প্রথম পাতা > কবিতা, বাংলাদেশ, রাজনীতি, সাহিত্য > আবুল হাসানের রাজনৈতিক কবিতা ও বর্তমান

আবুল হাসানের রাজনৈতিক কবিতা ও বর্তমান

abul-hasan-12মোমিন মেহেদী : আবুল হাসানের কবিতায় আমাদের জীবনের কথা এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে, জীবনদর্শনরুটিরুজিপ্রেমভালোবাসার কথা আসলেই নীরবে বয়ে চলে। বাংলাদেশে সাহিত্যসাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ গড়ে উঠতে উঠতে তিলোত্তমা মন নিয়ে এগিয়ে যায় আদর আয়েশ। বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে খ্রিস্টীয় গত শতকের সেভেনটিইসে যাঁরা কবিতা লিখছেন, অ্যাজ অ্যা টেনডেন্সি তাদের কবিতা সমাজরাজনীতির নিচে চাপা পড়ে গেছে বলে অভিযোগ আছে। আর সেই অভিযোগের হাত থেকে মুক্তির জন্য নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বিনয়ের সাথে তার কবিতা পাঠ করতে করতে কবি আবুল হাসানকে কাব্যজ কথা ভাবতে থাকি। ভাবনায় চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ, জন্মমৃত্যু জীবনযাপন, উচ্চারণগুলো শোকের, অসভ্য দর্শন, মিসট্রেসঃ ফ্রি স্কুল স্ট্রীট, উদিত দুঃখের দেশ, নিঃসঙ্গতা, গোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর, যুগলসন্ধি, বিচ্ছেদ, ঝিনুক নীরবে সহো, এপিটাফ, তোমার মৃত্যুর জন্য জ্যোস্নায় তুমি কথা বলছো না কেন, অপরিচিতি’র মতো অনন্য কবিতার চিত্রকল্প ভেসে ওঠে। কবি আবুল হাসান লিখেছেন :

সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র

মায়াবী করুণ

এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?

এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?

পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?

মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষ্ম তমোহর

কী অর্থ বহন করে এইসব মিলিত অক্ষর?

আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,

যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এঘরে ওঘরে যায়

সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী

তারা কেউ কেউ বলেছে আমাকে

এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,

একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,

তুই যার অনিচ্ছুক দাস!

হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,

নীল দীর্ঘশ্বাস কোনো মানুষের!

সত্যিই কি মানুষের?

তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত চিল, কোনোদিন

ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল?

ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?’

কবি মানে নির্মল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি শিক্ষার আলো জ্বালানোর প্রত্যয়ে অগ্রসর সবসময়। আর তাই চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন :

আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ

নইলে সরকারি লোক, পুলিশ বিভাগে চাকরি কোরেও

পুলিশি মেজাজ কেন ছিল না ওনার বলুন চলায় ও বলায়?

চেয়ার থেকে ঘরোয়া ধূলো, হারিকেনের চিমনীগুলো মুছে ফেলার মতোন তিনি

আস্তে কেন চাকরবাকর এই আমাদের প্রভু নফর সম্পর্কটা সরিয়ে দিতেন?

থানার যত পেশাধারী, পুলিশ সেপাই অধীনস্থ কনেস্টবল

সবার তিনি এক বয়সী এমনভাবে তাস দাবাতেন সারা বিকাল।

মায়ের সঙ্গে ব্যবহারটা ছিল যেমন ব্যর্থ প্রেমিক

কৃপা ভিক্ষা নিতে এসেছে নারীর কাছে!

আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ

নইলে দেশে যখন তাঁর ভাইয়েরা জমিজমার হিশেব কষছে লাভ অলাভের

ব্যক্তিগত স্বার্থ সবার আদায় কোরে নিচ্ছে সবাই

বাবা তখন উপার্জিত সবুজ ছিপের সুতো পেঁচিয়

মাকে বোলছেন এ্যাই দ্যাখো তো

জলের রংএর সাথে এবার সুতোটা খাপ খাবে না?

কোথায় কাদের ঐতিহাসিক পুকুর বাড়ি, পুরনো সিঁড়ি

অনেক মাইল হেঁটে যেতেন মাছ ধরতে!

আমি যখন মায়ের মুখে লজ্জাব্রীড়া, ঘুমের ক্রীড়া

ইত্যাদি মিশেছিলুম, বাবা তখন কাব্যি কোরতে কম করেননি মাকে নিয়ে

শুনেছি শাদা চামেলী নাকি চাপা এনে পরিয়ে দিতেন রাত্রিবেলায় মায়ের খোপায়!

মা বোলতেন বাবাকে তুমি এই সমস্ত লোক দ্যাখো না?

ঘুষ খাচ্ছে, জমি কিনছে, শনৈঃ শনৈঃ উপরে উঠছে,

কতরকম ফন্দি আটছে কত রকম সুখে থাকছে,

তুমি এসব লোক দ্যাখোনা?

বাবা তখন হাতের বোনা চাঁদর গায়ে বেরিয়ে কোথায়

কবি গানের আসরে যেতেন মাঝরাত্তিরে

লোকের ভিড়ে সামান্য লোক, শিশিরগুলো চোখে মাখতেন!’

এমন সব সম্ভাবনার রাতহীন আলোকিত দিনের গল্প প্রতিনিয়ত বলা কেবলমাত্র কবিদের পক্ষেই বলা সম্ভব। সত্যসুন্দর ও সাহসের সাথে তৈরি হওয়া আমাদের প্রতিটি পর্ব বয়ে চলবে বিদগ্ধ ভালোবাসার সাথে। ষাটের দশকে কবিতার রাজত্ব তখন কতটা সম্মৃদ্ধ ছিলো, তা নিয়ে একটু আধটু পড়াশোনা করলেই জানা যাবে। যেমন কবি আবুল হাসানের রক্তভাবনার কাব্যজ উচ্চারণ

এখন তিনি পরাজিত, কেউ দ্যাখে না একলা মানুষ

চিলেকোঠার মতোন তিনি আকাশ দ্যাখেন, বাতাস দ্যাখেন

জীর্ণ ব্যর্থ চিবুক বিষন্ন লাল রক্তে ভাবুক রোদন আসে,

হঠাৎ বাবা কিসের ত্রাসে দুচোখ ভাসান তিনিই জানেন!

একটি ছেলে ঘুরে বেড়ায় কবির মতো কুখ্যাত সব পাড়ায় পাড়ায়

আর ছেলেরা সবাই যে যার স্বার্থ নিয়ে সরে দাঁড়ায়

বাবা একলা শিরঃদাঁড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন, কী যে ভাবেন,

প্রায়ই তিনি রাত্রি জাগেন, বসে থাকেন চেয়ার নিয়ে

চামেলী হাতে ব্যর্থ মানুষ, নিম্নমানের মানুষ!

মানুষ যে নিম্নমানেরও হতে পারে; তা আজ থেকে কয়েক যুগ আগে লিখে গেছেন কবি আবুল হাসান। ‘জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন :

মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না,

আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে

আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,

সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন

কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?

আধিপত্যে এত লোভ? পত্রিকা তো কেবলি আপনাদের

ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর…’

এখন যেমন মানুষ ভালো নেই, দুর্নীতিধান্দাবাজিসন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নিজেদেরকে জড়িত করেছে। তখনও মানুষ ভালো ছিলো না; ভালো ছিলো না বলেই কবি আবুল হাসান নিজের চোখের সামনে নির্মম ঘটনাগুলোকে দেখতে দেখতে লিখেছেন বিভিন্ন কাব্যজ কথা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনসংগ্রামে যারা ত্যাগের রাজত্ব নির্মাণ করেছেন, একইভাবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতাস্বাধীকারের প্রতিটি মুহূর্তে যারা জীবনপণ লড়েছেন, সেই লড়াকুদের জীবন নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে ইতিহাস সবসময়ই প্রমাণ দিয়েছে যে, যখনই অন্যায়ের উত্থান হয়েছে, সাথে সাথে পতনও নির্মিতক হয়েছে ছন্দিতনন্দিত তানে। উচ্চারণগুলো শোকের :

এই অনবদ্যতায় আমাদেরকে তিনি দিয়ে গেছেন, লক্ষ্মী বউটিকে

আমি আজ আর কোথাও দেখিনা,

হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে

কোথাও দেখি না;

কতগুলো রাজহাঁস দেখি,

নরম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি,

কতগুলো মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখি না

শিশুটিকে কোথাও দেখি না!

তবে কি বউটি রাজহাঁস?’

সবুজের সামিয়ানা টাঙানো নতুন সম্ভাবনার দেশে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে বিনম্র ভালোবাসায়শ্রদ্ধায়। আর এই ভালোবাসা ছিলো বলেই কবি আবুল হাসানের প্রতিতার কবিতার প্রতি অমোঘ প্রীতি আজো বয়ে চলছে নদীর মতো। ভালোবাসাপ্রেম আর রাষ্ট্র দেশমানুষ নিয়ে অবিরত তার লেখনিগুলো সৃষ্টি হয়েছে শব্দজ ঘর নির্মাণের মধ্য দিয়ে। তার প্রকাশিত কবিতার বই : রাজা যায় রাজা আসে (১৯৭২), যে তুমি হরণ করো (১৯৭৪), পৃথক পালঙ্ক (১৯৭৫) এবং রচনা সসমগ্র (১৯৯৪)। বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৫) এবং একুশে পদক (১৯৮২) পেয়েছেন নতুন প্রজন্মের উদাহরণ কবি আবুল হাসান। সাংবাদিকতার পেশায় দৈনিক ইত্তেফাক, গণবাংলা এবং দৈনিক জনপদে কাজ করছেন। ঢাকার তৎকালীন সুন্দরী ও বিদুষী সুরাইয়া খানমএর প্রেমিক হিসাবে ব্যাপক পরিচিত কবি আবুল হাসানকে নিয়ে অনেকেই অনেক লেখা লিখেছেন, নিজের মতো করে মূল্যায়ন করেছেন; কবিপ্রাবন্ধিক শাহ মতিন টিপু লিখেছেন : “

মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা,

আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে

আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,

সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন

কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন? (জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন)

এই লাইন কটিই আবুল হাসানকে চিনিয়ে দেয় আমাদের। বলে দেয় তার কবিতার শক্তিমত্তার কথা।”

কবির আবুল হাসানের জন্ম ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট টুঙ্গীপাড়ার বর্নি গ্রামে নানার বাড়িতে। আবুল হাসানের প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া, পরবর্তীতে আবুল হাসান নামে কবি খ্যাতি অর্জন করেন। ডাকনাম ছিল ‘টুকু’। বাবার চাকরির সুবাদে ফরিদপুর থেকে ঢাকা আসেন। আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন। আরমানিটোলা স্কুলে পড়ালেখার সময় থেকেই আবুল হাসান নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন সম্পন্ন করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই হাসান সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি ঢাকার তরুণ কবিদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে আসেন। তিনি নির্মাণ করেছেন নিরন্তর কাব্যজ ভুবন ঠিক এভাবে :

উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো!

মানুষের লোকালয়ে ললিতলোভনকান্তি কবিদের মতো

তুমি বেঁচে থাকো

তুমি ফের ঘুরে ঘুরে ডাকো সুসময়!

রমণীর বুকের স্তনে আজ শিশুদের দুধ নেই প্রেমিক পুরুষ তাই

দুধ আনতে গেছে দূর বনে!’

কবিরা বরাবরই হয়ে থাকেন নিবেদিত আলো। এই আলো ছড়িয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মনের গভীরে স্থান করে নিয়েছেন। এছাড়াও কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লা যখন নির্মমতার রাজনীতি দেখতে দেখতে লিখেছেন. ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’র মতো অনবদ্য কবিতা। তারও অনেক আগে ক্ষয়ে যাওয়া আমাদের তৎকালীন নিয়ে কবি আবুল হাসান লিখেছেন :

পিতৃপুরুষের কাছে আমাদের ঋণ আমরা শোধ করে যেতে চাই!

এইভাবে নতজানু হতে চাই ফল ভরা নত বৃক্ষে শস্যের শোভার দিনভর

তোমার ভিতর ফের বালকের মতো ঢের অতীতের হাওয়া

খেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চাই!’

ইচ্ছের ডানায় ভর করে রাজনীতিকরা না চললেও কবিরা চলেন নির্লোভ হয়ে। যে কারণে সবুজ দিঘীর ঘন শিহরণ? হলুদ শটির বন? রমণীর রোদে দেয়া শাড়ি দেখতে ও দেখাতে বড্ড পরিপক্ব হয়ে এগিয়ে গেছেন সমসাময়িক কবিদেরকে পেছনে ফেলে বহু বহু দূর। কর্মজীবনের কথা আসলে জানা যায়, কবি আবুল হাসান ১৯৬৯ সালে তিনি দৈনিক ‘ইত্তেফাক’এ সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৭২ সালে ‘গণবাংলা’ পত্রিকায় যোগ দেন। ‘গণবাংলা’য় সাহিত্য বিভাগে শহীদ কাদরীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৩ সালে যোগ দেন আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক ‘জনপদ’ পত্রিকায়। এ পত্রিকায় আবুল হাসান সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘জনপদ’ পত্রিকায় তিনি ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাহিত্য সম্পাদনা করেন। এই দেড় বছরে ‘জনপদ’ পত্রিকায় আবুল হাসানের অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছেএর মধ্যে আছে কবিতা, প্রবন্ধ এবং উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ। এই পত্রিকায় তিনি ‘আপন ছায়া’ এবং ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক দুটি উপসম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক কলামটির প্রথম চার সংখ্যা তিনি ‘ভ্রামণিক’ ছদ্মনামে লিখেছেন। ১৯৭৪ সালে সহসম্পাদক হিসেবে দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগ দেন। ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় তিনি ‘আড়ালে অন্তরালে’ এবং ‘বৈরী বর্তমান’ শীর্ষক দুটি উপসম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘ফসলবিলাসী হাওয়ার জন্য কিছু ধান চাই’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ রচনা করে সেই সময় তিনি লেখক হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

১৯৭০ সালটি আবুল হাসানের জীবনে বিশেষ তাৎপর্যবহ। কারণ ‘শিকারী লোকটা’ শিরোনামে একটি কবিতার জন্য এ সময় তিনি সমগ্র এশিয়াভিত্তিক এক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। পরে ওই কবিতাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সমগ্র পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের কবিতাসঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৭০) শীর্ষক ওই গ্রন্থে তদানীন্তন পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধি আবুল হাসানের কবিতা স্থান পায়। কবি আবুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ‘রাজা যায় রাজা আসে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আবুল হাসানের কবি খ্যাতি বিস্তার লাভ করে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘যে তুমি হরণ করো’ প্রকাশ হয় ১৯৭৪ সালে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আবুল হাসান তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’র পান্ডুলিপি তৈরি থেকে শুরু করে প্রুফ দেখা সবটাই করেছেন। ‘পৃথক পালঙ্ক’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র আটাশ বছর বয়সে আবুল হাসান মৃত্যুবরণ করলেও কাব্যজ জীবনের পরিধি এতটাই বিস্তৃত করেছিলেন যে, কাজের মাঝে জীবিত ছিলেন নিরন্তর। আর একারণেই মৃত্যুর পর তার কাব্যজ জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় অনেকগুণ। তারই সুবাদে তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। আর মৃত্যুরও দশ বছর পর ১৯৮৫ সালে নওরোজ সাহিত্য সংসদ প্রকাশ করে ‘আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা’ গ্রন্থটি। কবি হলেও আবুল হাসান বেশকিছু সার্থক ছোটগল্প রচনা করেছেন। মৃত্যুর পনের বছর পর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তার নয়টি গল্পের সঙ্কলন ‘আবুল হাসান গল্পসংগ্রহ’। ‘ওরা কয়েকজন’ শীর্ষক একটি কাব্যনাটক তাঁর মৃত্যুর পর সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’(১২.১২.১৯৭৫) প্রকাশিত হয়, যা স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয় ১৯৮৮ সালে। জার্মানি থেকে ফিরে এসে আবুল হাসান ‘কুক্কুরধাম’ নামে একটি বৃহৎ কাব্য রচনার পরিকল্পনা করেন। এর বেশকিছু অংশ তিনি রচনাও করেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি তা আর শেষ করতে না পারলেও সমৃদ্ধ করেছেন সম্ভাবনার প্রতি পর্বকে। স্বল্পপরিসর জীবনে মাত্র দশ বছরের সাহিত্যসাধনায় আবুল হাসান নির্মাণ করেছেন এক ঐশ্বর্যময় সৃষ্টিসম্ভার, যার ভিতর দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। তিনি নির্মলেন্দু গুণকে উৎসর্গ করে ‘অসভ্য দর্শন’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন :

দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে তাও রাজনীতি,

দেবদারু কেটে নিচ্ছে নরোম কুঠার তাও রাজনীতি,’

কবি আবুল হাসানের এই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্নের উত্তরও আজো দিতে পারেনি নির্মমতার রাজনীতি। যে কারণে নির্মমতার রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে পা রাখতে তৈরি হচ্ছে বর্তমানের রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ। তাদের কাছে ছাত্রযুবজনতাআবালবৃদ্ধবণিতার মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য নিবেদিত থেকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। শপথ করেছে দেশ বাঁচাতেমানুষ বাঁচাতে তারা রাজনীতির নামে সকল অপরাজনীতির রাস্তা বন্ধ করতে জীবন দিয়ে হলেও এগিয়ে যাবে। কেননা, বায়ান্নকে প্রেরণাএকাত্তরকে চেতনা করে এগিয়ে যেতে যেতে তারা জাতির সকল শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জীবনদর্শন নিয়ে গবেষণা করে এগিয়ে চলছে…

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: