প্রথম পাতা > জীবনী, সমাজ, সাহিত্য > ভিএস নাইপল : ঝাঁজালো মেজাজের সাহিত্যিক

ভিএস নাইপল : ঝাঁজালো মেজাজের সাহিত্যিক

নভেম্বর 25, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

naipaul-9. অরুণ কুমার গোস্বামী : এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, ৮৪ বছর বয়সের ভিএস নাইপল (বিদ্যাধর সুরুজপ্রসাদ নাইপল) একজন অতি চমৎকার এবং সমসাময়িক বিশ্বের মধ্যে একজন অত্যন্ত উন্নত মর্যাদার লেখক। নামকরা সাহিত্য সমালোচকরা নাইপলের গদ্য রচনার প্রশংসাই শুধু নয়, সেগুলো সম্পর্কে বলছেন যে, তার (নাইপলের) গদ্য রচনা সমসাময়িক ব্রিটিশ লেখকদের লজ্বায় ফেলে দেয়। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, নাইপল হচ্ছেন বর্তমান বিশ্বের সেরা লেখকদের একজন। দুর্ভাগ্যবশত, ঝাঁজালো মন্তব্যের কারণে সমালোচকরা তাকে এক ধরনের হৃদয়হীন মানুষহিসেবে গণ্য করে থাকেন! সাহিত্য সমালোচক এমিলি টেম্পলের মতে, ‘আনফরচুনেটলি হি ক্যান অলসো বি কাইন্ড অব অ্য জার্ক। সাহিত্য সমালোচকদের মতে নাইপল তৃতীয় বিশ্বের অন্ধকার এলাকাদিয়ে বিচরণ করেছেন। নাইপলকে তারা কর্কশ রসিকবলেছেন। এ কারণে নাইপলের একটি ডাকনাম আবিষ্কার করেছেন ডেরেক ওয়ালকট। ভিএস নাইপলকে ডেরেক ওয়ালকট বলেছেন ভিএস নাইটফল‘; গায়েত্রী চক্রবর্তী স্পাইভাক নাইপলকে বলেছেন একজন মিথ্যা তথ্যজ্ঞ‘; ‘সমসাময়িক ইংরেজি সাহিত্যের বদরাগীহিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ! এ ধরনের আরও অনেক কটু মন্তব্য ভিএস নাইপল সম্পর্কে করা হয়েছে। অবশ্য এতে তিনি কিছু মনে করেন না। কারণ, নাইপলের মতে, ‘লেখকরা যদি শত্রুতা সৃষ্টি না করতে পারে, তাহলে সে (লেখক) মৃত‘! (If a writer doesn’t generate hostility, he is dead.) এভাবে চিন্তা করলে বলতে হবে, ৮৪ বছর বয়সে হুইল চেয়ারে চলাচল করা সত্ত্বেও, নাইপল খুবই এগিয়ে থেকে লেখক হিসেবে এখনো তরতাজা আছেন।

যেসব উক্তি করার কারণে নাইপলকে ঝাঁজালো মেজাজের লেখকহিসেবে সমালোচকরা সমালোচনা করে থাকেন তার দুএকটি উদাহরণ দেয়া সঙ্গত। নাইপলের মতে, হেনরি জেমস হচ্ছেন বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ লেখক। অপর দিকে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে সম্পর্কে নাইপল অভিযোগ করেন যে, তিনি (হেমিংওয়ে) ‘একজন আমেরিকান হিসেবে এত ব্যস্ত যে, তিনি তার অবস্থান সম্পর্কে অবগত নন।২০১১ সালে রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তিনি কোন নারী লেখককে তার সমকক্ষ হিসেবে মনে করেন কী না। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আই ডোনট থিঙ্ক সো। এ কথার মানে হলো কোনো নারী তার সমান হতে পারেন না ! ১৯৮৬ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নাইজেরিয়ার ওলে সোয়িঙ্কা সম্পর্কে নাইপল বলছেন, ‘হ্যাজ হি রিটেন এনিথিং?’ আফ্রিকানদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আফ্রিকানস নিড টু বি কিকড, দ্যাটস দ্য অনলি থিং দে আন্ডারস্ট্যান্ড।নিজের জন্মভূমি ত্রিনিদাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, ত্রিনিদাদ হচ্ছে গুরুত্বহীন, অসৃষ্টিশীল, ঘৃণ্য, মানচিত্রে একটি ফোঁটা। নাইপলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘আফ্রিকার ভবিষ্যৎ কী?’ এর জবাবে নাইপল বলেছেন, ‘আফ্রিকার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
১৯৬০এর দশকে, পিতৃপুরুষদের দেশ ভারত সফরে এসেছিলেন নাইপল। ভারতে তার ভ্রমণের ওপর ভিত্তি করে তার লেখা তিনটি বই হচ্ছে, ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস‘; ‘ইন্ডিয়া : অ্যা মিলিয়ন মিউটিনিজ‘; ‘ইন্ডিয়া : অ্যা উন্ডেড সিভিলাইজেশন। এই বই তিনটিতে ভারত ভ্রমণের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন রয়েছে। বিশেষ করে, তার প্রথম বইটির কিছু কিছু পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত বাস্তব জ্ঞান দ্বারা চালিত বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। মানুষের উন্মুক্ত স্থানে মল ত্যাগের দৃশ্যে ভিএস নাইপল ঝাঁজালো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন! দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ চার দশক পরেও বর্তমান ভারত সরকার কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচির দ্বারা এটি প্রমাণিত হচ্ছে যে নাইপলের প্রতিক্রিয়া ঝাঁজালো হলেও সঠিক এবং সত্যি। ভারতীয়দের এই অভ্যাস দূর করার জন্য সেদেশের সরকার স্বচ্ছ ভারতকর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। অতএব, দৃশ্যত, নাইপল যা বলেছিলেন সত্যি বলেছিলেন। জীবন বেলার শেষ প্রান্তে এসে ৮৪ বছর বয়সের নাইপল যৌবনের সেই ঝাঁজালোনাইপল থেকে কতটুকু আলাদা, বা উল্টোভাবে বলতে গেলে যৌবনের ঝাঁজালোনাইপলের মতো বেলা শেষের নাইপল, অন্তত পক্ষে মেজাজ মর্জির দিক দিয়ে এখনো একই আছেন কী না, তা একটি ব্যাপক কৌতূহল ও অনুসন্ধানের বিষয়। অবশ্য যারা আশৈশব কাছে থেকে তাকে দেখেছেন অথবা অনেক আগে থেকেই যারা তার সাহিত্যকর্মগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন, তাদের মতো এত ঘনিষ্ঠভাবে আর কেউ এ সম্পর্কে বলতে পারবেন বলে মনে হয় না। বলা বাহুল্য, নাইপলের মতো একজন বিশ্ব মানের সাহিত্যিকের জীবনী অনুসন্ধানের পথে সেভাবে অগ্রসর হওয়া, বিপুল সীমাবদ্ধতা নিয়ে, বর্তমান লেখকের পক্ষে সম্ভব না হলেও কৌতূহলকে তো আর চাপিয়ে রাখা যায় না ?! এই কৌতূহল এবং সীমাবদ্ধতা নিয়েই নাইপলের জীবনী, তার লেখালেখি এবং বাংলাদেশ সফরে এসে সম্প্রতি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন, ‘ঢাকা লিট ফেস্টিভ্যালেনাইপলের বক্তৃতা প্রভৃতি নিয়েই বর্তমান আলোচনা।

বয়সের পার্থক্য ছাড়া, নাইপলের জীবনের প্রথম এবং জীবনের শেষ প্রান্তের মধ্যকার অভিব্যক্তিরপার্থক্য সম্পর্কিত প্রশ্নটির কন্সটিউটিভ উপাদানগুলোর মধ্যে, অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে আছে, তার বেড়ে ওঠা এবং লেখক হিসেবে তার পরিণতি; তার শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষা; জীবন সম্পর্কে তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা; তার সাহিত্য কর্ম; ভারত তথা এশিয়া সম্পর্কে তার ঝাঁজালো সব উক্তি; ২০০১এ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে ১৯৭১এ সাহিত্যের জন্য বুকার পুরস্কার এবং ১৯৮৯ সালে নাইটহুড প্রাপ্তি; তার পূর্ব পুরুষের স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা; প্রথম স্ত্রী ও তার লেখার প্রথম সম্পাদক প্যাট্রিসিয়া অ্যান হেলির সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন; প্যাট্রিসিয়ার অকাল মৃত্যুর পর পাকিস্তানি নাগরিক নাদিরাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ প্রভৃতির মধ্য থেকে খুব সামান্য কয়েকটি বিষয় এই ক্ষুদ্র লেখার মধ্যে আলোকপাত করা সম্ভব ! উল্লেখ্য, স্যার বিদ্যাধর সুরুজপ্রসাদ নাইপলকে ঢাকা লিট ফেস্ট‘-এর অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে কেন বাছাই করা হয়েছিল, এ ধরনের একটি প্রশ্নের উত্তরে এই উৎসবের অন্যতম আয়োজক, ‘পেন বাংলাদেশ‘-এর পরামর্শক, ইউল্যাব, ঢাকা ট্রান্সেলশন সেন্টার এবং বেঙ্গল লাইটস সাহিত্য পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকার প্রকাশক কাজী আনিস আহমদ বলছেন, ‘আমার জানা মতে ভিএস নাইপল প্রথম ব্যক্তি, যিনি সাহিত্যের নোবেলজয়ী হিসেবে স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে এসেছেন। এ ছাড়া নোবেল পাওয়া গুন্টার গ্রাস এসেছিলেন অনেক আগে। নাইপল বিতর্কের জন্ম দিতে ভালোবাসেন; কিন্তু অসাধারণ লেখক তিনি। গভীর সততার সঙ্গে তিনি উত্তঔপনিবেশিক জগৎকে পুঙ্খনাপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। মিল না থাকতে পারে, কিন্তু তার লেখার শৈলী ও সাহিত্যিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না।

১৯৬৪ সালে তার বয়স যখন ৩২ বছর তখন অন্যান্য কিছুর পাশাপাশি খারাপ লোক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন সেই লোকটিাকে যে বাঙালি এবং ক্রিমিনালদের সঙ্গে মেশে‘ ! ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেসশীর্ষক ধ্রুপদী ভারত বিষয়ক ভ্রমণ কাহিনীতে বাঙালি এবং ক্রিমিনলাদেরএক করে দেখার পাশাপাশি ভারতীয়দের সম্পর্কেও অনেক বিরূপ মন্তব্য ছিল। লিখেছিলেন, ‘ভারতীয়রা সর্বত্র মলত্যাগ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, রেললাইনের ধারে তারা মলত্যাগ করে। এমনকি তারা সমুদ্র তীরে; পাহাড়ের গায়ে; নদীর তীরে; রাস্তার ওপর সব জায়গায় তারা হাগে‘; আর এই কাজটি সারার সময় তাদের কোনো রাখঢাক থাকে না। উবু হয়ে মাটি ছুঁয়ে মলত্যাগের এইসব কথা কখনো বলা হয় না, এগুলো কখনো উপন্যাস বা গল্পে আসে না, কাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্র অথবা ডকুমেন্টারিতে দেখানো হয় না। আসল কথা হলো, ভারতীয়রা, এইসব উবু হয়ে মাটি ছুঁয়ে বসে মল ত্যাগের দৃশ্য দেখে না এবং পুরোপুরি আন্তরিকতার সঙ্গে, অঙ্গীকার করে না যে এগুলো এখনো আছে।‘ [“Indians defecate everywhere. They defecate, mostly, beside the railway tracks. But they also defecate on the beaches; they defecate on the hills; they defecate on the riverbanks; they defecate on the streets; they never look for cover (…). These squatting figures (…) are never spoken of, they are never written about, they are not mentioned in novels or stories; they do not appear in feature films or documentaries (…). The truth is that Indians do not see these squatters and might even, with complete sincerity, deny that they exist. (An Area of Darkness, p.70)]

তার পূর্ব পুরুষের দেশ ভারত বর্ষকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার কারণে কথাটায় খুব ঝাঁজের স্বাদ পাওয়া গেলেও কিন্তু ২০১৬ সালের নভেম্বরের ১৭ থেকে ১৯ তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্যের লালনকেন্দ্র বাংলা একাডেমিরঅনুষ্ঠানে তার কথায় সেই ঝাঁজ ছিল না। বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ঢাকা লিট ফেস্ট‘-এর উদ্বোধন করার সময় আনন্দচিত্তে ভিএস নাইপল বলেন, ‘ঢাকা এসে খুব ভালো লাগছে আমার। উৎসব উদ্বোধন করেও আমি আনন্দিত।এ সময় তিনি খানিকটা রসিকতা করে বলেন, ‘একবার একটা অনুষ্ঠানে তাড়াতাড়ি ফিতা কেটে ছিলাম। তখন পাশে থাকা আমার এক বন্ধু বলল, তাড়াতাড়ি ফিতা কাটতে নেই। আবেদনটা ধরে রাখতে ধীরে ধীরে কাটতে হয়। আমি বোধ হয় এবারেও তাড়াতাড়ি ফিতা কেটে ফেলেছি।

ভিএস নাইপল ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট ত্রিনিদাদের সাগুয়ানাসে ভারত থেকে সামুদ্রিক জাহাজে করে নেয়া চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সিপরসেড নাইপল এবং মাতা দ্রোয়াপাতি। অভিবাসী ভারতীয় শ্রমিক সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। যদিও তার ঠাকুরদাদাদাদি চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তার পিতা কিন্তু শিক্ষায় ব্রতী হতে পেরেছিলেন এবং ইংরেজি ভাষার একজন সাংবাদিক হয়েছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে পিতার পেশা এবং তার পৃষ্ঠপোষকতা বিদ্যাসুন্দরকে লেখক হতে উৎসাহিত করেছিল।

১৯৩৯ সালে তাদের পরিবারটি ত্রিনিদাদের রাজধানী পোর্ট অব স্পেনে চলে আসে এবং লেখাপড়ার জন্য বিদ্যাসুন্দরকে সেখানকার কুইনস রয়েল কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। কলেজে পড়াকালেই তার সঙ্গে প্যাট্রিসিয়া অ্যান হেলির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। ছাত্র হিসেবে বিদ্যাসুন্দর ভালো ছিলেন এবং তার কঠোর পরিশ্রমের ফলে তিনি ত্রিনিদাদ সরকারের একটি স্কলারশিপ লাভ করেন এবং ১৯৫২ সালে ১৮ বছর বয়সে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ার জন্য ত্রিনিদাদ ত্যাগ করেন। প্রথম দিকে অক্সফোর্ডের ছাত্র হিসেবে তিনি খুবই বিভ্রান্ত এবং তার নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুবই অনিশ্চিত ছিলেন। তিনি লেখালেখির শুরু করেছিলেন কিন্তু তার প্রচেষ্টার ব্যাপারে খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এ সময় তিনি খুবই একাকী অনুভব করতেন এবং মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিলেন।

মানসিকভাবে এমনি বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে তিনি স্পেনে যাত্রা করেছিলেন এবং তার কাছে থাকা সব অর্থ সেখানে তিনি ব্যয় করেছিলেন। এর পরের বছর তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তিনি মানসিকভাবে আরও একটি আঘাত পান। ঠিক এ সময়েই একজন যুবতী মহিলা তার জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আসেন। তার নাম হচ্ছে প্যাট্রিসিয়া অ্যান হেলি। হেলির সঙ্গে তিনি কলেজে মিশেছিলেন। বিদ্যাধরের জীবন এ সময় থেকে নতুনভাবে শুরু হতে থাকে। এভাবে ১৯৫৩ সালে অক্সফোর্ড থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর থেকে তিনি লন্ডনেই বসবাস করতে থাকেন। তবে তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় তিনি এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকা ভ্রমণে ব্যয় করেন। অক্সফোর্ডে পড়ার পর কিছুকাল তিনি ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে আত্মনিয়োগ করার সময়টুকু ছাড়া তিনি পুরোপুরি লেখালেখির কাজে ব্যয় করতে থাকেন। ১৯৯৬ সালে তার প্রথম স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া মৃত্যুবরণ করেন। আর ওই বছরই তিনি নাদিরা খানুম আলভিকে বিয়ে করেন। নাইপলের এটি দ্বিতীয় কিন্তু নাদিরার এটি তৃতীয় বিয়ে। নাদিরার জন্ম পাকিস্তানে। কিন্তু তিনি বড় হয়েছেন কেনিয়ায়। নাদিরার বয়স যখন ১৬ বছর কখন তার সঙ্গে ২৬ বছর বয়সী পাকিস্তানি প্রকৌশলী আগা হাসিমের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। নাদিরাহাসিম দম্পতির দুটি কন্যা সন্তান গুল জাহর এবং সুমার জাহর। পরে হাসিমের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পরে নাদিরা ইকবাল শাহএর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নাদিরাইকবাল দম্পতির মালিহা নামে একটি কন্যা সন্তান আছে। নাইপলএর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবার পরে মালিহা তাদের সঙ্গে থেকেছেন।

গত ১৮ নভেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় নাইপল ঢাকা লিট ফেস্টিভ্যাল‘-এ প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে নিজের লেখক জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলে ও হাস্যকৌতুকের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। এ সময় মুহুর্মুহু করতালিতে বারবার মুখরিত হয়েছিল বাংলা একাডেমির মিলনায়তন। দ্য রাইটার অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ডশিরোনামের আলোচনার প্রধান আকর্ষণ ছিলেন নাইপল। সাহিত্যে অনবদ্য সৃষ্টিশীলতার কারণে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক বিদ্যাধর সুরুজপ্রসাদ নাইপল যখন হুইল চেয়ারে করে মঞ্চে উপস্থিত হয়েছিলেন তখন কানায় কানায় পরিপূর্ণ মিলনায়তনের দর্শকরা তার সম্মানে একসাথে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।
নিজের সৃষ্টিশীলতার কথা জানাতে গিয়ে নাইপল বলেন, ‘সৃষ্টিশীল যে কোনো কাজের পেছনে কাজ করে অদ্ভূত পাগলামি। ওটা না থাকলে সৃষ্টিশীল কাজ হয় না। আমার লেখালেখির জীবন ছিল জাদুর মতো। আমি ভাগ্যবান যে, সেই পথে হেঁটেছি। লেখক হতেই চেয়েছি আমি। সে ইচ্ছে তৈরি হয়েছিল আমার লেখক বাবাকে দেখে। আমার অনেক লেখায়ই আমার বাবার জীবনের কাহিনীর ছাপ রয়েছে।

কিন্তু শুরুতে আমি জানতাম না, কী লিখব।তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম, এর জন্য আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। আমার কাছে বিষয়টি খুব বিব্রতকর ছিল। লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাম। নিজের ব্যাপারে নিজেই বিরক্ত হতাম। এক সময় বিবিসির লন্ডন অফিসের ডার্করুমে বসে টাইপরাইটারে লিখতে শুরু করলাম। নিজেকে বললাম, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এ ঘরা ছেড়ে যাব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না জানি যে আমার লেখাটি কী দাঁড়াচ্ছে।

নাইপল বলেন, ‘আমি যে লেখালেখি করেছি, তা ননসেন্সছাড়া আর কিছুই না। আবার এটাও বলতে হয়, কোনো কিছুই খুব সহজ নয়। অনেক চিন্তাভাবনা করে, তারপরই একটা কিছু দাঁড়ায়। একটা সময় আমি বুক পকেটে নোটবই নিয়ে ঘুরতাম এবং যাদের ভিন্নরকম মনে হতো, তাদের সঙ্গে কথা বলতাম এবং সেগুলো লিখে রাখতাম।নাইপলের বক্তব্যের মাঝখানে তার বিখ্যাত বই অ্যা হাউজ ফর মি. বিশ্বাস‘-এর পান্ডুলিপি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন নাদিরা নাইপল। তিনি বলেন, ‘এ বইয়ের পান্ডুলিপি ভুল করে রান্নাঘরে ফেলে আমরা প্যারিস চলে গিয়েছিলাম। এর আর কোনো কপি ছিল না। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ পান্ডুলিপিটির কথা মনে পড়ে যায়। তখন আমি সেটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করি। পরে এ বইটি তুমুল পাঠকপ্রিয়তা পায়।

ঢাকা লিট ফেস্টে অংশগ্রহণ শেষে তিনি আরও কয়েক দিন ঢাকা ছিলেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে দেখেন। এ সময় কোনো প্রকার আমন্ত্রণ ছাড়াই তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। আবেগাপ্লুত নাইপল এ সময় বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি শুনেছিলাম এখানে অতিথি পাখি আসে। ঢাকার কাছে হওয়ায় না এসে থাকতে পারিনি।হুইল চেয়ারে বসে ঘুরে ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজাপতি পার্কও দেখেন তিনি। এ সময় নাইপল বলেন, ‘এই ক্যাম্পাস, এখানকার পাখি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা আমার স্মৃতিতে অমস্নান হয়ে থাকবে।বোঝা যাচ্ছে, তার পূর্বপুরুষের জন্মভূমি ভারত ভ্রমণ শেষে নাইপলের ঝাঁজালোপ্রতিক্রিয়ার বিপরীতে বাংলাদেশ পরিদর্শন শেষে তার মুগ্ধতা ছিল লক্ষণীয়ভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশ সত্যিই এগিয়ে যাচ্ছে। জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো

সূত্রঃ দৈনিক যায় যায় দিন, ২৫ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: