প্রথম পাতা > অপরাধ, আন্তর্জাতিক, ইতিহাস, ইসলাম, জীবনী, রাজনীতি > টনি ব্লেয়ারঃ এক নির্লজ্জ সুযোগ-সন্ধানী যুদ্ধাপরাধী

টনি ব্লেয়ারঃ এক নির্লজ্জ সুযোগ-সন্ধানী যুদ্ধাপরাধী

নভেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

বিলায়ার’ কি বুশের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাঁধে সওয়ার হতে পারবেন?

chilcot-report-blairআবদুল গাফ্ফার চৌধুরী : কার্ল মার্কসের একটি বহুল উদ্ধৃত কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করছি। মার্কস বলেছেন, ‘ইতিহাস নিজেই তার পুনরাবৃত্তি ঘটায়, প্রথমে ট্রাজেডিতে, তারপর তামাশায়।’ পাশ্চাত্যের ইতিহাসে এই কথাটি আবার তার সত্যতা প্রমাণ করতে চলেছে মনে হয়। ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগের সিদ্ধান্ত (ব্রেক্সিট) এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় সারা বিশ্বে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার তার সুযোগ গ্রহণ করে নিজের ভাগ্য ফেরাতে চাইছেন এবং ইতিহাসের আরেক দফা পুনরাবৃত্তি ঘটুক তাও চাইছেন সম্ভবত।

টনি ব্লেয়ার ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন ‘মিথ্যাবাদী রাখাল বালক’ হিসেবে পরিচিত এবং মিথ্যাচার দ্বারা ইরাক যুদ্ধ বাধানোর জন্য নিজ দেশের তদন্ত কমিশন কর্তৃক অভিযুক্ত। যুদ্ধাপরাধীর তকমা কপালে লেগে থাকায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েও তিনি হতে পারেননি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দূত হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। তাতে আরও বিতর্কিত হয়েছেন। এখন তিনি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামাচ্ছেন নানা ধরনের প্রকাশ্য ও গোপন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের ডিলের সঙ্গে জড়িত থেকে এবং নিজেকে আরও বিতর্কিত ও সমালোচিত করে।

টনি ব্লেয়ারের অবস্থা এখন ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়লের’ মতো। কেউ তাকে এখন আর পাত্তা দেয় না, তার কথা শোনে না। তবু তিনি গায়ে পড়ে সব বিশ্ব সমস্যায় নাক গলান, অযাচিত উপদেশ দেন। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলের অপকর্মগুলোর সাফাই গান। কিন্তু এই প্রকাশ্য সাফাই গাওয়া দিয়ে তিনি দেশেবিদেশে মানুষের কাছে একেবারেই প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় তীব্র মানসিক জ্বালা এড়াতে পারছেন না। এটা তার চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। এক কালে টনি ব্লেয়ারের ছিল চিরতারুণ্য ভরা বেবি ফেস। এখন সেখানে অকাল বার্ধক্যের ছায়া। এখন তার চোখেমুখে অকালপক্ব বার্ধক্যের ছাপ।

টনি ব্লেয়ারকে একশ্রেণীর ব্রিটিশ মিডিয়ায় নাম দেয়া হয়েছিল ‘বিলায়ার’। আমেরিকার ইতিহাসে ‘নিকৃষ্টতম প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে আখ্যাত জর্জ বুশ জুনিয়রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মিথ্যাচার দ্বারা ইরাক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং সারা বিশ্বে অশান্তির আগুন জ্বেলেছেন। যে অশান্তির আগুনে এখনও পুড়ে মরছে মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ নিরীহ নারীপুরুষশিশু। লাখ লাখ মানুষকে এখনও দেশ ছেড়ে বিদেশে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। আইএস সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে এবং সারা বিশ্বে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

সারা বিশ্বে হিটলারমুসোলিনি জুটির পর এত বড় অঘটন আর কেউ ঘটাতে পারেননি, যেটা ঘটিয়েছেন বুশব্লেয়ার জুটি। অনেক পশ্চিমা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই বলেন, যদিও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অশান্তির জন্য জর্জ বুশই প্রধানত দায়ী, কিন্তু তার অযোগ্যতা, অনভিজ্ঞতা, অশিক্ষা ও বলদর্পী চরিত্রের সুযোগ নিয়ে ব্রিটেনের লেবার পার্টির নেতা হয়েও ব্লেয়ার আমেরিকায় ডেমোক্রেট দলের বন্ধু হওয়ার ট্রাডিশন ভেঙে রাতারাতি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বুশের বন্ধু হয়ে যান এবং তার যুদ্ধবাদী মনোভাবকে আরও উসকে দেন। তাদের চোখে ছিল বিশ্ব জয়ের নেশা। পরিণামে বিশ্ব জয় হয়নি। সারা বিশ্বে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। ইরাকের বিরুদ্ধে অবৈধ যুদ্ধ চালাতে গিয়েও তিনি নিজের লেবার দলের সচেতন অংশের সমর্থন পাননি। তাকে টোরি দলের ভোটের জোরে পার্লামেন্টের অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে ক্ষমতায় থাকতে হয়েছিল।

পশ্চিমা রাজনীতিতে এই ‘একঘরে’ ব্লেয়ার সাহেবের এখন আবার ইচ্ছা হয়েছে তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসবেন। তাহলে তিনি আবার রাজ্য পাবেন, সিংহাসন পাবেন ইত্যাদি খোয়াব। ভাবছেন সামনে সুবর্ণ সুযোগ। ব্রেক্সিট প্রশ্নে ব্রিটিশ জনগণ দ্বিধাবিভক্ত। টোরি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে সবল নেতৃত্ব দিতে পারছেন না, দলকেও ঐক্যবদ্ধ করতে পারছেন না। লেবার পার্টি লেফ্ট করবিনের নেতৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এ দ্বন্দ্ব ও অনৈক্যও ব্লেয়ার সাহেব তৈরি করে গেছেন।

অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির একমাত্র সুপার পাওয়ারনিয়ামক আমেরিকার জাতীয় ঐক্য বিপজ্জনকভাবে বিভক্ত। বুশের চেয়েও ক্ষমতাপাগল ও উগ্রপন্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত হয়েই তিনি তার নতুন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সর্বোচ্চ পদে এমন তিন ব্যক্তিকে নিয়োগ করেছেন, যারা নিজের দেশেই ‘হকিশ’ এবং বর্ণবাদী ও যুদ্ধবাদী বলে চিহ্নিত। প্রেসিডেন্টইলেক্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এখনও আমেরিকাজুড়ে চলছে তার বিরুদ্ধবাদীদের বিক্ষোভ। বিশ্বজুড়েই চলছে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও অনৈক্য। সানডে টাইমসের ভাষায় ‘America’s journey into the great unknown’ (আমেরিকার বিরাট অজ্ঞাত যাত্রা শুরু)। আমার মতে এখানে আমেরিকার সঙ্গে বিশ্ব কথাটাও জুড়ে দেয়া উচিত।

মজার কথা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনবিজয়কে ব্লেয়ারও প্রথমে আখ্যা দিয়েছিলেন ভূমিকম্প। বলেছিলেন, ‘এটা একটা আর্থকোয়েক’ বা ভূমিকম্প। এ কথা বলার দু’দিন না যেতেই দেখা গেল, বিলায়ার সাহেব তার নামের এবং সুযোগসন্ধানী দ্বৈত চরিত্রের যথার্থতা দুটিই বজায় রেখেছেন। তিনি ছুটে গেছেন নিউইয়র্কে এবং ট্রাম্পের ওপর যে ব্যক্তির গভীর প্রভাব, সেই জার্ড কুশনারের সঙ্গে খানাপিনার টেবিলে একান্ত বৈঠক করছেন। কুশনার ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা।

ব্লেয়ারকুশনার বৈঠকের পর নিউইয়র্কে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, এই সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বুশের যেমন ঘনিষ্ঠ মিত্র ও পরামর্শদাতা সেজেছিলেন, এখন ট্রাম্পের সঙ্গেও সেই সম্পর্ক পাতাতে চান। তাই ট্রাম্পের জামাতার কাছে ধরনা দিয়েছেন। নিউইয়র্কের একটি কাগজে এ সম্পর্কে ঠাট্টা করে বলা হয়েছে, ‘দুঃখের বিষয় ব্লেয়ার মার্কিন নাগরিক নন, নইলে তিনি ট্রাম্প কেবিনেটের সদস্য হতে পারতেন।’ ব্লেয়ারের পক্ষ থেকে অবশ্য এ গুজবের প্রতিবাদ করা হয়েছে।

কিন্তু এই ধূর্ত ও সুযোগ সন্ধানী নেতার পরবর্তী কথাবার্তা ও কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি চান ইরাক যুদ্ধপূর্ববর্তী ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি ঘটাক। অর্থাৎ তিনি বুশের কাঁধে চড়ার মতো ট্রাম্পের কাঁধে চড়ার সুযোগ পান এবং ট্রাম্পের যুদ্ধবাদী ভূমিকায় পরামর্শদাতা ও সহযোগী হয়ে আবার ব্রিটিশ রাজনীতিতে ঢুকে নিজের আগের ব্যর্থ উচ্চাকাক্সক্ষা সফল করতে পারেন। মার্কসের সতর্ক বাণীটি হয়তো তিনি ভুলে গেছেন অথবা তাতে বিশ্বাস করেন না। মিথ্যাচার দ্বারা গাল্ফ যুদ্ধ বাধিয়ে তিনি ইতিহাসকে ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে সাহায্য করেছেন। এই একুশ শতকে আবারও ইতিহাসকে আরেক দফা পুনরাবৃত্তি ঘটাতে দিতে চাইলে এক বিয়োগান্ত প্রহসনের জন্ম দেয়া হবে। টনি ব্লেয়ার হবেন সেই প্রহসনের সবচেয়ে নিন্দিত ও হাস্যকর চরিত্র।

সানডে টাইমস’ (২০ নভেম্বর) খবর দিয়েছে, বিশ্বনিন্দিত টনি ব্লেয়ার বর্তমান অনিশ্চিত বিশ্ব পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজের চেহারায় কালিমা মুছে বিশ্বের ত্রাণকর্তা সাজতে চাইছেন। তিনি লেবার পার্টির ব্লেয়ারাইট অংশ এবং দু’একজন প্রভাবশালী টোরি নেতার (থেরেসাবিরোধী) সঙ্গে হাত মিলিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে আবার বিরাটভাবে ঢুকতে চান। এজন্য ওয়েস্ট মিনস্টারে অফিস খুলে একটি ‘পাওয়ার বেইজ’ তৈরি করতে চান।

ব্লেয়ার টোরি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’কে আখ্যা দিয়েছেন ‘লাইটওয়েট’ বা ব্যক্তিত্বহীন নেত্রী। লেবার পার্টির নেতা করবিনকে আখ্যা দিয়েছেন নাটার (nutter) বা পাগলাটে লোক। অর্থাৎ ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন গণনা করার মতো কোনো নেতা নেই। সুতরাং একমাত্র তিনিই পারেন এই শূন্যস্থান পূর্ণ করতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবোর্নকে কাছে টেনেছেন এবং তার সঙ্গে বৈঠক করছেন। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সঙ্গেও তার শিগগিরই এক কফিবৈঠকে বসার কথা।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছের লোকেরা মনে করেন– ‘he is part of an unholy alliance of former ministers who are determined to disrupt Brexit’ (সাবেক টোরি মন্ত্রী যারা ব্রেক্সিটকে ব্যর্থ করতে চায়, তাদের একটি অশুভ আঁতাতের অংশ ব্লেয়ার)। তাদের এই সন্দেহের কারণ, গত মাসেই ব্লেয়ার ‘নিউ ইউরোপিয়ান’ নিউজপেপারে লিখেছিলেন, ব্রিটেনে যারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকার (remain) পক্ষপাতী তাদের উচিত ইনসারজেন্সি (বিদ্রোহ) মবিলাইজ ও অর্গানাইজ করা, যাতে ব্রিটিশ জনগণ ইইউ ত্যাগের মনোভাব ত্যাগ করে।

ব্লেয়ার ওয়েস্ট মিনস্টারে অফিস খোলার জন্য জায়গা দেখা শুরু করেছেন এবং স্কটিশ লেবার দলের সাবেক নেতা জিম মারফিকে দলে টেনেছেন। নিজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তিনি একটি প্রতিষ্ঠান তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছেন। সানডে টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ‘Blair wants to show that he’s making a big comeback’ [ব্লেয়ার দেখাতে চান, তিনি (রাজনীতিতে) বিরাটভাবে ফিরে আসছেন]

ব্রিটিশ রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারলে ব্লেয়ার হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে হাত বাড়াবেন, এসো দোস্ত, বুশের মতো তোমার সঙ্গেও দোস্তালি করি। তারপর চলো আমাদের বিশ্ব আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হই। টনি ব্লেয়ারের এ অভিলাষ কি পূর্ণ হবে? আমার মনে হয় না হবে। তার মিথ্যাচার ও ধূর্ত চরিত্রের যে পরিচয় বিশ্ববাসী ইতিপূর্বে পেয়েছে, তাতে সহসা তিনি নতুন মুখোশ ধারণ করে তাদের কেন, ব্রিটেনের মানুষকেও ধোঁকা দিতে পারবেন এটা বিশ্বাস করা কঠিন। তিনি হয়তো চাইবেন, ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি ঘটাক। তা যদি ঘটে তাহলে তার পরিণতি হবে চরম বিয়োগান্ত তামাশা। আর সেই তামাশার মূল পাত্র হবেন টনি ব্লেয়ার।

লন্ডন, ২০ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: