প্রথম পাতা > ইতিহাস, ইসলাম, জীবনী, ধর্মীয়, রাজনীতি, সমাজ > বিপ্লবী চিন্তাধারার সুফি মওলানা ভাসানী

বিপ্লবী চিন্তাধারার সুফি মওলানা ভাসানী

সৈয়দ ইরফানুল বারী : তৌহিদ প্রশ্নে মওলানা ভাসানীকে কখনও উদাসীন থাকতে দেখিনি। সে তৌহিদ ওয়াহ্দাতুল অজুদের নাকি ওয়াহ্দাতুশ শুহুদেরএ প্রশ্নের জবাব এ লেখায় সম্ভব নয়। তবে এতটুকু লিখতেই হয়, মওলানা ভাসানী বিপ্লবী চিন্তাধারার একজন সুফি ছিলেন। আলেম সমাজ দূরদূরান্ত থেকে সন্তোষে আসতেন এবং নানা প্রশ্নের অবতারণা করতেন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে মহাচীনের প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাইএর মৃত্যুতে মওলানা ভাসানীর প্রেরিত বার্তার শেষ বাক্য গধু অষষধয নষবংং যরং ংড়ঁষ প্রসঙ্গে আলেমরা বললেন, যিনি স্রষ্টায় বিশ্বাসী নন, যিনি আত্মার অমরত্বে বিশ্বাসী নন তার জন্য এ মোনাজাত কেন? মওলানা ভাসানী অতিশয় সহজ ভাষায় বললেন, ৭০ কোটি মানুষের দেশ থেকে তারা সব নকল খোদা তাড়িয়েছে। এটাই বা কম কিসে? লাইলাহা আগে, তার পরে ইল্লাল্লাহ্। তোমরা তো নকল খোদার বেড়াজালে হাবুডুবু খাচ্ছ। আসল খোদার সন্ধান পাবে কীভাবে? ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবরে একই মাত্রার কথা বলেছিলেন ১৯৪০ দশকের তুখোড় রাজনীতিক, ষাটের দশকে ইসলামিক একাডেমির ডায়রেক্টর আবুল হাসিমকে। তিনি চীনের বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা টেপরেকর্ডারে মওলানা ভাসানীকে শুনাতে ঢাকা থেকে সন্তোষে এসেছিলেন। মনোযোগ সহকারে শুনে বললেন, খুব ভালো বলেছেন। কিন্তু একটা কথা বাদ পড়ে গেছে। আবুল হাসিম বললেন, বলুন শুনে রাখি। চান্স পেলে পরে বলব। মওলানা ভাসানী বললেন, আপনি বলতে পারতেন, চীনারা সব নকল খোদা ঝেঁটিয়ে তাড়িয়েছে। এ কাজ মস্ত ঈমানদারের কাজ। ময়দান থেকে আগাছা সাফ করা হয়েছে। এবার কেবল আসল খোদাকে বসিয়ে দিলেই তো হক্কুল ইবাদের সঙ্গে হক্কুল্লাহও আদায় হয়ে যায়। আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী, প্যাপিরাস সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৫৬।

এই দেশে, বাঙালি মুসলমানের মধ্যে আবির্ভূত প্রত্যেক বড় নেতা শেরে বাংলা, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শুধু রাজনীতির খাতিরে নয়, ধর্মীয় চেতনায়ও সবাই উদার, অসাম্প্রদায়িক। এদের দিয়ে যখন ইতিহাসের পর ইতিহাস সৃষ্টি হল, জাতিসত্তার বিকাশ হল, একটি সহনশীল, ধর্মপ্রাণ জাতি সৃষ্টি হল, তখন কেন ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর শক্তি আবির্ভূত হল? এ প্রশ্নের জবাব একশ দুইশ বছরে নয়, খুঁজতে হবে আদি দিনগুলোতে। এ শক্তির আবির্ভাব আকস্মিক বিপথগামিতা নয়। তারা একটি ইতিহাস, একটি মতাদর্শ ধারণ করে। তাই তাদের এত একমুখীনতা এবং নির্মম কঠোরতা। ভ্রান্ত মতাদর্শটির উদ্ভব চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর জীবিতকালেই হয়েছে। অভ্রান্ত আদর্শ অর্থাৎ হজরত আলীর (রা.) আদর্শ যেমন আজও আছে, তেমনি ভ্রান্ত মতাবলম্বীরাও টিকে আছে। ইতিহাসে এরা খারেজি সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। এদের প্রসঙ্গে ভারতের প্রখ্যাত গবেষক ও লেখক সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভি লিখেছেন, এ সম্প্রদায়ের স্বভাবপ্রকৃতিতে স্থূলবাদিতা, পরমত অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদিতা ও স্ববিরোধিতা এমন মূর্ত হয়ে উঠেছিল যা বিগত ধর্মগুলোর কোনো সম্প্রদায়ে কিংবা ইসলামের ইতিহাসে আত্মপ্রকাশকারী কোনো দলের মাঝে দেখা যায়নি। হজরত আলী (রা.)- জীবন খিলাফত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১৭৩।

খারেজি সম্প্রদায়ের লোকগুলো হজরত আলী (রা.)-এর সৈন্যবাহিনীর একটি বিদ্রোহী অংশ, যাদের বিরুদ্ধে তিনি চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন যা নাহরোয়ান যুদ্ধ নামে খ্যাত। এ যুদ্ধে খারেজিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব ও চিন্তাদর্শন নির্মূল হয়ে যায়নি। সৈয়দ নদভি আরও লিখেছেন, খারেজিরা ছিল খুবই স্থূল দৃষ্টির অধিকারী এবং অদূরদর্শী। প্রতিপক্ষের মতামতের ব্যাপারে তাদের চিন্তা ছিল খুবই সংকীর্ণ। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও তারা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের সাহস ও শৌর্যবীর্যের অধিকারী। কথায় ও কাজে ছিল অতি স্পষ্টবাদী। আকিদা ও বিশ্বাসের জন্য জীবন বিসর্জন করা ছিল তাদের কাছে অতি সহজ বিষয়। খেজুর গাছের নিচে পড়ে থাকা একটি খেজুর খেতে তারা মালিকের অনুমতি নেয়া হয়নি বলে ইতস্তত করত এবং মুখ থেকে থুথু করে ফেলে দিত; অথচ মুসলমানদের রক্তপাতের ব্যাপারে ছিল দ্বিধাহীন। তাদের চিন্তায় বিশ্বাসী নয়, শুধু এই অপরাধে যে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করার ব্যাপারে তারা মোটেও কুণ্ঠিত হতো না। আব্দুর রহমান ইব্ন মুলজিম হজরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)কে হত্যা করার পর দেখা গেল দিনরাত সে শুধু কোরআন তিলাওয়াত করছে। তিলাওয়াতের মর্ম হল, আলীকে খুন করা দোষের নয়। তিলাওয়াতকারী না হওয়াটা দোষের।

হাজার বছর টিকে থেকে এরাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের (১৬৯১১৭৬৫) নেতৃত্বে রাজনৈতিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। সৌদি আরব তার প্রমাণ। একই মতাদর্শের হলেও আইএস অর্থাৎ ইসলামিক স্টেটওয়ালারা খিলাফত বনাম রাজতন্ত্রের প্রশ্নে সৌদি আরবের প্রতি শত্রভাবাপন্ন। যারা শুরুতে খারেজি তারাই কালক্রমে হয়ে যায় সালাফি পরিচয়দানকারী। সালাফিরা আদর্শগত এবং রাজনৈতিকভাবে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের অনুসারী। আলীবিদ্বেষ দিয়ে শুরু করে তারা শেষ পর্যন্ত মহানবী (সা.)কে বড় ভাই তুল্য ভাববার আকিদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তৎস্থলে অর্থাৎ নবীর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য এবং একান্ত মহব্বৎ পোষণের পরিবর্তে সালাফিরা/ওয়াহ্হাবিগণ খারেজিদের কালিমালা হুকমা ইল্লাল্লাকে প্রকৃত ঈমান হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা মনে করে, তারাই শুধু তৌহিদ ধারণ করে আছে। মুসলমান হলেও বাকি সব মুশরিক। তাই হত্যাযোগ্য। সুফিদের প্রভাবে বাংলা অঞ্চলে এদের সংখ্যা ছিল স্বল্প। এখনও স্বল্প। কিন্তু মাজহাবপন্থী তরুণযুবাদের বিভ্রান্ত ও একমুখী করে হাজার বছর আগের খারেজিদের মতো হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। তবে এও সত্য, সালাফি/ওয়াহ্হাবি মাত্রই যুদ্ধংদেহী নয়। অধিকাংশই ঈমান ও আমল নিয়ে সন্তুষ্ট। এর পরও সংঘাত থেকেই গেছে।

এই হল হাজার বছরের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ভিত্তি যা বাংলাদেশের মতো উদারমানবতাবাদী সংস্কৃতির দেশে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে চমক সৃষ্টি করতে পেরেছে। এর অবসান কেবলমাত্র আইন দিয়ে হবে না। এর মোকাবিলায় শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর যুগপৎ আধ্যাত্মিকরাজনৈতিক চিন্তাধারাকে সামনে আনতে হবে; এ মতপথকে যারা বিকশিত করেছেন, যারা যুগের দাবি অনুযায়ী লালনপালন করেছেন তাদের প্রজ্ঞা ও কর্মকে জাতির কাছে রাষ্ট্রীয়ভাবে তুলে ধরতে হবে। আমি মনে করি, এতে প্রকারান্তরে মওলানা ভাসানীর ধর্মচিন্তার চর্চা, তার রাজনীতির মূল আবেদনের অনুশীলন দেশবাসী বিশেষ করে তরুণ শ্রেণী ও যুবসমাজ গ্রহণ করবে। একটি নতুন লড়াই এগিয়ে যাবে। একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৭৩৭৪।

লেখক : কোর্স টিচার, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: