প্রথম পাতা > জীবনী, বাংলাদেশ, মিডিয়া, সাহিত্য > সাংবাদিকতার পথিকৃৎ মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন

সাংবাদিকতার পথিকৃৎ মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন

nasiruddin. গুলশান আরা : গত ২০ নভেম্বর ছিল এদেশের সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ১২৮তম জন্মবার্ষিকী। বিলম্বিত এ লেখাটি তার উদ্দেশেই নিবেদিত।

সাংবাদিকতা মহৎ পেশা। কিন্তু এ পথের যারা পথিক তাদের পথ কিন্তু মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ না। বরং পদে পদে বিপদসংকুল।

অতীতের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব কেমন কণ্টকাকীর্ণ ছিল এই পথ। আমাদের দেশের সাংবাদিকতার প্রবাদপ্রতিম পুরুষ সর্বজনশ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন যখন এই পেশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন, কেমন ছিল সেই সময় চলুন একবার ঘুরে আসি।

১৯১৭ সালে পত্রিকা প্রকাশের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে নাসিরউদ্দীন চাঁদপুর ছেড়ে কলকাতায় রওনা দেন। কলকাতায় গিয়ে নিজের উদ্দেশ্য অনেকের কাছেই ব্যক্ত করলে সবাই আশ্চর্য হয়ে বলেন, হিন্দুদের মতো ছবিসহ কাগজ বের করলে তো উৎসাহ দেখানো যায় নাকারণ ওটা গুনাহর কাজ। ইসলামী পত্রিকা বের করলে না হয় উৎসাহ দেখান যেত।

মুশকিলে পড়লেন নাসিরউদ্দীন। এত আশা নিয়ে এসেছেন আধুনিক পত্রিকা বের করবেন, তার মধ্যে কিনা এই কথা! আবার তিনি দৃঢ়সংকল্প হন। কোনো বাধা তাকে তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। তিনি পত্রিকা বের করবেনই এবং তা হবে আধুনিক পত্রিকা, সাহিত্য সৃষ্টির হাতিয়ার।

সেকালে মুক্তবুদ্ধির চিন্তা নিয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। বিধিনিষেধকড়াকড়ি এত ছিল যে, চিন্তাশীল লেখকরাও সে বেড়াজাল ছিঁড়তে সাহসী হতেন না। তখন যেসব পত্রপত্রিকা মুসলমান সমাজে প্রচলিত ছিল তাতে শিল্পসংস্কৃতি বা জ্ঞানবিজ্ঞানের কথা থাকত নাতাই লেখকরা তাদের লেখা বা আলোচনা সীমিত রাখতে বাধ্য হতেন। সে সময়ে পত্রিকাগুলোর সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মৌলভী বা মওলানা। তারা তাদের কাগজে নিজ নিজ উগ্র মতবাদ প্রচার করতেন। ফলে পরস্পরের বিদ্রুপ, গালিবর্ষণ, কোন্দলই এদের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যে যত বেশি কলহে ইন্ধন জোগাতে পারবেন তিনি তত বড় ধর্মীয় নেতা বলে পরিচিত হতেন। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে বিপজ্জনক কোন্দল লাগাতেও তারা দ্বিধা করতেন না। এই অন্ধকার যুগে কী করে যে নাসিরউদ্দীন স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশে ব্রতী হয়েছিলেন তা সত্যি অবাক করার ব্যাপার। শুধু আমরা ভেবে অবাক হই তাই না, তিনি নিজেও বলেছেন, সে সময়ে কী করে যে আধুনিক ধরনের সচিত্র মাসিক পত্রিকা প্রকাশের সংকল্প নিয়েছিলেন তা নিজেই এখন বলতে পারেন না।

নিজে সাহিত্য বা পত্রিকা পরিচালনায় অনভিজ্ঞ হয়েও অল্প বয়সে একটা ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বাধানিষেধের মধ্যে থেকে জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও এমন একটি পত্রিকা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন যে দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি, তার তুলনা বিরল। গল্পউপন্যাস সম্বন্ধে তৎকালীন ধারণা ছিল যে, ‘উপন্যাসের মাদকতায় মানুষ মুগ্ধ হইয়া পড়িলে তাহার রুচি বিকার উপস্থিত হয় এবং বর্তমান সময়ে উপন্যাস আমাদের সর্বনাশ করিতেছে।’

এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে নাসিরউদ্দীন বের করতে লাগলেন ‘সওগাত’। পদে পদে বাধা আসতে লাগল তার সামনে। চিত্রশিল্পী পাবেন কোথায়? হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে অসংখ্য চিত্রশিল্পী থাকলেও মুসলমানদের ভেতর কোনো চিত্রশিল্পী পাওয়া গেল না। অবশেষে গণেশ ব্যানার্জী নামের এক শিল্পী দিয়ে সওগাতের প্রচ্ছদ ও ভেতরের কয়েকটি লাইন ও কার্টুন ছবি আঁকানো হল।
এর পরের সমস্যাটি আরও ভয়ংকর। লেখা পাওয়া মুশকিল হয়ে গেল। মুসলমান লেখকদের লেখা দিয়ে পত্রিকা বের করার পরিকল্পনা থকলেও তা সম্ভব হল না। তাই হিন্দুমুসলমান লেখকদের রচনা দিয়েই পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন। শুধু লেখা পেলেই তো পত্রিকায় প্রকাশ করা যায় নাতিনি পড়লেন প্রেসের সমস্যায়। ‘সওগাতে’র পাণ্ডুলিপি নিয়ে সারা কলকাতা ঘুরেও মুসলমানদের কোনো উন্নতমানের প্রেস তিনি পেলেন না। হিন্দু সম্প্রদায়ের যেসব বড় প্রেস ছিল তাতে ছাপার দাম এত বেশি যে তা বহন করা কষ্টকর।

খবর পেলেন উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকায় একটি প্রেস আছে এক জমিদারের। প্রেসটি একরকম পড়েই আছে। তিনি সেখানে গেলেন। তারা বললেন তাদের প্রেসে আরবি হরফ নেই, মুসলমানদের পত্রপত্রিকায় বাংলার সঙ্গে আরবি অক্ষর থাকে। এই প্রেসে হবে না। তিনি বুঝিয়ে বললেন, এটা আধুনিক উন্নত শ্রেণীর কাগজ হবে এবং বাংলাতেই ছাপা হবে। তারা রাজি হলেন, তাদের হাতে পাণ্ডুলিপি দিয়ে দিলেন নাসিরউদ্দীন। এরপরও রয়ে গেল ব্লক প্রস্তুতের সমস্যা। যেহেতু ব্লক প্রস্তুতের কাজও ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই গুনাহের ভয় দেখিয়ে মোল্লারা এই দুই শিল্প থেকে মুসলানদের সরিয়ে রেখেছিল।

১৯১৮ সালে সওগাত প্রকাশের আগে বাংলার মুসলমান সমাজে কোনো পত্রিকায় মানুষের ছবি নিয়ে কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র ছাপা হয়নি। মহিলাদের ছবি ছাপা তো কল্পনারও বাইরে। প্রথম সংখ্যা সওগাতে সম্পাদক চিরচরিত বিধিনিষেধ ভেঙে নারীপুরুষের ছবি ও কার্টুন ছবিসহ পত্রিকা প্রকাশ করে দুঃসাহসের পরিচয় দেন।

প্রথম সংখ্যা সওগাত বের হলে চিন্তাশীল সাহিত্যিক সমাজ এবং তরুণদের কাছ থেকে তিনি আন্তরিক অভিনন্দন লাভ করেন। কিন্তু মানুষের ছবি, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের কয়েকটি ঐতিহাসিক ছবি ছাপাকে কেন্দ্র করে গোঁড়া মোল্লা শ্রেণীর লোকরা সওগাতের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। অনেকে ভয় দেখিয়ে সম্পাদক সাহেবকে পত্র লেখেন। কেউ কেউ তার মুসলমানিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। ফরিদপুরের পীর বাদশা মিয়ার কাছ থেকেও তিনি পত্র পান। পীর সাহেব লিখেছিলেন ‘সওগাত’ খুব ভালো পত্রিকা হইয়াছে। কিন্তু আপনার কাগজে পুরুষ ও নারীদের ছবি ছাপার দরুন ইহা ঘরে রাখিয়া নামাজ পড়া যায় না।’

