প্রথম পাতা > ইতিহাস, বাংলাদেশ, শিল্প > কালের সাক্ষী মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি

কালের সাক্ষী মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি

murapara-zamindarbariজি এম সহিদ : রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া জমিদারবাড়িকে ঘিরেই রূপগঞ্জের ইতিহাস, কৃষ্টি, সভ্যতা ও আজকের এই কোলাহলপূর্ণ জনবসতি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে মহাকালের নীরব সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জমিদারবাড়িটি। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার মুড়াপাড়া এলাকায় ৫২ বিঘা জমির ওপর এই জমিদারবাড়ি অবস্থিত।

বিশাল জমিদারবাড়িটিতে রয়েছে মোট ৯৫টি কক্ষ। নাচঘর, আস্তাবল, গোপন সিঁড়ি, উপাসনালয়, কাছারিঘর। বিশালাকৃতির প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতে হয় ভেতরে। অন্দর মহলে রয়েছে আরও দুটি ফটক। সর্বশেষ ফটক পেরিয়ে মেয়েদের স্নানের জন্য ছিল শান বাঁধানো পুকুর। পুকুরের চারধার উঁচু দেয়ালে ঘেরা। বাড়ির সামনে রয়েছে আরও একটি বিশাল পুকুর। পুকুরটির চারদিক নকশি কাটা ঢালাই লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। আর চারদিকে চারটি শান বাঁধানো ঘাট। পুকুর জুড়ে টলমল করছে পানি।

পুকুর সংলগ্ন মন্দির। মন্দিরে বড় দুটি চূড়া রয়েছে। প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। এর প্রবেশদ্বারগুলো খিলান দিয়ে নির্মিত। মন্দিরের মূল কক্ষ বেশ ছোট, অন্ধকার। মন্দিরের বাঁপাশ ঘেঁষে ছায়াঘেরা শান্তশ্যামল বিশাল আম বাগান। এখানে আছে সারি সারি পান ও সুপারি বাগান। জানা যায়, জমিদার রাম রতন ব্যানার্জী তত্কালীন মুড়াপাড়া জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং জমিদারদের ঊর্ধ্বতন ষষ্ঠ পুরুষ। তিনিই মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ির গোড়াপত্তন করেন। রাম রতন ব্যানার্জীর ছেলে পীতাম্বর ব্যানার্জী এবং তার ছেলে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী শাহজাদপুরের জমিদারি কিনে নিজের জমিদারি বিস্তৃত করেন।

কথিত আছে, জমিদারি কেনার সূত্র ধরে প্রতাপ ব্যানার্জীর সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। ১৮৮৯ সালে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী পৈতৃক এজমালি পুরনো বাড়ি ত্যাগ করে এ প্রাসাদের পেছনের অংশ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। প্রতাপ চন্দ্রের ছেলে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী ১৮৯৯ সালে প্রাসাদের সামনের অংশের একতলা ভবন নির্মাণ ও সেখানে দুটি পুকুর খনন করেন। এই কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হূদরোগে মারা যান। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথম গ্রাজুয়েট।

বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জীর দুই সুযোগ্য সন্তান জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী ও আশুতোষ চন্দ্র ব্যানার্জী ১৯০৯ সালে প্রাসাদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। এ অঞ্চলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জীর নাম সমধিক প্রসিদ্ধ। কারণ তিনি দুবার দিল্লির কাউন্সিল অব স্টেটের পূর্ববঙ্গ হতে সদস্য নির্বাচিত হন। জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী প্রজা সাধারণের কল্যাণে স্থাপন করেছেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কেটেছেন পুকুর। এই জনহিতকর ইতিহাসের উল্টাপিঠেই রয়েছে অত্যাচার আর নির্যাতনের বহু ঘটনা। জমিদারি প্রথার শেষ দিকে শুরু হয় প্রজাদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন আর ক্ষমতার অপব্যবহার। সুন্দরী মেয়ে, ঘরের বধূএদের কারও ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়লেই সে রেহাই পেত না। ধীরে ধীরে এই অত্যাচারের মাত্রা বাড়তেই থাকে। জমিদারি প্রথার শেষ দিকে নানাভাবে বিদ্রোহের পটভূমি তারই অংশ।

১৯৪৭ সালে পর তত্কালীন জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী সপরিবারে কলকাতায় চলে যান। ফলে জমিদারবাড়িটি শূন্য হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি সরকারের দখলে চলে যায়। পরে ১৯৬৬ সালে এখানে হাই স্কুল ও কলেজ স্থাপিত হয়। বর্তমানে জমিদারবাড়িটি মুড়াপাড়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

জমিদারবাড়িটিতে সারা বছরই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। বিদেশি পর্যটকরাও আসেন। নয়ন জুড়ানো রূপগঞ্জের এ জমিদারবাড়ির ভেতরের অপরূপ কারুকাজ, নিপুণ হাতের শিল্পকর্ম দেখে আজও পর্যটকরা বিস্মিত হন। ভ্রমণপিপাসু ব্যক্তিরা এ জমিদারবাড়িটি দেখতে চাইলে ঢাকা থেকে আসতে সময় লাগে মাত্র ৪০৫০ মিনিট। বাস, প্রাইভেট কার অথবা সিএনজিতে আসতে পারেন এখানে। প্রথমে নামতে হবে রূপসী অথবা ভুলতা বাস স্টেশনে। সেখান থেকে সিএনজি অথবা অটোরিকশা করে আসতে পারেন জমিদারবাড়িতে। এলেই আনন্দ পাবেন।

সূত্রঃ দৈনিক সকালের খবর, ১ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: