প্রথম পাতা > জীবনী, বাংলাদেশ, রাজনীতি > মোহন মিয়া : একটি অবিস্মরণীয় নাম

মোহন মিয়া : একটি অবিস্মরণীয় নাম

mohon-mian-3ডা. ননীগোপাল সাহা : যে যুগে ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়া তাঁর কর্মমুখর জীবনের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সে যুগ ছিল সাফল্যে পরিপূর্ণ। সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি কোনো ক্ষেত্রেই শূন্যতা ছিল না। অভাব ছিল না সুযোগ্য নেতৃত্বের। সেদিনের রাজনৈতিক অঙ্গনে মোহন মিয়া ছিলেন এক সুযোগ্য ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। আমার ছাত্রজীবনে আমি তাঁকে দূর থেকে দেখেছি। কিন্তু কর্মজীবনে অতি কাছে থেকে তাঁকে দেখার এবং জানার সুযোগ হয়েছিল আমার। প্রাসাদে জন্ম নিয়েও জীবনের রাজপথ ছেড়ে তিনি নেমে এসেছিলেন জনতার পায়ে চলার পথে। প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলেন এই বাংলার মাটি ও মানুষকে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা ছিল মানবতাবাদ। মোহন মিয়া পুঁজিবাদ বা কমিউনিজম কোনোটিতেই বিশ্বাস করতেন না। তিনি কল্পনা করতেন এক লোকাশ্রিভ গণতন্ত্রের, যার লক্ষ্য ছিল গ্রামবাংলার উন্নতি। বহুদিন বহুকান্ত অবসরে তিনি এই গ্রামবাংলার কৃষকশ্রমিকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন।

পৃথিবীতে ভিন্ন মত ও ভিন্ন পথ চিরকাল ছিল, চিরকাল থাকবে। কখনো তা বস্তুগত, কখনো ভাবগত, আবার কখনো আদর্শগত। এর ফলে মানুষে মানুষে অনেক সময় সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু মানবিক সম্পর্ক কোনো দিনই বিচ্ছিন্ন হয়নি। জনাব ইউসুফ আলী চৌধুরীর সঙ্গে আমার ছিল একটি আত্মিক ও মানবিক সম্পর্ক। ভারতবর্ষ তখন ইংরেজ শাসনাধীন। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তির জন্য স্বাধীনতা আন্দোলনের দুর্বার ঢেউ দিল্লি থেকে তখন সমগ্র ভারতের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। ফরিদপুরের সেই গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়া।

১৯৬৪ সাল, পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী একদিকে সরকারি দলের মনোনীত ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান, অন্যদিকে সম্মিলিত বিরোধী দলের মনোনীত প্রার্থী পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভগ্নী মাদারে মিল্লাত মিস ফাতেমা জিন্নাহ। গণতন্ত্র উদ্ধারের সেই আন্দোলনে ফরিদপুরের গণতন্ত্রকামী বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা ও কর্মীরা Combined Opposition Party (COP)-এর অধীনে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারাভিযানে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। আমিও তাঁদের সঙ্গে একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে শামিল হয়েছি। মোহন মিয়া ছিলেন সত্যিকার গণতন্ত্রকামী মহান পুরুষ। ন্যায়নীতির ক্ষেত্রে তিনি কখনো কারো সঙ্গে আপস করেননি।

এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়েছে। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের জয়লাভের পর দীর্ঘদিন কেটে গেছে। আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন শুরু হয়েছে। সে আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃতি লাভ করছে। সংগ্রামী রূপ নিচ্ছে। এ সময় করাচিতে Round Table Conference-এর আয়োজন করেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। পূর্ব পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক নেতাকে আমন্ত্রণ জানান সেই বৈঠকে যোগ দিতে। মোহন মিয়া জনগণের অধিকারের বিনিময়ে তথা গণতন্ত্রের বিনিময়ে কোনো আপস ফর্মুলা কোনো দিনই গ্রহণ করেননি।

মোহন মিয়া তাই নিজেই এককভাবে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারাভিযানে অবতীর্ণ হন। তাঁর সেই অভিযানে আমি ছিলাম প্রধান সাথি। ফরিদপুর সদরে নির্বাচনী ফলাফলে ফাতেমা জিন্নাহ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ভোট বেশি পান। এর পেছনে মোহন মিয়ার অবদান ছিল প্রচুর। নির্বাচন শেষে আমরা বিভিন্ন থানায় মোট ১১টি জনসভা করি। মোহন মিয়ার সঙ্গে মফস্বলের গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করি। সেই সঙ্গে তাঁকে খুব কাছ থেকে জানার সুযোগ পাই। পথে চলতে চলতে অনেক সময় আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মোহন মিয়াকে কখনো ক্লান্ত হতে দেখিনি। অপরিমেয় প্রাণশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকে তিনি যে খুব সুস্থ ছিলেন তা নয়। তাঁর High blood pressure ছিল। তা সত্ত্বেও তাঁকে সব সময় হাসিখুশি দেখেছি। মাঝেমধ্যে তিনি সুন্দর Humour করতেন। তাঁর সঙ্গে এক টেবিলে বসে খানাপিনার সুযোগ আমার অনেকবার হয়েছে। টেবিলে বসার আগে তিনি তাঁর Blood pressure Diet control-এর কথা বারবার হাসতে হাসতে বলতেন। কিন্তু খানাপিনা করার সময় Diet control-এর কোনো লক্ষণ আমি দেখিনি। নিজের প্রতি মমত্ববোধ তাঁর খুবই কম ছিল। সত্যিকার দেশপ্রেমিক মানুষের কল্যাণে যাঁরা উৎসর্গীকৃত, নিজের প্রতি মমত্ববোধ তাঁদের থাকে খুবই কম।

তাঁর সঙ্গে যেখানেই গিয়েছি, দেখেছি অসংখ্য লোককে তিনি চেনেন এবং তাঁদের নামধাম তাঁর মুখস্থ। অসাধারণ ছিল তাঁর স্মৃতিশক্তি। না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

তাঁর সহনশীলতাও ছিল অসাধারণ। প্রতিদিন ময়েজ মঞ্জিলে সকাল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত কত অসংখ্য লোক তাঁর কাছে এসেছেন কত আবেদননিবেদন নিয়ে। তিনি সবার কথা শুনেছেন, কখনো বিরক্ত হননি। কাউকে ফিরিয়ে দেননি। চেষ্টা করেছেন সবাইকে সাধ্যমতো সাহায্য করতে। তাঁর এই অসীম ধৈর্য ও সীমাহীন সহনশীলতা শুধু দুর্লভ নয়, তুলনাবিহীন।

বিডি মেয়রদের (মৌলিক গণতন্ত্রী) সঙ্গে আলাপ করার সময় আমি দেখেছি অতি সহজেই তিনি তাঁদের মত পরিবর্তন করে স্বপক্ষে আনতে পারতেন। প্রতিকূলকে অনুকূল করে তোলার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। স্বামী বিবেকান্দ বলেছেন, Expansion is life, contraction is death. ব্যক্তি ও গতিময়তাই মোহন মিয়ার জীবন। তাঁর সুবিশাল বহুধাবিস্তৃত রাজনৈতিক জীবনের অতি সামান্য আমি জানি। আমি যা জানি, যেটা জানি সেটা একটা ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। মোহন মিয়ার চরিত্রের একটি বিশিষ্ট দিক তা হচ্ছে, তিনি ছিলেন শতভাগ অসাম্প্রদায়িক। ফরিদপুরের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধাভাজন একান্ত প্রিয়জন, একান্ত আপনজন। মহাকাল অনেক কিছু দেয়, কিন্তু জীবনে এমন কিছু স্মৃতি, এমন কিছু কথা থাকে, যা কোনো কালের প্রভাবে ম্লান হয় না। আমার প্রতি মোহন মিয়ার অপার স্নেহের আনন্দময় স্মৃতি আমার মনের মণিকোঠায়, তাই থাকবে চির অম্লান।

mohon-mian

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: