প্রথম পাতা > অপরাধ, আন্তর্জাতিক, ধর্মীয়, রাজনীতি, সমাজ > মুসলিম হওয়াই কি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অপরাধ?

মুসলিম হওয়াই কি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অপরাধ?

rohingya-torture-3এরদোগান কোথায়? মাওলানা নিজামীকে যুদ্ধাপরাধের রায়ে ফাঁসীতে ঝুলাতে তাঁকে চিল্লাপাল্লা করতে শোণা গেলো কিন্তু আজ হাজার হাজার রোহিঙ্গা হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া সত্ত্বেও এরদোগান কেনো মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন? জাকির নায়েকের সংগঠন রাজীব গান্ধী ফাউন্ডেশনে ৫০ লাখ রুপি অনুদান দিয়েছে রোহিঙ্গাদের সাহার্য্যার্থে কি করেছে ? অমুসলিমদের মুসলিম বানানো বেশী জরুরী নাকি মুসলিমদের মুসলমানিত্ব বজায় রাখা আরো বেশী জরুরী ? ইসলামী বিশ্বের বড় বড় নেতারা যারা ধর্ম নিয়ে লম্বা লম্বা বক্তব্য দেন, তারা কই? আমরা যতদিন একতাবদ্ধ না হব ততদিন মুসলিমরা এইভাবে নির্যাতিত হবে। কোথায় মানবতা নিয়ে বুলি আওরানো লোকগুলো ?

ওবামাহিলারী চুপ কেনো? তারা নাকি ট্রাম্পের মতো মুসলিমবিদ্বেষী নন ? কিন্তু ওবামা তো চীনকে ঠেকানোর পন্থা হিসেবে মিয়ানমারের ওপর থেকে অবরোধ উঠিয়ে নিয়েছেন এবং মুসলিম নির্যাতনের ব্যাপারে স্পিকটিনট হয়ে আছেন !

অনেকে সূচির নোবেল পুরষ্কার ফিরিয়ে নেয়ার আবেদন করছেন । সেটা করে কি লাভ হবে ? নোবেল পুরষ্কার বেশীর ভাগ সময়ে (বিশেষত শান্তি পুরষ্কার) রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া হয় । ওটার পেছনে মুসলমানরা অন্তত লালায়িত থাকতে পারে না !

মুসলিম হওয়াই কি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অপরাধ?

স্টালিন সরকার : দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। পুড়ছে ঘরবাড়ি, হাঁড়িপাতিল, ধানচাল, গৃহপালিত পশুপাখি। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাদ যায়নি রোহিঙ্গা মুসলিমদের মাঠের ফসলও। আকাশে কুলী পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। প্রাণ বাঁচাতে পালানো শিশুনারীকে গুলি করা হচ্ছে। গুলিতে নিহত রক্তাক্ত লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে নারীশিশুর স্বজন। ঘরের ভিতরে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া লাশের পাশে বসে আহাজারী করছে স্ত্রীছেলেমেয়ে। এক বিভীষিকাময় নারকীয় দৃশ্য। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন সরকারের সেনাবাহিনীর এই নিষ্ঠুরতায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের মানবাধিকার ভূলণ্ঠিত। কিন্তু বিশ্ব মিডিয়াগুলোতে এগুলো স্বাভাবিক ‘খবর’। নীরব বিশ্ববিবেক! প্রতিবেশী দেশেও এ নিয়ে নেই তেমন ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া! বনজঙ্গল, সাগর পেরিয়ে বাঁচার চেষ্টায় মরিয়া সীমান্তে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম নারীশিশুদের ‘অবৈধ প্রবেশ’ ঠেকিয়েই যেন দায় শেষ করছি। উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা মুসলমান, এটাই কি তাদের অপরাধ? বিগত ষাটের দশকে হাজার হাজার মাইল দূরের ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে ভিয়েতনামীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়েছি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে মানবতার স্বার্থে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে ঢাকার রাজপথে গান গেয়ে টাকা তুলে ভিয়েতনামের নির্যাতিত মানুষের জন্য পাঠিয়েছি। অথচ বাড়ির পাশের দেশ মিয়ানমার। যাদের সঙ্গে হাজার বছরের আত্মিক সম্পর্ক। সে দেশের রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিপন্নতা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করছে না। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মুসলিম বিদ্বেষী হিংস্রতার প্রতিবাদ করছি না। দু’একটি ইসলামী দল প্রতিবাদ করলেও বড় রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীরা নীরব। জাতি হিসেবে আমরা কি মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছি?

বিজ্ঞানপ্রযুক্তির সাফল্যে পৃথিবীকে এখন বলা হয় গ্লোবাল ভিলেজ (বিশ্বগ্রাম)। বৈশ্বিক যোগাযোগে পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর নিমিষেই চলে যায় অন্যপ্রান্তে। মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামে গত অক্টোবরে রোহিঙ্গাদের গ্রামে অগ্নিসংযোগ করে। অতঃপর গত ৯ নভেম্বর মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভিযানের নামে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর শুরু করে আক্রমণ। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পরিচালিত সে অভিযানে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়েছে রাখাইন রাজ্যের শত শত মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম। রোহিঙ্গা মুসলিমদের রক্তে ভিজে গেছে রাখাইন রাজ্যের মাটি। নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে সাড়ে তিনশ’ মুসলিম শিশুনারীপুরুষ। ঘরছাড়া করা হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার মানুষকে। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নারীপুরুষশিশু বনেজঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে; সাগরে ভাসছে। বর্বরতার হাত থেকে বাঁচাতে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে বিতাড়িত হয়ে আবার সাগরবনজঙ্গলে চলে গেছে। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দেয়ার দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিক কফি আনান এবং ওআইসি রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়নের প্রতিবাদে মিয়ানমারের ওপর চাপ দেয়ার দাবি জানিয়েছে। শুধু তাই নয়, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি বাতাসে বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে বন্দুকের নলে মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান কি না এ প্রশ্ন রেখে তার নোবেল প্রাইজ বাতিলের দাবি জানিয়েছে লাখো মানুষ। প্রশ্ন হলো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের রক্তাক্তের খবর ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে; বিপন্ন হয়ে পড়েছে মানবতা; তারপরও বিশ্ব বিবেক নীরব কেন? রোহিঙ্গারা মুসলিম ধর্মের বলেই কি তারা বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোর কাছে অপাংক্তেয়? আর প্রতিবেশী দেশের মুসলিম হিসেবে বিপর্যয়ের মুখেপড়া রোহিঙ্গা মুসলিম শিশুনারীদের জন্য আমরা কি করছি? রোহিঙ্গারা মুসলিম না হয়ে যদি অন্য ধর্মাবলম্বী হতো, তাহলে কি আমরা নীরব থাকতাম? আশ্রয়ের সন্ধানে বনজঙ্গলসাগর পাড়ি দিয়ে বেঁচে থাকার আকুতিকে পায়ে দলিয়ে দিতাম?

অক্টোবরে এক পুলিশ চেকপোস্টে সমন্বিত হামলার জের ধরে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক সেনা অভিযান শুরু হয়। অতঃপর ৯ নভেম্বর সেটা বীভৎস হত্যাযজ্ঞের রূপ লাভ করে। রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ওই এলাকায় প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তথাকথিত ‘শান্তির রানী’ অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন সরকারের সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর জুলুমনির্যাতন চলছে তো চলছেই। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান সমর্থিত ‘রোহিঙ্গা ভিশন’ নামে একটি ওয়েবসাইটে পোস্ট করা একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, কিছু আগুনে পোড়া লাশ মাটিতে রাখা হয়েছে এবং এগুলোকে ঘিরে তাদের স্বজনরা আর্তনাদ করছে। ধারাভাষ্যে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের মংডুর উত্তরাঞ্চলীয় একটি গ্রামে ১৩ নভেম্বর অন্তত ৯ জন মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলে দেশটির সেনাবাহিনী। সে দিনের পর থেকে ওই গ্রামের আরও ৯০ জন নারীপুরুষশিশুর সন্ধান এখন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। এলাকাটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে খুব কাছে। বিবিসির খবরে বলা হয়, ওই ভিডিওতে যাদের দেখানো হয় তাদের ভাষা অনেকটা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এলাকার আঞ্চলিক ভাষার মতোই। ভিডিওতে আগুনে পোড়া ধ্বংসস্তুপের মধ্যে তিনটি লাশও দেখানো হয়। ভিডিওতে একটি লাশের পাশে বসে দুই মহিলা কাঁদছেন। এক মহিলা লাশটির মুখে হাত বোলাচ্ছিলেন এবং বিলাপ করছিলেন। পাশেই ছিল আরও একটি লাশ। ভিডিওচিত্রটিতে একজন ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন, তবে তাকে দেখা যায়নি। তিনি বলছিলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ১৩ নভেম্বর এই ঘটনা ঘটিয়েছে।

আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমাদের বর্তমান অবস্থাকে নরকের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, সেখানে প্রায় দেড় মাস ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কমপক্ষে সাড়ে তিনশ’ মানুষ নিহত হয়েছে। বিবিসিতে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সেখানে এমন অত্যাচার চলছে যা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। অক্টোবরের ৯ তারিখ থেকে সাড়ে তিনশ’ জনকে হত্যার পাশাপাশি বহু নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়েছেন ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষ। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে মিথ্যাবাদী উল্লেখ করে তিনি বলেন, হত্যাযজ্ঞের পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক কিম্বা সাংবাদিকদের সেখানে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। রাখাইন রাজ্যে স্থানীয় রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের সাথে কথাবার্তার ভিত্তিতে আমরা যেসব খবর পাচ্ছি সেই চিত্রটা আরো অনেক বেশি ভয়াবহ। সবচে খারাপ অবস্থা উত্তর আরাকান এবং মংডু টাউনশীপে। সেনাবাহিনী বিভিন্ন পাড়ায় বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। লোকজনকে গুলি করে মেরে ফেলছে। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে লোকজন যখন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তখন হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে গুলিবর্ষণ করে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গারা যেখানে গিয়ে লুকাচ্ছে সেখানে রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পথেঘাটে, খালে নদীতে তাদেরকে মেশিনগান দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হচ্ছে। লোকজন নৌকায় করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে চাইলে তাদের নৌকার ওপর গুলি করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যাদের নিরাপত্তা নেই তাদেরকে বাংলাদেশের আশ্রয় দেয়া উচিত। আমাদের ওপর যে নির্যাতন চলছে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। বাংলাদেশের উচিত মানবিক কারণে তাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়া। না হলে এই লোকগুলো যাবে কোথায়? অবশ্য রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে চোরাচালান প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক শেষে তিনি জানান, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মিয়ানমার সীমান্তে বিশেষ প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংসতায় সাড়ে ৩শ’ মানুষ খুন এবং এক লাখ ৬০ হাজার নিখোঁজের খবর প্রচার করা হলেও জাতিসংঘের হিসাবে এখন পর্যন্ত ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এদের অর্ধেকের বেশি গৃহহীন হয় ৯ নভেম্বরের পর। রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা, মহিলা ও কিশোরীদের ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ব্যাপকভিত্তিক অভিযোগ উঠেছে। তবে সেনাবাহিনী বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করছে। তবে তারা স্বীকার করেছে ৬৯ জন রোহিঙ্গা মুসলমানকে (তাদের ভাষায় বাঙালী) হত্যা করেছে।

এদিকে গৃহবন্দী থাকাবস্থায় ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অং সান সুচির বিরুদ্ধে ব্যাপক অসন্তোষ শুরু হয়েছে। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় ও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের সন্ত্রাসের শিকারে তিনি নিশ্চুপ। দীর্ঘ বন্দী জীবন কাটানো সুচি ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর মিয়ানমারের নির্বাচনে বিজয়ী হন। তারপরও মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন চলছেই। এ অবস্থায় সুচির নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি ক্রমাগত জোরালো হচ্ছে। ‘পিটিশন ওয়েবসাইট চেঞ্জ ডট’ ওআরজি নামে এক ওয়েব সাইটে জমা হচ্ছে তার পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবির একের পর এক আবেদন। বাংলাদেশ সময় গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত ওই পিটিশনে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। নরওয়ের নোবেল কমিটির কাছে পিটিশনটি উপস্থাপন করতে হলে অন্তত দেড় লাখ স্বাক্ষর লাগবে পিটিশনে। অং সান সু চির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে খোলা হচ্ছে নতুন নতুন পিটিশন। চলছে স্বাক্ষর সংগ্রহ। উল্লেখ, ২০১২ সালে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিগত সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষকে ঘরহারা হওয়ার পর সুচির নীরব ভূমিকার প্রতিবাদে শান্তিতে পাওয়া তার নোবেল পুরস্কার বাতিলের এই ক্যাম্পেইন শুরু হয়।

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ভয়ে সাগরবনজঙ্গল পথে পালিয়ে প্রতিদিনই বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে ঘরছাড়া রোহিঙ্গা মুসলমানরা। টেকনাফের স্থানীয়রা বলছেন, সীমান্ত রক্ষীদের কড়া প্রহরা সত্ত্বেও গোপনে তাদের কেউ কেউ ঢুকছে। আবার সীমান্ত রক্ষীরা অনেককে ফেরত পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবিকে কঠোর নজরদারীর নির্দেশ দিলেও মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। শরণার্থী বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সি আর আবরার বলছিলেন, মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে যতটা চাপ দেয়া প্রয়োজন ততটা দেয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। সে হিসেবে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার বিষয় রয়েছে বাংলাদেশের। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সি আর আবরার বলেন ‘লোকগুলো (রোহিঙ্গা মুসলিম) যখন জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে আরেক দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করছে; তখন শুধু বাংলাদেশ নয়, সব দেশের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করার বিষয় রয়েছে। এটা একটা মানবিক সমস্যা’। ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুরবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিয়ানমারের সরকারকে সেখানের নাগরিকদের নিয়ম অনুযায়ী রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে।

হাজার বছর আগে মুসলিমরাই এক সময় মিয়ানমার শাসন করতো। সেই মুসলমান জনগোষ্ঠীকে চূড়ান্তভাবে নির্মূল করতে ১৯৮৯ সালে আরাকান রাজ্যের নাম বদলে রাখাইন প্রদেশ রাখা হয়। একই সময়ে বার্মার নামকরণ করা হয় মিয়ানমার। মুসলিম রোহিঙ্গাদেরকে অবর্মী ও অবৌদ্ধ বলে অভিহিত করা হয়। নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাদের বিদেশী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। শুধু তাই নয়, তাদের ব্রিটিশ শাসনামলে বার্মায় এসে বসতি স্থাপনকারী ‘অবৈধ বাঙালি অভিবাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বার্মা থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বহিষ্কার করার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে অপারেশন পরিচালনা করা হয়। ১৯৯১ সালে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে মিয়ানমার থেকে বহিষ্কারের চেষ্টায় সেনাবাহিনী আবার ‘অপারেশন পাই থায়া’ বা ‘পরিষ্কার ও সুন্দর জাতি অপারেশন’ নামে দ্বিতীয় অভিযান শুরু করে। ২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা এ সময় পালিয়ে বাংলাদেশে আসে। ১৯৯৪ সালে আইন করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের দু’টির বেশি সন্তান নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১২ সালে আবার রাখাইন বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্মূলে দাঙ্গা শুরু করে। এতে এক হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করা হয়। অবশ্য সরকার ১৯২ জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করে। ওই সময় উগ্রসাম্প্রদায়িক বৌদ্ধরা মুসলমানদের গ্রামগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। তাই তাদের আশ্রয়ের দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের নয়। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়ানমার সরকারের স্বীকৃত ১৩৫টি জাতি গোষ্ঠীর দেশের বৈধ নাগরিক রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তুচ্ছ ঘটনায়। ভাগ্যের নির্মমতায় আরাকানের এক সময়কার মুসলিম রাজশক্তির অংশ রোহিঙ্গারা এখন শরণার্থী। এ সংকট শুরু হয় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বার্মার আরাকান দখলের পর থেকে। ১৮১৫ সালে আরাকান স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী নেতা সিনপিয়ার মৃত্যুর দুইশ’ বছর পরও রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সুরাহা হয়নি। মিয়ানমারের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আরাকানি জনগণ ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে নির্যাতননিপীড়ন চালাচ্ছে তা চরম মানবাধিকার লংঘন। পূর্বপুরুষদের ভিটেবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানরা এখন অনাহার পুষ্টিহীনতায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অথচ বিশ্ব বিবেক নীরব।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ২১ নভেম্বর ২০১৬

বিশ্ব বিবেক নীরব কেন

rohingya-torture-4মুহাম্মদ আবদুল কাহহার : রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধর্মের অনুসারী। বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় বসবাসকারীরা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের অর্থ হলো নৌকার মানুষ, যারা সমুদ্রজলে নৌকা ভাসিয়ে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে জীবিকা অর্জন করেন। ২০১২ সালের এক হিসাবে অনুযায়ী ৮ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বসবাস করে। বিবিসির এক খবরে প্রকাশ, গত ৯ অক্টোবর থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত এক সপ্তাহে মিয়ানমারে ৬৯ জন রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর তারা হেলিকপ্টার থেকেও নির্বিচারে গুলি ছুড়েছে। খবরটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। রাখাইন প্রদেশে সম্প্রতি শুরু হওয়া বিদ্রোহ দমনের অংশ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে সেনাবাহিনী স্বীকার করছে। আর রোহিঙ্গা সূত্রগুলো বলছে, সেনাবাহিনী সেখানে অধিবাসীদেরকে হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণও করছে এবং গ্রামের পর গ্রাম তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ব্যবহার করে হামলা পরিচালনা করছে। ওই এলাকায় সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা ব্রিটিশদের কর্তৃত্বকে সহজে মেনে না নেবার কারণে বরাবরই তারা মুসলমানদের শত্রু মনে করতো। ফলে বার্মায় পুরোপুরিভাবে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর রোহিঙ্গারা যাতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে এবং মুসলমানদেরকে পরাস্ত করতেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘মগ’দেরকে প্রতিষ্ঠিত করা হয় সেখানে। তারই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা উত্তর বার্মার শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অজুহাতে তাদের মিয়ানমার বা আরাকানের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ না করে শুধু আরাকানের বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করে। এই উপমহাদেশে ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে ক’টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তথা বর্তমান রাখাইন প্রদেশ তার অন্যতম। তদুপরি, মুসলিম শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ২০০ বছরের অধিককাল স্থায়ী হওয়া সেই স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব আজ নেই। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জনের পর বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলে সে সময়ের পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থান হলে তাদেরকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়। সরকারিভাবে সে দেশে তাদের বসবাসকারী হিসেবে উল্লেখ করে সাংবিধানিক ও আর্থসামাজিক অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়েছে।

বার্মা সরকারের নির্যাতনের কারণে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়ে ৫ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ এবং প্রায় ৫ লাখ সৌদিআরবে বাস করার একটি পরিসংখ্যান উইকিপিডিয়া তুলে ধরেছে। জাতিসংঘের তথ্য মতে, বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। ধর্মীয় কারণেও তাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। সালাত আদায়ে বাধা দেয়া হয়। নির্বিচারে হত্যা ও নারীদেরকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেয়াসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ দেয়া হয় না। তাদের সংখ্যা যাতে বাড়তে না পারে সে জন্য বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয় না। বৌদ্ধ রাখাইনদের টার্গেট হলো নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্যাতনের মাধ্যমে নির্মূল করা। সেই লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার ও সেনাবাহিনী পরকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিতেই যত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। ড্রউকউই শহরটি যেন গণহত্যার কূপে পরিণত হয়েছে। বার্মিজ সরকারপন্থী পত্রিকা ‘দ্যা নিউ লাইট অব মায়নমার’ সূত্রে জানা গেছে ৮টি মসজিদসহ ২০০০ রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। (২৬ অক্টোবর)। ধারণা করা হচ্ছে, ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের আনুমানিক ১০,০০০ বসতি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে পালাচ্ছে সাগরে কিংবা জঙ্গলে, তবুও রক্ষা হচ্ছে না। রাখাইন সন্ত্রাসীরা এবং কতিপয় সেনাসদস্যরা রোহিঙ্গা মেয়েদের তুলে নিয়ে ধর্ষণ করছে। বৌদ্ধরা নিজেদের অহিংস দাবি করলেও তারা সহিংসতার চরমে পৌঁছে গেছে। মুসলিমদের নির্যাতন ও হত্যার জন্য বৌদ্ধদেরকে জবাবদিহিতা ও শাস্তির আওতায় না আনায় তাদের সহিংসতা ক্রমশ বেড়েই চলছে। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নির্বাসন ও ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপারে শংকিত হলেও তাদেরকে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। এই যদি হয় তাদের অবস্থা তাহলে তাদেরকে কারা শান্তি দিবে? এভাবেই জাতিসংঘ ও ওআইসির কর্মকান্ড বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।

মুসলিমদের নির্বিচারে হত্যা করা হবে আর প্রতিবেশী মুসলিমরা শুধু তাকিয়ে দেখবে! এ যেন নিষ্ঠুরতা। তবে এটিও সত্য বহিশক্তির চাপ না থাকায় তারা যা ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছে। মুসলিম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানরা চুপচাপ না থেকে নির্যাতিত মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে নির্যাতন থেকে তাদের মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তারা যাতে নাগরিকত্ব ফিরে পায় সেই লক্ষ্যে সার্বিক ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ও হামলার ঘটনা হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া অন্যান্য পত্রিকায় তাদের সংবাদও প্রকাশিত হয় না। এদের অবস্থাটা হলো এমন যে, মুসলিমদের বেলায় তারা প্রচার বিমুখ। অথচ মুসলিম সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কোনো সম্প্রদায়ের ওপর যখন কোনো হামলা হয় তখন সে বিষয়কে খুব গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হয়। আর আমরা মুসলিমরা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের দুর্বিষহ জীবনযাপন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি কম যায় বলেই তাদের দুঃখকষ্ট বোঝার উপায় থাকে না।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুটিই প্রতিবেশী দেশ। এই দুই দেশের মধ্যে সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭১ কিলোমিটার। মধ্যযুগে আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং সেই সময় এর পরিধি চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মধ্য যুগের এক পর্যায়ে আরাকান রাজ্যসভাই মুসলিমভিত্তিক বঙ্গীয় সাহিত্যচর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল বলেই ড. এনামুল হকের তথ্য থেকে জানায়। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া হবে কি হবে না সে বিতর্কের শেষ হতেহতে হয়তো রোহিঙ্গাদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে কমে আসবে। অসহায় নারী শিশু ও বৃৃদ্ধসহ খেটে খাওয়া অশিক্ষিতঅর্ধশিক্ষিত রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী কী এভাবেই নির্যাতিত হতে থাকবে? আশ্রয়হীন এ মানুষগুলো বাংলাদেশ সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েও পায়নি তাদের সমাধান। আরাকানি মুসলমানদের সাথে বাংলাদেশের বন্ধন দীর্ঘদিনের। অথচ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সে সম্পর্ক আজ ম্লান। ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয়সহ বহুমাত্রিক বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে দেশের স্বার্থে, মুসলিম জনগোষ্ঠী হিসেবে মানবতার কল্যাণে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সুযোগ রয়েছে এখানে।

রোহিঙ্গারা মূলত মিয়ানমারের নাগরিক। বিশ্ববাসী এই চিরসত্যটি জানলেও মিয়ানমার সরকার তা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। প্রাণ ভয়ে সাগর পথে পালাতে চাইলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাদেরকে আশ্রয় দেয়া হয় না কোনো দেশে। অসুস্থ হলেও চিকিৎসা নেই, স্কুলে যেতে পারছে না এ কেমন বর্বর রাষ্ট্র। ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে না খেয়ে মরছে। প্রতিবেশী দেশগুলো তাদেরকে গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছে না। সার্বিক দিক বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, মুসলমান হওয়াই রোহিঙ্গাদের নির্যাতিত হওয়ার অন্যতম কারণ। আর এটি বিশ্ব শান্তির জন্য এক অশনি বার্তা। বাংলাদেশ সরকারের মতো কেউ কেউ ভাসমান নৌকায় শুধু খাবার আর পানীয় দিয়ে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে তাদের দায়িত্ব এড়িয়েছেন, এমনটি যথাযথ হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। রোহিঙ্গাদেরকে স্থায়ীভাবে নিরাপদে বসবাসের একটি সুযোগ করে দিতে পারলে মুসলিম জনগোষ্ঠীটি আপন ঠিকানা খুঁজে পেত। জুলুমনির্যাতন কমে আসত। শিক্ষা বঞ্চিতরা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার উপায় বের করতে পারত। কোনো মুসলিম যদি অপর মুসলিমের কাছে সহযোগিতা চায় আর তার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি তাকে সহযোগিতা না করে তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অবশ্যই তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

সর্বোপরি, রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিটি মুসলমানের সার্বিক চেষ্টা করা উচিত। রোহিঙ্গারা আর কতকাল শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করেই কী দায় এড়ানো সম্ভব? রোহিঙ্গাদের কান্না বিশ্ব বিবেককে এখনও জাগ্রত করতে পারেনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিশ্ব বিবেক এ ক্ষেত্রে নীরব কেন?

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ১৯ নভেম্বর ২০১৬
Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: