আর্কাইভ

Archive for ডিসেম্বর 3, 2016

মাকাল ফলেরও কিন্তু গুণ আছে!

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

makal-fruitমাকাল ফল। এই নামটির সঙ্গে হয়তো কমবেশি সবার পরিচয় আছে। কিন্তু মাকাল ফল দেখেনি এমন মানুষেরও সংখ্যাও একেবারে কম হবে না। বাংলা বাগধারায় মাকাল ফল একটি বিশেষ উপমা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। বাইরে সুন্দর, ভিতরে কিছুই নেই। যে মানুষগুলো দেখতে সুন্দর কিন্তু তাদেরকে দিয়ে কোনো কাজের কাজ হয় না, তাদেরকেই মাকাল ফলের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। তবে বিশেষ উপমা হিসেবে ব্যবহার হলেও এই ফলটি কিন্তু একেবারে অপ্রয়োজনীয় নয়। মাকাল ফল ও গাছের রয়েছে ঔষধি গুণ। তাছাড়া পাখিদের অন্যতম প্রিয় খাবার মাকাল ফল। পাকা মাকাল ফলের সৌন্দর্য যে কাউকে বিমোহিত করে।

মাকাল ফলের ইংরেজিতে নাম Colocynth, Cucumber-এর দ্বিপদী নাম। এর বৈজ্ঞানিক নাম Citrullus colocynthis। পৃথিবীতে এই পরিবারের ৪২টি প্রজাতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে রয়েছে ১২টি প্রজাতি। এ গাছের জন্মস্থান তুর্কি। তুর্কি থেকে এশিয়া মহাদেশ ও আফ্রিকা মহাদেশে এ গাছটির বিস্তার ঘটে। এটি একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। মাকাল ফলের গাছ লতানো আকৃতির হয়। জঙ্গল বা বাড়ির বড় বড় গাছকে অাঁকরে ধরে মাকাল গাছ বেড়ে ওঠে। একটি পরিপূর্ণ গাছ ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। চৈত্রবৈশাখ মাসে মাকাল গাছে সাদা ধবধবে ফুল ধরে। শ্রাবণভাদ্র মাসে ফল সম্পূর্ণ পরিপক্ব হয়। মাকাল ফল দেখতে গোলাকৃতির। কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ, কিছুদিন পর হলুদ ও ফলটি পাকার পড়ে লাল রং ধারণ করে। এক সময় গ্রাম বাংলার রাস্তার পাশে ঝোপঝাড়ে অনেক মাকাল গাছ দেখা যেত। কিন্তু এখন নগরায়ণের ফলে শিল্পকারখানার প্রসার ঘটায় গ্রামের রাস্তার পাশে ঝোপঝাড় কমে গেছে যে কারণে এই ফলটি আজ বিলুপ্ত হওয়ার পথে।

মাকাল ফল পাখিদের অন্যতম প্রিয় খাবার। তাছাড়া এটি একটি পরিবেশবান্ধব গাছ। এই ফল ও গাছের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ।

মাকাল গাছের শিকড় কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমের ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।

কফ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে, নাক ও কানের ক্ষত উপশমে মাকাল গাছ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

জন্ডিস, দেহে পানি জমা (শোথ রোগে), স্তনের প্রদাহ, প্রস্রাবের সমস্যা, বাত ব্যথা, পেট ফুলা এবং শিশুদের অ্যাজমা নিরাময়ে মাকাল গাছের ফলমূলকাণ্ড বিশেষ ভূমিকা আছে।

মাকাল ফলের বীজের তেল সাপের কামড়, বিছার কামড়, পেটের সমস্যা (আমাশয়, ডায়রিয়া), মৃগীরোগ এবং সাবান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যায়।

মাকাল ফলের বীজের তেল চুলের বৃদ্ধি ও চুল কালো করতে কার্যকর।

মাকাল ফলের বিচি ও অাঁশ শুকিয়ে গুঁড়ো করে পানিতে দ্রবীভূত করে ফসলে প্রয়োগ করলে পোকামাকড়, ইঁদুর ও রোগবালাই দমনে বিষ হিসেবে কাজ করে থাকে।

বাংলা উপন্যাসের প্রথম কারিগর

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

parichand-mitraকুতুবউদ্দিন আহমেদ : দেখতে দেখতে বাংলা উপন্যাসের বয়স পাঁচদশ বছর নয়, প্রায় দেড়শ’ বছর পার হয়েছে। সে বিবেচনায় বাংলা উপন্যাসের বয়স খুব যে বেশি হয়েছে তা বলা যায় না। মহাকালের বিচারে, সাহিত্যের উৎকর্ষমাত্রায় দেড়শ’ বছর এমন আর কী বয়স হতে পারে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, উৎকর্ষের বিচারে বাংলা উপন্যাস কতদূর এগিয়েছে? প্রকৃত প্রস্তাবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে গেলে বলা যায় যে বাংলা উপন্যাস যথেষ্ট পরিপুষ্ট হয়েছে। শুধু পরিপুষ্ট হয়েছে বললেই মনের ভাবটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয় না; বলতে হয় যথেষ্ট পরিমাণে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে। জোর দিয়েই বলা যায় যে বিশ্বের আর সব শক্তিশালী ভাষা থেকে বাংলা উপন্যাস কোনো দিক থেকেই পিছিয়ে নেই। এর ইতিহাসের ঝুঁড়িতে রয়েছে অসংখ্য পরিপুষ্ট, বলবান ও সার্থক উপন্যাস। এর কারণ সম্পর্কে কী বলা যায়? এর কারণ খুঁজতে গেলে নানাবিধ কারণ বের হয়ে আসতে পারে। তবে সম্ভবত প্রধান কারণটি হতে পারে যে বাঙালি আবেগপ্রবণ, বাঙালি ভাবুক, বাঙালি কল্পনাবিলাসী, বাঙালি বোহেমিয়ান, বাঙালি সহসা লাভক্ষতির হিসেব কষে না, বাঙালি কথার কাঙাল। এজাতিকে এধরনের অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত করা যেতে পারে। বাঙালির এসবকটি গুণই স্বভাবজাত বা বলা যায় জন্মগত। তাই বলা যায় বাঙালি জন্মই নেয় সাহিত্যিক সত্তা নিয়ে; বাকি থাকে কেবল বিকাশটুকু। তাই একটু বিকাশের পথ পেলেই বাঙালির অনেকেই বড়বড় সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন। এরই ধারাবাহিকতায় কিনা ঠিক বলা যায় না, বাঙালির মধ্য থেকে বের হয়ে এসেছেন বড়বড় ঔপন্যাসিক; তাদের কেউ কেউ আবার বলা যায়, বিশ্বমানের ঔপন্যাসিকে উন্নীত হয়েছেন।

কালে কালে পথ পথিক সৃষ্টি করে না, পথিকই পথের স্রষ্টা। কিন্তু পথের সৃষ্টিটা বড় কঠিনকর্ম। সকলেই পথ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় না, সকলের ভাগ্যে সে সৌভাগ্য জোটেও না। তবে পথ যারা সৃষ্টি করে, তারা সাধারণ কোনো মানুষ নয়। আটপৌরে কোনো মানুষ পথের স্রষ্টা হতে পারে না। নতুন পথের স্রষ্টা যাঁরা, তাঁদের নাম মহাকাল স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখে।

প্যারিচাঁদ মিত্র এমনই একজন যুগান্তকারী স্রষ্টা; যিনি বাংলা উপন্যাসের পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন; এবং তিনিই এ পথের প্রথম পথিক। মহাকাল তাঁকে স্বর্ণের জ্বলজ্বলে অক্ষরে লিখে রেখেছে। বলা বাহুল্য বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ [ ১৮৫৮ ] তাঁরই সৃষ্টি।

প্যারিচাঁদ নিজেই ছিলেন একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। পত্রিকাটি প্রকাশ করা হয়েছিল তৎকালীন অবহেলিত নারীসমাজের দুঃখসুখের কথা লিখতে; নাম ছিল ‘মাসিক পত্রিকা’ [১৮৫৪]। প্যারিচাঁদের এপত্রিকাটিতেই ধারাবাহিক প্রকাশ হতে থাকে আলালের ঘরের দুলাল। পত্রিকাটির প্রথমবর্ষের ৭ম সংখ্যা থেকে অর্থাৎ ১৮৫৫’র ফেব্রুয়ারি থেকে এটি প্রকাশ হতে থাকে; শেষ হয় ১৮৫৭’র জুনে অর্থাৎ তয় বর্ষের ১২শ সংখ্যায়। ১৮৫৮ সালে এটি সর্বজনীনভাবে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়।

প্যারিচাঁদ উপন্যাসটি লিখতে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন কয়েকটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে। তিনি ছিলেন তৎকালীন কলকাতার সমাজ হিতৈষী ব্যক্তিত্ব। নানান সামাজিক কর্মকাে তিনি বলা যায় অস্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সামাজিক নানান কর্মকাে জড়িয়েছিলেন বলেই সামাজিক সমস্যাগুলো তিনি প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিনেন। এবং সামাজিক এসমস্যাগুলোকে উপজীব্য করেই তিনি লিখেছেন আলালের ঘরের দুলাল। নিছক মনের আনন্দে সাহিত্যসৃষ্টি তার উদ্দেশ্য ছিল না। গ্রন্থটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি লিখে জানিয়েছেন

অন্যান্য পুস্তক অপেক্ষা উপন্যাসাদি পাঠ করিতে প্রায় সকল লোকেই মনে স্বভাবত অনুরাগ জন্মিয়া থাকে এবং যে স্থলে এতদ্দেশীয় অধিকাংশ লোক কোন পুস্তাকাদি পাঠ করিয়া সময়ক্ষেপণ করিতে রত নহে সে স্থলে উক্তপ্রকার গ্রন্থের অধিক আবশ্যক, এতদ্বিবেচনায় এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানি রচিত হইল।’

উপন্যাসটির ঢ়ৎবভধপবএ তিনি তৎকালীন প্রচলিত শিক্ষা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ওঃ পযরবভষু ঃৎবধঃং ড়ভ ঃযব ঢ়বৎহরপরড়ঁং বভভবপঃং ড়ভ ধষষড়রিহম পযরষফৎবহ ঃড় নব রসঢ়ৎড়ঢ়বৎষু নৎড়ঁমযঃ ঁঢ়, রিঃয ৎবসধৎশং ড়হ ঃযব বীরংঃরহং ংুংঃবস ড়ভ বফঁপধঃরড়হ, ড়হ ংবষভ ভড়ৎসধঃরড়হ ধহফ ৎবষরমরড়ঁং পঁষঃঁৎব—’

হিন্দুদের পারিবারিক জীবন ও তাদের প্রচলিত বাকরীতি সম্পর্কেও তিনি তুলে ধরে বলেছেন,
ঞযব ড়িৎশ যধং নববহ ৎিরঃঃবহ রহ ধ ংরসঢ়ষব ংঃুষব, ধহফ ঃড় ভড়ৎবরমহবৎং ফবংরৎড়ঁং ড়ভ ধপয়ঁরৎরহম ধহ রফরড়সধঃরপ শহড়ষিবফমব ড়ভ ঃযব ইবহমধষর ষধহমঁধমব ধহফ ধহ ধপয়ঁধরহঃধহপব রিঃয ঐরহফঁ ফড়সবংঃরপ ষরভব, রঃ রিষষ ঢ়বৎযধঢ়ং নব ভড়ঁহফ ঁংবভঁষ.’

উপন্যাসটির বিষয়বস্তু তৎকালীন সমাজের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি। কলকাতাস্থ বৈদ্যবাটির ধনাঢ্য ব্যক্তি বাবুরাম বাবুর পুত্র মতিলাল তার পিতামাতার অত্যধিক আদরে এবং উপযুক্ত শাসনের অভাবে কুসঙ্গে পড়ে কেমন অধঃপাতে গেল সেই বিষয়টিকেই লেখক উপজীব্য করেছেন। পরে অবশ্য তিনি দেখিয়েছেন নানা দুঃখভোগের মধ্যদিয়ে একদিকে যেমন মতিলালের বিবেক দংশন ঘটেছে, সেইসঙ্গে এক পুণ্যাত্মা ব্যক্তির সাহচর্যে সে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। যে মতিলাল তার মাকে চপেটাঘাত করায় মনঃদুঃখে তার জননী গৃহত্যাগিনী হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই জননীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, দেখা হয়েছে তার পতœীর সঙ্গে এমনকি তার ছোটভাই রামলালের সঙ্গেও। গ্রন্থটিতে যে আখ্যান উপস্থাপিত হয়েছে তাতে নতুনত্ব তেমন কিছু নেই, তাছাড়া আখ্যানের বৈচিত্র্যেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অভাব রয়েছে চিন্তার গভীরতারও। তবে নিপুণ কথার বুননে লেখক শেষপর্যন্ত উপন্যাসটিকে মনোগ্রাহী করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। সম্ভবত বাংলা ভাষার এই গ্রন্থখানিই সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষের দোড়গোড়া পর্যন্ত ব্যাপকভাবে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিল; এবং প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

উপন্যাসটির চরিত্রগুলোকে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একভাগে পড়ে আদর্শভ্রষ্ট, নীতিজ্ঞান বিবর্জিত, অমানবিক, স্বার্থপর, স্ত্রৈণ মানুষগুলো। অপরভাগে পড়ে উদারনীতিপরায়ণ, মানবিকগুণে মিত, ন্যায়নীতিবোধসম্পন্ন আদর্শপরায়ণ মানুষগুলো।
প্রথম পর্যায়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চরিত্রটি হচ্ছে ঠকচাচা। তাছাড়া মতিলাল, বাঞ্ছারাম, বক্রেশ্বর বাহুল্য, হলধর, গদাধর প্রমুখ চরিত্রগুলোও এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

দ্বিতীয় পর্যায়ের চরিত্রগুলো বরদা, রামপাল, বেণীবাবু প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।


প্যারিচাঁদ মিত্র ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুলাই কলকাতার এক সফল ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন নামকরা ব্যবসায়ী রামনারায়ণ মিত্র। শৈশবে প্যারিচাঁদ সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষা শেখেন। তার বয়স যখন ১৩, তখন তিনি তৎকালীন হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। হিন্দু কলেজের বিখ্যাত অধ্যাপক হেনরি ডিভিয়ার ডিরোজিওকে সরাসরি শিক্ষক হিসেবে পান। তবে তিনি ইয়ংবেঙ্গল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। ছাত্র হিসেবে তিনি মেধাবী ছিলেন কিন্তু নাস্তিক ছিলেন না। তিনি যোগসাধনা, ধ্যান ইত্যাদির পক্ষপাতি ছিলেন। অলৌকিকতায় ছিল তার গভীর বিশ্বাস। ভারতীয় আচারঐতিহ্যের প্রতি ছিল তার গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা। বলা যায় প্যারিচাঁদ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন তৈরিতে নিয়োজিত ছিলেন। হয়তো এ কারণেই তিনি বাংলা উপন্যাসের মডেল না থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি অনুসরণে বাংলা উপন্যাস লিখনে হাত দিয়েছিলেন।

১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন; ‘ঈধষপঁঃঃধ চঁনষরপ খরনৎধৎু’ এ সহকারী গ্রন্থগারিক হিসেবে যোগদান করেন। ১৮৪৭এ একই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান ও সেক্রেটারি পদে উন্নীত হন।

প্যারিচাঁদ কলকাতার যাবতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। জ্ঞানোর্পাজিকা সভার [১৯৩৮] তিনি যুগ্মসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বেঙ্গলব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির [১৮৪৩] সম্পাদক পদে নিয়োজিত ছিলেন; ব্রিটিশইন্ডিয়া এসোসিয়শেনের [১৮৫১] কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন, পশুক্লেশ নিবারণী সভার সম্পাদক পদে আসীন ছিলেন। বঙ্গদেশীয় সামাজিক বিজ্ঞানসভার যুগ্মসম্পাদক ছিলেন ১৮৬৭ থেকে ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো এবং বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবেও তাকে দেখা গেছে [১৮৬৮১৮৭০]। মূলত তারই চেষ্টায় ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে পশুক্লেশ নিবারণ আইন, আইনসভায় পাশ হয়। ‘থিওসফিকাল সোসাইটি’র বঙ্গীয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন ১৮৮২ সালে।

প্যারিচাঁদের বড় একটি পরিচয়, তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী, মানবহিতৈষী, মানবদরদি, নিষ্ঠাবান সংগঠক, দেশ, জাতি ও ঐতিহ্যের প্রকৃত একজন ধারক ও বাহক। তবু সবকিছু ছাপিয়ে প্যারিচাঁদ একজন লেখক; বাংলা উপন্যাসের স্থপতি; আলালের ঘরের দুলালের স্রষ্টা। আলালের ঘরের দুলালের পরেও তিনি পাঠকের চাহিদার কথা চিন্তা করে বেশ কিছু পুস্তক রচনায় হাত দিয়েছিলেন। এই পুস্তকগুলোও যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল। গ্রন্থগুলো : মদ খাওয়া বড় দায় জাত থাকার কি উপায় [১৮৫৯], রামারঞ্জিকা [১৮৬০], কৃষিপাঠ [১৮৬১], গীতাঙ্কুর [১৮৬১], যৎকিঞ্চিত [১৮৬৫], অভেদী [১৮৭১], ডেভিড হেয়ারের জীবনচরিত [১৮৭৮], এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্বাবস্থা [১৮৭৯], আধ্যাত্মিকা [১৮৮০], বামাতোষিণী [১৮৮১]

প্যারিচাঁদ মিত্র উনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণে অনেকটাই নেতৃস্থানীয়। তৎকালীন বিভিন্ন প্রগতিমূলক কাজের সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ট যোগ। তার চোখে পড়েছে এমন হিতৈষী কাজ তিনি ফেলে রেখে পাশ কাটিয়ে যাননি। সমাজ ও মানুষের প্রতি ছিল তার অসংবাদিত দায়বদ্ধতা। তিনি দেশকে ভালবেসেছেন, দেশের মানুষকে ভালবেসেছেন, দেশের সংস্কৃতিকে ভালবেসেছেন, দেশের ঐতিহ্যকে ভালবেসেছেন। নারী শিক্ষার প্রতি ছিল তার বিশেষ নজর। তার পিতামহ, জননী এবং জননীস্থানীয়রা বাংলা পড়তে জানতেন, লিখতে জানতেন; এমনকি তার স্ত্রীও বাংলায় ভালো পড়তে ও লিখতে পারতেন। ওই সময়ে নারীরা পড়বে, জানবে এমন কোনো লিখিত গ্রন্থ ছিল না। তাই তিনি স্ত্রী শিক্ষার উপযোগী করে গ্রন্থ লেখায় হাত দেন। বাল্যবিবাহের ঘোরবিরোধী ছিলেন তিনি। পরিবেশ সচেতনাও ছিল তার প্রচরকমের। মদ্যপানের ঘোরবিরোধী ছিলেন, মদ্যপানরোধে তিনি বেশকিছু লেখাতেও হাত দেন। এককথায় প্যারিচাঁদ ছিলেন অতি সামাজিক মানুষ, সমাজকে তিনি দেখেছেন একেবারেই নিজের করে; আর এখানেই তার জীবনের চরমতম সার্থকতা; লেখক হিসেবে যেমন সার্থক হয়েছেন ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এ।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ২ ডিসেম্বর ২০১৬

পরিবেশবান্ধব কারখানার শীর্ষ ১০-এ বাংলাদেশের ৭টি

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

plumy-fashions-3শুভংকর কর্মকার : পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা স্থাপনে বাংলাদেশে একধরনের নীরব বিপ্লবই ঘটে গেছে। সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে শীর্ষ ১০–এ স্থান পাওয়া বিশ্বের ২৫টি পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনার মধ্যে আছে বাংলাদেশের সাতটি। সব কটিই তৈরি পোশাক কারখানা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) ‘লিড’ নামে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সনদ দিয়ে থাকে। লিডের পূর্ণাঙ্গ রূপ লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর অনুরোধে সম্প্রতি বিশ্বের পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনার একটি তালিকা পাঠিয়েছে ইউএসজিবিসি। অবশ্য প্রতিদিনই নিত্য নতুন পরিবেশবান্ধব কারখানা তালিকায় যোগ হচ্ছে।

১১০ নম্বরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৭ পেয়ে বিশ্বের শীর্ষ পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) রেমি হোল্ডিংস নামের পোশাক কারখানা। ৯২ নম্বর পাওয়া দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে আছে নারায়ণগঞ্জের প্লামি ফ্যাশনস। কারখানাটিতে নিট পোশাক উৎপাদন করা হয়।

৯০ নম্বর পেয়ে যৌথভাবে তৃতীয় অবস্থানে আছে আয়ারল্যান্ডের একটি শিল্পকারখানা ও বাংলাদেশের ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও। আয়ারল্যান্ডের কারখানাটির নাম এবং সেটি কোথায় তা জানা যায়নি। পাবনায় অ্যাবা গ্রুপের ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিওতে জিনসসহ বিভিন্ন ধরনের প্যান্ট তৈরি হয়। ৮৬ নম্বর পেয়ে চতুর্থ অবস্থানে আছে ইতালির বত্তেগা ভেনতা আর্টিলার ও যুক্তরাষ্ট্রের মেথড প্রোডাক্টস পিবিসি। ইতালির কারখানাটিতে চামড়াজাতীয় পণ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের কারখানাটিতে সাবান তৈরি হয়।

পঞ্চম অবস্থানটি বাংলাদেশের পোশাক কারখানার। ময়মনসিংহের ‘এসকিউ সেলসিয়াস ২’ পেয়েছে ৮৫ নম্বর। ৮৪ নম্বর নিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে ভিয়েতনামের এফজিএলতান পু এক্সপানশন। ৮৩ নম্বর পেয়ে সপ্তম অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটেল। ৮২ নম্বর পেয়ে অষ্টম অবস্থানে আছে চীনের ফক্সকন গুজিহুউ। ৮১ নম্বর নিয়ে বাংলাদেশ, চীন, তাইওয়ান ও মেক্সিকোর ১০টি স্থাপনা সম্মিলিতভাবে নবম স্থানে আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের তিনটি পোশাক কারখানা—জেনেসিস ওয়াশিং, এসকিউ কোলব্লেনস ও এসকিউ বিরিকিনা। আর ৮০ নম্বর নিয়ে দশম অবস্থানে সম্মিলিতভাবে আছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও চেক রিপাবলিকের তিনটি শিল্প স্থাপনা।

ইউএসজিবিসির লিড সনদ পেতে নয়টি শর্ত পরিপালন করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, এমন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করতে হয়, যাতে কার্বন নিঃসরণ কম হয়। এ জন্য পুনরায় উৎপাদনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ইট, সিমেন্ট ও ইস্পাত লাগে। এ ছাড়া কারখানার ৫০০ বর্গমিটারের মধ্যে শ্রমিকদের বাসস্থান, স্কুল, বাজার, বাস বা ট্যাম্পোস্ট্যান্ড থাকতে হয়। কারণ দূরত্ব বেশি হলে শ্রমিকদের কারখানায় আসতে গাড়িতে চড়তে হবে। এতে করে জ্বালানি খরচের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ বেশি হয়। এর বাইরে বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সূর্যের আলো, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বাতি ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি পানিসাশ্রয়ী কল লাগে। এ ছাড়া কারখানাসহ অন্য ভবন নির্মাণের নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। কারখানার ভেতরের কর্মপরিবেশ উন্নত এবং অবশ্যই শ্রমবান্ধব হতে হয়। উৎপাদনের জন্য সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হয়।

ইউএসজিবিসির নয়টি শর্ত পরিপালনে মোট ১১০ পয়েন্ট আছে। এর মধ্যে ৮০ পয়েন্টের ওপরে হলে ‘লিড প্লাটিনাম’, ৬০৭৯ পয়েন্টে ‘লিড গোল্ড’, ৫০৫৯ পয়েন্টে ‘লিড সিলভার’ এবং ৪০৪৯ পয়েন্ট হলে ‘লিড সার্টিফিকেট’ সনদ মেলে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩২টি কারখানা ও স্থাপনা পরিবেশবান্ধব সনদ অর্জন করেছে। পরিবেশবান্ধব কারখানার স্থাপনার দিকে এগোচ্ছেন আরও অনেক শিল্প উদ্যোক্তা। এ ক্ষেত্রে অবশ্য পোশাকশিল্পের মালিকেরাই এগিয়ে আছেন।

সংস্থাটির অধীনে কলকারখানার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন, স্কুল, হাসপাতাল, বাড়ি, বিক্রয়কেন্দ্র, প্রার্থনাকেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপনা পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এ জন্য একটি প্রকল্পকে ইউএসজিবিসির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ থেকে উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ মান রক্ষা করতে হয়। ভবন নির্মাণ শেষ হলে কিংবা পুরোনো ভবন সংস্কার করেও আবেদন করা যায়।

পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনার শীর্ষে থাকা রেমি হোল্ডিংসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরান আলী প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে, তবে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। কারণ সাধারণ কারখানার চেয়ে এখানে খরচ একটু বেশি। তবে ক্রেতারা এসব কারখানায় পোশাক তৈরির জন্য বেশি পয়সা দিচ্ছে না। তাই পরিবেশবান্ধব কারখানার ব্র্যান্ডিংটা আরেকটু জোরেশোরে করা দরকার।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনের কারণে দেশের ব্র্যান্ডিং হবে। কারণ আমাদের দেশের ব্র্যান্ডিংটা এখনো অতটা উজ্জ্বল নয়। একই সঙ্গে অবশ্যই আমাদের পোশাক খাতের ব্র্যান্ডিংটাও হবে। দেশে নতুন নতুন পরিবেশবান্ধব কারখানা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে পোশাকমালিকদের মধ্যে একধরনের সুস্থ প্রতিযোগিতা আছে।’

বিজিএমইএর এই সহসভাপতি বলেন, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ মূল চ্যালেঞ্জ। কারণ সঠিকভাবে দেখভাল করতে না পারলে হয়তো সনদ বাতিল হয়ে যাবে। সে জন্য বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিককে সচেতন হতে হবে। শোনা যাচ্ছে, ইউএসজিবিসি বাংলাদেশে তাদের একটি কার্যালয় করবে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেবে।

top-10-factories

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ৩ ডিসেম্বর ২০১৬

পাঠক মন্তব্যঃ

Sk N Tariq

২০১৬১২০৩ ০৯:৪১

ইনিশিয়াল ইনভেস্টমেন্ট বেশী হলেও , এসব ফ্যাক্টরি গুলি ৩৫ % পর্যন্ত এনার্জি ইফিশিয়েন্ট ও ১০০ % পর্যন্ত ওয়াটার রিসাইকেল হওয়াতে ইনভেস্টমেন্ট খুব তাড়াতাড়ি উঠে আসে, কেননা একটা ফ্যাক্টরির অন্যতম খরচ হল এর ইউটিলিটি । খরচ কম হলে এর প্রডাক্ট খরচও কমে আসবে । আর উপযুক্ত কর্ম পরিবেশ হওয়াতে প্রোডাক্টিভিটি অনেক বেঁড়ে যায় । এছাড়াও এখানে সার্বিক নিরাপত্তা , বা সেইফটি সিস্টেম খুবই উন্নত মানের হওয়াতে দুর্ঘটনার রিস্ক ফ্যাক্টর কমে আসে । শুধু পোশাক কারখানা নয় , সকল ফ্যাক্টরি , বাণিজ্যিক ভবন , হাসপাতাল , হোটেল এই রকমের LEED সার্টিফিকেশন অনুসরন করে তার সুবিধাগুলি নিতে পারে ।

আমাদের সাম্প্রদায়িক চেতনার কিছু নমুনা !

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

কবে হিন্দু কাঁদবে মুসলমানের জন্য, মুসলমান হিন্দুর জন্য!

communality-artরোকেয়া লিটা : ফেসবুক বর্তমানে সবচে বড় কসমোপলিটন নগরী। বিশ্বের কোথাও কিছু ঘটে গেলে সঙ্গেসঙ্গে এই নগরীর বাসিন্দারা প্রতিক্রিয়া জানান। তবে ফেসবুকে সবাই কিন্তু সক্রিয় নন। কেউ কেউ শুধু শেয়ার করেন, কেউ কেউ ছবি পোস্ট করেন। আবার অনেকেই কোনও কিছু পোস্ট করেন না, শুধু অন্যদের ছবি বা লেখায় লাইক অথবা কমেন্ট করে বেড়ান। ফেসবুকে নিয়মিত লেখালেখি করেন, এমন মানুষের সংখ্যা আসলে খুব বেশি নয়, বেশিভাগই অন্যের লেখায় সক্রিয়তা দেখান। আত্মীয়, বন্ধু মিলিয়ে এমন অনেকেই আছেন আমার ফেসবুকের বন্ধু তালিকায়।

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার যে আত্মীয়াটি কখনও ফেসবুকে কিছু লেখে না, সে হঠাৎ বিশাল একটি লেখা পোস্ট করেছে ফেসবুকে। তার লেখার বিষয় হলো—মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা। মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে ভীষণ রকমের ঘৃণার প্রকাশ ঘটেছে তার লেখায়। গত কয়েকদিনে এমন অনেককেই দেখলাম, যারা কখনও কিছু লেখেন না কিন্তু মিয়ানমার প্রসঙ্গে কিছু না লিখে বা পোস্ট করে বসে থাকতে পারেননি। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের বিষয়টি তাদের প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। অথচ এই মানুষগুলোই আবার বাংলাদেশে সাঁওতালদের ওপর, হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হওয়ার পর চুপ করে বসে ছিল। তার মানে হিন্দু ও সাঁওতালদের ওপর নির্যাতন তাদের মনে কোনও দাগ কাটেনি একটুও!

আরও অনেক ভিন্ন চিত্র দেখলাম। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন হলে, যারা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার থাকেন, তারা আবার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিয়ে একেবারেই চুপ। এমনকি আমার ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় যেসব অমুসলিম বন্ধু আছেন, তাদের মধ্যে হাতে গোনা দুএকজনকে দেখেছি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে সরব হতে। তাদের বেশিভাগই রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে নীরব। তার মানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের মনে দাগ কাটছে না! এরাই আবার যখন হিন্দু নির্যাতন, সাঁওতাল নির্যাতন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মানবতার বুলি আওড়াবেন। কেমন বেমানান লাগে না বিষয়টা?

আমাদের বন্ধনগুলো ভীষণ সাম্প্রদায়িক। আমরা সবাই এখনও নিজেদের সমানভাবে একই দেশের নাগরিক ভাবতে পারি না, কারণ আমরা একই ধর্মের অনুসারী হয়ে বসে আছি। আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি, অথচ আমরা দিব্যি ধার্মিক হয়ে বসে আছি। তাহলে কী দাঁড়ালো? হিন্দুর ওপর নির্যাতন হলে শুধু হিন্দুরাই প্রতিবাদ করবে আর মুসলমানের ওপর নির্যাতন হলে শুধু মুসলমানরাই প্রতিবাদ করবে। এর ফল কিন্তু ভয়াবহ। নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন আর রোহিঙ্গাদের গণহত্যাই হলো, আমাদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ভয়াবহ চিত্র। আমরা অনেকেই হয়তো সশরীরে গিয়ে নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন লাগাইনি, কিন্তু আমাদের নীরবতা, প্রতিবাদ না করার প্রবণতাও কিন্তু হামলাকারীদের শামিল।

আমি জানি, আমার সঙ্গে তর্ক করার জন্য লোকের অভাব হবে না। অনেকেই বলবেন, নাসিরনগরের ঘটনা আর রোহিঙ্গাদের ঘটনা এক নয়। অনেকে বলবেন, রসরাজ নামের ওই যুবক মক্কা শরীফের ছবি বিকৃত করে ফেসবুকে ছাড়লো কেন? জ্বী জনাব, আপনাকেই বলছি, রসরাজের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তাতে কিন্তু প্রমাণিত হয়নি যে, ওই কাজটি রসরাজই করেছে। হতে পারে, রসরাজের ফেসবুকে আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অন্য কেউ এই কাজটি করেছে। আর ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়া তো খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়, হরহামেশাই মানুষের ফেসবুক আইডি হ্যাক হচ্ছে। এছাড়া রসরাজ যদি কোনও অপরাধ করেই থাকে, তাকে তো পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, তার শাস্তি কেন রসরাজের পরিবার বা পাড়াপড়শীকে ভোগ করতে হবে?

বাংলাদেশে মুসলমান বেশি, তাই অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে এই অমানবিক নির্যাতন। পত্রিকাগুলো বলছে, ওই ঘটনার পরপরই নাসিরনগরের হিন্দু পরিবারগুলো বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতি সাভাবিক হলে, আবারও তারা ফিরে আসে। কিন্তু রসরাজের পরিবার নাকি এখনও ফিরে আসেনি। আমাদের মধ্যেই যারা রোহিঙ্গাদের জন্য কাঁদেন, তারা কি নিজেদের দেশেই হিন্দু আর সাঁওতালদের কথা ভাবছেন?

ওদিকে দেখুন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধেও কিন্তু অভিযোগ আছে। অক্টোবরে মিয়ানমারের মংডুতে যখন বিজিপির ছাউনীতে দুষ্কৃতকারীদের হামলায় ১৪ জন নিহত হলেন, তখন কিন্তু এই হামলার দায় গিয়ে পড়েছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)-এর ওপর। আর তারপরই কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, গণহত্যা বাড়তে থাকে। অর্থাৎ সেদেশেও একই চর্চা চলছে। শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তারা মুসলমানদের জাতিগতভাবে নিধন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু মিয়ানমারে বৌদ্ধদের সংখ্যা বেশি, তাই তারাও তাদের সংখ্যাগুরুত্বের মহড়া দিয়ে যাচ্ছে।
এই তো হচ্ছে দেশে দেশে। মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবী থেকে জাতিগত বৈচিত্র্যের ব্যাপারটা কি উঠেই যাচ্ছে? এভাবে চলতে থাকলে তো, সংখ্যাগুরু মুসলমানের দেশে শুধু মুসলমানরাই থাকবে, সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দেশে শুধু হিন্দুই থাকবে আর সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের দেশে শুধু বৌদ্ধরাই থাকবে। আমরা কি আর কখনও মানুষ হয়ে উঠব না? নাকি যুগের পর যুগ ধরে বয়ে চলা ধর্মীয় হানাহানি টেনে নিয়েই চলব?

মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি এমন একটা সকাল আসতো, ঘুম থেকে উঠেই দেখতে পেতাম, হিন্দু ও সাঁওতালদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে আন্দোলন করছে বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো। আর ওদিকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন করছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ! পৃথিবীটা বদলে যেতে সময় লাগতো না একটুও। পরিবর্তনটা শুরু হোক না বাংলাদেশ থেকেই, ক্ষতি কী? যার যার ধর্ম তার তার সঙ্গেই তো থাকছে।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ৩ ডিসেম্বর ২০১৬

কবি সিকান্দার আবু জাফর

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

sikandar-abu-zafor. গুলশান আরা : ভাষা, ছন্দ, শব্দ দিয়ে কবিরা কবিতা লেখেন। নির্বাচিত শব্দ ব্যবহার করেন পাঠকের কল্পনা শক্তিকে উসকে দেয়ার জন্য। শব্দ কবির চেতনার বাহন হিসেবে কাজ করে। কবিতার ভাবটি আবেগ হয়ে পাঠকের মনে সাড়া জাগায়। সমাজ এবং সংসারের প্রত্যক্ষ সংঘাতের অভিজ্ঞতাকেও কবি ব্যক্ত করেন তার কবিতায়তার কাব্যে শব্দের আবেগময় প্রকাশে।
তেমনি একজন শব্দসচেতন, সমাজসচেতন সংগ্রামী কবি সিকান্দার আবু জাফর। তিনি তার কাব্যের মূল সুর খুঁজেছেন সমাজ সংঘাতের দুঃখ বেদনার মধ্যে। বক্তব্যে স্পষ্টভাষী এবং মেজাজে বলিষ্ঠ হওয়ার পক্ষপাতী সিকান্দার আবু জাফর। এ ধাঁচটি নজরুলের কাব্যাদর্শ থেকে এসেছে। চল্লিশ দশকে যাদের কবি জীবনের সূত্রপাত তারা জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে নজরুলের প্রভাব বলয় ছিন্ন করতে পারেননি। তবুও তার বক্তব্যকে অনায়াস নির্ভাবনায় প্রকাশ করতে সচেষ্ট সিকান্দার আবু জাফর। তার সময়ের বিকার ও অন্যায়কে একটি পরিহাস তিক্ততার মধ্যে প্রকাশ করেছেন কবিতায়।

সিকান্দার আবু জাফরের কাব্যগ্রন্থ ‘বৈরী বৃষ্টি’তে প্রথম কবিতার শেষ স্তবকের লাইনগুলো এরকম

ধ্বংসের রাহু পেয়েছে রাজ্যতার।
বিশ্ব মানবতার
দিকদিগন্তে একি ক্ষমাহীন ব্যাভিচার?
স্তব্ধ কৌতূহলে
অতীত যুগের পাতা ছিঁড়ে একে একে
ভাসাই তিক্ত বিস্মরণের জলে!’

এমন বিষাত্মক স্বগতোক্তি বাংলা কাব্যে নূতন নয়। কবি হৃদয়ের ক্ষোভ স্পন্দন বাঙালি পাঠক বহু শুনেছেন। তবে সিকান্দার আবু জাফরের এই উক্তি যেন কিছুটা অভিনব ঠেকলো কারণ এই সত্যের ভাষ্যকার হওয়ার যোগ্যতা তার স্নায়ুর অবিমিশ্র উপাদান। জীবনকে আলোড়িত করেই এই সত্য প্রকাশিত। তাই ‘দিক দিগন্তে’ শুধুমাত্র ‘ব্যভিচার’ দেখেই সময় কাটাতে পারেননি কবি বিক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চারণ করলেন দুটো বিশেষণ ‘ক্ষমাহীন’ ও ‘অকণ্ঠ’। এ উচ্চারণ শুধু মৌখিক আস্ফালন নয়, কবির চেতনা স্পন্দিত বিক্ষোভ এতেও সন্তুষ্ট না থাকতে পেরে নিজের অবিভাজ্য ব্যক্তি সক্রিয়তায় অবশেষে অতীতের পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে বিস্মরণের জলে ভাসিয়ে স্বস্তি পেলেন যেন। এই আত্মগত চেতনা ও সেই সঙ্গে বলিষ্ঠ বক্তব্যের যে সুরস্বতন্ত্র বিশেষত্ব সিকান্দার আবু জাফরের মধ্যে বিদ্যমান তাই তাকে নজরুল সংলগ্নতা থেকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করেছে। অবশ্য এই আত্মগত সুর যা শিল্পমন্ডিত করার সুযোগ তার হাতে এসেছিল, তা তিনি ক্ষেত্রবিশেষে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করলেও সব ক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। দেখা গেছে, কখনও তিনি উচ্চকণ্ঠ, উপাদান ব্যবহারে নির্বিচার, কাব্যের শিল্পসত্তা সম্পর্কে একেবারে বেপরোয়া।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখবে
চাউল এসেছে ঘরে
তেল নুন চিনি অনেক এসেছে আরো
দুধ মাছ আর খাসির মাংশ
এনেছি জোগাড় করে।
সারাটা সকাল তোমার জননী
রান্নায় মশগুল।
(
এখন তুমি ঘুমাও/সমকাল)

যদিও সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায় ছন্দ ও শব্দের ব্যবহারে একটা উজ্জ্বল সাবলীলতা আছে, তা সত্ত্বেও অনেক সময়েই তিনি গদ্য ও পদ্য উপাদানের পার্থক্য সম্পর্কে বেশ অসচেতন এবং অসাবধান।

কবিরা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাদের ধ্যানধারণা ব্যক্ত করবেন এটাই প্রত্যাশা। কবি কী ধরনের কথা বলছেন, কীভাবে বলছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ এবং বিবেচনার বিষয়। বাচন ভঙ্গিকে চিহ্নিত করা হয় আঙ্গিক হিসেবে। কবিতায় শিল্প গুণের প্রকাশ পায় ভাষায়, ইঙ্গিতে আর শব্দ ব্যঞ্জনায়। কবিরা নিরাকার ভাবকে সকার করেন উপযুক্ত শব্দ চয়নে। কিন্তু সিকান্দার আবু জাফর বার বার স্খলিত হয়েছেন কবিতার এই শিল্প সৌন্দর্য থেকে। যাপিত জীবন ধারণা পাঠকের মনে সঞ্চারিত করার অভিপ্রায় তাকে উত্তেজিতউদ্বেলিত করেছে ঠিকই, কিন্তু সুস্থিরতার অভাব বোধে কবিতা হয়েছে গদ্যধর্মী। এই একই কারণে সিকান্দার আবু জাফরের ছন্দও প্রায়ই অত্যন্ত গদ্যধর্মী। ‘ঈদের চিঠি’তে কবি লিখেছেন

বাপজান
ঈদের সালাম নিও। দোয়া কোরো আগামী বছর
কাটিয়ে উঠতে পারি যেন এই তিক্ত বছরের
সমস্ত ব্যর্থতা।
অন্তত: ঈদের দিনে সাদাসিদে লুঙ্গি একখানি
একটি পাঞ্জাবি আর সাদা গোলটুপি
তোমাকে পাঠাতে যেন পারি;
আর দিতে পারি পাঁচটি নগদ টাকা
এইটুকু পেলে
দশজন পড়শীর মাঝে
পুত্রের কৃতিত্ব ভেবে দু’টি অন্ধ চোখে
হয়তো আসবে ফিরে দৃষ্টির সান্তনা।’

কাব্যের কাব্যগুণ, শিল্পের শিল্প সৌন্দর্য সাহিত্যের মানদন্ডে অপরিহার্য বিবেচনা। শিল্পের বিচার এই ত্রুটিকে ক্ষমা করে না।
কবিতা একাধারে মনকে বিস্তৃত করে, কানকে সচেতন করে শব্দের ধ্বনি ব্যঞ্জনার পরিমন্ডলে। তাই কবিতা মামুলী ব্যাপার না হয়েহয়ে ওঠে শ্রাবন্তীর কারুকাজের মতো কঠিন আর অনিন্দ্য সৌন্দর্যের বাণীরূপ। প্রেম যখন ব্যক্তি থেকে নির্বিশেষে পরিব্যাপ্ত হয়, তখন শিল্প সুষমা ফুটে ওঠে। এক্ষেত্রে বলিষ্ঠ মেজাজ অথবা স্পষ্ট বক্তব্যের প্রয়োজন খুব জরুরি নয়। অথচ সিকান্দার আবু জাফরের প্রেমের কবিতাতেও এ ধাঁচটিও লক্ষ্যণীয়। যেমন,

তাকাতেই দেখি নাগালের গন্ডিতে
ইঙ্গিত আঁকা অমৃত কুম্ভ
তুমিই প্রথমে মেলেছো আমন্ত্রণ
মুহূর্তে তুমি প্রিয়া,
এবং তোমাকে আত্মদানের তখুনি উদ্দামতা।’

সুখের কথা এই যে, সিকান্দার আবু জাফর কোনো নির্দিষ্ট গন্ডিতে বা ছকে বাঁধা পড়ে থাকেননি। চল্লিশের দশক থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেন। সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত রেখে বিশেষ করে সময়ের প্রবাহমানতার সঙ্গে শুধু বিষয়ে নয়, আঙ্গিকের পরিবর্তনেও যোগ স্থাপনে সচেষ্ট। এখানেই তিনি সজীব কবি। তার কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা ১৩৭২’ স্পষ্টতই সিকান্দার আবু জাফরের পালা বদলের উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

কবিতায় তার এগিয়ে চলার কথাই বলে। এর পরেও তার লেখা নূতন কবিতার প্রায় প্রত্যেকটিতে যেন খোলস খুলে খুলে যুগের কাছাকাছি ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছেন। বক্তব্য, ভাষা ও শিল্প চেতনার প্রতি স্তরেই তার এই পরিপক্বতা লক্ষণীয় হয়ে ধরা পড়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সিকান্দার আবু জাফর হয়ে উঠেছেন পরিণততর কবি। কবিতায় যুগ যন্ত্রণার প্রতিফলন তাকে ঋদ্ধ করেছে/কাজী নজরুল ইসলামের মতো সিকান্দার আবু জাফরও সঙ্গীত রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। বহু জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উদ্দীপনা সঙ্গীত ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ গানটিও তার লেখা। এটি তিনি লিখেছিলেন ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময়।

আমাদের চোখে চোখে লেলিহান অগ্নি
সকল বিরোধবিধ্বংসী।
এই কালো রাত্রির সুকঠিন অর্গল
কোন দিন আমরা যে ভাঙবোই
মুক্ত প্রাণের সাড়া অনবোই
আমাদের শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে
নূতন সূর্যশিখা জ্বলবেই।
চলবেই চলবেই
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।’

একজন বিপ্লবকামী কবি হিসেবে অসংখ্য গণসংগীত লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন কবি। প্রথমদিকে কলকাতায় ‘দৈনিক নবযুগে’ সাংবাদিকতা শুরু। দেশ বিভাগের পর রেডিও পাকিস্তানে চাকরি গ্রহণ। ১৯৫৩এ দৈনিক ইত্তেফাকের সহযোগী সম্পাদক, ১৯৫৪এ দৈনিক মিল্লাতের প্রধান সম্পাদক এবং ১৯৫৭১৯৭০ পর্যন্ত মাসিক ‘সমকাল’ (সেপ্টেম্বর১৯৫৭) পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। পঞ্চাশের দশকে ‘দৈনিক মিল্লাত’এর সম্পাদক ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর। শোনা যায়, ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়ার মালিকানাধীন ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকার মুদ্রণ প্রমাদ তখন ছিল এক প্রকার হাস্যরসের উৎস। সম্পাদক সাহেব এই দুর্নাম ঘোচাতে ছিলেন স্থিরচিত্ত। মুদ্রণ প্রমাদকারীকে চিহ্নিত করে তার ওই দিনের বেতন মাসিক বেতন থেকে কেটে হলেও মুদ্রণ প্রমাদ শুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সফল সম্পাদক কোনো গাফিলতির প্রশ্রয় দিতে পারেন নাএটাই সত্য। সিকান্দার আবু জাফর পত্রিকা সম্পাদনায় সাফল্যের পরিচয় দেন।

রুবাইয়াৎওমর খৈয়াম’ অনুবাদ প্রসঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলী মন্তব্য করেন ‘কাজীর অনুবাদই (কাজী নজরুল ইসলাম) সকল অনুবাদের কাজী। তা সত্ত্বেও সিকান্দার আবু জাফরের ওমর খৈয়াম অনুবাদ যথেষ্ট কৃতিত্বের দাবিদার। নাট্যকার হিসেবেও তিনি বাংলা সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। তার লেখা ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদৌল্লা’র একটি বিশেষ বৈশিষ্ট হলো মীর জাফর চরিত্রে অতি নবতর দৃষ্টিভঙ্গির আরোপ। সংলাপ ঐতিহাসিক আবাহ সৃষ্টিতে সক্ষম। ‘মহাকবি আলাওল’ তার একটি জীবনীভিত্তিক নাটক। এ নাটকে তিনি ঐতিহাসিকতার চেয়ে কল্পনার উপরে অধিক নির্ভরশীল। ১৯৬৬তে নাটকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

আধুনিক কবিতা মানুষের অনুভূতিতে বিপ্লব এনেছে, গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মূল্য নিরূপনের পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে, পৃথিবীকে নতুন বিশ্বাস ও বিস্ময়ে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের অস্তিত্বের অতলে অনবরত কত যে অনুভূতি আমাদের দেহে ও মনে উত্তাপ এনেছে, তাকে বোধের আয়ত্তে আনার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন আধুনিক কালের কবিগণ। তাই তাদের সুরে ও শব্দে বিচিত্র কৌশল, আশ্চর্য দুরূহতা এবং অপরিচয়ের তাৎপর্য। তারা তাদের কাব্যে যে নূতন আবহ এনেছেন, নতুন স্বাদ ও সংশয়তাতে কল্লোলমুখর হয়েছে কাব্যাঙ্গন।

সিকান্দার আবু জাফরও এনেছেন তার কবিতায় আধুনিকতার পরশ। সিকান্দার আবু জাফর শুধু কবি হিসেবেই খ্যাত নন, সাহিত্য মাসিক ‘সমকাল’এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও তার অবদান অবিস্মরণীয়। কারণ বাংলাদেশে আধুনিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সমকালের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পরিচয় থাকলেও কবি হিসেবেই তিনি অধিকতর উজ্জ্বল। খুলনার তেঁতুলিয়া গ্রামে ১৯১৯এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি, মৃত্যুবরণ করেন ঢাকায় ৫১৯৭৫এ।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ২ ডিসেম্বর ২০১৬

সীমান্ত যখন পরিণত হয় মিলনমেলায় !

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

ranishoinkal-border-meeting