প্রথম পাতা > কবিতা, জীবনী, নারী, বাংলাদেশ, সাহিত্য > সুফিয়া কামাল এক অনন্য মহীয়সী নারী

সুফিয়া কামাল এক অনন্য মহীয়সী নারী

নভেম্বর 25, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

sufia-kamal-67আজাদ এহতেশাম : নারীমুক্তি অগ্রগতি ও প্রগতির আন্দোলনের পুরোভাগে যে মহীয়সী নারী আমৃত্যু শোষণ, বঞ্চনা, স্বৈরাচার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তিনি বেগম সুফিয়া কামাল (১৯১১১৯৯৯)। তার আন্দোলন সংগ্রাম এবং সাহিত্য কীর্তির অনুপ্রেরণায় প্রোথিত ছিল দেশ, দেশের মানুষ, নারীমুক্তি ও প্রগতি। এ কারণে কেউ কেউ তাকে বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরি হিসেবেও মনে করেন। গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য ও লাবণ্যতা নস্টালজিক বিরহ, প্রেমরোমান্টিকতা, নারীর রূপমাধুর্যতা, অতৃপ্ত কামনাবাসনা তার কাব্যে এক অনন্য মাত্রায় নানন্দিক সৌকর্যে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কল্যাণকামিতা, মাতৃত্বের সার্বজনীনতা, ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক মূল্যবোধ ব্যাকুলতা, নারী জাগরণ, নিসর্গ প্রকৃতির উৎসারণ তার কবিতার মূল সুর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বেগম সুফিয়া কামালের জীবন ও কর্মের অনুপুঙ্খ দৃষ্টির প্রাখর্যে দ্বৈত সত্তার পরিচয় মেলে। একটি বিদ্রোহিনী সত্তা অন্যটি স্বভাবজাত রোমন্টিক কবি সত্তা। তার অদম্য সাহস, প্রত্যয়দৃপ্ত কণ্ঠের তেজস্বিতা যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে তাকে অবিচল রেখেছে। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ সব আন্দোলনেই তিনি যুক্ত ছিলেন এবং তার আস্থা ও বিশ্বাসের ভীত টলাতে পারেনি কেউ। অন্যদিকে তার কুসুমকোমল হৃদয়ের সরলতা রোমান্টিক কবিসত্তার সংবেদনশীলতায় উৎসারিত। তার কবিতায় প্রেমপ্রকৃতি ও জীবনের সনি্নধানতার স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়।

মানবতার কবি, সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় তার অন্তরলোকে নিঃস্ব বঞ্চিত নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের প্রতি সাম্যবাদের মনোভাব জারিত হয়। নিগৃহীত কুলি মজদুরদের সমব্যথী কাজী নজরুল বলেন, ‘দেখিনু সেদিন রেলে/কুলি বলে এক বাবু সাব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে/চোখ ফেটে এল জল/এমনি করে কি জগতজুড়িয়া মার খাবে দুর্বল! (কুলি মজুর)

সুফিয়া কামালও এ সব নিঃস্ব বঞ্চিত মানুষের একনিষ্ঠ সুহৃদ। অত্যন্ত আপনজনের মতো তার কবিতায় তাদের প্রতি সমবেদনা ব্যক্ত হয়েছে:

শস্যের বুকে সৃজিতে ক্ষীর
আপন জীবন যামিন রাখিয়া তুষ্টি মাগিয়া বিধাতৃর।
আজকে ওদের অন্ন নাই
বস্ত্র নাই
শুষ্ক নয়নে অশ্রু নাই
উৎসবে আজ অংশ নাই,
তোমাদের হাতে তুলিয়া দিয়াছে শস্য গোলার সোনার চাবি
তাহাতে কি নাই ওদের দাবি?
[‘
ক্ষুধায় আজিকে কাঁদো কারা‘ ‘অভিযাত্রিক‘]

পাকিস্তানি শাসন শোষণে অতিষ্ঠ বাঙালি এক সময় বিস্ফোরন্মুখ হয়ে ওঠে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার ঘোষণা প্রতিহত করতে তারা রাজপথে মিছিল করে। কয়েকজন ছাত্রের বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। সুফিয়া কামাল এ ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন। তিনি বিদেশি সুহৃদ বন্ধুদের কাছে এ হীন ন্যক্কারজনক হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানান:

শুনেছ তোমরা? দেখনি তো, তাই মোর সাথে এসো তবে
এখানে রয়েছে শোণিতের স্রোত, এখানে পুড়েছে দেহ
ভীরু জালিমেরা ঢেকেছে মাটিতেযদি দেখে ফেলে কেহ!
পা ফেলিও ধীরে ধীরে
আহা! কত দেহ এখনও মজিছে বুড়িগঙ্গার তীরে।
বিদেশি সুজন! তোমরা দেখনি শহীদ মিনার হেথা
বাংলা ভাষার তরে দিল প্রাণ প্রথম শহীদ যেথা।
[‘
আমন্ত্রণ‘ ‘মোর যাদুদের সমাধি পরে‘]

সুফিয়া কামালের মেধা মনন ও ব্যক্তিত্বের সাথে অন্যায় অসঙ্গতি, নিপীড়ন কখনোই যায়নি। কখনো সশরীরে আবার কখনো লেখনীর মাধ্যমে প্রতিবাদ সংগ্রামে উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। বিশ্ব মোড়ল আমেরিকার মোড়লিপণার অন্তরালে তাদের যে হীন কূটকৌশল কবিকে ব্যথিত করে তোলে। তাদের মানবসেবার নামে প্রতারণার খোলস কবির চোখে উন্মেচিত হয়ে উঠেছে:

এ দেশ আশ্চর্য দেশ! ঐশ্বর্যের এত সমারোহ
নগরে সৌন্দর্য আশ্চর্য সৃষ্টি রূপায়ণ চলে অহরহ।
বিস্তৃত সমুদ্রবক্ষ তলে তলে জমে আবর্জনা
সহিবে জলধি আর কত দিন এই প্রতারণা?
গরজি উঠিবে সিন্ধু, লবে গ্রাস করি
ক্ষুধিতের অন্ন কাড়ি যায়া আছে দাতা রূপ ধরি।
[‘
আমেরিকা ১৯৮৯‘ ‘অগ্রন্থিত কবিতা‘]

গ্রামীণ প্রকৃতির রূপমাধুর্যে মুগ্ধ কবির শৈশবে ফেলে আসা স্মৃতি বিচিত্র অনুভূতির রঙে উৎসারিত হয়েছে তার বিভিন্ন কবিতায়। পলি্লগ্রামকে মায়ের শান্তি ও মমতার কোল চিত্রকল্পে গ্রামের প্রতি অপরিমেয় হৃদয়াবেগ ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। গ্রাম তার পলি্লমায়ের কোল, অতৃপ্ত ও তৃষ্ণার্তের শান্তি সুধার শীতল পরশ।

বহুদিন পরে মনে পড়ে আজি পলি্লমায়ের কোল,
ঝাউশাখে যেথা বনলতা বাঁধি হরষে খেলেছি দোল!
ফুলের কাঁটার আঘাত সহিয়া কাঁচা পাকা কুল খেয়ে
অমৃতের স্বাদ লভিয়াছি যেন গায়ের দুলালী মেয়ে।
[‘
পুরনো দিনের স্মৃতি‘ ‘সাঁঝের মায়া‘]

নিসর্গ প্রকৃতির তার কাব্যে নিছক প্রকৃতি নয়, প্রেমানুভূতি সঞ্জাত এক প্রকার প্রগাঢ় আবেগময়তার প্রতীক। প্রকৃতি তার প্রেমভালোবাসার নিত্য সহচর। কখনো কখনো প্রেমিকের চিত্রকল্পে উপস্থাপিত হয়েছে তার প্রকৃতি। এ কারণে তার প্রেম ও প্রকৃতি একাকার, পরস্পর অন্বিত হৃদয়াবেগের মূর্ত প্রকাশ।

গ্লানির নির্মোক মুক্ত মোর প্রেম, মোর ভালোবাসা।
জীবনের পরম প্রত্যাশা
তবু শান্ত স্নিগ্ধ স্পর্শ লাভ
এ দেহধূপের ধুম বিথারিব মৃদুল সুরভী।
অজস্র নক্ষত্রপুঞ্জে অনির্বাণ উৎসবদেওয়ালী
তোমার আকাশে শোভে; হেথা মোর প্রতিদিন
খালি চিত্ত করে নিত্য অভিসার
তোমাতে মিশায়ে যেতে। প্রিয়তম নিশীথ আমার।
[‘
আমার নিশীথ‘ ‘সাঁঝের মায়া‘]

অকাল বৈধব্য দেশ কাল ও সমাজের প্রেক্ষাপটে কবির সংবেদনশীল কবিচিত্তে প্রবল প্রভাব ফেলে। কবির শান্তি সুখের নিরবচ্ছিন্ন ঘরকন্যায় হতাশা, রিক্ততা ও শূন্যতা তাকে বিচলিত করে তোলে। কাব্য সাধনার ঘটে ছেদ; ব্যক্তি জীবনে নেমে আসে নিঃসীম নৈঃসঙ্গ্যতা। তাই বসন্ত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য মাধুর্য কবির চিত্তকে আনন্দে উদ্বেলিত করে না। প্রিয়জন সানি্নধ্য বঞ্চিত কবির কাছে বসন্ত নিতান্তই অর্থহীন।

হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?’
কহিলাম, ‘উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?’
কহিল সে কাছে সরে আসি_
কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে! তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোনো মতে।
[‘
তাহারেই পড়ে মনে‘ ‘সাঁঝের মায়া‘]

নারীমুক্তি উন্নয়ন ও প্রগতির স্বপ্নদ্রষ্টা বেগম সুফিয়া কামাল। দৃঢ় প্রত্যয় ও অসীম সাহসিকতায় তৎকালীন সমাজের পর্দার ঘেরাটোপ থেকে টপকিয়ে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন নারীদের প্রতি রক্ষণশীল সমাজের নেতিবাচক মনোভাব, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের অলীক বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে না পারলে নারীরা চিরদিনই পুরুষের নিগ্রহের শিকার হবে, এ অবস্থা থেকে নারীদের মুক্ত করে আনতে হবেতবেই হবে সমাজ ও দেশের প্রকৃত উন্নয়ন।

জাগে জীবনের জয়গান
পঙ্গু ও লঙ্ঘিছে গিরি অন্ধ লভে পথের সন্ধান!
চিরদিবসের গ্লানি শিরে বহি, চির উপেক্ষিতা
ঘরে ঘরে বহু নির্যাতিতা
মূঢ় মূক অন্ধকারাগারে
নিমজ্জিত করি আপনারে
পঙ্গু অসহায় করি যুগযুগ ধরি
রেখেছিল দেশজাতি! সেই গাঢ় অন্ধ বিভাবরী
ভেদ করি হে সুকন্যা! দুর্দিনের শেষ_
অজ্ঞানের পক্ষ হতে আলোর উন্মেষ
ভাষা আর বাণী
অবোলা জীবেরে দিল আনি।
[‘
অমৃত কন্যা‘ ‘অভিযাত্রিক‘]

কন্যাজায়াজননীরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে, পারি দেব মুক্তগতি পথ। অজ্ঞতা, ভীরুতা পরিহার করে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিত্তবলয় ভেদ করে আলোর রেখায় তাদের বের হয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন :

জাগে না কি চিত্তে সাধ অন্ধ অাঁধার ঘুচাবার?
হৃদয় স্পন্দন জাগে, জাগে মনে কঠোর শপথ,
ঘুচাব অাঁধার আনি আলোকিত মুক্তি গতিপথে,
ভেঙে দেব ভীরুতার দ্বার
আমার সন্তান হোক দুরন্ত দুর্বার।
আকাশে মেলুক ডানা; সিন্ধু বক্ষে জমাবে সে পাড়ি
দুর্বলা দুহিতা নহে, হোক সবে মহীয়সী নারী।
[‘
হোক সবে মহীয়সী‘ ‘অভিযাত্রিক‘]

তরুণ যুবকরাই যে কোনো দেশের শক্তি ও সম্ভাবনার আধার। তরুণরাই পারে শত বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে। তারা লক্ষ্যে অটল অবিচল, সংকল্পে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী। শত বাধার দুর্গম পথে তারা নির্ভীক, তারা অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী। সমাজ ও দেশের যে কোনো পরিবর্তন তাদের পক্ষেই সম্ভব। তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ও প্রতীতিতে নির্মিত হবে জাতির সমৃদ্ধ ও কল্যাণময় ভবিষ্যৎ। কবি তাদের প্রশস্তি ও সফলতা কামনা করেছেন:

ঝড়ের রাতে বৈশাখী দিনে, বরষার দুর্দিনে
অভিযাত্রিক। নির্ভীক তারা পথ লয় ঠিক চিনে।
হয়তো বা ভুল। তবু ভয় নাই, তরুণের তাজা প্রাণ
পথ হারালেও হার মানে নাকো, করে চলে সন্ধান
অন্য পথের, মুক্তপথের, সন্ধানী আলো জ্বলে
বিনিদ্র অাঁখি তারকার সম, পথে পথে তারা চলে।
প্রাণের শিখার দীপ্তিতে জ্বলে ভালো,
হার মানে মহাকাল।
[‘
অভিযাত্রিক‘ ‘অভিযাত্রিক‘]

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির জাতীয় জীবনে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বাঙালির নতুন জন্ম পরিচয়ের নাম মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের সশস্ত্র আন্দোলন সংগ্রামে পাকবাহিনীর নৃশংসতায় এ দেশ ধ্বংসপুরীতে পরিণত হয়। এ সময় কবি সাহিত্যিকগণ দেশাত্মবোধের প্রেরণায় তাদের মেধানন্দনের সংশ্লিষ্টতায় যুদ্ধ করেছেন কলম দিয়ে; উদ্বুদ্ধ করেছেন গান, কবিতা ও অন্যান্য মাধ্যমে। সুফিয়া কামালের কবিতায় হিংস্র খান সেনাদের বিরুদ্ধে বাঙালিদের যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ও আশ্বাস ব্যক্ত হয়েছে:

পশুর অসুর শক্তিরে হানি চরম আঘাত প্রাণের পণে
বক্ষে বাহুতে শিরার শোণিতে শক্তি রাখিয়া মেতেছি রণে।
হটিব না পিছুদুর্বার মোরা বাংলা মায়ের দুহিতাসূত,
নিঃশেষ করি হিংস্র পশুরে করিব দেশেতে স্নিগ্ধ পূত।
নেমেছি আমরা সংগ্রামে।
[‘
আমরা নেমেছি সংগ্রামে‘ ‘মোর যাদুদের সমাধি পরে‘]

তার প্রকৃতি প্রেম দেশপ্রেমের অনুষঙ্গ হয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে গভীর ভালোবাসায় কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে। তার কল্পনার অনুধ্যানের কেন্দ্রভূমে রয়েছে চিরশ্যামল বাংলাদেশ ও বাঙালি। এ দেশের রূপ মুগ্ধতায় কবি বিমোহিত, আনন্দিত ও গৌরবান্বিত। এ দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ উৎসবে হাসি আনন্দে প্রীতির বন্ধনে আবহমানকাল ধরে বাস করে আসছে। পৃথিবীর অন্যকোনো দেশে এ দেশের মতো সৌন্দর্য নেই। কবির উপলব্ধিতে পাওয়া যায় সে চিত্র:

দোয়েল পাখি শিষ দিয়ে যায়
টুনটুনিরা নাচে
শালিকগুলো পাখনা মেলে
থাকে কাছে কাছে।
এমন শোভন, এমন লোভন এত পরিপাটি,
এমন কোমল, এমন কাজল এ কোন দেশের মাটি
সাদা কাশের গোছা যেন
চাঁদের বুড়ির কেশ
এই ধান শালিকের দেশ।
[‘
ধান শালিকের দেশ‘ ‘অগ্রন্থিত কবিতা‘]

দ্রুত পরিবর্তনশীলতা, ব্যাপক শিক্ষা বিস্তর এবং নগরায়নের ফলে মানুষ ক্রমেই শহরমুখী হচ্ছে দিন দিন। জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্রমোন্নতিতে বিস্তর পরিবর্তন এসেছে মানুষের চিন্তা চেতনায়। অনেক অজানা রহস্য, কল্পকাহিনী মানুষের এখন করায়ত্ত। আজকের শিশুরা পূর্ব কালের তুলনায় অনেক জ্ঞানী। তাদের অজানাকে জানার কৌতূহলে মুগ্ধ কবিচিত্ত আশার বাণী উচ্চারণ করেছেন :

আমরা যখন আকাশের কোলে উড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি
তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগনজুড়ি।
উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু সব তোমাদের জানা,
আমরা শুনেছি সেখানে রয়েছে জিন, পরী, দেও, দানা।
পাতালপুরীর অজানা কাহিনী তোমরা শোনাও সবে,
মেরুতে মেরুতে জানাপরিচয় কেমন করিয়া হবে।
তোমাদের ঘরে আলোর অভাব কভু নাহি হবে আর,
আকাশ আলোক বাঁধি আনি দূর করিবে অন্ধকার।
[‘
আজিকার শিশু‘ ‘অগ্রন্থিত কবিতা‘]

সংলাপ নির্ভর কবিতা সুফিয়া কামালের কাব্য বৈশিষ্ট্যের এক অনন্য সংযোজন। চলি্লশের দশকে আর কোনো কবির কবিতায় সংলাপ নির্ভরতা খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। গল্পবলার ঢঙে কবিতার ভাবব্যঞ্জনা অক্ষুণ্ন রেখে কবিতা রচনার প্রয়াস তাকে বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। এ ধরনের কবিতায় কথোপকথনের মধ্যদিয়ে পাঠকচিত্তে এক ধরনের মুগ্ধতা আবিষ্ট করে যা শেষ পর্যন্ত তাকে ধরে রাখে। সুফিয়া কামাল এ ধরনের কবিতায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন:

এখনও দেখনি তুমি?’ কহিলাম, ‘কেন কবি আজ
এমন উন্মন তুমি? কোথা তব নব পুষ্প সাজ?’
কহিল সে সুদূরে চাহিয়া
অলখের পাথার বাহিয়া
তরী তার এসেছে কিবেজেছে কি আগমনী গান?
ডেকেছে কি সে আমারে? শুনি নাই রাখিনী সন্ধান।

সুফিয়া কামাল আমৃত্যু শান্তির স্বপক্ষে লেখনী ধারণ করেছিলেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের রক্তচক্ষুর তীর্যক বাণ তাকে আদর্শচ্যুৎ করতে পারেনি। তিনি শান্তিময় এক সুখের আবাসভূমি কামনা করেছেন, সেখানে থাকবে না হানাহানি, অশান্তি থাকবে শুধু অনাবিল সুখ শান্তি ও ঐশ্বর্যের হিমশীতল প্রস্রবণ ধারা। এমন বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তিনি:

এই দিন কেটে যাক
তরী এসে বন্দরে ভিড়াক।
সোনালী শস্যের স্বর্ণভাব
পূর্ণ হয়ে উঠুক আবার।
[‘
এই দিন কেটে যাক‘ ‘মন ও জীবন‘]

রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্য সাহিত্যের গতি প্রকৃতি, বিষয় বৈচিত্র্য ও অবস্থানে অনেকেই রবীন্দ্রকিরণ প্রভায় প্রভাবিত হলেও সুফিয়া কামালের কাব্য ভাবনায় স্বাতন্ত্র্য বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। তার কাব্য সত্তার ঊর্ধ্বে ছিল দেশ প্রেম, মানবিকতা ও ন্যায়দন্ডের উড্ডীন ধজা যা আমৃত্যু স্বীয় বিশ্বাস ও প্রত্যয়ে উচল রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। গণমানুষের মুক্তি সৌম্যশান্ত পরিবেশে দেশের মানুষের মাতৃবৎ কল্যাণকামিতা তাকে জননী সাহসিকার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। সে বিবেচনায় তিনি যতবড় না কবি তার চেয়ে বড় মানবতাবাদী ও সমাজ সংস্কারক একজন মহীয়সী নারী।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: