প্রথম পাতা > ইসলাম, ধর্মীয়, নারী, বাংলাদেশ, সমাজ > মেয়েদের বিয়ের নূন্যতম বয়স ১৮ সম্পর্কিত কিছু মতামত

মেয়েদের বিয়ের নূন্যতম বয়স ১৮ সম্পর্কিত কিছু মতামত

child-marriage-artআমাদের দেশের ইসলামপন্থীরা কোরআনহাদীস পড়ে বুঝে নিয়েছে যে, সরকার বা ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা বিয়ের বয়স নির্ধারণ করে দেয়া আল্লাহর আদেশ ও রাসুলের () সুন্নাহর লংঘন ! স্থানকালপাত্র ভেদে যে শরীয়াহর অনেক হালাল জিনিস হারাম আর হারাম জিনিস হালাল হয়ে যায় তা তারা এক্ষেত্রে আমলে নারাজ । এসব অনেক কিছু নিয়ে সমাজে আছে নানা রকম প্রতারণামূলক কর্মকান্ড । এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হচ্ছে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার নিয়ে । সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ইসলামী চিন্তাবিদ, ইমাম, মোল্লামৌলভী, হাফেজে কোরআন কে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে, তারা শরীয়াহর শর্ত পালন করে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার করে চলেছেন !

শিশুদের জন্য লোভের জিভ

তসলিমা নাসরিন : বিয়ের জন্য আগের মতোই মেয়েদের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর বয়স হওয়ার শর্ত রেখে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’ করার প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ আদালতের নির্দেশনা নিয়ে এবং বাবামায়ের সমর্থনে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরও বিয়ের সুযোগ দিচ্ছে এই আইন। ‘অপ্রাপ্তবয়স্কের’ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “বিবাহের জন্য ২১ বছর পূর্ণ করেননি এমন কোনো ছেলে এবং ১৮ বছর পূর্ণ করেননি এমন কোনো মেয়ে”।

এই আইনটি খুব সভ্য আইন হতে পারতো যদি ওই বিশেষ প্রেক্ষাপটের ব্যাপারটি না থাকতো। বিশেষ প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ বলেন, “অবিবাহিত মাতা, কিন্তু তার বাচ্চা আছেএ রকম কেইস যদি হয়, এসব ক্ষেত্রে তাকে প্রোটেকশন দেওয়ার জন্য এই বিধান করা হয়েছে। কত ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, এজন্য বিয়েগুলো হয়ে যায়। ওটাকে লিগালাইজ করার জন্য এই প্রক্রিয়া। আমাদের দেশে তো ১০১১ বছরেও পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। এ সমস্যাগুলো আছে তো, এটার জন্য এই ব্যবস্থা।”

মন্ত্রিপরিষদ বলতে চাইছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক যে মেয়েরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে, তাদের বিয়ে, এই আইনটি থাকলে অবৈধ বলে গণ্য হবে না। এই আইনটি বাল্যবিবাহকে ছলে কৌশলে বৈধ করছে, কিন্তু এটি বাল্যবিবাহ কী করে রোধ করবে, তা আমার বোধগম্য নয়। আইনটিতে বিশেষ প্রেক্ষাপটের উল্লেখ আছে, কিন্তু কোনো বয়স নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। ৫০ বছর বয়সী কোনো পুরুষ ৬ বছর বয়সী কোনো মেয়েকে বিয়ে করলেও সেই বিয়েকে এই আইন বৈধ ঘোষণা করতে পারে। আদালতের অনুমতি না নিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্করা বিয়ে করলে সামান্য জেলজরিমানা ছাড়া শাস্তি এমন কিছু নয়।

মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর থেকে কমানো যায় কি নাতা নিয়ে ২০১৩ সালে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে প্রথম আলোচনা উঠলে বিভিন্ন মহল থেকে এর বিরোধিতা করা হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরি করে, যাতে ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর করার প্রস্তাব করা হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সে সময় ‘বিশেষ পরিস্থিতির’ ব্যাখ্যায় বলেন, “মেয়ে প্রেমঘটিত কারণে ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেলে বা মেয়ে ছেলের বাড়িতে চলে যাওয়ার পর নিজের বাড়িতে ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানালে বা বিয়ের আগে গর্ভবতী হলেএরকম পরিস্থিতিতে ১৬ বছর করা যায় কি না, তা সরকার চিন্তাভাবনা করছে।” এ নিয়ে সিদ্ধান্তে আসার আগে মাতৃমৃত্যু রোধ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ক্ষমতাসীন দলের দুই সংসদ সদস্যও বিয়ের বয়স কমানোর প্রস্তাবে তাদের আপত্তির কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, কোনো ধরনের শর্ত রেখেও মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮এর নিচে আনা উচিত হবে না। এক অনুষ্ঠানে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক করে বলেছিলেন, মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানো হলে তা ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করবে। সেইভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনে মেয়ে শিশুদের সুস্থস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এত বাধা এসেছে, তারপরও মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮এর নিচে করার জন্য বাংলাদেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। আমি আশঙ্কা করছিলাম ১৮কে আচমকা একদিন ১৬ করে ফেলবে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন এমন একটি আইন করা হয়েছে যেটি আরো ভয়ঙ্কর। যে কোনো বয়সী মেয়েরই বিয়ে হতে পারবে এই আইনে। বাংলাদেশের মতো দেশে ‘আদালতের অনুমতি’ নিতান্তই বাক্যালংকারের জন্য ব্যবহৃত হয়।

মানুষ যত সভ্য হয়, মেয়েদের বিরুদ্ধে বর্বরতা তত কমিয়ে ফেলে। যে দেশে মেয়েরা বাল্যবিবাহের শিকার, সে দেশে মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়ানোটা সে দেশের সভ্য হওয়ার লক্ষণ। বাংলাদেশেও তাই করা হয়েছিল, কিন্তু এখন আবার কমানো হচ্ছে সেই বয়স। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ যেসব দেশে ঘটছে, যেসব অনুন্নত বর্বর দেশগুলোতে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে প্রতি তিনটে বিয়ের একটি বিয়েই বাল্যবিবাহ। শতকরা ৬৮ ভাগ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ ঘটে মাত্র তিনটে দেশে। আফ্রিকার নাইজের, চাদ আর মালিতে।

আমরা সকলেই জানি, আঠারো বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক নয়, তারা শিশু। বাংলাদেশও আঠারো বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়েদের প্রাপ্তবয়স্ক বলে গণ্য করে না। তাহলে জেনেবুঝে বাংলাদেশ কেন শিশুদের বিয়ে বৈধ করছে! কচি কুমারী মেয়েকে যেন আইনের কোনো ঝামেলা ছাড়াই পুরুষেরা ভোগ করতে পারে বা ধর্ষণ করতে পারে তার ব্যবস্থা করছে?

একথা কে না জানে যে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে হলে সামাজিক বা অর্থনৈতিক কোনও উপকার তো হয়ই না, বরং অপকার হয়! অল্প বয়সী মেয়েরা স্বামীর অত্যাচারনির্যাতনের শিকার হয় অতি সহজেই। অশিক্ষিত থেকে যায় জীবনভর, কারণ বিয়ের পর ইস্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে তারা বাধ্য হয়। যৌনরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকাটাও বেশি। গর্ভবতী হওয়ার জন্য শরীর এবং মন প্রস্তুত হওয়ার আগেই তাদের গর্ভবতী হতে হয়। অল্প বয়সে গর্ভবতী হওয়া এবং সন্তান প্রসবের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মেয়ের মৃত্যু ঘটে। সত্যি কথা বলতে কী, কোনও মেয়ের বাল্যবিবাহ হওয়া মানে তার মৃত্যুদণ্ড হওয়া।

এই আইনের ভুক্তভোগী হবে মেয়েরাই। শিশুর জন্য লোভের জিভ দিন দিন লম্বা হবে পুরুষের। শিশুধর্ষকদের হাত থেকে মেয়েদের রেহাই নেই। শিশু পাচারকারীর হাত থেকেই রেহাই নেই। এই আইনের মাধ্যমে সরকার আসলে ধর্ষণকে বৈধ করবার ব্যবস্থা করছে। দরিদ্র মেয়েরা এমনিতে নানা নির্যাতনের শিকার, প্রায় সমস্ত অধিকার থেকেই বঞ্চিত, তাদের নির্যাতনকে এখন আইনি বৈধতা দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। যে বয়সটায় একটা মেয়ে খুব অসহায়, সেই বয়সটায় তার বিয়েটা বৈধ করা হচ্ছে। এ অনেকটা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো। বিনা অপরাধে যাবজ্জীবন। অথবা অপরাধ একটিই, মেয়ে হিসেবে জন্ম নেওয়ার অপরাধ। পতিতালয় থেকে অসহায় মেয়েরা যেমন বেরোতে পারে না, নারীপুরুষের বৈষম্যের সংসার থেকেও তেমনি বেরোতে পারে না। সে কারণে একটি মেয়ের শিক্ষিত আর স্বনির্ভর হওয়াটা খুব জরুরি। শিক্ষিত এবং স্বনির্ভর মেয়েরা অশিক্ষিত এবং পরনির্ভর মেয়েদের চেয়ে সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, মানসিকভাবে, শারীরিকভাবে অনেক বেশি ভালো অবস্থায় আছে। একটা মেয়ের অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে হওয়া মানে, তার স্বাস্থ্য, তার শিক্ষা, তার সম্ভাবনা সব নষ্ট করে দেওয়া। জেনেশুনে বাংলাদেশ সরকার কার বা কাদের স্বার্থে এই আইনটি তৈরি করতে চাইছে?

বাংলাদেশে আঠারো বছর বয়স ছিল মেয়েদের জন্য বিয়ের ন্যূনতম বয়স। তারপরও আইনটিকে না মেনে অসাধু লোকেরা নিজেদের শিশুকন্যাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল। এই সমস্যার সমাধান কিন্তু বিয়ের বয়স আঠারো থেকে কমিয়ে এনে হয় না। এর সমাধান হয় ওই অসাধু লোকদের সাধু বানানোয়। এর সমাধান হয় মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে দেশব্যাপী মানুষকে সচেতন করিয়ে। যখন মানুষকে সচেতন করার কাজটি পরিশ্রমের বলে মনে হয়, তখনই সরকার দুষ্ট লোকদের তুষ্ট করতে মন্দ কাজটি করে।

একটা সমাজ কতটা সভ্য, তা নির্ভর করে ওই সমাজে মেয়েদের অবস্থাটা কেমন, তার ওপর। বাংলাদেশে একগাদা আইন রাখা আছে মেয়েদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের সমাজ নারীবিদ্বেষী সমাজ, এই সমাজ মেয়েদের যৌন বস্তু, পুরুষের দাসী আর সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ছাড়া আর কিছু মনে করে না। এই নারীবিদ্বেষী মানসিকতা যখন পরিবর্তনের প্রয়োজন, যখন নারী পুরুষের সকল বৈষম্য দূর করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া উচিত, তখনই সরকার কি না হায়েনার মুখে হরিণ ছুড়ে দেওয়ার মতো শিশুধর্ষকদের বিকৃত যৌনলালসা মেটাতে শিশুদের বিয়ে বৈধ করছে।

ঋতুস্রাব শুরু হয়ে গেলে বা গায়ে গতরে বাড়লেই যে মেয়েরা বিয়ের জন্য মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গেলো, তা নয়। ঠিক যেমন ছেলেদের দাড়িগোঁফ গজালেই বিয়ে করার যোগ্য হয়ে ওঠে না। বিয়ে শুধুই দৈহিক সম্পর্ক নয়, বিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। বিয়ে খুব বড় দায়িত্ব পালন, বিশেষ করে সন্তানের।

শৈশব যাপনের অধিকার প্রত্যেক শিশুরই আছে। মেয়েদের শৈশব আর কৈশোরকে ছিনিয়ে নিয়ে হুটহাট যৌবন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অচিরে মেয়েরা বার্ধক্যকে বরণ করে নিতে বাধ্য হচ্ছে। মেয়েদের জীবনকে এভাবে নষ্ট করে দেওয়ার কোনও অধিকার কোনও সরকারের নেই।

শিশুসঙ্গমে আর শিশুধর্ষণে মূলত কোনও পার্থক্য নেই। শরীরে যৌনতার বোধ শুরু না হতেই, নিতান্তই কৌতূহলে বা বাধ্য হয়ে শিশুরা সঙ্গমে রাজি হতেই পারে, কিন্তু সে রাজি হওয়া সত্যিকার রাজি হওয়া নয়।

সমাজের বেশির ভাগ মেয়েরা সুখী নয়, অথচ সুখী হওয়ার ভান করে। অথবা দুঃখকেই, না পাওয়াকেই, পরাধীনতাকেই সুখ বলে, পাওয়া বলে, স্বাধীনতা বলে ভাবে। ভাবতে শিখেছে ছোটবেলা থেকেই। নতুন করে এর বিপরীত কিছু শেখা সম্ভবত অধিকাংশ মেয়ের পক্ষেই আর সম্ভব নয়। পুরুষ যা শিখেছে ছোটবেলা থেকে তা হলো, তারা প্রভু, তারা জানে বেশি, বোঝে বেশি, তাদের জন্য সমাজ, তাদের জন্য জগৎ, তারা শাসন করবে, তারা ভোগ করবে। এই শিক্ষাটা না শিখতে এবং এর বিপরীত কিছু শিখতে অধিকাংশ পুরুষই রাজি নয়।

জাতি হিসেবে সভ্য হতে চাইলে শিশুর প্রতি পুরুষের লোভের জিভকে সংযত করার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের দায়িত্ব এই জিভকে সংযত করার জন্য উৎসাহ দেওয়া। কিছুতেই ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ জিভ অসংযত করা যেতে পারে বলে অসংযত করায় উৎসাহ দেওয়া নয়।

১ ডিসেম্বর, ২০১৬

১৮ বছরের আগে বিয়ে কেন বিপদজনক?

বিবিসি : মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল রোজিনা পারভিনের। দুবছর না যেতেই সে এখন কন্যা সন্তানের মা। আর স্বামীও তাকে ছেড়ে গেছেন সন্তান জন্মের আগে। মেয়েকে নিয়ে রোজিনা ঢাকায় বস্তিবাসী। বাবামার কুঁড়েঘরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বলছিলেন, হতদরিদ্র পরিবারে শারীরিক মানসিক এক যন্ত্রণার জীবন এখন তার। মেয়ে হওয়ার আগে আমার ওজন ছিল ৪৫ কেজি। বাচ্চা হওয়ার পর এহন ৩২কেজি। আমার বাচ্চা হইছে সিজারে। অনেক ধরনের সমস্যা। মাজা কোমরে ব্যাথা, শরীল দুর্বলতা সবই এখন দেখা যায়।রোজিনা বলছিলেন, তার অগোচরেই তিনি গর্ভবতী হয়েছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী রোজিনার অল্প বয়সে বিয়ে এবং গর্ভধারণের ফলেই এসব সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. ফারহানা দেওয়ান বলেন, আঠারোর আগে শারিরীক মানসিক কোন দিক দিয়েই একটি মেয়ে বিয়ে এবং গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হয় না। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. ফারহানা দেওয়ান বলেন সন্তানধারণের জন্য শরীরের প্রস্তুতি প্রয়োজন।

পিউবার্টি বলি আমরা যে বয়সে প্রথম পিরিয়ড হবে তার পরে আস্তে আস্তে তার বডিটা ডেভলপ করবে। এই ডেভলপমেন্টের জন্য একটা সময় দিতে হয়। পনের থেকে আঠার বছর পর্যন্ত এই শরীর গঠন চলতে থাকে। আঠারো বছরের আগে যদি মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয় তখন তার প্রপার গ্রোথ হয় না। এক্ষেত্রে গর্ভধারণ করলে প্রিম্যাচিওর ডেলিভারির শঙ্কা থাকে। যেটি শিশুর মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি করে।দেখা যাচ্ছে বাল্য বিবাহ মেয়েদের স্বাস্থ্যে সমস্যার পাশাপাশি শিশু মৃত্যুরও অন্যতম কারণ।

ইউনিসেফের তথ্য

ইউনিসেফের তথ্য বলছে কুড়ি বছরের আগে মেয়েরা সন্তান জন্ম না দিলে বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৩ হাজার শিশুর জীবন রক্ষা পাবে। ইউনিসেফের সবশেষ হিসেবে বাংলাদেশে ৫২.% মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে। আর ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয় ১৮.১ শতাংশের। ১৮ বছরের আগে বিয়ের দেওয়ার ক্ষেত্রে পৃথিবীর শীর্ষে অবস্থানকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম এবং ১৫ বছরের আগের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে ৬ষ্ঠ অবস্থানে।

রোজিনার মতো মেয়েদের যেন আঠারো বছরের আগে বিয়ে না হয়, সেজন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার ১৯২৯ সালের আইন সংশোধনী এনেছে। সরকারের মন্ত্রিসভা এর নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে তবে সেখানে একটি ধারায় নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। মানবাধিকার এবং নারী সংগঠন, চিকিৎসক এবং নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করা দেশি বিদেশি এনজিওগুলো এর ঘোর বিরোধী।

জাতীয় মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়শা খানম বলেন, “আজকে যারা কন্যা তাদের স্বাস্থ্য, তাদের ক্ষমতায়ন, তাদের মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন এগুলো শারীরিক, মানসিক এবং পারিবারিকভাবে পালনের যোগ্যতা অর্জনের জন্য জাতিসংঘ একটি ন্যুনতম বয়স ঠিক করে দিয়েছেযেটা আঠারো। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, বিশ্ব সম্মেলন, জাতিসংঘের ঘোষণা তার সঙ্গে সরকারের আইনের এ ধারা কন্ট্রাডিক্টরি

আয়শা খানমের আশঙ্কা বিশেষ ধারার সুযোগ নিয়ে আইনের অপব্যবহার হবে। তিনি বলেন, আইনে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বলতে যেগুলো আলোচনায় এসেছে সেটিও উদ্বেগের।

তবে একটা ধারা হলো যদি প্রেগনেন্ট হয়ে যায় তাহলে বিচারালয় এবং অভিভাবকের পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিয়ে দেওয়া যাবে। আমার মনে হয় এতে করে ধর্ষণের শিকার নারীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া হবে। যেটা বাংলাদেশের জন্য আরেকটা ভয়াবহ চিত্র হবে এবং ধর্ষণের শিকার সন্তান তাদেরকে বৈধতা দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করবে। এছাড়া এতে করে কম বয়সীদের মধ্যে গর্ভধারণের প্রবণতাও বাড়বে,” বলেন আয়েশা খানম।

আইনের এ বিরোধিতা নিয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম বলেন, আইন সংশোধনের মাধ্যমে বাল্য বিবাহ বন্ধে আরো জোরদার পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। এতে আইন আরো শক্তিশালী হচ্ছে। শাস্তিও বাড়ানো হয়েছে। যে বিয়ে পড়াবে তাকেও শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

আইনে বিশেষ ধারা রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন সব আইনেই একটা বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হয় যেটা আইনের বৈশিষ্ট্য। সরকার বলছে আইন সংশোধনের মাধ্যমে বাল্য বিবাহ বন্ধে তারা আরো জোরদার পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে । আইনে বলা হয়েছে কন্যা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতে যেতে হবে। সেখানে আদালত এবং বাবা মা উভয়ের সম্মতি লাগবে। এটা বিধিতে বলা থাকবে যে কখন কোন্ প্রেক্ষাপটে আদালত থেকে বিয়ের অনুমতি দেয়া হবে। এটা যেরকমভাবে বলা হচ্ছে যে একেবারে অবাধ সুযোগ দেয়া হচ্ছেতা নয়।

নাছিমা বেগম বলেন, সংশোধনী নিয়ে অনেকেই ভুল ব্যাখ্যা করছেন। আইনটি পাশ হলে বাস্তবায়নের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে এবং সেখানে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিধিমালা করার সময় সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান সচিব।

বাল্যবিবাহ আইন ২০১৬ নিয়ে দুটি কথা

জাহানারা নুরী : মন্ত্রিসভা সদ্য খসড়া বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ অনুমোদন করেছে। এই আইনে নবতর সংযোজন বিশেষ প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ বৈধকরণ। তাতে বলা হয়েছে এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনও বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশনাক্রমে এবং মাবাবার সম্মতিক্রমে বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ ক্রমে বিবাহ সম্পাদিত হইলে, উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।বিয়ে প্রথা মেয়েশিশুর সর্বোত্তম কল্যাণ নিশ্চিত করার উপায় হতে পারে না। একটি স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র ও তার অধীনস্ত সরকার ব্যবস্থা কায়েম আছে, অথচ সেখানেই নাগরিকের মানবাধিকার দিনেদুপুরে লোপাট হচ্ছে। তা জায়েজ করতে রাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলছেন, আমাদের দেশে তো ১০১১ বছরেও পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। এ সমস্যাগুলো তো সমাজে আছে, এ ধরনের বিয়ের বৈধতার জন্য এটা একটা ব্যবস্থা মন্ত্রিপরিষদ কি কারণেই বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের যে সুরক্ষা আমাদের কন্যারা সামান্য হলেও পেয়ে আসছিলেনতা বাতিল করলো? পালিয়ে গিয়ে প্রেগন্যান্ট হয়ে যাওয়া ১০১১ বছরের বালিকাদের সংখ্যা কত, তার কোনও জরিপ মাননীয় সচিবের কাছে আছে কিনা, সে উল্লেখ অবশ্য কোনও পত্রিকায় পেলাম না।

আমাদের পবিত্র শিশুরা বয়স্কদের জীবনযাপন করে। তাদের শৈশব পরিবার ও সমাজের হাতে ছিনতাই হয়ে যায়। এখন রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা এই ছিনতাই কর্মকে আইনি বৈধতা দিয়েছেন। বিয়ের দায়দায়িত্ব কি বোঝে ১০১১ বছরের মেয়েশিশু? যৌনতার জটিলতাইবা কতটুকু সে জানে? জানলেও তার অবিকশিত বুদ্ধিতে, দেহে ও মনে তা ধারণ করার সামর্থ্যই বা কতটুকু? না বুঝে যদি সে প্রেগন্যান্ট হয়ে যায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই এ সিদ্ধান্ত তার নিজের নয়, তার সঙ্গের পুরুষটিরও এবং প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে সে পুরুষের বয়স ১০১১ নয়। সেক্ষেত্রে অসচেতনভাবে নিজ শরীর ব্যবহার হতে দেওয়ার কিংবা মা হওয়ার কাজটিতে মেয়েশিশুর সম্মতি দান ও সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার থাকে না। পরিস্থিতির ও অজ্ঞান শৈশবের কৌতূহলের শিকার হয় সে। বাল্যমাতৃত্বের সমাধান খুঁজতে হবেরাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের উদার চেতনায়, পরিবার ও সমাজকে সহিষ্ণু আধুনিক জ্ঞান এবং মানবিকতার ভেতর, বিয়েতে নয়। যে বিশেষ প্রেক্ষাপটে ১০ বছরের মেয়েকে মাবাবা বিয়ে দিতে চান, তা গুটিকয়েক ঘটনামাত্র, জাতীয় সমস্যা নয়; ওই সব বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ওই মেয়েশিশুকে বিশেষ নিরাপত্তা এবং তার মাবাবাকে বিশেষ সচেতনতা ও সুবিধা দেওয়াই সঙ্গত। অন্যথায় বিয়ে মেয়ে শিশুটিকে যৌনকর্মে নিয়োগের পথই প্রশস্ত করে মাত্র।

বাংলাদেশ এখন লড়ছে শুধু বাল্যবিবাহ নিয়েই নয়, অল্পবয়সে জন্ম দেওয়া শিশুর অটিজম ও খর্বতা, মায়ের স্বল্পায়ু ইত্যাদি সমস্যা নিয়েও। ভুলে গেলে চলবে না, এ দেশে সন্তান ধারণ ঠেকিয়ে জনসংখ্যা কম রাখার দায়ও নারী ও মেয়েদেরই। এসব সমস্যা সমাধানের পথে না গিয়ে মেয়েদের ১০১১ বয়সেই বিশেষ প্রেক্ষাপটে স্থায়ী যৌন সম্পর্কে ও আরও সন্তানের মা হওয়ার পথে যেতে বাধ্য করা কি ঠিক? শিশুর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি যে দেশ, সে দেশে বাল্যবিবাহ অনুমোদন করে একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক বিধান পাস করা হলো। অথচ বলা হলো, এ আইন নাকি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ!

আমরা পরিবার পরিকল্পনার বিজ্ঞাপনে দেখতামবিশের আগে সন্তান নয়/আঠারোর আগে বিয়ে নয় বাল্য বিবাহ নিরোধ প্রচারণা সরকারিভাবে প্রায় দুই দশক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। শিশুদের জন্য অন্যতম আইনটি হচ্ছে শিশু অধিকার অ্যাক্ট ১৯৭৪ এর বাইরে শিশুর আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার চার্টার, রিয়াদ গাইড লাইন এবং হাভানা রুলস ইত্যাদি থেকে গা বাঁচিয়ে চলছে। অন্যপক্ষে সরকারি দলিল দস্তাবেজের শেলফে বেশ সাজিয়ে রাখা আছে মুসলিম পারিবারিক আইন, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স (প্রটেকশন অ্যান্ড পিভেনশন) অ্যাক্ট ২০১০, হিউম্যান ট্রাফিকিং অর্ডিন্যান্স ২০১১।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ও শিশু পাচারের একটি অন্যতম ট্রানজিট রুট দেশের অভ্যন্তরে যৌনকর্মে নিয়োগে বছরের মেয়েশিশু পাচার নিত্য ঘটনা। এ দেশে কমপক্ষে চারটি নীতি প্রণীত হয়েছে। পাচার বিষয়ক ২০১২২০১৪ পরিকল্পনা, চাইল্ড রাইটস পলিসি ২০১১, নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এবং শিশুশ্রম নির্মূলনীতি ২০১০ ইত্যাদি। সিডওতে স্বাক্ষরকারী প্রথম দশটি দেশের একটি হলেও বাংলাদেশ মৌলিক দুটো ধারা এড়িয়ে চলছে। ১৯৭২ এ ছিল দুজন নারী মন্ত্রী, বর্তমানে রাজনীতিতে নারীর সংখ্যা বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য আর্থিক খাতে নারীরা শ্রম দিচ্ছেন, ও আয় করছেন বৈদেশিক মুদ্রা। দেশের উন্নতিতে অবদান রাখতে তারা সহস্র বাধা ডিঙাচ্ছেন।
শেলফের আইন ও মেয়েশিশুর জীবনের বাস্তবতার মাঝে প্রকট বিরোধাভাস; শত প্রচারণার পরও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এবং আইসিডিডিআরবি ২০১৩ জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ হারযুক্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। এর অর্থ এত এত আইনি এবং পরিবার পরিকল্পনার টার্গেট পূরণে বালিকাদের বিয়ে না দেওয়ার ব্যাপক প্রশাসনিক চাপ থাকার পরও শিশু নির্যাতন ও মেয়েশিশুর বাল্যবিবাহ বন্ধ হচ্ছে না। জরিপ মতে বর্তমান প্রজন্মে বিবাহিত নারীদের প্রতি তিনজনের দুজনই আঠারো বছরের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়েছিলেন। নারী ও শিশুর সুরক্ষায় প্রণীত আইন এবং সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগে ফারাক বিস্তর। আমাদের সিস্টেমের অধিকাংশই পিতৃতন্ত্রের মানসিকতার।

দুটি পরিবার বিবাহের মাধ্যমে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের শরীর বিনিময় সন্তান উৎপাদনকে অনুমোদন দেয়। এ সম্পর্ক পুরুষের সন্তানের পরিচয় নিশ্চিত করে এবং তার পরিবারের সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসেবে সে সন্তানকে (মূলত পুরুষ সন্তান) পরিবার ও সমাজে বরণ করে নেওয়া হয়। মূল চিন্তাটি হচ্ছে, মেয়েশিশুর জীবনের লক্ষ্য হবেস্ত্রী ও মা হওয়া। তার জন্য পুঁজি বিনিয়োগ লাভজনক নয়, তাই মেয়ে শিশুর শারীরিক, মানসিক, চেতনা ও দক্ষতার উন্নয়নে অর্থ খরচে পরিবার অনিহা। মেয়েশিশু স্বামীর ঘরে চলে গেলে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার দায় কমে, যদিও পিতৃগৃহের বাইরে মেয়েটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় বাস করে। নারী ও মেয়ে শিশুর রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক শোষণমূলক; রাষ্ট্র তাদের না অগণতান্ত্রিক পারিবারিক ব্যবস্থায় সুরক্ষা দেয়, না মুক্ত করে ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের বৈষম্য থেকে। সমাজে ধর্ষণ, হত্যা নিত্য ঘটছে। এর জন্য মেয়েকেই দায়ী করে ও নিজেদের সামাজিক হেনস্তা নিয়ে পরিবার বিব্রত থাকে। এমন সমাজে রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানবাধিকার প্রশ্নে শিশুর গার্ডিয়ান হওয়া; তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায় থেকে রাষ্ট্র ও সরকার হাত ধুয়ে ফেলতে পারে না। সরকারকে দেওয়া জনগণের শক্তিই রাষ্ট্রের মূল শক্তি। প্রজন্মযারা জনগণ ও আগামীর শ্রমশক্তিরাষ্ট্রের নিজেরই স্বার্থে তাদের লালন করবে। দুর্বল গণতন্ত্রে রাষ্ট্র তার হাতে জনতার তুলে দেওয়া ক্ষমতা যখন স্থানীয় ও জাতীয় দুর্নীতিগ্রস্ত অপশক্তিগুলোর সঙ্গে বণ্টন করে নেয়। যার বলে এ সব অপশক্তি দরিদ্র, নারী ও শিশুদের শোষণ ও নিপীড়ন করে, তখন সরকারও তাদের অপরাধগুলোর অংশীদার বৈ কি!

২০১২ তে নারীদের দাবিতে আইন কমিশন বিয়ে, সেপারেশন, ডিভোর্স ইত্যাদি ব্যক্তিগত আইন পর্যালোচনা শেষে কিছু সুপারিশ করেছিল। দেশব্যাপী যে নারীদের যেসব দাবি ছিল সেগুলো ও কমিশনেরও সুপারিশ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারতো। যেমন, সিডওর ধারা দুটিতে স্বাক্ষর, বিরাজমান আইনি বৈষম্য বিলোপ, মেয়েদের পৈতৃক ও বৈবাহিক সম্পত্তির সম অধিকার নিশ্চিত করা, বিচারিক প্রক্রিয়া, আদালত ইত্যাদি নারী ও শিশুবান্ধব করা এবং বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে যে বিভৎস দারিদ্র্য নারী ও শিশুকে অপুষ্টি ও মানবেতর জীবনে ঠেলে দেয়, তার সমাধানে এগিয়ে আসা। নারীরা দেশ ও পরিবারকে যে বিপুল শ্রম দেয়, তার বিনিময়ে এটুকু খুব বেশি দাবি কি?

কিন্তু দেখা গেলো অনবরত আমরা একই আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি। জাতি হিসেবে আমরা যূথ প্যারাডাইম তৈরি করছি না। বরং ব্যক্তির নানা ইচ্ছে, প্রতিযোগিতামূলক ক্ষীণদৃষ্টি, চেতনার কূপমণ্ডুকতা দিয়েই জাতীয় উন্নয়ন দেখছি। আমাদের আইন ও পরিকল্পনা প্রণয়নের মূল প্রণোদনা হলো, আগে যা হয়েছে তা উল্টে দেওয়া। নিজেদের ও প্রজন্মের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে মানবিক মহিমায় সংজ্ঞায়নের দক্ষতা ও সমাজকে মানবাধিকারের নৈতিক উন্নততর মানে উন্নিত করায় আমাদের বেদনাদায়ক সীমাবদ্ধতা ও অনীহা রয়েছে।

সর্বশেষ ২০১৩তে মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলো নারীবিরোধী ১৩ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নামে। তারপর থেকেই ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, নারী নিপীড়ন ও কিশোরীর আত্মহত্যার খবর বেড়েছে। যেহেতু রাষ্ট্র নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণ ঠেকাতে অপারগ সেহেতু তিন চার বছরের মেয়েশিশুর ধর্ষণও বিয়ের দ্বারা জায়েজ হলে অবাক হব না।

বিশেষ প্রেক্ষাপটে মেয়েশিশু বিয়ে দিয়ে পরিবার ও সমাজ অসংখ্য উপায়ে লাভবান হওয়ার লম্বা তালিকা করা যায়, কিন্তু বিষয়টি অরুচিকর। এই তো সেদিনের খবর, কোনও এক পরিবার তার মেয়ে প্রেম করেছে বলে পিটিয়ে মেরে ফেলে ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখে। নারী হত্যার খবর দিয়েই বিশ্বব্যাপী মৌলবাদী রাষ্ট্র পাকিস্তানের পরিচিতি। এই নৃশংসতা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে। একটি ছোট্ট আইনের ধারা কিভাবে নারীর অধিকার সুরক্ষায় এ যাবৎ পাওয়া আমাদের সব অর্জনকে মিথ্যে করে দিতে পারে, তারই উদাহরণ এসব ঘটনা। সুতরাং বাল্যবিবাহ আইন ২০১৬এর বিশেষ বিধান একটি বড় সমস্যার সূত্রপাত করতে পারে।

লেখিকা : কথাসাহিত্যিক

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

আসলেই কি কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে?

. তৌফিক জোয়ার্দার : ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে কন্যাশিশু সন্মেলনে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৯৭১ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ২২৩, যা বর্তমানে মাত্র ৩৭.এ নেমে এসেছে। শুধু শিশুমৃত্যুই নয়, বাংলাদেশ প্রায় সবগুলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয়েছ এবং এক্ষেত্রে বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এসব অর্জনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু এতসব অর্জনের পরও একটি বিষয়ে বাংলাদেশ আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। এটি হল, মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাড়ানো।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) রিপোর্ট, ২০১৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স হল ১৬.৬ বছর। শুধু এই একটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ায় বিভিন্ন সামাজিক সূচকের পরিমাপকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, উন্নয়নকর্মী ও গবেষকদের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলেছিল। একজন সচেতন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে এটা খুবই স্বাভাবিক।

এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে সরকার হঠাৎ করেই সব উন্নয়ন প্রপঞ্চের বিপরীত স্রোতে নৌকা ভাসাল। ঘোষণা করা হল, বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের লিগ্যাল বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা হবে। উন্নয়ন সেক্টরে কাজ করা একজন গবেষক হিসেবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অন্য অনেকের মতো আমিও চিন্তাভাবনা না করে পারিনি।

এ ঘোষণার পেছনে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য তারাই ভালো বলতে পারবে, তবে আমার ধারণা হচ্ছেকেউ হয়তো সরকারকে বুঝিয়েছেন, বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিলে বাল্যবিবাহিত মেয়েদের সংখ্যাও পরিসংখ্যানে কম দেখাবে। তখন কৃত্রিমভাবে হলেও বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ হ্রাসে সরকারের আপাত ব্যর্থতা আর আলাদাভাবে চোখে পড়বে না।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বিয়ের বয়স কম বলে এত যে সমালোচনা এবং সে সমালোচনা ধামাচাপা দিতে গিয়ে এতসব আয়োজন, বিয়ের সে বয়সটিই সঠিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছে কিনা? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এশিয়ান পপুলেশন স্টাডিজ নামক জার্নালে প্রখ্যাত গবেষক পিটার কে স্টিটফিল্ড, নাহিদ কামাল, কারার জুনায়েদ আহসান এবং কামরুন নাহার এমনটিই দাবি করেছেন।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে করা জরিপের সঙ্গে বাংলাদেশ উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) স্বাস্থ্য ও জনমিতিক অতন্দ্র তত্ত্বাবধান (ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভেইলেন্স) উপাত্তের তুলনা করে তারা দেখিয়েছেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের প্রায় দুইতৃতীয়াংশই বিয়ের সঠিক বয়স উল্লেখ করেননি। ৫৬% নারী বিয়ের বয়স কমিয়ে বলেছেন এবং ৭% বলেছেন বাড়িয়ে।

বিবাহিত নারীদের মধ্যে করা জরিপের ফল অনুযায়ী, তাদের উল্লেখ করা প্রথম বিয়ের বয়সের গড় পাওয়া গেছে ১৬.৮ বছর, যা বিডিএইচএস রিপোর্ট, ২০১৪তে উল্লিখিত ১৬.৬ বছরের খুবই কাছাকাছি। যেহেতু আইসিডিডিআরবি তাদের সার্ভেইলেন্স ব্যবস্থার অন্তর্গত প্রত্যেক মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও স্থানান্তরের তথ্য সেই ১৯৬৬ সাল থেকে সংরক্ষণ করে আসছে, তাই তাদের এলাকায় জরিপকৃত ১৯৬৬ বিবাহিত নারীর প্রকৃত বয়সও তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের প্রকৃত বয়স বের করে জরিপে উল্লিখিত বয়সের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, তাদের বিয়ের প্রকৃত গড় বয়স মোটেও ১৬.৮ বছর নয়, বরং ১৮.৬ বছর।

এমন একটি চমকপ্রদ ফলাফল গবেষকদের স্বভাবতই অত্যন্ত কৌতূহলী করে তোলে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারলেন, যেসব নারীর প্রকৃত বিয়ের বয়স যত বেশি, বিয়ের বয়স ভুল বলার বা কমিয়ে বলার প্রবণতাও তাদের তত বেশি। তারা আরও দেখলেন, যেসব নারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং যারা অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বলবিয়ের বয়স ভুল বলার প্রবণতাও তাদের বেশি। সবকিছু বিচারবিশ্লেষণ করে তারা তাদের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেনআমাদের সমাজে এখনও যৌতুকের প্রকোপ ব্যাপকভাবে রয়েছে, কাজেই যেসব মেয়ের বয়স যত বেশি, যৌতুকের পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই যৌতুক দিতে হয়েছেএমন নারীরা তাদের প্রকৃত বিয়ের বয়স কমিয়ে বলে থাকতে পারেন, যাতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কোনোভাবে জরিপ থেকে তার প্রকৃত বয়স জেনে বেশি বয়সের জন্য অধিক যৌতুকের জন্য চাপ দিতে না পারে (যদিও গবেষণার উপাত্ত গোপন রাখা হয়, তবে গ্রামের নারীরা এ বিষয়ে সম্ভবত নিশ্চিত হতে পারেনি)

গবেষণার প্রসঙ্গ এ কারণে উত্থাপন করলাম, যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার উপলব্ধি করতে পারেবিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিমভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে লিগ্যাল বয়সের নিচে বিয়ে হওয়া মেয়েদের সংখ্যা যে বাংলাদেশে কম, তা প্রমাণের চেয়ে কার্যকর উপায়ে এ লক্ষ্যটি অর্জিত হতে পারে।

প্রথমত, বর্তমানে সরকারের গৃহীত নানা সামাজিক পদক্ষেপ প্রকৃতই কাজ করছে, ফলে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাস্তবিকপক্ষেই অনেক বেড়েছে (১৯৯৪ সালের বিডিএইচএস রিপোর্ট অনুযায়ী ১৪.১ বছর)। কিন্তু নানা জরিপে যে কারণে এ উন্নয়ন প্রতিফলিত হতে পারছে না, তা অ্যাড্রেস করা বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দেয়ার থেকেও অধিক কার্যকর ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মান নিয়ন্ত্রণ করা। যে কোনো নাগরিকের প্রকৃত বয়স নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে জন্ম নিবন্ধন সনদ।

দ্বিতীয়ত, নারীরা তাদের বয়স কমিয়ে বলার তাগিদ অনুভব করছেকারণ অধিক বয়সে বিয়ের ব্যাপারে সমাজে এক ধরনের ‘স্টিগমা’ বিরাজ করছে। এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে বিয়ের বয়স ও যৌতুক সংক্রান্ত সামাজিক মূল্যবোধ। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটলে দেশের নারীরা আর বয়স লুকানোর প্রয়োজন অনুভব করবে না।

সরকার সম্প্রতি ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ প্রণয়ন করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এ আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি এবং বাবামায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সাধারণভাবে বিয়ের লিগ্যাল বয়স আগের মতোই মেয়েদের জন্য ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে হয় না, সেখানে ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ কম বয়সে বিয়ের সুযোগটির অপব্যবহার ঘটতে পারে। তাই এ অনুবিধিটি বাতিল করার অনুরোধ জানাই।

সহকারী অধ্যাপক

জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: