আধুনিক নারীর পূর্ণাঙ্গ জীবনের স্বয়ম্ভূ রূপরেখার নির্মাণ থাকলেও আজকের বাংলাদেশে সেই নারী কোথায়? শিক্ষাসুযোগঅধিকার সবকিছুই হয়তো প্রত্যাশিত রকমের বৈষম্যরহিত হয়ে যায়নি, কিন্তুু যতটুকু দূরত্ব পেরোনো গেছে, ছায়াভূতের মতো সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছে রোকেয়া কথিত ানসিক দাসত্বস্বয়ং নারীর সমাজের, উভয়ত। নারী আজ অবোরোধের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষিত, শিল্পিত, স্বাধীন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রীতদাসে রূপান্তরিত পুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণকারী ছায়ামূর্তি মাত্র। আজকের যুগের এই নারীদের জন্য রোকেয়ার কণ্ঠই পুনরায় প্রতিধ্বনিত হোক:অতএব জাগো, জাগো গো ভগিনী।

প্রথমে জাগিয়া উঠা সহজ নয় জানি; সমাজ মহা গোলযোগ বাধাইবে জানি, ভারতবাসী মুসলমান আমাদের জন্য কৎলএর (অর্থাৎ প্রাণদণ্ডের) বিধান দিবেন এবং হিন্দু চিতানল বা তুষানলের ব্যবস্থা দিবেন জানি! (এবং ভগ্নিদিগেরও জাগিবার ইচ্ছা নাই জানি!) কিন্তু সমাজের কল্যাণের নিমিত্ত জাগিতে হইবেই। কারামুক্ত হইয়াও গ্যালিলিও বলিয়াছিলেন, কিন্তু যাহাই হউক পৃথিবী ঘুরিতেছে (but nevertheless it does move)!! … সমাজের সমঝদার (reasonable) পুরুষেরা প্রাণদণ্ডের বিধান নাও দিতে পারেন, কিন্তু unreasonable অবলা সরলাগণ; (যাহারা যুক্তি তর্কের ধার ধারে না, তাহারা) শতমুখী ও আঁইস বঁটির ব্যবস্থা নিশ্চয় দিবেন, জানি!! (রোকেয়া রচনাবলী/পৃ.২০)

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

মরহুম সিরাজুদ্দীন হোসেন – টোটাল নিউজ এডিটর

total-news-editor

রাসুল প্রেমিক কবি গোলাম মোস্তফা

golam-mustafa. এম এ সবুর : বাংলা ভাষায় ইসলামি ভাবধারার সাহিত্য রচনায় গোলাম মোস্তফার ভূমিকা অনন্য। মহানবি হযরত মুহম্মদ সা. এর সিরাত রচনায় তার কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। সাহিত্যের সব শাখায় তার অবাধ বিচরণ থাকলেও কবি হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। আর তার কবিতাগানের বেশির ভাগই রাসুলপ্রেমে উজ্জীবিত। তার রচিত বিশ্বনবী গদ্য গ্রন্থখানি যেমন বাঙালি পাঠক সমাজে ব্যাপক সমাদৃত তেমনি তার রচিত ইয়া নবী সালাম আলাইকা কবিতাখানি মুসলিম ঘরে ঘরে মিলাদ মাহফিলে বহুল পঠিত। তাছাড়া রাসুল সা. এর প্রশংসায় তার রচিত নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি আমার মোহাম্মদ রাসুল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রাসুল ইত্যাদি গানকবিতা মুসলিম সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়। রাসুল সা. এর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে তার সাহিত্য জীবনের শুরুর দিকেই তিনি হযরত মোহাম্মদ কবিতা রচনা করেন। এ কবিতায় তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবের অন্ধকার অবস্থার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে রাসুল সা.কে সেই অন্ধকার বিদারক আখ্যা দিয়ে বলেন,

এই ঘোর দুর্দিনে এলো কে গো বিশ্বে,
উজলিয়া দশদিশি, তরাইতে নিঃস্বে!
মুখে তার প্রেমবাণী, করুণা ও সাম্য,
বিশ্বের মুক্তি ও কল্যাণ কাম্য।

প্রায় একই ধ্বণী উচ্চারিত হয়েছে তার ফাতেহাদোআজদহম কবিতায়। এতে তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর জন্মদিনের বর্ণনা দিয়ে এবং তাঁকে স্বাগত জানিয়ে লিখেন,

আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম।
দিকে দিকে উঠিতেছে নব ছন্দে বন্দনার গান
স্বাগতম! স্বাগতম! ধরণীর হে চিরকল্যাণ!

হরযত মুহম্মদ সা. শুধু মুসলিম কিংবা আরবদের জন্য নয় বরং বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তাই তাঁর জন্মোৎসব শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত নয় বরং বিশ্ববাসীর জাতীয় উৎসব। এ জন্য গোলাম মোস্তফা রাসুলের জন্মোৎসবে বিশ্বের সব মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন,

হে নিখিল ধরাবাসী! মুসলিমের লহ নিমন্ত্রণ,
এ উৎসব নহে শুধু আমাদের একান্ত কখন!
নাসারাখৃষ্টান এসো, এসো বৌদ্ধ চীন,
মহামানবের এ যে পরিপূর্ণ উৎসবের দিন।

রাসুলপ্রেমিক কবির কল্পনায় হযরতের জন্মদিনে বিশ্ব প্রকৃতিতে এক মহোৎসবের আয়োজন হয়েছিল। ঐতিহাসিকদালিলিক ভিত্তি না থাকলেও রাসুলভক্ত কবি মনে করেন তাঁর জন্মদিনে সারা বিশ্ব বেহেস্তের সুগন্ধিতে মোহিত হয়েছিল, সেদিন আকাশেবাতাসেও মহাআনন্দের জয়গান ধ্বনিত হয়েছিল; ফিরেস্তাগণও চঞ্চল চিত্তে সে আনন্দে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। কবির ভাষায় রাসুলের জন্মদিনের দৃশ্য এ রকম,

আকাশ দিয়েছে তার রক্ত রাঙা অরুণকিরণ,
বেহেশ্তের সুধাগন্ধ আনিয়াছে মৃদু সমীরণ;
ছুটাছুটি করিতেছে দিকে দিকে ফেরেশ্তার দল,
সারা চিত্ত তাহাদের আজিগো যে পুলক চঞ্চল!
এসেছে হাজেরা বিবি, আসিয়াছে বিবি মরিয়ম,
আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম!

মক্কার কুরাইশ বংশে হযরত মুহম্মদ সা.-এর জন্ম কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয় বরং আলকুরানের বর্ণনা মতে মহানবি সা. এর পূর্ব পুরুষ হযরত ইব্রাহীম ও তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আ.- এর প্রার্থনার ফল এবং হযরত ঈসা আ.-এর সুসংবাদ। আর গোলাম মোস্তফার ভাষায়,

আমিনা মায়ের কোলে খুদা রাখ্ল সে সওগাত
ইবরাহিমের দোয়া সে আর ঈসার সুসংবাদ

হযরত মুহম্মদ সা. চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার অদূরে হেরা পর্বতে নবুওয়াত লাভ করেন। এ সময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত জিব্রাইল . মুহম্মদ সা.-এর নিকট প্রথম অহি নিয়ে আসেন। মহানবি সা.-এর নবুওয়াত লাভ ইসলামের ইতিহাসে তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এ নবুওয়াতের মাধ্যমে আধুনিক ইসলাম তথা মুহম্মদী শরিয়তের যাত্রা শুরু হয় এবং আইয়্যামে জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগের অবসানের সূত্রপাত ঘটে। নবুওয়াত লাভের ঐতিহাসিক এ ঘটনা কবি গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাসহালীতে বর্ণিত হয়েছে এভাবে

চক্রবালে উঠ্ল যেন ভাগ্যচাঁদিমা
দূর হ সব বিশ্ব হতে আঁধার কালিমা!
ছুট্ল না তা কিরণ বটে অল্প কিছুক্ষণ,
রেসালাতের চাঁদে ছিল মেঘের আবরণ;
কালের স্রোতে চল্লিশ সাল গুজরে গেল যেই
হেরাগিরির উর্ধে সে চাঁদ উদয় হল সেই!

নবুওয়াত লাভের মাধ্যমে হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদ প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়ে প্রথমে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকদের কাছে তাওহিদ তুলে ধরেন। কিন্তু কুরাইশ নেতা আবু জহল ও তার অনুসারীরা রাসুলের দাওয়াত কবুল করেনি বরং বিরোধীতা করেছে। এমনকি তাওহিদ প্রচার বন্ধ করার লক্ষ্যে হযরত মুহম্মদ সা. কে হত্যার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। আবু জহলের এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা গোলাম মোস্তফার লিখনীর মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে এভাবে

এ বিপুল সঙ্ঘমাঝে যে আজি দাঁড়াবে
ছিন্ন করি আনিবারে মোহাম্মদশির,
পঞ্চশত স্বর্ণমুদ্রা, শত উষ্ট্র সনে
সানন্দ হৃদয়ে তারে দিব উপহার।

হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর মনোনীত নবী ও রাসুল। তাঁর রক্ষক আল্লাহ নিজে। মানুষের কোন ষড়যন্ত্র ও অনিষ্ট তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। যে কুরাইশরা হযরতকে নির্যাতননিপীড়ন করে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছিল এবং যারা রাসুল সা. কে হত্যা করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছিল; মাত্র আট বছর পর তারাই মক্কা বিজয়ের সময় মুহম্মদ সা.-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। যে উমার রা. মহানবিকে হত্যার জন্য মুক্ত তরবারী নিয়ে ছুটেছিল সে উমারই ইসলাম কবুল করে হযরতের একনিষ্ট সহচর, খলিফা হয়ে বিশ্বের বুকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। ঐতিহাসিক এসব ঘটনা কবি তুলে ধরেছেন এভাবে,

তারপর এলো আরবমরুতে খোদার রসূলনূরন্নবী,
কোরেশ আসিল কতল করিতে বিশ্বের সেই আলোকরবি
বলো কে মরিল? মোহাম্মদ? না আততায়ী সেই কোরেশ জাতি।
ঘাতক শেষে যে রক্ষক হয়ে ধারায় রাখিল অতুল খ্যাতি।

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন অসাধারণ গুণে গুণান্বিত একজন মহামানব। দুর্বলকে তিনি কখনও বঞ্চিত করেননি বরং সাহায্য করেছেন। পথ হারানো মানুষদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ধনীগরিব তার কাছে ছিল অভিন্ন। তাঁর কাছে মানুষের কোন ভেদাভেদ ছিল না; ছিল না সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও বৈষম্য। ক্ষমা, দয়াপ্রেম ছিল তাঁর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ জন্য আল্লাহ তাআলা হযরত মুহম্মদ সা. কে বলেছেন, নিশ্চয়ই আপনি উত্তম চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত (আল কুরআনুল কারীম, ৬৮:)। মহানবি হযরত মুহম্মদ সা.-এর উত্তম চরিত্রের গুণাবলীকে গোলাম মোস্তফা কবিতায় চিত্রিত করেছেন এভাবে

দূর্বলে করে না সে নিপীড়ন হস্তে
আর্তেরে তুলে দেয় শুভাশীষ মস্তে,
ভ্রান্তরে বলে দেয় মঙ্গল পন্থা
রক্ষক, বীর নহে ভক্ষক হন্তা।
ভিক্ষুকে টেনে নেয় আপনার বক্ষে,
ছোটবড় ভেদজ্ঞান নাহি তার চোক্ষে,
মানুষের অকাতরে করে না সে ক্ষুদ্র,
হোক্ না সে বেদুইন হোক্ না সে শুদ্র।

রাসুল সা. ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি ছিলেন প্রেমভালবাসা, ক্ষমান্যায়ের মূর্তপ্রতীক। তাঁর প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল না কখনও। যারা তাঁকে অত্যাচারনির্যাতনে জর্জরিত করেছিল তাদেরকেই উদার চিত্তে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁর ক্ষমার দৃষ্টান্ত অসংখ্য। মক্কা বিজয়ের দিনে সাধারণ ক্ষমা তারই উজ্জলতম নিদর্শন। মক্কার কাফির কুরাইশরা নিজেদের অপকর্মের কারণে মক্কা বিজয়ের দিনে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। যে কোন শাস্তির জন্য তারা প্রস্তুতও ছিল। কিন্তু ক্ষমার অনুপম আর্দশ মহানবি হযরত মুহম্মদ সা. সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। কবি গোলাম মোস্তফা হযরতের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা উল্লেখ করে বলেন,
কহিলেন নবী হাসি তখন

ভেবেছো ঠিকই বন্ধুগণ!

কঠোর দন্ড হবে বিধান!

ধরো সে দকহিনু সাফ

সব অপরাধ আজিকে মাফ,

যাও সবে, দিনু মুক্তিদান।

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবিরাসুল। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ; রাসুলপ্রেমে নিমজ্জিত ও প্রবল আবেগে আপ্লুত হয়েও সে কথা ভুলে যাননি কবি গোলাম মোস্তফা। তবে হযরত মুহম্মদ সা. মানুষ হলেও সাধারণ মানুষ নন, তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল; যা মহানবি সা. নিজেই বলেছেন। আর তা গোলাম মোস্তফার ভাষায়,

আমার চেয়ে তোমরা ত কেউ বান্দাতে নও কম,

তুমিআমি একবরাবর দুর্বল ও অক্ষম।

তোমায় আমায় প্রভেদ যেটুক নয়ক সে অদ্ভুত

আমি শুধু বান্দা নহিআমি খোদার দূত।

ইসলামের মূলমন্ত্র তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। কিন্তু খৃষ্টানরা হযরত ঈসা আ. কে এবং ইহুদীরা হযরত ওযায়ের আ. কে আল্লাহর পুত্র বলে তাওহিদ পরিপন্থী বিশ্বাস করে। তাই হযরত মুহম্মদ সা. নিজেই তাঁর অনুসারীদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তারা যেন তাঁকে ইহুদীখৃষ্টানদের মত আল্লাহর পুত্র বলে ধারণা না করে। রাসুল সা.-এর এই নিষেধাজ্ঞা গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাসহালী তে উল্লেখ আছে এভাবে,

নাসারাদের মতন কেহই পড়ো না ধোঁকায়

খুদার বেটা বলে যেন পূজো না আমায়।

মহানবি সা. এর অনুপম আদর্শ ও নির্দেশনাবলী অনুসরণ করে মুসলিমরা এক সময় উন্নতি ও সম্মানের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। কিন্ত বিশ শতকের মুসলিম সমাজ ছিল নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত। বিভিন্ন দেশে তারা ছিল দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও বিভিন্ন কুসংস্কারে অধঃপতিত ছিল মুসলিম সমাজ। বিশ শতকের মুসলমানদের এসব অধঃপতনের জন্য রাসূলের আদর্শচ্যুত হওয়ার বিষয় সমকালীন দার্শনিক ও কবি ইকবাল রচিত শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ আছে। আর তা গোলাম মোস্তফা অনুবাদ করেন এভাবে,

কারা, বল, ত্যাগ করেছে আমার পাক রাসূলের পাক বিধান,

মুহম্মদের পয়গাম আর তোমাদের কারো নাই স্মরণ।

তবে হতাশনিরাশ হওয়ার কারণ নাই, মুসলমানগণ আবারও রাসুলের আদর্শ অনুসরণ করলে তাদের হৃত গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। তাই কবি অধঃপতিত মুসলিমদেরকে রাসুলের ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন,

তুচ্ছরে আজ করগো উচ্চপ্রেমে ও পূণ্যে কর মহৎ

মুহম্মদের নামের আলোকে উজ্জ্বল কর সারা জগৎ।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ৯ ডিসেম্বর ২০১৬

মধ্যপ্রাচ্যের পুরাকীর্তি ও নারীরা যেভাবে পাচার হচ্ছে

yazidi-womenমক্কা ও মদিনায় পবিত্র দুই মসজিদের খাদেম ( কাস্টডিয়ান) হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে সৌদি আরব। পবিত্র মসজিদের খতিব মাঝে মধ্যেই বিশ্বের মুসলমানদের উদ্দেশ্যে খুৎবায় বাণী দিয়ে থাকেন। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সৌদি আরবের একজন স্বনামধন্য নাগরিক। এরপরও সৌদি আরব মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সৌদি আরবের মত অন্যান্য আরব দেশগুলো এ ব্যাপারে নিশ্চুপ।

কিন্তু কেন? এর সহজ উত্তর হচ্ছে সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনে মুসলিম হত্যাযজ্ঞে আইএস জঙ্গিদের পেছনে অস্ত্র ও অর্থ দানে নিজেরাই জড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে অথবা রাজতন্ত্র বহাল রাখার খায়েশে দোর্দপ্রতাপ থাকা সত্ত্বেও একদিকে বিলাসবহুল জীবন যাপন ও গণতন্ত্রবিহীন স্বচ্ছতা ও জবাদিহীতার অভাবে যে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা জেঁকে বসেছে তার ফলেই রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের মত ঘটনায় এসব আরব দেশ কোনো উদ্যোগই নিতে পারছে না। এমনকি মিয়ানমারের সামরিক শাসক ও তল্পিবাহক সুচি সরকারের মত একই অবস্থা বিরাজ করছে আরব দেশগুলোর মধ্যে। ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তি দেশগুলোর কোনো ইচ্ছার বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো বিন্দুমাত্র কোনো উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতা নেই। উপরন্তু বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনে আরব দেশগুলো বাহরাইন, ইয়েমেনে নিজেদের পছন্দসই সরকার রক্ষার জন্যে জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই প্রভাব সৃষ্টি ছাড়াও আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।

এমনি এক সময় মিসরের সামরিক শাসক ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল আব্দেল আল সিসি বলেছেন, তার দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের মতপার্থক্যই মধ্যপ্রাচ্যের মূল সংকটের কারণ। সে থাক, কিভাবে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠী আরব শেখদের অস্ত্র ও অর্থের বিনিময়ে প্রতিদান দিচ্ছে তা জানলে আপনার শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠবে। ইয়াজিদি নারীদের দাস হিসেবে সৌদি আরবে বিক্রির মাধ্যমে উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিচ্ছে আইএস জঙ্গিরা। যাদের এর আগে তারা পাঠিয়েছে অন্যান্য দেশেও। পশ্চিমা মিডিয়ার একাধিক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ইয়াজিদি নারী ছাড়াও চুরি করে ইরাকের তেল বিক্রির পাশাপাশি দেশটি থেকে ঐতিহাসিক ও প্রাচীন নিদর্শন বস্তু যেভাবে চোরাচালানের মাধ্যমে কালোবাজারে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়েছিল তা এখন হচ্ছে সিরিয়া ও ইয়েমেনে।

বিশ্বের কাছে এটা এখন জলের মত পরিস্কার হয়ে গেছে যে সৌদি আরব ও কাতারসহ বেশ কয়েকটি আরবদেশ আইএস জঙ্গিদের অস্ত্র ও অর্থায়ন করে আসছে। কাতার ইতিমধ্যে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যদি সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেও নেয় তবুও দেশটি সেখানে বিদ্রোহীদের সহায়তা অব্যাহত রাখবে। দুই বছর আগে ২০১৪ সালে উইকিলিকস যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ক্যাম্পেইন ম্যানেজার জন পোডেস্টার কাছে পাঠানো একটি ইমেইলের বিষয়বস্তু ফাঁস করে দিয়ে বলেছে, সৌদি আরব ও কাতার সরকার আইএস জঙ্গিদের গোপনে অর্থ ও অন্যান্য কৌশলগত উপকরণ সাহায্য দিচ্ছে। তবে এ দুটি মুসলিম দেশের কোন কোন শেখ এধরনের সহায়তা দানের সঙ্গে জড়িত তা ওই ইমেইলে বলা হয়নি।

এধরনের তহবিল আরব দেশগুলো দেয়ার ফলেই আইএস জঙ্গিরা তা সন্ত্রাস, নারী ধর্ষণ ও ঘৃণ্য অপরাধে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে আসছে। একই সঙ্গে আইএস জঙ্গিরা ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে যে ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে শুরু করে যাদুঘরগুলো ধ্বংস করে আসছে এবং সেখান থেকে ঐতিহাসিক মিনার, প্রাচীন ও পুরাকালের নিদর্শনগুলো লুটপাট করে কালোবাজারে বিক্রি করছে। এসব পণ্যের বড় ক্রেতা হচ্ছে ইউরোপ। তুরস্ক ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেও আইএস জঙ্গিরা পুরাকীর্তি লুট করে পাচার করছে।

সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকা দি গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সুইস কর্তৃপক্ষ কিছুদিন আগে সিরিয়ার প্রাচীন নগরী পালমিরা, লিবিয়া, ইয়েমেন থেকে পাচারকৃত পুরাকীর্তির একটি বড় ধরনের চালান জেনেভার মুক্ত বন্দর থেকে উদ্ধার করেছে।

ফরেন পলিসি সাময়িকীতে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রান্সিস তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার লোভি ও অনৈতিক পুরাকীর্তি সংগ্রাহকরা আইএস জঙ্গিদের কাছ থেকে এসব পণ্য কালোবাজারে কিনে নিচ্ছে। তুরস্কের একটি মাফিয়া গোষ্ঠী কিলিস ও উরফা শহরকে দীর্ঘদিন ধরে পালমিরা থেকে চুরিকৃত এসব পুরাকীর্তি পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। এর আগে ইরাক আগ্রাসনে বাগদাদ যাদুঘর থেকে ১৫ হাজার পুরাকীর্তি চুরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে এসব চুরিকৃত পুরাকীর্তির মাত্র ২৫ ভাগ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

বিশ্বের প্রত্নতাত্ত্বিকরা আশঙ্কা করে বলেছেন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে এধরনের পুরাকীর্তি যেভাবে লুঠতরাজ হচ্ছে, বেহাত হয়ে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে আইএস জঙ্গিদের হাত দিয়ে, শুধু দামাস্কাস ও হোম থেকে পাচারকৃত পুরাকীর্তির মূল্য হবে ৩৬ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু আসলে এর মূল্য আরো বেশি কারণ কালোবাজারে চুরির মাল হিসেবেই এগুলো বিক্রি হচ্ছে ঐতিহাসিক মূল্য বিবেচনা করে নয়। আর হলেও সে মূল্য তালিকা অজানা থেকেই যাচ্ছে।

অবাক হওয়ার ব্যাপার যে আইএস জঙ্গিদের সন্ত্রাস শুরু হওয়ার পর তুরস্ক, ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেলেও পণ্য আনা নেওয়ার পরিমাণ তুরস্কের সঙ্গে এসব দেশের বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ধারণা করা খুবই সহজ যে কালোবাজারের ডিলাররা ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের মাধ্যমেও পুরাকীর্তি পাচার জায়েজ করে নিয়েছে। প্রথমে সিরিয়া থেকে পুরাকীর্তি পাচার শুরু হলেও পরে তা নিরাপদ মনে না করে অন্যান্য পথ ধরা হয় যেখানে পাচারকারীরা আইএস জঙ্গিদের নিয়মিত কর দিয়ে থাকে।

যাহোক, আরব ও পারস্য উপসাগরের শেখদের কাছে আইএস জঙ্গিরা অর্থ ও অস্ত্র পাওয়ার বিনিময়ে শুধু পুরাকীর্তি ঋণ শোধ হিসেবে পাঠাচ্ছে তা নয়। ইরাকের মসুল শহরের দক্ষিণে একটি ভিডিও উদ্ধারের পর দেখা গেছে সৌদি আরবে ইয়াজিদি নারীদের দাস হিসেবে বিক্রির ব্যবসা জমাজমাট হয়ে উঠেছে। একজন আইএস জঙ্গিকে হত্যার পর তার সেল ফোন থেকে ওই ভিডিও উদ্ধার করা হয়। ২০১৪ সালে মসুলে আইএস জঙ্গিরা হাজার হাজার ইয়াজিদি নারীকে অপহরণ করে। তাদের অনেককে ধর্ষণ করে জঙ্গিরা, বিক্রি করে ফাল্লুজায় এমনকি সিরিয়ায়। কিন্তু পরিস্থিতি সঙ্গীন হয়ে উঠায় এখন সৌদি আরবে অপহৃত ইয়াজিদি নারীদের চালান যাচ্ছে।

ব্রিটিশ পত্রিকা দি সান ইয়াজিদি নারীদের দুর্দশা নিয়ে এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে আইএস জঙ্গিদের কাছে সৌদি আরবের অস্ত্র ও অর্থ সাহায্যের কড়া সমালোচনা করা হয়। যদিও লন্ডন এখনো আইএস জঙ্গিদের পক্ষেই অবস্থান নিয়ে আছে এবং সিরিয়া ও রাশিয়ার মিলিত আক্রমণে আইএস জঙ্গিরা পিছু হটে নরকে অবস্থান নিচ্ছে। এই যখন অবস্থা তখন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞে আরব দেশগুলোর নজর দেয়ার সময় কি আদৌ আছে?

সূত্রঃ আমাদের সময়, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

মূল শিরোণামঃ রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞে যে কারণে নিশ্চুপ আরব দেশগুলো