বই পড়ার আদবকেতা

books-6আফরোজা জাহান : বই, এই নামটা শুনলে কারো হয়তো ভ্রু কুঁচকে যায় আর কেউ হারিয়ে যায় তুষার শুভ্র সাদা পাতার দেশে যেথায় ছড়িয়ে থাকে নানা ছন্দের, নানা আবেগের শব্দ নামক কালো মুক্ত। সেই কালো মুক্ত কুড়ানোর নেশা যার একবার হয়েছে সেই জানে এই নেশায় রাত দিন ভুলে হারিয়ে যাওয়া যায় বর্তমান থেকে অতীতে, অতীত থেকে ভবিষ্যতে। বইয়ের প্রতি এমন নেশা বা ঝোক অনেকেরই আছে। তাই তো এই নেশার জন্য কেউ ডাকে তাদের বইয়ের পোকা আর কেউ বা ডাকে বই পাগলা। আমাদের রোজকার জ্ঞান ও বিনোদনের সঙ্গী এই বইয়ের ব্যবহারের প্রতি আমাদের কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই।

অবাক হচ্ছেন? বইয়ের ব্যবহার মানে শুধু বই নিলাম আর পড়লাম এই নয়। মানুষের সবচেয়ে কাছের বন্ধু বইয়ের ও লাগে আলদা যত্ন আর এর ব্যবহারেও রয়েছে কিছু আদবকেতা। বসার ঘর ভর্তি বই, দেখতে খুব ভালো লাগে। বাসায় অতিথি আসলে তাদের মাঝে ও এই ভালো লাগাটা কাজ করে। এটা ঠিক অন্যান্য ঘর সাজানো জিনিসের মতো বই ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু এটা ভুললে চলবে না, বই প্রথমত মনকে আলোকিত ও প্রসারিত করার উপকরণ, তারপর সৌন্দর্যবর্ধক হিসেবে কাজ করে। তাই বই কেনা, ঘরে রাখা ও ব্যবহারের আগে এই ব্যাপারটা মনে রাখতে হবে। এই একটা ভাবনা থাকলে বইয়ের সঠিক ব্যবহার, যত্ন ধীরে ধীরে জানা হয়ে যায়। বই পড়া ও এর ব্যবহারের কিছু আদবকেতা দেওয়া হলো।

বই পড়ার সময় কি করবেন আর কি করবেন না :

* বই পড়ার সময় কলম বা পেন্সিল দিয়ে দাগ দিবেন না। আর পড়ার সুবিধার জন্য যদি কোনো শব্দ বা বাক্যকে দাগিয়ে পড়তেই হয় তবে ছোট করে হালকাভাবে দাগ দিন। যেন আপনার পরে কারো পড়তে সমস্যা হয় না।

* বইয়ের পাতা কখনো ভাজঁ করে রাখবেন না। পেজমার্ক ব্যবহার করুন। বই ও ভালো থাকবে, খুঁজে পেতে সহজ হবে।

* পাতা উল্টানোর সময় থুতু ব্যবহার করবেন না। ভেবে দেখুন, আপনার মতো অনেকেই এই বই উল্টানোর সময় হয়তো থুতুই ব্যবহার করেছে। আর ব্যাপারটা আনহাইজিনিক।

* বইয়ের পাতায় স্টিলের পেপার ক্লিপ লাগাবেন না। মরচে পড়ে বইয়ের পাতা নষ্ট হয়ে যাবে।

* নিজের বই হোক বা লাইব্রেরির কখনো প্রয়োজন বলে বইয়ের পাতা ছিঁড়বেন না। কিছু দরকার হলে নোটবুকে সেই তথ্যটা লিখে নিন।

* বই পড়তে পড়তে তা উল্টে রাখবেন না, বিশেষ করে মোটা, বড় বই। এতে বইয়ের বাইন্ডিং ছিঁড়ে যেতে পারে।

* বইয়ের মধ্যে ফুল রাখার অভ্যাস আমাদের অনেকেরই আছে। কিন্তু এটা ঠিক না। এর ফলে পাতার রঙ নষ্ট হয়ে যায়।

* কোনো পুরোনো নথিপত্র, বইয়ের পাতা ছেঁড়া থাকলে সেলোটেপ লাগানোর আগে জেনে নিতে হবে বই এর সংরক্ষণের জন্য তা নিরাপদ কি না।

* লাইব্রেরিতে বই পড়লে ডিসপ্লে সেকশন থেকে বই নিয়ে, সেখানেই আবার রেখে দিবেন। অন্য কোনো সেকশনে রাখবেন না। এতে অন্য কারো বই খুঁজে পেতে কষ্ট হবে।

বই রাখুন গুছিয়ে :

books-5মানুষের প্রতিটি কাজের মধ্য দিয়েই তার রুচির প্রকাশ পায়। এমনকি বই এর ব্যবহার, যত্ন ও গুছানোর মধ্য দিয়েও বইয়ের মালিকের ও রুচির প্রকাশ পায়। বই গুছিয়ে রাখার জন্য কিছু ব্যবহার মনে রাখা দরকার।

* বিষয় বা লেখকের নাম অনুসারে বই গুছিয়ে রাখুন। প্রয়োজনের সময় খুঁজে পেতে সময় কম লাগবে।

* আরো সহজে বই খুঁজতে লাইব্রেরির মতো নিজের সংগ্রহে থাকা বইয়ে লেবেলিং ও ট্যাগ লাগিয়ে নিতে পারেন।

* সরাসরি রোদে বই না রাখাই ভালো, বইয়ের পাতা খারাপ হয়ে যেতে পারে।

* স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় বই সংরক্ষণ করবেন না। বই ড্যাম্প হতে পারে।

* বুকশেলফে বই সোজা করে রাখা উচিত। গাদাগাদি করে বই রাখলে বইয়ের বাইন্ডিং খুব সহজে নষ্ট হয়ে যাবে।

* বইয়ের ছেঁড়া বা আলগা পাতা থাকলে বই বাধিঁয়ে নিন।

* বইয়ে পোকামাকড় যাতে না ধরে সেই জন্য নিমপাতা শুকিয়ে বা ন্যাপথলিন বুক শেলফে রেখে দিবেন। পোকার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাবেন। মাঝে মাঝে এগুলো পরিবর্তন করে নতুন করে দিবেন।

* বইয়ের রাখার স্থান যাই হোক, তা মাঝে মাঝে পরিষ্কার করুন। বইয়ের ওপর ধূলাবালি জমলে বই নষ্ট হয়ে যেতে পারে খুব সহজে।

বই দেওয়ানেওয়ার নিয়ম :

books-7সব সময় বই কিনে পড়া সম্ভব হয় না। তাই বই দেওয়ানেওয়া একটা সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য, বই পড়তে নিয়ে অনেকেই তা ফেরত দেন না। কেউ ইচ্ছা করে ফেরত দেয় না কেউ বা আবার ফেরত দিলেও বই নেওয়ার সময় যেমন নিয়েছেন সেই রুপে ফেরত দেন না। হয় মলাটটা ছিড়ে গেছে, নয়তো ঝোল পড়েছে বইয়ে, এমন অবস্থায় ফেরত দেন। যা কখনোই উচিত নয়।

তাই বই নেওয়া ও তা ফেরত দেওয়ার সময় কিছু ব্যাপার মনে রাখতে হবে।

* কাউকে বই ধার দিলে বইয়ের নাম, যাকে দিচ্ছেন তার নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা লিখে রাখুন। এতে বই হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

* বই ধার যেভাবে নিয়েছেন সেভাবেই ফেরত দিতে চেষ্টা করবেন।

* বই ফেরত দেওয়ার সময় মলাট করে ফেরত দিতে পারেন। তাতে আপনার সুরুচি প্রকাশ পাবে।

* বই ধার নিলে যথাসময়ে ফেরত দিবেন। তাতে আপনার সময়ানুবর্তী মনোভাব ও প্রকাশ পাবে। যদি পড়া না হয়ে থাকে তবে বইয়ের মালিককে তা জানাবেন যে আপনার আরো কিছু সময় লাগবে। এর ফলে আপনার সম্পর্কে একটা ভালো মনোভাব অপর পক্ষের সৃষ্টি হবে।

বই এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা তখনই প্রকাশ পায় যখন বই পড়ার আদবকেতা মনে রেখে কেউ বই পড়ে আর যত্ন নেয়। নয়তো বই প্রেমিক হিসেবে তার নম্বর কমতে বাধ্য। তাই বইকে ভালোবাসুন, বইয়ের মতো খাঁটি বন্ধু আর নেই।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: