আর্কাইভ

Archive for ডিসেম্বর 1, 2016

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে ওলামায়ে কেরাম

মাওঃ এইচএম গোলাম কিবরিয়া : নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই তাঁকে ভয় করে” (সূরা ফাতির : ২৮)
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশে অনেক আগ থেকেই ইলমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসার ছিল। আরব, ইরাক ও ইরান থেকে আগত পীর আউলিয়া ও ইসলামী চিন্তাবিদগণের মাধ্যমে এ দেশে ইলমে দ্বীনের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং তাদের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে ইলমে হাদীসের চর্চা ব্যাপকতা লাভ করে, এ দেশে অনেক বড় বড় মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে প্রতি বছর অসংখ্য লোক ইলমে দ্বীনের শিক্ষা লাভ করে দ্বীন ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির সাথে সাথে পরিচিত হয়। এ ধারাবাহিকতা অদ্যাবধি অব্যাহত রয়েছে।

যুগ যুগ ধরে মহান আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান ইসলামের প্রচারপ্রসার এবং কুরআনহাদীসের চর্চা নবীরাসূল, সাহাবায়ে কিরাম, তাবেয়ীন, তাবেতাবেয়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, আওলিয়ায়ে কিরাম এবং হক্কানী পীরমাশায়েখ ও ওলামায়ে কিরামের মাধ্যমে হয়ে আসছে। আমাদের এই উপমহাদেশে ইসলামের প্রচারপ্রসারে হক্কানী পীরমাশায়েখ ও ওলামায়ে কিরামের বিশেষ অবদান রয়েছে। মূলত আলেমরাই হচ্ছেন ইসলামের ধারকবাহক। তাঁদের উপরই ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার মহান জিম্মাদারী। হাদীস শরীফে এসেছে “আলেমরাই হচ্ছে নবীগণের উত্তরসূরি” (তিরমিযী, আবু দাঊদ, ইবনে মাজা)

ওলামায়ে কিরামের মর্যাদা

হযরত হাসান বসরী (রা.) বলেন, “আলেম বলা হয়, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ্কে না দেখে ভয় করে এবং আল্লাহ যা পছন্দ করেন তা সে পছন্দ করে ও আল্লাহ যা অপছন্দ করে তা সে বর্জন করে।” তারপর তিনি প্রথমোক্ত আয়াতখানা তিলাওয়াত করেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা.) বলেন : “অনেক হাদীস মুখস্থ করে নেয়া ইলম নয়, বরং ইলম হচ্ছে আল্লাহকে অধিক ভয় করা।” হযরত রবী ইবনে আনাস (রা.) বলেন : “যে ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহর ভয় নেই, সে আলেম নয়”। মুজাহিদ (রা.) বলেন : “কেবল সেই আলেম যে আল্লাহকে ভয় করে।”

সত্যপন্থী হক্কানী আলেমগণ হচ্ছেন একটি জাতির, একটি দেশের, বিশেষত মুসলিম উম্মাহ্র শ্রেষ্ঠ সন্তান, সর্বোপরি এক একজন পথপ্রদর্শক। একজন শিক্ষিত লোক, ধনী লোক, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, যদি তার মধ্যে আল্লাহ ভীতি না থাকে, তাহলে আল্লাহ্র নিকট তার কোন মূল্য নেই। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে– “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারাস্বাস্থ্য ও ধনসম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান”।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আলেমদের মর্যাদার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন : “যারা জানে ও যারা জানে না, তারা কি এক সমান হতে পারে? (সূরা জুমার : )

যদি তোমরা না জান তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর” (সূরা নাহল : ৪৩)

আলেমদের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন : “তোমাদের উপর আমার মর্যাদা যেমন, একজন ইবাদতকারীর উপর আলেমের মর্যাদা তেমন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, যাঁরা জনগণকে দ্বীনি ইলম শেখায় তাদের জন্য আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমান ও জমিনের অধিবাসীগণ, এমনকি গর্তের পিঁপড়া ও মাছ পর্যন্ত কল্যাণ কামনা করতে থাকে” (তিরমিযী)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, একজন বিজ্ঞ আলেম শয়তানের নিকট এক হাজার আবেদের চেয়ে ভয়াবহ” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

বর্ণিত হাদীস দুটি থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, আলেমদের মর্যাদা কত বেশি!

হক্কানী ওলামায়ে কেরাম ও পীরমাশায়েখদের কারণে দ্বীন ইসলাম এবং কুরআনহাদীসের চর্চা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এমন এক সময় আসবে যখন হক্কানী আলেমগণ ব্যতীত বেআলেম, সাধারণ মুসলমান নিজের খেয়ালখুশিমত শরীয়াতের বিভিন্ন বিষয়ে ফাতওয়া দেওয়া শুরু করবে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, নিশ্চই আল্লাহ ‘ইলম’ বা জ্ঞানকে তাঁর বান্দাদের মন থেকে টেনেহেঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাবেন না, বরং আলেমদেরকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ইলমকে উঠিয়ে নেবেন। এরপর যখন কোন আলেম অবশিষ্ট থাকবে না, মানুষ অজ্ঞ জাহেল লোকদেরকে নেতা বানাবে, তারপর তাদের নিকট ফাতওয়া জিজ্ঞেস করবে। তখন তারা বিনা ইল্মেই ‘ফাতওয়া’ দিবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে” (বুখারী ও মুসলিম)

ওলামায়ে কিরামের দায়িত্ব ও কর্তব্য

ওলামায়ে কিরামের মর্যাদার পাশাপাশি তাঁদের অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ত ‘ইল্ম’ যদি তার আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে কাজে না লাগায়, তাহলে তাদেরকেও আল্লাহ্র কাঠগড়ায় বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। দ্বীন ইসলামের প্রচার ও প্রসারে একজন আলেমের প্রধান ভূমিকা থাকা উচিত। কারণ এই দাওয়াতী কাজ আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-সহ সকল নবীরাসূল () করে গেছেন। তাঁদের উত্তরসূরি হিসেবে আলেমদেরকেও এই দাওয়াতী কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। এই বিষয়ে আল্লাহর হুকুম হচ্ছে– “তুমি তোমার প্রভুর পথে (মানুষকে) হেকমত (প্রজ্ঞা) ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে ডাকো।” (সূরা নাহল : ১২৫)

তোমরাই উত্তম জাতি, তোমাদেরকে বের করা হয়েছে মানুষদেরকে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার জন্য” (সূরা আলে ইমরান : ১১০)

তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে” (আলে ইমরান : ১০৪)

এই আয়াতগুলো দ্বারা আল্লাহতায়ালা দাওয়াতের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। একজন দা‘ঈ আল্লাহতায়ালার নিকট অনেক সম্মানের অধিকারী। আল্লাহ বলেন– “তার কথার চেয়ে আর কার কথা অধিক উত্তম হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকাজ করে এবং বলে, আমি একজন মুসলমান” (সূরা হামীমসাজদা : ৩৩)

বাংলাদেশে ইলমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের ইতিহাস

বাংলাদেশে ইলমে দ্বীনের চর্চা, প্রচার ও প্রসারের ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত কয়েকজন পীর আউলিয়া ও মুহাদ্দিসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিম্নে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এ ব্যাপারে দ্বীনের দায়ীদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের পরিচয় তুলে ধরা হলো।

আলাউদ্দীন হোসাইন শাহ : আলউদ্দীন হোসাইন শাহ ইবনে সাইয়েদ আশরাফ মক্কী হিজরি ৯০০ সন থেকে ৯২৪ সন পর্যন্ত বঙ্গদেশে রাজত্ব করেন। তাঁর শাসনামলে কুরআন ও হাদীস শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন করার ব্যাপারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী লোকদেরকে তাঁর রাজ্যে আসার ও বসবাস করার আহ্বান জানান। তিনি হিজরি ৯০৭ সনে তৎকালীন গৌড়স্থ গুরবাযে শহীদ নামক স্থানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইলমে দ্বীনের শিক্ষা দান করা হত। তারই শাসনামলে মুহাম্মদ ইবনে ইয়জদান বখশ সহীহ বুখারীকে তিন খন্ডে ভাগ করেন।

মুহাদ্দীস শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা : মুহাদ্দিস শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা হিজরি সপ্তম শতকে ঢাকা জেলাধীন সোনারগাঁও আগমন করেন এবং এখানে ইলমে দ্বীন শিক্ষা দানের ব্যাপক ব্যবস্থা করেন। ফলে সোনারগাঁও ইলমে দ্বীনের একটি শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়। পূর্ব বাংলার রাজধানী হিসেবে তখন সোনারগাঁয়ে বহুসংখ্যক কোরআনহাদীসবিশারদ সমবেত হন। ফলে এ স্থানের বহুলোক ইলমে দ্বীনের শিক্ষা লাভ করে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তখন সে অঞ্চলে দ্বীন চর্চার এতই ব্যাপকতা ছিল যে, দ্বীন চর্চার কেন্দ্র হিসেবে বহু মসজিদ ও খানকা নির্মাণ করা হয়।

হযরত শাহজালাল ইয়ামানী : তিনি আরবের ইয়েমেন হতে বাংলাদেশের সিলেট আগমন করেন এবং ৩৬০ জন সহচর আউলিয়াসহ বাংলাদেশে দ্বীন প্রচার করেন। পাশাপাশি ইলমে হাদীস শিক্ষা দান করেন।

শাহ বদরুদ্দীন বদরে আলম জাহেদী : তিনি হযরত শিহাবুদ্দীন ইমাম মক্কীর বংশধর। তাঁর পিতা তার প্রতি দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করলে তিনি অসংখ্য সহচরসহ চট্টগ্রামে আগমন করেন এবং তথায় ইসলামের আলো বিস্তার করেন। মুসলমানগণের মাঝে তিনি ইলমে দ্বীনের জ্যোতি ছড়িয়ে দেন।

হযরত খানজাহান আলী : তিনি দক্ষিণ বাংলার খুলনা অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগমন করেন। পাশাপাশি ইসলামে দিক্ষীত মুসলমানগণকে তিনি ইলমে দ্বীনের শিক্ষা দান করেন।

সৈয়দ আলী বাগদাদী : তিনি একশজন সহচরসহ ইসলাম প্রচারের উদেশ্যে তুঘলক রাজত্বের শেষের দিকে বাগদাদ হতে ভারতে আগমন করেন। তিনি কিছুকাল দিল্লী অবস্থান করেন এবং তথায় সৈয়দ রাজত্ব শুরু হলে সৈয়দ রাজবংশে বিবাহ করেন। রাজ দরবার হতে বাংলার ফরিদপুর জেলার ঢোল সমুদ্র নামক স্থানে ১২ হাজার বিঘা লাখেরাজ জমি প্রাপ্ত হয়ে তিনি বাংলায় আগমন করেন। দীর্ঘকাল ইলমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসার শেষে ঢাকার মিরপুরে ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরিদপুরী : তিনি ফরিদপুর জেলার মাদারীপুরে শিবচর থানার অন্তর্গত শামাইল নামক গ্রামে তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সেই তিনি মক্কায় চলে যান এবং তথায় তিনি শায়খ তাহের সম্ভলের নিকট হাদীস, তাফসীর ও ফিকহশাস্ত্রে দীক্ষা লাভ করেন। সেখানে দীর্ঘকাল অবস্থানের পর তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং নিজ এলাকায় ইলমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

মাওলানা আবদুল কাদের সিলেটী : তিনি ছিলেন মাওলানা ইদ্রীস সিলেটীর পুত্র। তিনি একজন বিখ্যাত আলেম ও হাদীস বিশারদ ছিলেন। হাদীস বিষয়ে তাঁর লিখিত বিভিন্ন কিতাব রয়েছে।

মাওলানা ইমামুদ্দীন হাজীপুরী : তিনি শাহ আবদুল আযীয দেহলভীর এবং সৈয়দ আহমদ বেরলভীর খলিফা ছিলেন। তিনি সৈয়দ আহমেদের সাথে পেশওয়ার জেহাদে যোগদান করেন। সৈয়দ আহমেদের শাহাদাতের পর তিনি রামপুর হয়ে নিজ জেলা নোয়াখালীতে প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তিনি জীবনের বাকি অংশ কুরআন ও হাদীসের চর্চা, প্রসার ও প্রচারে অতিবাহিত করেন।

মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী : তিনি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে জৌনপুরীর এক সম্ভ্রান্ত ছিদ্দিকী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাওলানা আহমদুল্লাহ আমানীর নিকট ইলমে হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেন। সৈয়দ শহিদ বেরলভীর নিকট থেকে তিনি ইলমে মারেফত অর্জন করেন। সৈয়দ শহিদের আদেশে তিনি বাংলাদেশে ইলমে দ্বীন ও ইলমে হাদীসের প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। প্রায় একান্ন বছরকাল এ কাজে ব্যাপৃত থেকে তিনি উত্তর বঙ্গের রংপুর জেলায় ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা হাফেয আহমদ জৌনপুরী : তিনি কলিকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি উচ্চস্তরের আলেম ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি তার গোটা জীবন বাংলাদেশে ইসলাম ও ইলমে দ্বীনের প্রচারে ব্যয় করেন।

মাওলানা আবদুল ওয়াহেদ চাটগামী : তিনি চট্টগ্রামের খরন্দ্বীপে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম যুগে মাওলানা ইয়াকুব নানুতবী প্রমুখ মুহদ্দিসগণের নিকট ইলমে দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে নিজ এলাকায় এসে মাওলানা আবদুল হামীদসহ কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তির সহযোগিতায় ১৯০১ সালে তিনি হাটহাজারিতে ‘মইনুল ইসলাম’ নামে একটি কাওমী মাদরাসায় ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ও প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৯০৮ সালে মাদরাসাটিকে তিনি দাওরায়ে হাদীস স্তরে উন্নীত করেন।

মাওলানা ওয়াজীবুল্লাহ সন্দ্বীপী : তিনি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরির সাথে দেওবন্দে ইলমে দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করেন। শিক্ষাগ্রহণ শেষে তিনি নোয়াখালী আহমাদিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন এবং সমগ্র জীবন ইলমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তিনি একজন অসাধারণ মেধা সম্পন্ন ব্যক্তি ও ইলমে দ্বীনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

মাওলানা আব্দুল হাকীম (.) : তিনি কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া থানার অর্ন্তগত শশীদল ইউনিয়নের আশাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। সেখান থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে বটগ্রাম মাদরাসা, চৌয়ারা ফাযিল মাদরাসাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বহু দ্বীনি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। সর্বশেষে তিনি ১৯৪৪ সালে বাগড়া দারুল উলুম ফাযিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বীন প্রচার ও প্রসারে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৮৬ সালে ২৬ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। এছাড়াও প্রখ্যাত আলেমগণের মধ্যে দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছিলেন তেতাভূমি দায়রায়ে রাহমানিয়ার মাওলানা আব্দুর রহমান পীর সাহেব (বড় হুজুর), নাগাইশ দরবার শরীফের মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক (রাহ.) সোনাকান্দার আব্দুর রহমান হানাফী (রাহ.), আড়াইবাড়ীর আজগর আহমাদ ছাইদ আল কাদরী (রাহ.), ধামতী আলিয়া মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আজীম উদ্দিন (রাহ.)। শর্ষিনা আলীয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা নেছার উদ্দিন (রাহ.)। তারাও দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্বীন প্রচারের স্বার্থে বহু দ্বীনি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করেন।

পরিশেষে বলা যায়, মানবতার মুক্তির দিশারি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সুমহান আদর্শকে উজ্জীবিত করার জন্য ওলামায়ে কিরামের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সময়ের অনিবার্য দাবি। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন– “আমি তোমাদের নিকট দুইটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যাবত তোমরা সে দু’টি মজবুতভাবে আঁকড়ে থাকবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না : আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত (হাদীস)।” আর এ কথাও প্রতিয়মান হয় যে, ইলম সূত্রে আলেমগণ হচ্ছেন নবীদের ওয়ারিশ। সুতরাং, যদি কেহ হক্কানী আলেম, পীরমাশায়েখ এবং দ্বীনের দা’ঈদের সমালোচনা এবং বিরোধিতা করে তাহলে তারা যেন নবীরাসূলদের বিরোধিতা করল।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে দ্বীনইসলামের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ১ ডিসেম্বর ২০১৬
Advertisements

সোনাদিয়া দ্বীপে পর্যটন সম্ভাবনা

sonadiya-island-1sonadiya-island-2

কবুতর পালন করে ভাগ্য ফিরিয়েছে গ্রামের নারীরা…

women-rearing-pigeons

শতবর্ষাধিক প্রাচীন ঠাকুরগাঁও সরলারি হাই স্কুল

thakurgaon-boys-high-school

নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র

dinbandhu-mitraনাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম ১৮৩০ সালের ১ ডিসেম্বর। লেখাপড়ার প্রতি তাঁর তীব্র ঝোঁক ছিল। শিক্ষা লাভের জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। সেখানে গৃহভৃত্যের কাজ করে জীবনধারণ ও পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতেন। কলেজের সব পরীক্ষা না দিয়ে ১৮৫৫ সালে ১৫০ টাকা বেতনে পাটনায় পোস্টমাস্টার পদে চাকরি জীবন শুরু করেন। এরপর তিনি পোস্টমাস্টার জেনারেলের সহকারী পদে উন্নীত হন। সে সময় ডাক বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল হগের অপ্রীতিভাজন হওয়ায় অপসারিত হন তিনি।

১৮৭২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের ইন্সপেক্টর পদে যোগদান করেন। তার সাহিত্য জীবনের শুরু কবিতা দিয়ে। ঈশ্বর গুপ্তের সংস্পর্শে এসে তারই অনুপ্রেরণায় কবিতা লিখে সংবাদ প্রভাকর ও সংবাদ সাধুরঞ্জন পত্রিকায় প্রকাশ করেন। তার সুরধ্বনি কাব্য ও দ্বাদশ কবিতা সেকালে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। নাট্যকাররূপেই দীনবন্ধু মিত্র সমধিক খ্যাত।

কর্মজীবনে সরকারি কাজে গ্রামগঞ্জে ঘোরার ফলে বহু লোকের সঙ্গে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। মানবচরিত্র ও বাংলার সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে লাভ করেন ব্যাপক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন সংবেদনশীল মনের অধিকারী। অন্যের দুঃখে সহজে ব্যথিত হতেন। তাঁর নাটকে এসবের প্রতিফলন ঘটেছে।

নীলকর সাহেবদের বীভত্স অত্যাচারে লাঞ্ছিত নীলচাষিদের দুরবস্থা অবলম্বনে তিনি রচনা করেন নীল দর্পণ নাটক। এটি প্রকাশ হওয়ার পরই নীলকরদের বিরুদ্ধে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মাইকেল মধূসুদন দত্ত এটির ইংরেজি অনুবাদ করেন, সেই অনুবাদ লঙ সাহেব প্রকাশ করে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হন। এ নাটকের অভিনয় দেখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মঞ্চে জুতো ছুড়ে মারেন। আর সে জুতোই অভিনেতা পুরস্কার হিসেবে মাথায় তুলে নেন।

তিনি প্রহসন রচনায়ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কলকাতার ইংরেজি শিক্ষিত নব্য যুবকদের মদ্যপান ও বারবনিতা সঙ্গকে ব্যঙ্গ করে সধবার একাদশী ও সমাজের প্রাচীনপন্থীদের বহুবিবাহ লিপ্সাকে ব্যঙ্গ করে বিয়ে পাগলা বুড়ো প্রহসন রচনা করেন। নবীন তপস্বিনী, লীলাবতী, জামাই বারিক, কমলে কামিনী তাঁর অন্যান্য নাটক।

১৮৭৩ সালের ১ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

কালের সাক্ষী মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি

murapara-zamindarbariজি এম সহিদ : রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া জমিদারবাড়িকে ঘিরেই রূপগঞ্জের ইতিহাস, কৃষ্টি, সভ্যতা ও আজকের এই কোলাহলপূর্ণ জনবসতি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে মহাকালের নীরব সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জমিদারবাড়িটি। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার মুড়াপাড়া এলাকায় ৫২ বিঘা জমির ওপর এই জমিদারবাড়ি অবস্থিত।

বিশাল জমিদারবাড়িটিতে রয়েছে মোট ৯৫টি কক্ষ। নাচঘর, আস্তাবল, গোপন সিঁড়ি, উপাসনালয়, কাছারিঘর। বিশালাকৃতির প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতে হয় ভেতরে। অন্দর মহলে রয়েছে আরও দুটি ফটক। সর্বশেষ ফটক পেরিয়ে মেয়েদের স্নানের জন্য ছিল শান বাঁধানো পুকুর। পুকুরের চারধার উঁচু দেয়ালে ঘেরা। বাড়ির সামনে রয়েছে আরও একটি বিশাল পুকুর। পুকুরটির চারদিক নকশি কাটা ঢালাই লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। আর চারদিকে চারটি শান বাঁধানো ঘাট। পুকুর জুড়ে টলমল করছে পানি।

পুকুর সংলগ্ন মন্দির। মন্দিরে বড় দুটি চূড়া রয়েছে। প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। এর প্রবেশদ্বারগুলো খিলান দিয়ে নির্মিত। মন্দিরের মূল কক্ষ বেশ ছোট, অন্ধকার। মন্দিরের বাঁপাশ ঘেঁষে ছায়াঘেরা শান্তশ্যামল বিশাল আম বাগান। এখানে আছে সারি সারি পান ও সুপারি বাগান। জানা যায়, জমিদার রাম রতন ব্যানার্জী তত্কালীন মুড়াপাড়া জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং জমিদারদের ঊর্ধ্বতন ষষ্ঠ পুরুষ। তিনিই মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ির গোড়াপত্তন করেন। রাম রতন ব্যানার্জীর ছেলে পীতাম্বর ব্যানার্জী এবং তার ছেলে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী শাহজাদপুরের জমিদারি কিনে নিজের জমিদারি বিস্তৃত করেন।

কথিত আছে, জমিদারি কেনার সূত্র ধরে প্রতাপ ব্যানার্জীর সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। ১৮৮৯ সালে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী পৈতৃক এজমালি পুরনো বাড়ি ত্যাগ করে এ প্রাসাদের পেছনের অংশ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। প্রতাপ চন্দ্রের ছেলে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী ১৮৯৯ সালে প্রাসাদের সামনের অংশের একতলা ভবন নির্মাণ ও সেখানে দুটি পুকুর খনন করেন। এই কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হূদরোগে মারা যান। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথম গ্রাজুয়েট।

বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জীর দুই সুযোগ্য সন্তান জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী ও আশুতোষ চন্দ্র ব্যানার্জী ১৯০৯ সালে প্রাসাদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। এ অঞ্চলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জীর নাম সমধিক প্রসিদ্ধ। কারণ তিনি দুবার দিল্লির কাউন্সিল অব স্টেটের পূর্ববঙ্গ হতে সদস্য নির্বাচিত হন। জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী প্রজা সাধারণের কল্যাণে স্থাপন করেছেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কেটেছেন পুকুর। এই জনহিতকর ইতিহাসের উল্টাপিঠেই রয়েছে অত্যাচার আর নির্যাতনের বহু ঘটনা। জমিদারি প্রথার শেষ দিকে শুরু হয় প্রজাদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন আর ক্ষমতার অপব্যবহার। সুন্দরী মেয়ে, ঘরের বধূএদের কারও ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়লেই সে রেহাই পেত না। ধীরে ধীরে এই অত্যাচারের মাত্রা বাড়তেই থাকে। জমিদারি প্রথার শেষ দিকে নানাভাবে বিদ্রোহের পটভূমি তারই অংশ।

১৯৪৭ সালে পর তত্কালীন জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী সপরিবারে কলকাতায় চলে যান। ফলে জমিদারবাড়িটি শূন্য হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি সরকারের দখলে চলে যায়। পরে ১৯৬৬ সালে এখানে হাই স্কুল ও কলেজ স্থাপিত হয়। বর্তমানে জমিদারবাড়িটি মুড়াপাড়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

জমিদারবাড়িটিতে সারা বছরই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। বিদেশি পর্যটকরাও আসেন। নয়ন জুড়ানো রূপগঞ্জের এ জমিদারবাড়ির ভেতরের অপরূপ কারুকাজ, নিপুণ হাতের শিল্পকর্ম দেখে আজও পর্যটকরা বিস্মিত হন। ভ্রমণপিপাসু ব্যক্তিরা এ জমিদারবাড়িটি দেখতে চাইলে ঢাকা থেকে আসতে সময় লাগে মাত্র ৪০৫০ মিনিট। বাস, প্রাইভেট কার অথবা সিএনজিতে আসতে পারেন এখানে। প্রথমে নামতে হবে রূপসী অথবা ভুলতা বাস স্টেশনে। সেখান থেকে সিএনজি অথবা অটোরিকশা করে আসতে পারেন জমিদারবাড়িতে। এলেই আনন্দ পাবেন।

সূত্রঃ দৈনিক সকালের খবর, ১ ডিসেম্বর ২০১৬

২০৪৫ সালে যেমন হতে পারে জীবন ও জগৎ !

world-2045