প্রথম পাতা > পরিবেশ, বাংলাদেশ, শিল্প, স্বাস্থ্য > ঢাকার চারপাশে ইটভাটা বাড়িয়ে দিচ্ছে বায়ুদূষণ

ঢাকার চারপাশে ইটভাটা বাড়িয়ে দিচ্ছে বায়ুদূষণ

kiln-1দেলোয়ার জাহান: রাজধানীর ঢাকা উদ্যানের উত্তর দিকে দ্বীপনগর পাথরবাড়ী বুড়িগঙ্গা নদীর পারে দাঁড়ালে চোখে পড়ে ৫০টি ইটভাটা। ভাটাগুলোর চিমনি দিয়ে বেরোনো কালো ধোঁয়া উত্তরের বাতাসে রাজধানীর দিকে ভেসে আসে। এই ৫০টি ইটভাটার মতো রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে রয়েছে আরও প্রায় ২ হাজারের বেশি ইটভাটা। এসব ইটভাটার ধোঁয়া ও ক্ষতিকারক গ্যাস রাজধানীর বায়ুদূষণে নতুন মাত্রা যোগ করছে বলে জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।

বরাবরের মতো চলতি শীত মৌসুমের শুরুতে প্রায় সবগুলো ইটভাটায় ইট তৈরি শুরু হওয়ায় ইতোমধ্যে রাজধানীতে দূষণের মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর তুরাগ, বালু ও বুড়িগঙ্গা নদীর পারে গড়ে ওঠা শত শত ইটভাটার ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর বাতাসে।

সাম্প্রতিক রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর বসিলা থেকে মিরপুর ব্রিজ, তুরাগ নদের মিরপুর বেড়িবাঁধ, পূর্বাচল বালু নদীর ব্রিজ, বুড়িগঙ্গার উত্তর পারের শ্যামপুর ও পোস্তাগোলা এলাকা সরেজমিন ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। এছাড়াও রাজধানীর প্রবেশমুখ আমিনবাজার, কেরানীগঞ্জ, ফতুল্লা, পাগলা ও আশুলিয়া দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করার সময় চোখে পড়ে ইটভাটার সারি সারি চিমনিযেগুলো থেকে কুণ্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে।

ঢাকা উদ্যান বুড়িগঙ্গা নদীর অন্য পরে গড়ে ওঠা নূর ব্রিকসের কর্মকর্তারা জানান, ইটভাটায় কাঠের পরিবর্তে কয়লা পোড়ানো হয়। সরকারি নিয়ম মেনে ইটভাটা পরিচালিত হয়। তবে অনেকে ব্যয় কমাতে কয়লার বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ফার্নেস অয়েল, প্লাস্টিক ও গাড়ির বাতিল টায়ারও ব্যবহার করে বলে জানান গাবতলীর মায়া কয়লা সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের কর্মী আয়াত আলী। তিনি জানান, এসব পোড়ানোর ফলে ইটভাটা থেকে বেশি কালো ধোঁয়া নির্গত হয়। এসব ইটভাটায় ভারত থেকে আমদানি করা তুলনামূলকভাবে সস্তা কয়লা পোড়ানো হয় বলে অভিযোগ করেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবার) নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান। তিনি বলেন, ইটভাটাগুলো পার্শ্ববর্তী এলাকার জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। রাজধানীর দেড় কোটির বেশি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ পড়ছে হুমকির মুখে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে ইটভাটায় সৃষ্ট দূষণে বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া কালো ধোঁয়ার কারণে মানুষের ফুসফুসের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট ও ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগ দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি ধুলাময়লা উড়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দেয়।

ইটভাটা সৃষ্ট দূষণ পরিবেশ বিপর্যয়সহ রাজধানীর চারপাশের কৃষি উৎপাদন ও ফলমূলের ফলনকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। রাজধানীর বাতাস এমনিতেই অনেক দূষিতম তার ওপর এর সঙ্গে চারপাশের ইটভাটার টন টন ধোঁয়া যোগ হয়ে রাজধানীর বাতাস আরও দূষিত করে তুলছে। ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটাগুলো অনতিবিলম্বে বন্ধ করে ১২০ ফুট চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটা জরুরি ভিত্তিতে কম ধোঁয়া সৃষ্টিকারী জিগজ্যাগে রূপান্তর করা প্রয়োজন।

বুয়েট কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ইজাজ হোসেনের ২০০৬ সালে ‘ইটভাটায় ঢাকার পরিবেশ দূষণ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১২০০ ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটাসহ অন্য সব ইটভাটা থেকে কয়লা ও গাছ পুড়ে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টন কার্বনড্রাইঅক্সাইড নির্গত হয়। এছাড়াও ইটভাটা থেকে নির্গমন হয় সালফারডাইঅক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডসহ আরও কিছু জৈব যৌগ।

ইটভাটার বিষয়ে কাজ করেন পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক মাসুদ ইকবাল। তিনি জানান, ইটভাটা থেকে বায়ুদূষণ বন্ধে পরিবেশ অধিদফতর কাজ করে চলেছে। এর মধ্যে পুরনো চিমনির স্থানে দূষণ কমানো চিমনি জিগজ্যাগ ব্যবহার বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জনবসতি ও ফসলের ক্ষেতের কাছে যেন ইটভাটা না গড়ে তোলা না হয় সেজন্যও পরিবেশ অধিদফতর পদক্ষেপ নিয়েছে। এছাড়াও আইন অমান্যকারীদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান পরিচালিত করে দায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে গত ১০ বছর ধরে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একটি স্যাটেলাইটের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা গত ১০ বছরে শতকরা আশি ভাগ বেড়েছে। ওই গবেষণায় ক্ষতিকারক নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ করে যাচাই করা হয়। নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড গ্যাস মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নিঃসরিত হয়। সংক্ষেপে এন ও টু নামে পরিচিত এই গ্যাসের মূল উত্স গাড়ির নির্গমন পাইপ ও কয়লা পোড়ানো হয় এমন শিল্পকারখানা।
অন্যদিকে ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব ইট তৈরি, কংক্রিট ইটসহ অন্য প্রযুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে স্বল্পপরিসরে হলেও দেশে কাজ শুরু হয়েছে। সরকার চলতি বাজেট প্রস্তাবে পরিবেশবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা কার্যক্রম সম্প্রসারণে ২০১৬১৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। একাধিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে দেশে প্রতিবছর ইটের চাহিদা প্রায় ১৫শ’ কোটি পিস। এজন্য ১২৭ কোটি টন মাটির প্রয়োজন হয়। নগরায়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে প্রতি বছর দুই থেকে তিনভাগ হারে ইটের চাহিদা বাড়ছে।

সূত্রঃ দৈনিক সকালের খবর, ২৬ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: