Archive

Archive for ডিসেম্বর 9, 2016

বিপ্লবী চিন্তাধারার সুফি মওলানা ভাসানী

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

সৈয়দ ইরফানুল বারী : তৌহিদ প্রশ্নে মওলানা ভাসানীকে কখনও উদাসীন থাকতে দেখিনি। সে তৌহিদ ওয়াহ্দাতুল অজুদের নাকি ওয়াহ্দাতুশ শুহুদেরএ প্রশ্নের জবাব এ লেখায় সম্ভব নয়। তবে এতটুকু লিখতেই হয়, মওলানা ভাসানী বিপ্লবী চিন্তাধারার একজন সুফি ছিলেন। আলেম সমাজ দূরদূরান্ত থেকে সন্তোষে আসতেন এবং নানা প্রশ্নের অবতারণা করতেন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে মহাচীনের প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাইএর মৃত্যুতে মওলানা ভাসানীর প্রেরিত বার্তার শেষ বাক্য গধু অষষধয নষবংং যরং ংড়ঁষ প্রসঙ্গে আলেমরা বললেন, যিনি স্রষ্টায় বিশ্বাসী নন, যিনি আত্মার অমরত্বে বিশ্বাসী নন তার জন্য এ মোনাজাত কেন? মওলানা ভাসানী অতিশয় সহজ ভাষায় বললেন, ৭০ কোটি মানুষের দেশ থেকে তারা সব নকল খোদা তাড়িয়েছে। এটাই বা কম কিসে? লাইলাহা আগে, তার পরে ইল্লাল্লাহ্। তোমরা তো নকল খোদার বেড়াজালে হাবুডুবু খাচ্ছ। আসল খোদার সন্ধান পাবে কীভাবে? ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবরে একই মাত্রার কথা বলেছিলেন ১৯৪০ দশকের তুখোড় রাজনীতিক, ষাটের দশকে ইসলামিক একাডেমির ডায়রেক্টর আবুল হাসিমকে। তিনি চীনের বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা টেপরেকর্ডারে মওলানা ভাসানীকে শুনাতে ঢাকা থেকে সন্তোষে এসেছিলেন। মনোযোগ সহকারে শুনে বললেন, খুব ভালো বলেছেন। কিন্তু একটা কথা বাদ পড়ে গেছে। আবুল হাসিম বললেন, বলুন শুনে রাখি। চান্স পেলে পরে বলব। মওলানা ভাসানী বললেন, আপনি বলতে পারতেন, চীনারা সব নকল খোদা ঝেঁটিয়ে তাড়িয়েছে। এ কাজ মস্ত ঈমানদারের কাজ। ময়দান থেকে আগাছা সাফ করা হয়েছে। এবার কেবল আসল খোদাকে বসিয়ে দিলেই তো হক্কুল ইবাদের সঙ্গে হক্কুল্লাহও আদায় হয়ে যায়। আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী, প্যাপিরাস সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৫৬।

এই দেশে, বাঙালি মুসলমানের মধ্যে আবির্ভূত প্রত্যেক বড় নেতা শেরে বাংলা, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শুধু রাজনীতির খাতিরে নয়, ধর্মীয় চেতনায়ও সবাই উদার, অসাম্প্রদায়িক। এদের দিয়ে যখন ইতিহাসের পর ইতিহাস সৃষ্টি হল, জাতিসত্তার বিকাশ হল, একটি সহনশীল, ধর্মপ্রাণ জাতি সৃষ্টি হল, তখন কেন ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর শক্তি আবির্ভূত হল? এ প্রশ্নের জবাব একশ দুইশ বছরে নয়, খুঁজতে হবে আদি দিনগুলোতে। এ শক্তির আবির্ভাব আকস্মিক বিপথগামিতা নয়। তারা একটি ইতিহাস, একটি মতাদর্শ ধারণ করে। তাই তাদের এত একমুখীনতা এবং নির্মম কঠোরতা। ভ্রান্ত মতাদর্শটির উদ্ভব চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর জীবিতকালেই হয়েছে। অভ্রান্ত আদর্শ অর্থাৎ হজরত আলীর (রা.) আদর্শ যেমন আজও আছে, তেমনি ভ্রান্ত মতাবলম্বীরাও টিকে আছে। ইতিহাসে এরা খারেজি সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। এদের প্রসঙ্গে ভারতের প্রখ্যাত গবেষক ও লেখক সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভি লিখেছেন, এ সম্প্রদায়ের স্বভাবপ্রকৃতিতে স্থূলবাদিতা, পরমত অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদিতা ও স্ববিরোধিতা এমন মূর্ত হয়ে উঠেছিল যা বিগত ধর্মগুলোর কোনো সম্প্রদায়ে কিংবা ইসলামের ইতিহাসে আত্মপ্রকাশকারী কোনো দলের মাঝে দেখা যায়নি। হজরত আলী (রা.)- জীবন খিলাফত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১৭৩।

খারেজি সম্প্রদায়ের লোকগুলো হজরত আলী (রা.)-এর সৈন্যবাহিনীর একটি বিদ্রোহী অংশ, যাদের বিরুদ্ধে তিনি চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন যা নাহরোয়ান যুদ্ধ নামে খ্যাত। এ যুদ্ধে খারেজিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব ও চিন্তাদর্শন নির্মূল হয়ে যায়নি। সৈয়দ নদভি আরও লিখেছেন, খারেজিরা ছিল খুবই স্থূল দৃষ্টির অধিকারী এবং অদূরদর্শী। প্রতিপক্ষের মতামতের ব্যাপারে তাদের চিন্তা ছিল খুবই সংকীর্ণ। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও তারা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের সাহস ও শৌর্যবীর্যের অধিকারী। কথায় ও কাজে ছিল অতি স্পষ্টবাদী। আকিদা ও বিশ্বাসের জন্য জীবন বিসর্জন করা ছিল তাদের কাছে অতি সহজ বিষয়। খেজুর গাছের নিচে পড়ে থাকা একটি খেজুর খেতে তারা মালিকের অনুমতি নেয়া হয়নি বলে ইতস্তত করত এবং মুখ থেকে থুথু করে ফেলে দিত; অথচ মুসলমানদের রক্তপাতের ব্যাপারে ছিল দ্বিধাহীন। তাদের চিন্তায় বিশ্বাসী নয়, শুধু এই অপরাধে যে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করার ব্যাপারে তারা মোটেও কুণ্ঠিত হতো না। আব্দুর রহমান ইব্ন মুলজিম হজরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)কে হত্যা করার পর দেখা গেল দিনরাত সে শুধু কোরআন তিলাওয়াত করছে। তিলাওয়াতের মর্ম হল, আলীকে খুন করা দোষের নয়। তিলাওয়াতকারী না হওয়াটা দোষের।

হাজার বছর টিকে থেকে এরাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের (১৬৯১১৭৬৫) নেতৃত্বে রাজনৈতিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। সৌদি আরব তার প্রমাণ। একই মতাদর্শের হলেও আইএস অর্থাৎ ইসলামিক স্টেটওয়ালারা খিলাফত বনাম রাজতন্ত্রের প্রশ্নে সৌদি আরবের প্রতি শত্রভাবাপন্ন। যারা শুরুতে খারেজি তারাই কালক্রমে হয়ে যায় সালাফি পরিচয়দানকারী। সালাফিরা আদর্শগত এবং রাজনৈতিকভাবে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের অনুসারী। আলীবিদ্বেষ দিয়ে শুরু করে তারা শেষ পর্যন্ত মহানবী (সা.)কে বড় ভাই তুল্য ভাববার আকিদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তৎস্থলে অর্থাৎ নবীর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য এবং একান্ত মহব্বৎ পোষণের পরিবর্তে সালাফিরা/ওয়াহ্হাবিগণ খারেজিদের কালিমালা হুকমা ইল্লাল্লাকে প্রকৃত ঈমান হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা মনে করে, তারাই শুধু তৌহিদ ধারণ করে আছে। মুসলমান হলেও বাকি সব মুশরিক। তাই হত্যাযোগ্য। সুফিদের প্রভাবে বাংলা অঞ্চলে এদের সংখ্যা ছিল স্বল্প। এখনও স্বল্প। কিন্তু মাজহাবপন্থী তরুণযুবাদের বিভ্রান্ত ও একমুখী করে হাজার বছর আগের খারেজিদের মতো হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। তবে এও সত্য, সালাফি/ওয়াহ্হাবি মাত্রই যুদ্ধংদেহী নয়। অধিকাংশই ঈমান ও আমল নিয়ে সন্তুষ্ট। এর পরও সংঘাত থেকেই গেছে।

এই হল হাজার বছরের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ভিত্তি যা বাংলাদেশের মতো উদারমানবতাবাদী সংস্কৃতির দেশে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে চমক সৃষ্টি করতে পেরেছে। এর অবসান কেবলমাত্র আইন দিয়ে হবে না। এর মোকাবিলায় শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর যুগপৎ আধ্যাত্মিকরাজনৈতিক চিন্তাধারাকে সামনে আনতে হবে; এ মতপথকে যারা বিকশিত করেছেন, যারা যুগের দাবি অনুযায়ী লালনপালন করেছেন তাদের প্রজ্ঞা ও কর্মকে জাতির কাছে রাষ্ট্রীয়ভাবে তুলে ধরতে হবে। আমি মনে করি, এতে প্রকারান্তরে মওলানা ভাসানীর ধর্মচিন্তার চর্চা, তার রাজনীতির মূল আবেদনের অনুশীলন দেশবাসী বিশেষ করে তরুণ শ্রেণী ও যুবসমাজ গ্রহণ করবে। একটি নতুন লড়াই এগিয়ে যাবে। একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৭৩৭৪।

লেখক : কোর্স টিচার, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল।

ব্যক্তিগত জীবনে কেমন ছিলেন বিশ্বনবী

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

. মুহাম্মদ আবদুল হাননান : মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বগুণে গুণান্বিত অতি মহৎ একজন মানুষ ছিলেন এবং মানুষের দৃষ্টিতেও তিনি অত্যন্ত মর্যাদাশীল ছিলেন।

তাঁর চেহারা মোবারক পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঝলমল করত।

মাঝারি গড়নবিশিষ্ট ব্যক্তি থেকে কিছুটা লম্বা, আবার অতি লম্বা থেকে খাটো ছিলেন তিনি।

মাথা মুবারক সুসংগতভাবে বড় ছিল। কেশ মুবারক সামান্য কুঞ্চিত ছিল, মাথার চুলে অনিচ্ছাকৃতভাবে আপনাআপনি সিঁথি হয়ে গেলে সেভাবেই রাখতেন, অন্যথায় ইচ্ছাকৃতভাবে সিঁঁথি তৈরি করার চেষ্টা করতেন না। চিরুনি ইত্যাদি না থাকলে এরূপ করতেন। আর চিরুনি থাকলে ইচ্ছাকৃত সিঁথি তৈরি করতেন। কেশ মুবারক লম্বা হলে কানের লতি অতিক্রম করে যেত।

শরীর মুবারকের রং ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল আর ললাট ছিল প্রশস্ত। ভ্রুদ্বয় বক্র, সরু ও ঘন ছিল। উভয় ভ্রু পৃথক পৃথক ছিল, মাঝখানে সংযুক্ত ছিল না। ভ্রুদ্বয়ের মাঝখানে একটি রগ ছিল, যা রাগের সময় ফুলে উঠত।

তাঁর নাসিকা উঁচু ছিল, যার ওপর একপ্রকার নূর ও চমক ছিল। যে প্রথম দেখত সে তাঁকে উঁচু নাকওয়ালা ধারণা করত। কিন্তু গভীরভাবে দৃষ্টি করলে বুঝতে পারত যে সৌন্দর্য ও চমকের দরুন উঁচু মনে হচ্ছে, আসলে উঁচু নয়।

দাড়ি মুবারক ভরপুর ও ঘন ছিল। চোখের মণি ছিল অত্যন্ত কালো। তাঁর গণ্ডদেশ সমতল ও হালকা ছিল এবং গোশত ঝুলন্ত ছিল না। তাঁর মুখ সুসংগতপূর্ণ প্রশস্ত ছিল।

তাঁর  দাঁত মুবারক চিকন ও মসৃণ ছিল এবং সামনের দাঁতগুলোর মধ্যে কিছু কিছু ফাঁক ছিল।

তাঁর গ্রীবা মুবারক সুন্দর ও সরু ছিল। তাঁর রং ছিল রুপার মতো সুন্দর ও স্বচ্ছ। তাঁর সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সামঞ্জস্যপূর্ণ ও মাংসল ছিল।

আর শরীর ছিল সুঠাম। তাঁর পেট ও বুক ছিল সমতল এবং বুক ছিল প্রশস্ত। উভয় কাঁধের মাঝখানে বেশ ব্যবধান ছিল। গ্রন্থির হাড়গুলো শক্ত ও বড় ছিল (যা শক্তিসামর্থ্যের একটি প্রমাণ)। শরীরের যে অংশে কাপড় থাকত না, তা উজ্জ্বল দেখাত। বুক থেকে নাভি পর্যন্ত চুলের সরু রেখা ছিল। তা ছাড়া বুকের উভয় অংশ ও পেট কেশমুক্ত ছিল। তবে উভয় বাহু, কাঁধ ও বুকের উপরিভাগে চুল ছিল।

তাঁর হাতের কবজি দীর্ঘ এবং হাতের তালু প্রশস্ত ছিল। শরীরের হাড়গুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সোজা ছিল। হাতের তালু ও উভয় পা কোমল ও মাংসল ছিল। হাতপায়ের আঙুলগুলো পরিমিত লম্বা ছিল। পায়ের তালু কিছুটা গভীর এবং কদম মুবারক এরূপ সমতল ছিল যে পরিচ্ছন্নতা ও মসৃণতার দরুন পানি আটকে থাকত না, সঙ্গে সঙ্গে গড়িয়ে পড়ত।

তিনি যখন পথ চলতেন, তখন শক্তি সহকারে পা তুলতেন এবং সামনের দিকে ঝুঁকে চলতেন, পা মাটির ওপর সজোরে না পড়ে আস্তে পড়ত। তাঁর চলার গতি ছিল দ্রুত এবং পদক্ষেপ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হতো, ছোট ছোট কদমে চলতেন না। চলার সময় মনে হতো যেন তিনি উচ্চভূমি থেকে নিম্নভূমিতে অবতরণ করছেন।

যখন কোনো দিকে মুখ ঘোরাতেন, তখন সম্পূর্ণ শরীরসহ ঘোরাতেন। তাঁর দৃষ্টি নত থাকত এবং আকাশ অপেক্ষা মাটির দিকে অধিক নিবদ্ধ থাকত।

সাধারণত চোখের এক পার্শ্ব দিয়ে তাকাতেন। অর্থাৎ লজ্জা ও শরমের দরুন কারো প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি খুলে তাকাতে পারতেন না।

চলার সময় তিনি সাহাবিদের সামনে রেখে নিজে পেছনে থাকতেন।

কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি আগে সালাম করতেন।

বিশ্বনবী (সা.) সর্বদা আখিরাতের চিন্তায় মশগুল থাকতেন। সর্বক্ষণ উম্মতের কল্যাণের কথা ভাবতেন। দুনিয়াবি জিনিসের মধ্যে তিনি কোনো প্রকার শান্তি ও স্বস্তি পেতেন না।

বিনা প্রয়োজনে কোনো কথা বলতেন না, বেশির ভাগ সময় চুপ থাকতেন। তিনি আদ্যপান্ত মুখ ভরে কথা বলতেন। জিহ্বার কোণ দিয়ে চাপা ভাষায় কথা বলতেন না যে অর্ধেক উচ্চারিত হবে আর অর্ধেক মুখের ভেতর থেকে যাবে, যেমন আজকাল অহংকারীরা করে থাকে।

তিনি এমন সারগর্ভ ভাষায় কথা বলতেন, যাতে শব্দ কম কিন্তু অর্থ বেশি থাকত। তাঁর কথা একটি অন্যটি থেকে পৃথক হতো। অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কথা বলতেন না, আবার প্রয়োজন অপেক্ষা এরূপ কমও না যে উদ্দেশ্যই পরিষ্কার বোঝা যায় না।

তিনি নরম মেজাজ ও স্বভাবের ছিলেন, কঠোর মেজাজি ছিলেন না। তিনি কাউকে হেয় করতেন না। আল্লাহর নিয়ামত যত সামান্যই হোক না কেন, তিনি তাকে বড় মনে করতেন। নিয়ামতের নিন্দা করতেন না, আবার মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসাও করতেন না। নিন্দা না করার কারণ যেহেতু আল্লাহ তাআলার নিয়ামত। আর অতিরিক্ত প্রশংসা না করার কারণ ছিল এই যে এতে লোভ হচ্ছে বলে সন্দেহ হতে পারে।

দ্বীনি বিষয় ও হকের ওপর হস্তক্ষেপ করা হলে তাঁর ক্রোধের সামনে কেউ টিকতে পারত না, যতক্ষণ না তিনি এর প্রতিকার করতেন, দ্বীনের ব্যাপারে তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হতো না।

তিনি দুনিয়া বা দুনিয়ার কোনো বিষয়ে রাগান্বিত হতেন না। কারণ তাঁর দৃষ্টিতে দুনিয়া ও দুনিয়াবি বিষয়ের কোনো গুরুত্ব ছিল না। তবে দ্বীনি বিষয় বা হকের ওপর কেউ হস্তক্ষেপ করলে ক্রোধে তাঁর চেহারা এরূপ পরিবর্তন হয়ে যেত যে তাঁকে কেউ চিনতে পারত না।

তিনি নিজের জন্য কখনো কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন না। নিজের জন্য প্রতিশোধও নিতেন না।

যখন কোনো কারণে কোনো দিকে ইশারা করতেন, তখন সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন। বিনয়ের খেলাপ বলে আঙুল দ্বারা ইশারা করতেন না।

তিনি আশ্চর্যবোধকালে হাত মুবারক উল্টে দিতেন। কথা বলার সময় কখনো (কথার সঙ্গে) হাত নাড়তেন, কখনো ডান হাতের তালু দ্বারা বাঁ বৃদ্ধাঙুলির পেটে আঘাত করতেন।

কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হলে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন ও অমনোযোগিতা প্রকাশ করতেন অথবা তাকে মাফ করে দিতেন।

যখন তিনি খুশি হতেন, তখন লজ্জায় চোখ নিচু করে ফেলতেন। তাঁর বেশির ভাগ হাসি মুচকি হাসি হতো। আর সেই সময় তাঁর দাঁত মুবারক শিলার মতো শুভ্র ও উজ্জ্বল দেখাত।

মহানবী (সা.) ব্যক্তিগত প্রয়োজনে (অর্থাৎ আহারনিদ্রা ইত্যাদির জন্য) ঘরে যেতেন। এ ব্যাপারে তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি তাঁর ঘরে থাকাকালীন তিন ভাগে ভাগ করতেন

. এক ভাগ আল্লাহর ইবাদতের জন্য।

. এক ভাগ পরিবারপরিজনের হক আদায়ের জন্য।

. এক ভাগ নিজের (আরাম ও বিশ্রাম ইত্যাদির) জন্য।

তারপর নিজের অংশকেও নিজের মধ্যে ও উম্মতের অন্যান্য লোকের মধ্যে দুই ভাগ করতেন। অন্যদের জন্য যে ভাগ হতো, তাতে অবশ্য বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম (রা.) উপস্থিত হতেন এবং তাঁদের মাধ্যমে তাঁর কথাবার্তা সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছত।

তিনি তাদের কাছে (দ্বীনি ও দুনিয়াবি উপকারের) কোনো জিনিসই গোপন করতেন না। নির্দ্বিধায় সব রকমের উপকারী কথা বলে দিতেন।

উম্মতের এই অংশে তিনি জ্ঞানীগুণীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দিতেন এবং এই সময়কে তিনি তাদের মধ্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে বণ্টন করতেন। তাদের মধ্যে হয়তো কেউ একটি প্রয়োজন, কেউ দুটি এবং কেউ অনেক প্রয়োজন নিয়ে আসত। তিনি তাদের প্রয়োজনের প্রতি মনোযোগী হতেন এবং তাদের এমন কাজে মশগুল করতেন, যাতে তাদের ও পুরা উম্মতের সংশোধন ও উপকার হয়। তিনি তাদের কাছে সাধারণ লোকদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন ও প্রয়োজনীয় কথা তাদের বলে দিতেন এবং বলতেন, তোমাদের যারা উপস্থিত তারা যেন আমার কথাগুলো অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেয়।

তিনি আরো বলতেন, যারা (কোনো কারণবশত যেমন—পর্দা, দূরত্ব, লজ্জা ও দুর্বলতা ইত্যাদির দরুন) আমার কাছে তাদের প্রয়োজন পেশ করতে পারে না, তোমরা তাদের প্রয়োজন আমার কাছে পৌঁছে দিয়ো। যে ব্যক্তি এমন লোকের প্রয়োজন কোনো ক্ষমতাসীনের কাছে পৌঁছে দেয়, যে নিজে পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখে না, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে দৃঢ়পদ রাখবেন। মহানবী (সা.)-এর কাছে উপকারী ও প্রয়োজনীয় বিষয়েরই আলোচনা হতো। এর বিপরীত অন্য কোনো বিষয় তিনি গ্রহণ করতেন না। জনসাধারণের প্রয়োজন ও উপকারী বিষয় ছাড়া অন্য অপ্রয়োজনীয় বিষয় তিনি শুনতেনও না।

সাহাবারা তাঁর কাছে দ্বীনি বিষয়ের প্রার্থী হয়ে আসতেন, তাঁরা কিছু না কিছু খেয়েই ফিরতেন। তিনি যেমন জ্ঞান দান করতেন, তেমনি কিছু না কিছু খাওয়াতেনও। তাঁরাও তাঁর কাছ থেকে কল্যাণের পথে মশাল ও দিশারি হয়ে বের হতেন। রাসুলে পাক (সা.) সাহাবা আজমাইনদের সালাম, কালাম ও ত্বোয়ামের (খাবার খাওয়ানো) বেশি বেশি আমল করার তাগিদ দিতেন। এর অর্থ হলো, তিনি বললেন, বেশি বেশি সালাম দাও, বেশি বেশি নেক কথা বলো এবং বেশি বেশি খানা খাওয়াও।

নবী করিম (সা.) প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া নিজের জবানকে ব্যবহার করতেন না। আগত ব্যক্তিদের মন রক্ষা করতেন, তাদের আপন করতেন, বিচ্ছিন্ন করতেন না। অর্থাৎ এমন ব্যবহার করতেন না, যাতে তারা চলে যায় অথবা দ্বীনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে যায়।

প্রত্যেক কওমের সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান করতেন এবং তাকেই তাদের অভিভাবক বা সরদার নিযুক্ত করে দিতেন।

লোকদের তাদের ক্ষতিকর জিনিস থেকে সতর্ক করতেন বা লোকদের পরস্পর মেলামেশায় সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে বলতেন আর নিজেও সতর্ক ও সাবধান থাকতেন।

তিনি কারো জন্য চেহারার প্রসন্নতা ও আপন সদাচারের কোনো পরিবর্তন করতেন না।

আপন সাহাবিদের খোঁজখবর নিতেন। লোকদের পারস্পরিক হাল অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেন ও তা সংশোধন করতেন।

ভালোকে ভালো বলতেন ও তার পক্ষে মদদ জোগাতেন। খারাপকে খারাপ বলতেন ও তাকে প্রতিহত করতেন।

প্রত্যেক বিষয়ে সমতা রক্ষা করতেন। আগে এক রকম, পরে আরেক রকম—এরূপ করতেন না।

সর্বদা লোকদের সংশোধনের প্রতি খেয়াল রাখতেন, যাতে তারা দ্বীনের কাজে অমনোযাগী না হয় বা হকপথ থেকে সরে না যায়।

প্রত্যেক অবস্থার জন্য তাঁর কাছে একটি বিশেষ বিধিনিয়ম ছিল। হক কাজে ত্রুটি করতেন না, আবার সীমা লঙ্ঘনও করতেন না।

লোকদের মধ্যে উত্কৃষ্ট ব্যক্তিবর্গই তাঁর কাছাকাছি থাকত। তাদের মধ্যে সেই তাঁর কাছে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হতো, যে লোকদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকামী হতো এবং তাঁর কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল সেই হতো যে লোকদের জন্য সর্বাধিক সহানুভূতিশীল ও সাহায্যকারী হতো।

মহানবী (সা.) সর্বদা আল্লাহর জিকির করতেন।

তিনি নিজের জন্য কোনো স্থানকে নির্দিষ্ট করতেন না এবং অন্য কাউকেও এরূপ করতে নিষেধ করতেন।

কোনো মজলিসে উপস্থিত হলে, যেখানেই জায়গা পেতেন বসে যেতেন এবং অন্যদেরও এরূপ করতে আদেশ করতেন।

তিনি মজলিসে উপস্থিত প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অংশ দিতেন। অর্থাৎ প্রত্যেকের সঙ্গে যথাযোগ্য হাসিমুখে কথাবার্তা বলতেন। তাঁর মজলিসের প্রত্যেক ব্যক্তি মনে করত যে তিনি তাকেই সবার অপেক্ষা বেশি সম্মান করছেন।

যে কেউ কোনো প্রয়োজনে তাঁর কাছে এসে বসত অথবা তাঁর সঙ্গে দাঁড়াত, তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর জন্য বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতেন, যতক্ষণ না সে নিজেই উঠে যেত বা চলে যেত।

কেউ কোনো জিনিস চাইলে তিনি দান করতেন অথবা (না থাকলে) নরম ভাষায় জবাব দিয়ে দিতেন।

তাঁর সদা হাসিমুখ সাধারণভাবে সবার জন্য ছিল। তিনি স্নেহমমতায় সবার জন্য পিতা সমতুল্য ছিলেন।

হকের বা অধিকারের বেলায় সবাই তাঁর কাছে সমান ছিল।

তাঁর মজলিস ছিল সহনশীলতা ও লজ্জাশীলতা এবং ধৈর্ষ ও আমানতদারীর এক অপরূপ নমুনা।

তাঁর মজলিসে কেউ উচ্চস্বরে কথা বলত না, কারো ইজ্জতহানি করা হতো না। প্রথমত তাঁর মজলিসে সবাই সংযত হয়ে বসত, যাতে কোনো ধরনের দোষত্রুটি হলে তা নিয়ে সমালোচনা বা তার প্রচার করা হতো না। মজলিসের সবাই পরস্পর সমঅধিকার লাভ করত। বংশমর্যাদা নিয়ে একে অপরের ওপর অহংকার করত না। তবে তাকওয়ার ভিত্তিতে একে অপরের ওপর মর্যাদা লাভ করত এবং একে অপরের প্রতি বিনয়নম্র ব্যবহার করত। তারা বড়দের সম্মান করত, ছোটদের প্রতি সদয় ব্যবহার করত, অভাবগ্রস্তদের প্রাধান্য দিত ও অপরিচিত মুসাফিরদের খাতিরযত্ন করত।

মহানবী (সা.) সদা হাসিখুশি থাকতেন, নম্রস্বভাবের ছিলেন, সহজেই অন্যদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতেন।

তিনি রূঢ় ও কঠোর ছিলেন না। চিৎকার করে কথা বলতেন না।

অশ্লীল কোনো কথা বলতেন না, কাউকেও দোষারোপ করতেন না।

অধিক হাসিঠাট্টা করতেন না।

মর্জির খেলাফ কেউ কিছু আশা করলে তাকে একেবারে নিরাশ ও বঞ্চিত করতেন না। বরং কিছু না কিছু দিয়ে দিতেন বা কোনো সান্ত্বনার কথা বলে দিতেন।

তিনি নিজেকে তিনটি বিষয় থেকে সম্পূর্ণরূপে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন—১. ঝগড়াবিবাদ, . বেশি কথা বলা, . অনর্থক বিষয়াদি থেকে।

অনুরূপ তিনটি বিষয় থেকে অন্যকেও বাঁচিয়ে রেখেছিলেন—১. তিনি কারো নিন্দা করতেন না, . কাউকে লজ্জা দিতেন না, . কারো দোষ তালাশ করতেন না।

তিনি এমন কথাই বলতেন, যাতে সওয়াব পাওয়া যায়।

যখন তিনি কথা বলতেন, তখন উপস্থিত সাহাবারা এমনভাবে মাথা ঝুঁকাইয়া বসতেন যেন তাঁদের মাথায় পাখি বসে রয়েছে। অর্থাৎ এমনভাবে স্থির হয়ে থাকতেন যেন সামান্য নড়াচড়া করলেই মাথার ওপর থেকে পাখি উড়ে যাবে।

যখন তিনি কথা বলতেন, তাঁরা চুপ থাকতেন আর যখন তিনি কথা শেষ করে চুপ করতেন, তখন তাঁরা কথা বলতেন। তাঁর কথার মাঝখানে তাঁরা কথা বলতেন না।

তাঁরা কোনো বিষয় নিয়ে তাঁর সম্মুখে কথা কাটাকাটি করতেন না।

যে কথা শুনে সবাই হাসতেন, তিনিও হাসতেন, যে বিষয়ে সবাই বিস্ময়বোধ করতেন, তিনিও তাতে বিস্ময় প্রকাশ করতেন।

অপরিচিত মুসাফিরের রুক্ষ কথাবার্তা ও অসংলগ্ন প্রশ্নাবলির ওপর ধৈর্য ধারণ করতেন। অপরিচিত মুসাফিররা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করত বলে তাঁর সাহাবিরা এরূপ মুসাফিরদের তাঁর মজলিসে নিয়ে আসতেন। যাতে তাদের প্রশ্নাবলির দ্বারা নতুন বিষয় জানা যায়।

মহানবী (সা.) বলতেন, কোনো অভাবী ব্যক্তিকে দেখলে তাকে সাহায্য করবে।

কেউ সামনাসামনি তাঁর প্রশংসা করুক, তিনি তা পছন্দ করতেন না, তবে কেউ তাঁর এহসানের প্রতিদান হিসেবে শুকরিয়াস্বরূপ প্রশংসা করলে তিনি চুপ থাকতেন। অর্থাৎ শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য বিধায় যেন তাকে তার কর্তব্য কাজে সুযোগ দিতেন।

তিনি কারো কথায় বাধা দিতেন না, যতক্ষণ না সে সীমা লঙ্ঘন করত। সীমা লঙ্ঘন করলে তিনি তাকে নিষেধ করতেন অথবা মজলিস থেকে উঠে যেতেন।

মহানবী (সা.)-এর নীরবতা চার কারণে হতো—১. সহনশীলতার কারণে, . সচেতনতার দরুন, . আন্দাজ করার উদ্দেশ্যে, . চিন্তাভাবনার জন্য।

(সূত্র : বিদায়া নিহায়া, কানজুল উম্মাল; মাওলানা সাদ : হায়াতুস সাহাবাহ, প্রথম খণ্ড, দারুল কিতাব, ঢাকা ও শামায়েলে তিরমিজি, আল কাউসার প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৭)

লেখক : সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদপ্তর

সিন্ধু সভ্যতা লোকসমাজ ও শিল্পকর্ম

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

indus-civilisationসুদীপ্ত সালাম : নতুনপুরাতন কোনো প্রস্তর যুগেই সভ্যতা গড়ে ওঠেনি। তার প্রধান কারণ সে সময় মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরি হয়নি। সংগঠিত হওয়ার মতো অবস্থাও হয়তো ছিল না। তখন বিচ্ছিন্নতাই ছিল নিয়তি। বরফ যুগের বরফ গলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষে মানুষে যে বিচ্ছিন্নতা তাও উবে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে শুরু হয় সভ্যতার গোড়াপত্তনপ্রধানত এশিয়া ও ইউরোপে।

মানুষে মানুষে মূল্যবান সম্বন্ধকে রবীন্দ্রনাথ যথার্থ সভ্যতা বলে মনে করতেন। আর এই ভারতবর্ষে তিনি সেই যথার্থ সভ্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রভেদের মধ্যে ঐক্যস্থাপন করা, নানা পথকে একই লক্ষ্যের অভিমুখীন করিয়া দেয়া এবং বহুর মধ্যে এককে নিঃসংশয়রূপে অন্তররূপে উপলব্ধি করাবাইরে যে সব পার্থক্য প্রতীয়মান হয় তাকে নষ্ট না করে তার ভিতরকার নিগূঢ় যোগকে অধিকার করাকে তিনি ভারতবর্ষের প্রধান সার্থকতা মনে করতেন। ভারত উপমহাদেশ ইতিহাসের ঊষালগ্নেও আমরা এ কথার সত্যতা খুঁজে পাই।

আমরা জানি, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের শেকড় সিন্ধুসভ্যতায় গিয়ে ঠেকেছে। কমপক্ষে ৩ হাজার খ্রিস্টপূর্বে সিন্ধু নদের অববাহিকায় এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। আনুমানিক ২ হাজার ৩শ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তা পূর্ণতা লাভ করে। আর এই সভ্যতার স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় দেড় হাজার বছর।

১৯২২২৩ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মোন্টগোমেরী জেলার হরপ্পা নামক গ্রামে সিন্ধুসভ্যতার একটি নগর এবং সিন্ধু প্রদেশের লরকানা শহরে মহেঞ্জোদাড়ো নগর আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, সিন্ধুসভ্যতা উত্তর থেকে দক্ষিণে ১ হাজার ১শ কিলোমিটার এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে দেড় হাজার কিলোমিটার ভূখণ্ড নিয়ে বিস্তৃত ছিল। এ যাবৎ ৮০টিরও বেশি স্থানে এই সভ্যতার চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এই সভ্যতার শিল্পকর্মকে বুঝতে হলে এই নিদর্শনগুলো জানা জরুরি। সিন্ধুসভ্যতার নগর ব্যবস্থাপনা আমাদের অনেক তথ্য সরবরাহ করেছে। হরপ্পা শহরটি ২৫০ একর স্থান নিয়ে গঠিত। অনেক গবেষক মনে করেন এর বিস্তৃতি ৪৯৫ একর পর্যন্ত। হরপ্পার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার এবং মহেঞ্জোদাড়ো নগরের জনসংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখের মতো ছিল বলে গবেষকরা মনে করেন। উভয় শহরই ২০ ফুট উঁচু কাঁচা ইটের ভিত্তির ওপর নির্মিত। আকস্মিকভাবে এখানে বসতি স্থাপন করা হয়নি। দুটো শহরেরই পশ্চিম দিকে নগরদুর্গ (citadel) ছিল। প্রশাসনিক ভবনগুলো দুর্গের ভেতরে স্থাপন করা হয়। নগরদুর্গের নিচে ছিল সাধারণ মানুষের বসতি তথা শহর। রাস্তা ও অলিগলি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। মহেঞ্জোদাড়োতে ৯ ফুট থেকে ৩৪ ফুট পর্যন্ত চওড়া রাস্তা আবিষ্কৃত হয়েছে। রাস্তার দুপাশে সরকারি বেসরকারি ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। ঘরবাড়িগুলো এক লাইনে সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়। ভবনের আকৃতি দেখে নাগরিকদের শ্রেণীবিন্যাস অনুমান করা যায়। দুকক্ষবিশিষ্ট ভবন যেমন ছিল তেমনি বহু কক্ষবিশিষ্ট প্রাসাদ ভবনেরও নিদর্শন মিলেছে। কোনো কোনো ভবন দোতলাবিশিষ্ট, কোনো ভবন তার চেয়েও উঁচু ছিল। প্রতিটি ভবনেই স্নানাগার, কূপ, আঙ্গিনা ইত্যাদি ছিল। হরপ্পায় একটি শস্যভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি দৈর্ঘ্যে ১৬৯ এবং প্রস্থে ১৩৫ ফুট ছিল। ধারণা করা হয়, বন্যার হাত থেকে শস্যভাণ্ডার রক্ষা করতে উঁচু বেদির ওপর তা স্থাপন করা হয়। মহেঞ্জোদাড়োতে ৮৫ প্রস্থ এবং ৯৭ ফুট দৈর্ঘ্য আয়তনের একটি বৃহৎ ভবনের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। চারকোণা স্তম্ভ ও বিশাল কক্ষবিশিষ্ট একটি বড় ভবনের ভগ্নাংশও আবিষ্কৃত হয়েছে। আরও পাওয়া যায় একটি বিশাল আকৃতির স্নানাগার (ঞযব ৎেবধঃ ইধঃয) এটি দৈর্ঘ্যে ১২ মিটার, প্রস্থে ৭ মিটার এবং এর গভীরতা আড়াই মিটার। শহর দুটির ঘরবাড়ি, রাস্তা, কূপ, নর্দমা ও অন্যান্য ভবন পোড়া ইট দিয়ে বানানো হয়েছিল।

শহরগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আমাদের বিস্মিত করে। পানি নিষ্কাশনের জন্য রাস্তার নিচে নর্দমা তৈরি করা হয়েছিল। নোংরা পানির সঙ্গে যে সব আবর্জনা যায় সেগুলো আটকাতে নর্দমার বিভিন্ন স্থানে গর্ত রাখা হয়েছে।

বর্তমান শহুরে মানুষের মনোজগৎ ইটপাথরের মতোই রুক্ষ ও প্রাণহীন। একই বাড়িতে থাকি কিন্তু এক ঘর আরেক ঘরের খবর রাখে না। ফলে এখানকার সমাজ ব্যবস্থা ভঙ্গুর ও অস্থির। অথচ গ্রামগুলো টিকে আছে। মানুষে মানুষে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন এই টিকে থাকার প্রধান নিয়ামক। সিন্ধুসভ্যতার নগর ব্যবস্থা দেখে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি, সিন্ধুবাসীরা শৃংখলাবদ্ধ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিল। জনসাধারণের মধ্যে অনৈক্য থাকলে নগর ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনার সুপরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না। ভেদাভেদ প্রকোট থাকলে অনেক লোকের জন্য বিশাল কিন্তু সাধারণ (common) স্নানাগার নির্মাণ করা যেত না। আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি এই সভ্যতায় শস্যভাণ্ডার ছিল। এ থেকে বুঝা যায় চাহিদার বেশি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হতো। কেন না কৃষি কাজের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ছিল। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আরও ছিল সিন্ধু, ইরাবতী, শতদ্রু, ভোগভো প্রভৃতি নদী। বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিতে এবং জ্বালানির চাহিদা মেটাতে কাঠের জন্য বেশি দূরে যেতে হতো না বলে অনেকে মনে করেন। কারণ সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলেই পর্যাপ্ত গাছ ছিল বলে ধারণা করা যায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য এবং সমাজে স্থিতিশীলতা না থাকলে এত অগ্রসর ও সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারতো না।

তবে তাদের নগর ব্যবস্থা যতই শহুরে হোক না কেন তারা যে মানসিক দিক থেকে গ্রামীণ তার প্রমাণ রয়েছে। তাদের পুরো অর্থনীতি কৃষি ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করতো। ফলে নগরবাসী হলেও তাদের সংস্কৃতি ও শিল্পকলা লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর।

সিন্ধুসভ্যতায় কোনো মন্দির বা উপাসনালয়ের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ভাস্কর্য, পুতুল ও সিলমোহর দেখে অনুমান করা যায় যে, সিন্ধুবাসীরা প্রকৃতি পূজক ছিল। গাছ, পশুপাখি, আগুন, জল প্রভৃতির পূজা করত। তিন শিং বিশিষ্ট এক দেবতার প্রতিকৃতি সংবলিত সিলমোহর পাওয়া গেছে। তার চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন পশুর অবস্থান। অনেক গবেষক মনে করেন, সিন্ধুবাসীরা এই দেবতার পূজা করত। এই দেবতাই পরবর্তীকালে হিন্দুদের মহাদেব বা পশুপতি হিসেবে পরিপূর্ণতা পেয়েছে বলে অনেকে মত দিয়েছেন। আমরা জানি শিব হল নিচু শ্রেণীর (প্রধানত কৃষিজীবী) মানুষের ত্রাণকর্তা। সিন্ধুসভ্যতার সেই ত্রয়ীশিং বিশিষ্ট দেবতাই যদি শিবের পূর্বসূরি হয়ে থাকে তাহলেও আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সিন্ধুবাসীরা বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল না। তাদের দৃষ্টি ছিল ভূমিসংলগ্ন। এ থেকেও আমরা বলতে পারি সিন্ধুবাসীদের আচারপ্রথা ছিল লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর।

শান্তিপ্রিয় লোকসমাজের মানুষের মানসিকতার ছাপ তাদের শিল্পকর্মেও লক্ষ্য করি। সিন্ধুসভ্যতা থেকে প্রধানত চার প্রকার শিল্পকর্মের নিদর্শন পাই। ভাস্কর্য, তৈজসপত্র, সিলমোহর ও অলংকার। ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে মহেঞ্জোদাড়ো থেকে পাওয়া নকশাখচিত পুরোহিত রাজার চুনাপাথরের আবক্ষ মূর্তি। এটি ১৭ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার লম্বা। তার চোখ আধো খোলা, মুখে সৌম্য ও প্রজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট। এই রাজা যুদ্ধজয়ের গর্বে গৌরবান্বিত নয়, শিল্পী তাকে মহান করারও চেষ্টা করেননি। এই আবক্ষ মূর্তির ব্যক্তিত্বকে শান্তিপ্রিয় লোকসমাজেরই প্রতিনিধি বলে মনে হয়।

ভাস্কর্য হিসেবে আরও রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্য ভঙ্গিতে নগ্ন নারী মূর্তি। মাত্র ১১ সেন্টিমিটার লম্বা এই ভাস্কর্যটি বেশকিছু তথ্য দেয়। মূর্তির সাজসজ্জা আছে, হাতে অনেক চুড়ি আছে, গলায় মাদুলি, হাতের উপরের অংশে আছে বাজুবন্ধ কিন্তু বিলাসিতার ছাপ নেই। রাজকীয় তো নয়ই।

প্রাপ্ত ভাস্কর্যের মধ্যে মস্তক ও বাহুহীন মিনিয়েচার মূর্তিও উল্লেখ্যযোগ্য। কাঁধের কাছে সকেট রয়েছে। হাত ও মাথা স্থাপন করতে এই সকেট কাজে লাগতো। লাল চুনাপাথরের এই ভাস্কর্যটি ৩৩ ইঞ্চি লম্বা। এটি হরপ্পা থেকে পাওয়া যায়। এটি কোনো যোদ্ধা বা রাজার প্রতিকৃতি নয়। এটি হয়তো কোনো দেবতার ফিগার। কেন না পরবর্তী সময়ে তৈরি কালো পাথরের বিষ্ণু ও অন্যান্য দেবতার ভাস্কর্যের সঙ্গে এই ভাস্কর্যের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।

আরেকটি হল ধূসর চুনাপাথরের পুরুষ নৃত্যশিল্পীর ভাস্কর্য। ৪ ইঞ্চি লম্বা এই ভাস্কর্যটি হরপ্পা থেকে পাওয়া যায়। এই ভাস্কর্যটিরও হাতমাথা পাওয়া যায়নি। এটিও কোনো দেবতার ইমেজ হতে পারে। দুটো ভাস্কর্যই সিন্ধুসভ্যতার পরের দিকের নিদর্শন।

সিন্ধুসভ্যতা থেকে পাওয়া মাটির তৈরি মূর্তিগুলো এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বেশিরভাগই গ্রামবাংলার টেপাপুতুলের মতো দেখতে। মাটির তৈরি কিছু খেলনারও সন্ধান মিলেছে। যেগুলোর সঙ্গে আবহমান লোকজ খেলনার মিল রয়েছে।

সিন্ধুসভ্যতায় চিত্রকলা ছিল কিনা জানা যায়নি। কিন্তু নাগরিকরা টেরাকোটা পদ্ধতিনির্ভর তৈজসপত্র ব্যবহার করত। মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা থেকে বিভিন্ন নকশা এবং আকৃতির থালা, বাটি, বাসন, কাপ, অলংকৃতপাত্র পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, সেগুলোর ওপর প্রধানত লাল ও কালো রঙ দিয়ে হাতে আঁকা বিভিন্ন মোটিফ ও নকশাও রয়েছে। কিছু পাত্র আছে বাহারি রঙিন (নীল, লাল, সবুজ ও হলুদ) থালা, বাটি, বাসন, কাপের যথার্থ আকৃতি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সে সময় এ সব তৈরিতে মৃৎশিল্পীরা চাকার ব্যবহার করত। বানানো শেষে মাটির পাত্রগুলোকে আগুনে পোড়ানো হতো। কিছু পাত্র রোদে শুকানো হতো। সেই তৈজসপত্রগুলো ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে, বিশেষ করে লোকসমাজে।

মহেঞ্জোদাড়োর থেকে প্রাপ্ত সিলমোহরগুলোকে ভারতবর্ষের প্রথম শিল্পকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে না। সিন্ধুসভ্যতায় লেখার নিদর্শন নেই। পাওয়া গেছে কিছু দুর্বোধ্য সাংকেতিক চিহ্ন (আড়াইশ থেকে ৫শ) সেগুলোর পাঠোদ্ধার না হওয়ায় এখন পর্যন্ত সিলমোহরগুলো কি তথ্য বহন করছে তা জানা যায়নি। তাই বলে সিলমোহরগুলোর শিল্পমূল্য অগ্রাহ্য করার উপায়ও নেই। ধারণা করা হয় সিলগুলো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হতো। অনেকে মনে করেন, এগুলো এক প্রকার অলংকার। সিলমোহরে বিভিন্ন পশুর প্রতিকৃতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খোদাই করা রয়েছে। কিছু সিলমোহরে রয়েছে বিভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতি। আর কিছু সিলমোহরে রয়েছে কাল্পনিক দেবদেবীর ফিগার। অনেকের ধারণা, এই পশুফিগারগুলো সিন্ধুসভ্যতার মানুষের টোটেম বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এগুলো নরম পাথরে তৈরি (steatite stone), খোদাইয়ের পর চকচকে ও শক্ত করতে এগুলোকে পোড়ানো হতো। তিন শিংবিশিষ্ট এক দেবতার কথা আগেই বলা হয়েছে। সিলমোহরগুলোর ইমেজ (ষাঁড়, হাতি, বাঘ, গণ্ডার, গাছ ইত্যাদি) আমাদের লোকায়ত জীবনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিকবৃন্দ এ বিষয়ে একমত যে, সিন্ধুসভ্যতার লোকেরা প্রচুর পরিমাণে অলংকার ব্যবহার করত। ইতিপূর্বে আলোচিত ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্যভঙ্গিতে থাকা নারী মূর্তিটিও তার সাক্ষ্য বহন করছে। পুঁতির মালা, হার, কানের দুল, মাদুলি, শাঁখের চুড়ি ইত্যাদি। তৎকালীন কারিগররা কার্নেলিয়ন (carnelian) পাথর পুড়িয়ে লাল করত। সেগুলো ঠাণ্ডা হলে পুঁতির আকৃতি দেয়া এবং ছিদ্র করা হতো। অলংকারের বেশিরভাগই লোকজ। ধাতুর তৈরি গহনা বেশি দেখা যায়নি।

অন্যান্য সভ্যতায় আমরা যুদ্ধ ও যোদ্ধার চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্য দেখেছি। কিন্তু দ্বন্দ্ব বা হিংসাকে ফুটিয়ে তুলেছে এমন কোনো শিল্পকর্ম আমরা এই সভ্যতায় দেখি না। বিলাসিতা এবং ঐশ্বর্যের ছাপও এই সভ্যতার শিল্পকলায় মেলে না। যুদ্ধজয়ের কথা নেই, নেই মিসরীয়দের মতো রাজা বা যোদ্ধাকে মহান করে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস।

সিন্ধু উপত্যকায় মানুষেরা অস্ত্রের চেয়ে যন্ত্রপাতি বেশি ব্যবহার করতো বলে মনে হয়। ছুরি, কুঠার, তীরধনুক, বর্শা, গুলতি ছাড়া তেমন কোনো অস্ত্রের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। আর পাওয়া গেছে কাস্তে, বাটালি, করাত, জুতা সেলাই করার সুই ইত্যাদি। ঢাল, তলোয়ার, বর্ম ইত্যাদি সামরিক অস্ত্রের নিদর্শন নেই। নেই কোনো অস্ত্রাগারের চিহ্নও। কারণ তারা এসবের প্রয়োজন অনুভব করেনি। তারা ছিল শান্তিপ্রিয়। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল বলে মনে হয়। এই উপত্যকাবাসীদের সঙ্গে মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, ইরান, দক্ষিণভারত, রাজস্থান, গুজরাট ও বালুচিস্তানের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। মেসোপটেমিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক থাকার নিদর্শন রয়েছে।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি নানা পথকে একই লক্ষ্যের অভিমুখীন করে দেয়া সিন্ধুসভ্যতার মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। উদার লোকসংস্কৃতির চর্চার ফলেই এই অসাধ্য কাজটি করতে পেরেছিল। তাই তাদের শিল্পকলাচর্চাও কর্তার ইচ্ছায় কর্মের বেড়াজাল থেকে বের হতে পেরেছে এবং সম্ভবত প্রথমবারের মতো শিল্পী আপন মনে শিল্পকর্ম তৈরির সুযোগ পেয়েছিল। অন্তত সিন্ধুসভ্যতার ছোট ছোট মাটির পুতুল, তৈজসপত্র ও খেলনাগুলো আমাদের এভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে।

ট্রাম্প ও মার্কিন মিডিয়া – সেয়ানে সেয়ান !

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

যে ট্রাম্প-কে মার্কিন মিডিয়া নির্বাচনের আগে তুলোধুনা করতে আদাজল খেয়ে নেমেছিলো, সেই মিডিয়া এখন ট্রাম-বন্দনায় আত্মনিয়োগ করেছে এবং নির্লজ্জ সর্মথন যোগাচ্ছে !

trump-best-by-timetrump-prefers-generals

ট্রাম্পপ্রশাসনে স্ত্রীনিপীড়কদের হিড়িক!

ধারাবাহিক যৌননিপীড়নের অভিযোগ আর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত যৌন মন্তব্য সত্ত্বেও নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার আগে নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, আমার থেকে আর কেউ নারীদের বেশি সম্মান করেন না তবে কথা আর কাজের মধ্যে ফারাক স্পষ্ট করে বৃহস্পতিবার তিনি নিজ প্রশাসনে আবারও শ্রমিকস্বার্থবিরোধী ব্যবসায়ী অ্যান্ড্রু পুজডারকে শ্রমমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছেন, যিনি নারী নিপীড়নে অভিযুক্ত। ট্রাম্প প্রশাসনে নিয়োগপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা এবং মুখ্য কৌশলপ্রণয়নকারী স্টিভ ব্যাননও একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। স্ত্রীনিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে স্বয়ং ট্রাম্পের বিরুদ্ধেও। সবমিলে ট্রাম্প প্রশাসনে যেন স্ত্রীনির্যাতকদের হিড়িক।

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্ত্রিসভায় বৃহস্পতিবার যুক্ত হয় আরেক বিতর্কিত নাম। শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি বৃদ্ধির বিরোধিতায় সরব ব্যবসায়ী অ্যান্ড্রু পুজডারকে শ্রমমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেন ট্রাম্প। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, সি কে ই রেস্টুরেন্টসএর প্রধান নির্বাহী পুজডার প্রায়ই দাবি করে থাকেন যে ন্যুনতম মজুরির হার বেশি হলে তা কাজের ক্ষেত্র কমাবে, চাকরি নষ্ট করবে। ৪০ লাখেরও বেশি মার্কিন শ্রমিকের ওভারটাইমএর টাকা বাড়ানোর লক্ষ্যে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আরোপ করা একটি নতুন নিয়মেরও সমালোচনা করেন তিনি। ফাস্টফুড কর্মীদের মজুরি দ্বিগুণ করে ন্যুনতম ১৫ ডলার নির্ধারণ করার জন্য দেশব্যাপী যে ক্যাম্পেইন চলছে তাও প্রত্যাখ্যান করেছেন অ্যান্ড্রু পুজডার। শনিবার হাফিংটন পোস্টের এক খবরে বলা হয়েছে, এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্ত্রীকে নিপীড়ন করার অভিযোগও রয়েছে।

হাফিংটন পোস্টের খবর অনুযায়ী, মার্কিন সাপ্তাহিক পত্রিকা রিভারফ্রন্ট টাইমসএ প্রথমবারের মতো পুজডারের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে নিপীড়নের অভিযোগ তোলা হয়। রিভারফ্রন্ট টাইমসএ প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ৮০ দশকে তিনি স্ত্রীকে নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। দুই দফায় পুলিশি হস্তক্ষেপ হয়েছিলো সেই ঘটনায়।

১৯৮৯ সালে পুজডারের সঙ্গে তার স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর বিষয়টি জনসম্মুখে আসে। ওই বছরের ২৬ জুলাই রিভারফ্রন্ট পত্রিকা এ নিয়ে প্রচ্ছদপ্রতিবেদন তৈরী করে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, স্ত্রী হেনিংয়ে বিবাহবিচ্ছেদের নথিতে পুজডারের বিরুদ্ধে শারীরিক নিপীড়নের অভিযোগ তোলেন। হেনিং অভিযোগ করেন, পুজডার তাকে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন এবং পুলিশকে ফোন করতে গেলে টেলিফোন ছিনিয়ে নিয়েছেন। পুজডার অবশ্য তার স্ত্রীর তোলা এইসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। তিনি তখন রিভারফ্রন্টকে বলেছিলেন, কোনও ধরনের শারীরিক নিপীড়নে আমি জড়িত নই।

পরে অবশ্য পুজডার একরকম স্বীকার করেন যে নিজেই নিজেকে আঘাত করতে যাওয়ায় স্ত্রীর কাধে আঘাত করে তাকে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। পুজডারের কাছে পাঠানো সাম্প্রতিক এক ইমেইলে নিপীড়নের অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন তার স্ত্রী। রিভারফ্রন্ট টাইমস এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করার কিছু সময়ের মধ্যে এক মুখপাত্রের মাধ্যমে সেই ইমেইলের অনুলিপি রিভারফ্রন্ট অফিসে পাঠান পুজডার।

৩০ নভেম্বর ২০১৬ তারিখ দিয়ে লেখা সেই ইমেইলে দেখা যায়, পুজডার এবং তার সাবেক স্ত্রী হেনিং (যিনি আবারও বিয়ে করেছেন) তাদের সন্তান নিয়ে একত্রে সময় কাটিয়েছেন এবং হেনিং পুজডারকে অভিযোগ থেকে নিস্কৃতি দিয়েছেন। তবে ৮৯ এ হেনিংএর আইনজীবী নিপীড়নের মেডিকেল প্রমাণ হাজিরে সক্ষম বলে জানিয়েছিলেন।

একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে ট্রাম্পের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা এবং মুখ্য কৌশলপ্রণয়নকারী স্টিভ ব্যাননের বিরুদ্ধে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো এক পুলিশ প্রতিবেদনের সূত্রে ব্যননের স্ত্রীকে নিপীড়নের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। সেই পুলিশ প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯৬ সালের বর্ষবরণের দিনে নাই্নওয়ানওয়ান নম্বরে (জরুরি আইনি সহায়তায় ব্যবহৃত মার্কিন টেলিফোন নম্বর) ফোন করে সহায়তা চান। পুলিশ ব্যাননের বাড়িতে হাজির হলে তার স্ত্রী ম্যারি লুইস অভিযোগ করেন, ব্যাননের কাছে বাজার করার টাকা চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে স্ত্রীর ঘাড় ও কব্জিতে আঘাত করেন তিনি। পুলিশকে ফোন করতে গেলে তা কেড়ে নেয় ছুঁড়ে ফেলে দেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসএর এক খবর অনুযায়ী, পুলিশ ম্যারি লুইসের শরীরে সেই ক্ষতচিহ্ন আবিষ্কার করে এবং ছবিও তুলে রাখে। ব্যাননের স্ত্রী লুইস অভিযোগ করেন, আদালতে গেলে তাকেই দোষী সাব্যস্ত করার ব্যবস্থা করবেন বলে হুমকি দিয়েছিলেন ব্যানন।

কেবল পুজডার কিংবা ব্যাননই নন, খোদ নবনির্বাচিত প্রেুসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধেও রয়েছে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ। প্রথম স্ত্রী ইভানা ট্রাম্পকে নিপীড়ন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ট্রাম্প পরে অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। চেক বংশোদ্ভূত ইভানা ও ট্রাম্প ১৯৭৭ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহবিচ্ছেদের কাগজে ইভানা ট্রাম্প তার স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছিলেন। পরে অবশ্য ইভানা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন।

১৯৯২ সালে ট্রাম্প ও ইভানার বিচ্ছেদের সময় এই জঘন্য অভিযোগ উঠে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে চ্যানেলএর একটি তথ্যচিত্রের বরাত দিয়ে সে সময় সান পত্রিকার খবরে বলা হয়, ধর্ষণের বিষয়টি প্রকাশ হয় ১৯৮৯ সালে। ট্রাম্পের আত্মজীবনীকার হ্যারি হার্ট চ্যানেল৪ কে এই চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন।

হারি হার্ট ট্রাম্পের আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন, এক রাতে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ঘরে এসে ইভানার চুল ধরে টানাটানি শুরু করেন। এদিনের পরই ইভানা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করে। ইভানা তার জবানবন্দিতে শপথ করে বলেছিলেন, ট্রাম্প আমাকে ধর্ষণ করেছে। হ্যারি আরও বলেন, এ ঘটনায় ইভানা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। সেখানে তিনি সারা রাত কাঁদেন। ইভানার বরাত দিয়ে হ্যারি বলেন, পরদিন সকালে ইভানা তার ঘরে এসে ট্রাম্পকে বসে থাকতে দেখেন। একটু পরই ট্রাম্প ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

ট্রাম্প এই দাবি অস্বীকার করেছেন বারবার। তিন সন্তানের মা ইভানা (৬৬) ১৯৯৩ সালে অবশ্য দাবি করেন, তিনি ব্যাপকার্থে ওই ঘটনাকে ধর্ষণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করেছেন, আক্ষরিক অর্থে নয়। আর গত বছর ট্রাম্পের আইনজীবী বলেছিলেন, ট্রাম্প কাউকে ধর্ষণ করেননি। কেউ তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করতে পারে না বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্পের আইনজীবী। তিনি আরও দাবি করেন, ইভানা আবেগপ্রবণ হয়ে এটাকে ধর্ষণ বলেছেন। তবে সাবেক সংবাদ উপস্থাপিকা সেলিনা স্কট দাবি করে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ডকুমেন্টরি তৈরির পর ইভানার পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকতেন। তার মতে, ইভানাকে মানসিকভাবে আঘাত করার জন্যই এমনটা করতেন। শুধু তাই নয়, ইভানাকে অপমান করে ১৩টি চিঠিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

ছবি-ব্লগঃ বিটিভি জাদুঘর

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

btv-museum-1btv-museum-2btv-museum-3btv-museum-4btv-museum-5btv-museum-6btv-museum-7btv-museum-8

টিপু সুলতানের রাজ্যে

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

touring-place-of-tipu-sultan-1

mysore-palace-1touring-place-of-tipu-sultan-2

mysore-palace-2mysore-palace-throne-of-king-wadiar

বেগম রোকেয়া’র “সুলতানা’র স্বপ্ন”র একটি অংশ

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

sultanas-dream-5