যুক্তিতর্কে নাসিরউদ্দীনও কম যান না। তিনি মোক্ষম যুক্তি দিয়ে পীর সাহেবকে লিখলেন, আপনারা বিধর্মী রাজার ছবি অংকিত টাকার নোট ও রাজার মূর্তি খোদিত রূপার টাকা সঙ্গে রেখে নামাজ আদায় করেন। নামাজের সময় কেউ এগুলো বাইরে রেখে আসে না। অনেক সময় ধর্মীয় গ্রন্থের সঙ্গেও এরূপ ছবিওয়ালা নোট বেঁধে রাখেন। আর আমি মুসলিম ইতিহাসের গৌরবব্যঞ্জক ছবি ছেপে কী অপরাধ করলাম! যা হোক, আপনি ‘সওগাত’ খানা নামাজের ঘরে না রেখে অন্যত্র সরিয়ে রাখলে আর কোনো অসুবিধা হবে না। এই যুক্তিতে পীর সাহেব নিজের মন্তব্য উঠিয়ে নেন এবং সওগাতের গ্রাহক হন। প্রতিক্রিয়াশীল মোল্লারা বললেন, ছবিওয়ালা পত্রিকা মুসলমানদের পড়া উচিত না। চিৎকারচেঁচামেচিতে সম্পাদক বুঝে নিলেন পত্রিকা প্রকাশ করে তিনি সফল হয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ বিনা পারিশ্রমিকে সওগাতের জন্য লেখা দিয়ে নাসিরউদ্দীনকে উৎসাহিত করেছিলেন। আর নজরুলের প্রতিষ্ঠা, খ্যাতি, যশ যে সওগাতকে ঘিরেই বিকশিত হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য। সওগাতের সঙ্গে আরও একজনের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়, তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। তার লেখা ‘সওগাত’ নামের কবিতা বুকে ধরেই সওগাত প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। সওগাত কবিতার আহ্বান

জাগো বঙ্গবাসী/দেখ, কে দুয়ারে
অতি ধীরে ধীরে করে/করাঘাত।
ঐ শুন শুন/কেবা তোমাদের
সুমধুর স্বরে বলে/সুপ্রভাত।’

মধুসূদনের ভ্রাতুষ্পুত্রী কবি মান কুমারী বসুও ‘সুপ্রভাত’ নামে কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন সওগাতের জন্য। এতে সম্পাদক সাহেবের আশা হল যে ক্রমে তিনি নারী সমাজ থেকেও লেখা পাবেন এবং তা সত্যি হয়েছিল বলেই ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে সওগাতের প্রথম মহিলা সংখ্যা প্রকাশিত হয়।

বাল্যকালে কোনো এক সহপাঠী তার হাত থেকে পত্রিকা কেড়ে নিয়ে বলেছিল ‘তোদের মোসলমানদের তো এরূপ কোনো পত্রিকা নেই, আমাদেরগুলো দেখার এত শখ কেন? যা দেবো না।’ সহপাঠীর এই শেষ উক্তির বেদনাবোধ তাকে মর্মাহত করেছিল, যার জন্য তিনি পরবর্তী সময়ে স্বীয় সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ববান হয়ে সেই অভাব পূরণ করলেন জীবনভর।
চাঁদপুরের চাঁদসওদাগর নাসিরউদ্দীন যে অলৌকিক আলো জ্বেলে গেছেন আমাদের সঠিক পথে চলতে, তার সে অবদান যেন আমরা ভুলে না যাই। তার কাছে আমরা চিরঋণী।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২৪ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: