প্রথম পাতা > ইতিহাস, শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ > সিন্ধু সভ্যতা লোকসমাজ ও শিল্পকর্ম

সিন্ধু সভ্যতা লোকসমাজ ও শিল্পকর্ম

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

indus-civilisationসুদীপ্ত সালাম : নতুনপুরাতন কোনো প্রস্তর যুগেই সভ্যতা গড়ে ওঠেনি। তার প্রধান কারণ সে সময় মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরি হয়নি। সংগঠিত হওয়ার মতো অবস্থাও হয়তো ছিল না। তখন বিচ্ছিন্নতাই ছিল নিয়তি। বরফ যুগের বরফ গলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষে মানুষে যে বিচ্ছিন্নতা তাও উবে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে শুরু হয় সভ্যতার গোড়াপত্তনপ্রধানত এশিয়া ও ইউরোপে।

মানুষে মানুষে মূল্যবান সম্বন্ধকে রবীন্দ্রনাথ যথার্থ সভ্যতা বলে মনে করতেন। আর এই ভারতবর্ষে তিনি সেই যথার্থ সভ্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রভেদের মধ্যে ঐক্যস্থাপন করা, নানা পথকে একই লক্ষ্যের অভিমুখীন করিয়া দেয়া এবং বহুর মধ্যে এককে নিঃসংশয়রূপে অন্তররূপে উপলব্ধি করাবাইরে যে সব পার্থক্য প্রতীয়মান হয় তাকে নষ্ট না করে তার ভিতরকার নিগূঢ় যোগকে অধিকার করাকে তিনি ভারতবর্ষের প্রধান সার্থকতা মনে করতেন। ভারত উপমহাদেশ ইতিহাসের ঊষালগ্নেও আমরা এ কথার সত্যতা খুঁজে পাই।

আমরা জানি, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের শেকড় সিন্ধুসভ্যতায় গিয়ে ঠেকেছে। কমপক্ষে ৩ হাজার খ্রিস্টপূর্বে সিন্ধু নদের অববাহিকায় এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। আনুমানিক ২ হাজার ৩শ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তা পূর্ণতা লাভ করে। আর এই সভ্যতার স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় দেড় হাজার বছর।

১৯২২২৩ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মোন্টগোমেরী জেলার হরপ্পা নামক গ্রামে সিন্ধুসভ্যতার একটি নগর এবং সিন্ধু প্রদেশের লরকানা শহরে মহেঞ্জোদাড়ো নগর আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, সিন্ধুসভ্যতা উত্তর থেকে দক্ষিণে ১ হাজার ১শ কিলোমিটার এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে দেড় হাজার কিলোমিটার ভূখণ্ড নিয়ে বিস্তৃত ছিল। এ যাবৎ ৮০টিরও বেশি স্থানে এই সভ্যতার চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এই সভ্যতার শিল্পকর্মকে বুঝতে হলে এই নিদর্শনগুলো জানা জরুরি। সিন্ধুসভ্যতার নগর ব্যবস্থাপনা আমাদের অনেক তথ্য সরবরাহ করেছে। হরপ্পা শহরটি ২৫০ একর স্থান নিয়ে গঠিত। অনেক গবেষক মনে করেন এর বিস্তৃতি ৪৯৫ একর পর্যন্ত। হরপ্পার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার এবং মহেঞ্জোদাড়ো নগরের জনসংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখের মতো ছিল বলে গবেষকরা মনে করেন। উভয় শহরই ২০ ফুট উঁচু কাঁচা ইটের ভিত্তির ওপর নির্মিত। আকস্মিকভাবে এখানে বসতি স্থাপন করা হয়নি। দুটো শহরেরই পশ্চিম দিকে নগরদুর্গ (citadel) ছিল। প্রশাসনিক ভবনগুলো দুর্গের ভেতরে স্থাপন করা হয়। নগরদুর্গের নিচে ছিল সাধারণ মানুষের বসতি তথা শহর। রাস্তা ও অলিগলি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। মহেঞ্জোদাড়োতে ৯ ফুট থেকে ৩৪ ফুট পর্যন্ত চওড়া রাস্তা আবিষ্কৃত হয়েছে। রাস্তার দুপাশে সরকারি বেসরকারি ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। ঘরবাড়িগুলো এক লাইনে সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়। ভবনের আকৃতি দেখে নাগরিকদের শ্রেণীবিন্যাস অনুমান করা যায়। দুকক্ষবিশিষ্ট ভবন যেমন ছিল তেমনি বহু কক্ষবিশিষ্ট প্রাসাদ ভবনেরও নিদর্শন মিলেছে। কোনো কোনো ভবন দোতলাবিশিষ্ট, কোনো ভবন তার চেয়েও উঁচু ছিল। প্রতিটি ভবনেই স্নানাগার, কূপ, আঙ্গিনা ইত্যাদি ছিল। হরপ্পায় একটি শস্যভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি দৈর্ঘ্যে ১৬৯ এবং প্রস্থে ১৩৫ ফুট ছিল। ধারণা করা হয়, বন্যার হাত থেকে শস্যভাণ্ডার রক্ষা করতে উঁচু বেদির ওপর তা স্থাপন করা হয়। মহেঞ্জোদাড়োতে ৮৫ প্রস্থ এবং ৯৭ ফুট দৈর্ঘ্য আয়তনের একটি বৃহৎ ভবনের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। চারকোণা স্তম্ভ ও বিশাল কক্ষবিশিষ্ট একটি বড় ভবনের ভগ্নাংশও আবিষ্কৃত হয়েছে। আরও পাওয়া যায় একটি বিশাল আকৃতির স্নানাগার (ঞযব ৎেবধঃ ইধঃয) এটি দৈর্ঘ্যে ১২ মিটার, প্রস্থে ৭ মিটার এবং এর গভীরতা আড়াই মিটার। শহর দুটির ঘরবাড়ি, রাস্তা, কূপ, নর্দমা ও অন্যান্য ভবন পোড়া ইট দিয়ে বানানো হয়েছিল।

শহরগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আমাদের বিস্মিত করে। পানি নিষ্কাশনের জন্য রাস্তার নিচে নর্দমা তৈরি করা হয়েছিল। নোংরা পানির সঙ্গে যে সব আবর্জনা যায় সেগুলো আটকাতে নর্দমার বিভিন্ন স্থানে গর্ত রাখা হয়েছে।

বর্তমান শহুরে মানুষের মনোজগৎ ইটপাথরের মতোই রুক্ষ ও প্রাণহীন। একই বাড়িতে থাকি কিন্তু এক ঘর আরেক ঘরের খবর রাখে না। ফলে এখানকার সমাজ ব্যবস্থা ভঙ্গুর ও অস্থির। অথচ গ্রামগুলো টিকে আছে। মানুষে মানুষে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন এই টিকে থাকার প্রধান নিয়ামক। সিন্ধুসভ্যতার নগর ব্যবস্থা দেখে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি, সিন্ধুবাসীরা শৃংখলাবদ্ধ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিল। জনসাধারণের মধ্যে অনৈক্য থাকলে নগর ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনার সুপরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না। ভেদাভেদ প্রকোট থাকলে অনেক লোকের জন্য বিশাল কিন্তু সাধারণ (common) স্নানাগার নির্মাণ করা যেত না। আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি এই সভ্যতায় শস্যভাণ্ডার ছিল। এ থেকে বুঝা যায় চাহিদার বেশি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হতো। কেন না কৃষি কাজের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ছিল। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আরও ছিল সিন্ধু, ইরাবতী, শতদ্রু, ভোগভো প্রভৃতি নদী। বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিতে এবং জ্বালানির চাহিদা মেটাতে কাঠের জন্য বেশি দূরে যেতে হতো না বলে অনেকে মনে করেন। কারণ সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলেই পর্যাপ্ত গাছ ছিল বলে ধারণা করা যায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য এবং সমাজে স্থিতিশীলতা না থাকলে এত অগ্রসর ও সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারতো না।

তবে তাদের নগর ব্যবস্থা যতই শহুরে হোক না কেন তারা যে মানসিক দিক থেকে গ্রামীণ তার প্রমাণ রয়েছে। তাদের পুরো অর্থনীতি কৃষি ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করতো। ফলে নগরবাসী হলেও তাদের সংস্কৃতি ও শিল্পকলা লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর।

সিন্ধুসভ্যতায় কোনো মন্দির বা উপাসনালয়ের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ভাস্কর্য, পুতুল ও সিলমোহর দেখে অনুমান করা যায় যে, সিন্ধুবাসীরা প্রকৃতি পূজক ছিল। গাছ, পশুপাখি, আগুন, জল প্রভৃতির পূজা করত। তিন শিং বিশিষ্ট এক দেবতার প্রতিকৃতি সংবলিত সিলমোহর পাওয়া গেছে। তার চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন পশুর অবস্থান। অনেক গবেষক মনে করেন, সিন্ধুবাসীরা এই দেবতার পূজা করত। এই দেবতাই পরবর্তীকালে হিন্দুদের মহাদেব বা পশুপতি হিসেবে পরিপূর্ণতা পেয়েছে বলে অনেকে মত দিয়েছেন। আমরা জানি শিব হল নিচু শ্রেণীর (প্রধানত কৃষিজীবী) মানুষের ত্রাণকর্তা। সিন্ধুসভ্যতার সেই ত্রয়ীশিং বিশিষ্ট দেবতাই যদি শিবের পূর্বসূরি হয়ে থাকে তাহলেও আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সিন্ধুবাসীরা বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল না। তাদের দৃষ্টি ছিল ভূমিসংলগ্ন। এ থেকেও আমরা বলতে পারি সিন্ধুবাসীদের আচারপ্রথা ছিল লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর।

শান্তিপ্রিয় লোকসমাজের মানুষের মানসিকতার ছাপ তাদের শিল্পকর্মেও লক্ষ্য করি। সিন্ধুসভ্যতা থেকে প্রধানত চার প্রকার শিল্পকর্মের নিদর্শন পাই। ভাস্কর্য, তৈজসপত্র, সিলমোহর ও অলংকার। ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে মহেঞ্জোদাড়ো থেকে পাওয়া নকশাখচিত পুরোহিত রাজার চুনাপাথরের আবক্ষ মূর্তি। এটি ১৭ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার লম্বা। তার চোখ আধো খোলা, মুখে সৌম্য ও প্রজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট। এই রাজা যুদ্ধজয়ের গর্বে গৌরবান্বিত নয়, শিল্পী তাকে মহান করারও চেষ্টা করেননি। এই আবক্ষ মূর্তির ব্যক্তিত্বকে শান্তিপ্রিয় লোকসমাজেরই প্রতিনিধি বলে মনে হয়।

ভাস্কর্য হিসেবে আরও রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্য ভঙ্গিতে নগ্ন নারী মূর্তি। মাত্র ১১ সেন্টিমিটার লম্বা এই ভাস্কর্যটি বেশকিছু তথ্য দেয়। মূর্তির সাজসজ্জা আছে, হাতে অনেক চুড়ি আছে, গলায় মাদুলি, হাতের উপরের অংশে আছে বাজুবন্ধ কিন্তু বিলাসিতার ছাপ নেই। রাজকীয় তো নয়ই।

প্রাপ্ত ভাস্কর্যের মধ্যে মস্তক ও বাহুহীন মিনিয়েচার মূর্তিও উল্লেখ্যযোগ্য। কাঁধের কাছে সকেট রয়েছে। হাত ও মাথা স্থাপন করতে এই সকেট কাজে লাগতো। লাল চুনাপাথরের এই ভাস্কর্যটি ৩৩ ইঞ্চি লম্বা। এটি হরপ্পা থেকে পাওয়া যায়। এটি কোনো যোদ্ধা বা রাজার প্রতিকৃতি নয়। এটি হয়তো কোনো দেবতার ফিগার। কেন না পরবর্তী সময়ে তৈরি কালো পাথরের বিষ্ণু ও অন্যান্য দেবতার ভাস্কর্যের সঙ্গে এই ভাস্কর্যের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।

আরেকটি হল ধূসর চুনাপাথরের পুরুষ নৃত্যশিল্পীর ভাস্কর্য। ৪ ইঞ্চি লম্বা এই ভাস্কর্যটি হরপ্পা থেকে পাওয়া যায়। এই ভাস্কর্যটিরও হাতমাথা পাওয়া যায়নি। এটিও কোনো দেবতার ইমেজ হতে পারে। দুটো ভাস্কর্যই সিন্ধুসভ্যতার পরের দিকের নিদর্শন।

সিন্ধুসভ্যতা থেকে পাওয়া মাটির তৈরি মূর্তিগুলো এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বেশিরভাগই গ্রামবাংলার টেপাপুতুলের মতো দেখতে। মাটির তৈরি কিছু খেলনারও সন্ধান মিলেছে। যেগুলোর সঙ্গে আবহমান লোকজ খেলনার মিল রয়েছে।

সিন্ধুসভ্যতায় চিত্রকলা ছিল কিনা জানা যায়নি। কিন্তু নাগরিকরা টেরাকোটা পদ্ধতিনির্ভর তৈজসপত্র ব্যবহার করত। মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা থেকে বিভিন্ন নকশা এবং আকৃতির থালা, বাটি, বাসন, কাপ, অলংকৃতপাত্র পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, সেগুলোর ওপর প্রধানত লাল ও কালো রঙ দিয়ে হাতে আঁকা বিভিন্ন মোটিফ ও নকশাও রয়েছে। কিছু পাত্র আছে বাহারি রঙিন (নীল, লাল, সবুজ ও হলুদ) থালা, বাটি, বাসন, কাপের যথার্থ আকৃতি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সে সময় এ সব তৈরিতে মৃৎশিল্পীরা চাকার ব্যবহার করত। বানানো শেষে মাটির পাত্রগুলোকে আগুনে পোড়ানো হতো। কিছু পাত্র রোদে শুকানো হতো। সেই তৈজসপত্রগুলো ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে, বিশেষ করে লোকসমাজে।

মহেঞ্জোদাড়োর থেকে প্রাপ্ত সিলমোহরগুলোকে ভারতবর্ষের প্রথম শিল্পকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে না। সিন্ধুসভ্যতায় লেখার নিদর্শন নেই। পাওয়া গেছে কিছু দুর্বোধ্য সাংকেতিক চিহ্ন (আড়াইশ থেকে ৫শ) সেগুলোর পাঠোদ্ধার না হওয়ায় এখন পর্যন্ত সিলমোহরগুলো কি তথ্য বহন করছে তা জানা যায়নি। তাই বলে সিলমোহরগুলোর শিল্পমূল্য অগ্রাহ্য করার উপায়ও নেই। ধারণা করা হয় সিলগুলো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হতো। অনেকে মনে করেন, এগুলো এক প্রকার অলংকার। সিলমোহরে বিভিন্ন পশুর প্রতিকৃতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খোদাই করা রয়েছে। কিছু সিলমোহরে রয়েছে বিভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতি। আর কিছু সিলমোহরে রয়েছে কাল্পনিক দেবদেবীর ফিগার। অনেকের ধারণা, এই পশুফিগারগুলো সিন্ধুসভ্যতার মানুষের টোটেম বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এগুলো নরম পাথরে তৈরি (steatite stone), খোদাইয়ের পর চকচকে ও শক্ত করতে এগুলোকে পোড়ানো হতো। তিন শিংবিশিষ্ট এক দেবতার কথা আগেই বলা হয়েছে। সিলমোহরগুলোর ইমেজ (ষাঁড়, হাতি, বাঘ, গণ্ডার, গাছ ইত্যাদি) আমাদের লোকায়ত জীবনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিকবৃন্দ এ বিষয়ে একমত যে, সিন্ধুসভ্যতার লোকেরা প্রচুর পরিমাণে অলংকার ব্যবহার করত। ইতিপূর্বে আলোচিত ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্যভঙ্গিতে থাকা নারী মূর্তিটিও তার সাক্ষ্য বহন করছে। পুঁতির মালা, হার, কানের দুল, মাদুলি, শাঁখের চুড়ি ইত্যাদি। তৎকালীন কারিগররা কার্নেলিয়ন (carnelian) পাথর পুড়িয়ে লাল করত। সেগুলো ঠাণ্ডা হলে পুঁতির আকৃতি দেয়া এবং ছিদ্র করা হতো। অলংকারের বেশিরভাগই লোকজ। ধাতুর তৈরি গহনা বেশি দেখা যায়নি।

অন্যান্য সভ্যতায় আমরা যুদ্ধ ও যোদ্ধার চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্য দেখেছি। কিন্তু দ্বন্দ্ব বা হিংসাকে ফুটিয়ে তুলেছে এমন কোনো শিল্পকর্ম আমরা এই সভ্যতায় দেখি না। বিলাসিতা এবং ঐশ্বর্যের ছাপও এই সভ্যতার শিল্পকলায় মেলে না। যুদ্ধজয়ের কথা নেই, নেই মিসরীয়দের মতো রাজা বা যোদ্ধাকে মহান করে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস।

সিন্ধু উপত্যকায় মানুষেরা অস্ত্রের চেয়ে যন্ত্রপাতি বেশি ব্যবহার করতো বলে মনে হয়। ছুরি, কুঠার, তীরধনুক, বর্শা, গুলতি ছাড়া তেমন কোনো অস্ত্রের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। আর পাওয়া গেছে কাস্তে, বাটালি, করাত, জুতা সেলাই করার সুই ইত্যাদি। ঢাল, তলোয়ার, বর্ম ইত্যাদি সামরিক অস্ত্রের নিদর্শন নেই। নেই কোনো অস্ত্রাগারের চিহ্নও। কারণ তারা এসবের প্রয়োজন অনুভব করেনি। তারা ছিল শান্তিপ্রিয়। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল বলে মনে হয়। এই উপত্যকাবাসীদের সঙ্গে মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, ইরান, দক্ষিণভারত, রাজস্থান, গুজরাট ও বালুচিস্তানের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। মেসোপটেমিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক থাকার নিদর্শন রয়েছে।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি নানা পথকে একই লক্ষ্যের অভিমুখীন করে দেয়া সিন্ধুসভ্যতার মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। উদার লোকসংস্কৃতির চর্চার ফলেই এই অসাধ্য কাজটি করতে পেরেছিল। তাই তাদের শিল্পকলাচর্চাও কর্তার ইচ্ছায় কর্মের বেড়াজাল থেকে বের হতে পেরেছে এবং সম্ভবত প্রথমবারের মতো শিল্পী আপন মনে শিল্পকর্ম তৈরির সুযোগ পেয়েছিল। অন্তত সিন্ধুসভ্যতার ছোট ছোট মাটির পুতুল, তৈজসপত্র ও খেলনাগুলো আমাদের এভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: