প্রথম পাতা > অপরাধ, আন্তর্জাতিক, ইতিহাস, ইসলাম, ধর্মীয়, বাংলাদেশ, রাজনীতি, সমাজ > আরাকানের রোহিঙ্গা সমস্যা আর সূচি’র অসূচি কান্ড !

আরাকানের রোহিঙ্গা সমস্যা আর সূচি’র অসূচি কান্ড !

আরাকানের অতীত ও বর্তমান

arakan-demographic-mapমুহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান : দক্ষিণপূর্ব এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত মিয়ানমার। আয়তন ২ লক্ষ ৬১ হাজার ৯৭০ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা ৬ কোটির চেয়ে বেশী। মিয়ানমার ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী বৃটেন হতে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৪০টি জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমানরা হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জনগোষ্ঠী। এদের সংখ্যা ৮০ লাখের চেয়ে বেশি। মিয়ানমারের ছোট বড় শহরেই মুসলমানদের বসবাস।

মিয়ানমারের পশ্চিমে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্বে নাফনদী ও সাগর উপকূলে এবং বিস্তীর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে আরাকানের অবস্থান। ২০ হাজার বর্গমাইল এলাকা জুড়ে আরাকান অবস্থিত। ঐতিহাসিকদের মতে, আরাকানের মাটি খুবই উর্বর। ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য আরাকান প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশ ও ভারতের সাথে রয়েছে সীমান্ত। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে আরাকান কখনো সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে মিয়ানমারের অংশ ছিল না। ১৮২৪ সালে বৃটিশবার্মা যুদ্ধে আরাকান বৃটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। বার্মিরাজা বুদা পাওয়া কর্তৃক ১৭৮৪ সালে মিয়ানমারের সাথে সম্পৃক্ত করার আগ পর্যন্ত আরাকান স্বাধীন ছিল। কিন্তু ১৯৪০ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের সময় বৃটেন আরাকানের সার্বভৌমত্ব রেঙ্গুনের কাছে ন্যস্ত করে। জাতিসংঘের ১৫১৪ ৬ষ্ঠ প্রস্তাব মোতাবেক আরাকানের সার্বভৌমত্ব বার্মা ইউনিয়নের কাছে ন্যস্ত করা ছিল অবৈধ।

১৯৪৮ সালে মিয়ানমার আরাকানকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল। কিন্তু ১৯৬২ সালে ১ ডিক্রি বলে জেনারেল নেউইনের নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা সরকার আরাকানের স্বায়ত্ত শাসন প্রত্যাহার করে। এক সময় স্বাধীনসার্বভৌম আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাস বেশি ছিল। আর আরাকান মিয়ানমারের অংশ নয়। স্বাধীনতা প্রদানকালে বৃটিশ সরকার আরাকানকে স্বায়ত্তশাসনসহ মিয়ানমারের সাথে সংযুক্ত করে দিয়ে যায়। কিন্তু জেনারেল নেউইনের সামরিক সরকার ১৯৬২ সালে আরাকানের স্বায়ত্তশাসন রহিত করে এবং পরে মুসলমানদের বহিরাগত হিসেবে গণ্য করে এবং তাদেরকে শুধু দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণতই করেনি, মুসলমানদের উপর অত্যচারনির্যাতন বৃদ্ধি করে, যাতে মুসলমানরা সেদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, যা আজো অব্যাহত আছে। আরাকানে রাখাইনদের পরেই মুসলমানদের অবস্থান।

বিগত দিনে জাতিগত দাঙ্গা সংঘটিত হওয়ার ফলে আরাকান ক্রমবর্ধমান হারে মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে। দুর্ভাগ্যজনক এই যে, আরাকান প্রদেশে বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আরাকানের ৮০ শতাংশ মুসলমানের বসবাস থাকার পরও বাইরের জগত তেমন অবগত নয়। ঐতিহাসিকদের মতে, রোহিঙ্গাদের পূর্ব পুরুষ হচ্ছে, আরব, তুর্কি, ইরানী, পাঠান, মোগল, বাঙ্গালী এবং ইন্দোমঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত কিছু জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গারা ধর্মে মুসলমান, তাদের রয়েছে পৃথক সংস্কৃতি ও সভ্যতা। আরাকানের মুসলমান অধিবাসীরা নিজেদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি সমস্যায় ভুগছে। ১৯৭৭ সালে তাদের দেশ ত্যাগের চাপের মুখ সম্মুখীন হয়। তখন থেকে রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণ শুরু হয়।

মিয়ানমার সামরিক জান্তা গোটা আরাকানের মুসলমানদের মুরগীর বাচ্চার ন্যায় খাঁঁচার মধ্যে আবদ্ধ করেছে। তাদের নেই নাগরিক মৌলিক অধিকার। ২০০১ সাল থেকে মুসলিম বৌদ্ধ জাতিগত দাঙ্গা শুরু হয় এবং নির্বিচারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যার কারণে গোটা আরাকান রাজ্যে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে উঠেছে। বৌদ্ধ ধর্মে জীব হত্যা মহাপাপ হলেও তারা বৌদ্ধ ধর্মের এ মর্মের বাণী কাজের মাধ্যমে অস্বীকার করছে। আরাকান থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধন করে সেখানে রাখাইন সম্প্রদায়ের অধিপাত্য বিস্তারে পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে।

আরাকান রাজ্যে কাউয়ার বিলের সীমান্ত রক্ষী (বিজিপি) ক্যাম্পে আক্রমণে সৃষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে দেশের সামরিক জান্তা এবং বিজিপি যৌথভাবে আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানদের দমন, নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছে। গত ৯ অক্টোবর এ ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনার সাথে কারা জড়িত এ তথ্য উদঘাটন না করে নির্বিচারে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাকে সীমান্ত রক্ষী বিজিপি সেনাবাহিনী রেডএলার্ট জারি করে রেখেছে। আরাকান রাজ্য থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সৃষ্ট ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বর্বরোচিত দমন, নিপীড়ন ও নির্যাতনে আরাকানের ৩৩ গ্রাম এখন পুরুষ শূন্য। আরাকানের স্বাধিকার আন্দোলনের সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) দমনের নামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৮শ’ ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দিয়েছে। ১১ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়ে পাহাড়ে, ধানক্ষেতে বাঁশবনে ও ঝোঁপজঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। সামরিক জান্তা ও বর্ডার পুলিশ (বিজিপি)র হাতে ২৩৩ জন নারীপুরুষ ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। আটক হয়েছে প্রায় ৩ শতাধিক। আহত হয়েছে শতাধিক। সামরিক জান্তা এবং বিজিপি নির্বিচারে হত্যার আতংকে ১৩৩ গ্রামের পুরুষ শূন্যতার সুযোগে বাড়ীতে তল্লাশীর নামে লুটপাট এবং সুন্দরী রমণীদের উপর শ্লীলতাহানিরও অভিযোগ উঠেছে।

রোহিঙ্গা সালিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) সন্ধান এবং আটকের নামে ১৩৩ গ্রামের ঘরের বেড়া, শৌচাগারের বেড়া ও গোসলখানার বেড়া পর্যন্ত তুলে নিয়েছে সীমান্ত রক্ষীরা। উচ্ছেদকৃত গ্রামগুলো হচ্ছে, কাউয়ার বিল, নাইনসং, ওয়াফেরপাড়া, কিয়ারীপাড়া, হাতগজ্যা পাড়া, নাচ্ছ্যাগুরো পাড়া, বাদল্ল্যাপাড়া, বুড়া সিকদার পাড়া, নাপপুরা পাড়া, লোটাইং, হাতিপাড়া, সিং ডিবি বিলপাড়া, হাছার বিল পাড়া, মোম্বাইপাড়া, দেচ্ছেরপাড়া, তিনগজ্যা পাড়া, খাঁইরপাড়া, কোয়াইংছড়ি বিল পাড়া, খসরের বিলপাড়া, নাপিতত বিল পাড়া, ৫নং ভেকুয়াপাড়, বাঁকঘোনাপাড়া, শীলখালীপাড়া, বুচিদং শরের, নাইক্ষ্যংচংপাড়া, মরিচ্যা বিল পাড়া, কোয়াইসং, আলিদং, রাসিদং শহরের মোজাইপাড়া, আলাপ্রাংপাড়া ও জেটিং পাড়া। এসব এলাকায় সীমান্ত রক্ষী (বিজিপি) বর্ডার গার্ড পুলিশ এবং সামরিক জান্তার ঘাঁটি ছিল মোট ৯০টি। এ ঘটনার পর আরো ২৬টি ঘাঁটি বৃদ্ধি করেছে। গত নভেম্বর মাসের ১১ তারিখ থেকে নির্যাতন ও হত্যাসহ টর্সারসেলএর মাধ্যমে নির্বিচারে হত্যাকাঅব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন নেট ও গণমাধ্যম এই বিষয়ের উপর ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ১৯ নভেম্বর ২০১৬

নন্দিত নেত্রীর মলিন মুখচ্ছবি

cr-rakhaine-sukiমোজাম্মেল হোসেন : ২০১৫এর ফেব্রুয়ারিতে কয়েক দিনের জন্য মিয়ানমারে গিয়েছিলাম। আমার সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ত্যাগী কন্যা তখন ইয়াঙ্গুনে চাকরি করত বলে আমাদের চারজনের খুদে পরিবার এই শরৎচন্দ্রীয় বর্ণনার চেনাকিন্তুঅদেখা শহরটি ছাড়াও অন্য ঐতিহাসিক শহর মন্দালয়, উত্তরের বিদ্রোহকবলিত শান প্রদেশের পিন উ লিন, সিপাও প্রভৃতি পর্যটকআকর্ষক পাহাড়ি শহর ঘুরে বেড়িয়েছি। বিশাল বিশাল বুদ্ধমূর্তি, শায়িত (রিক্লাইনিং) বুদ্ধ, বিশ্বের সর্ববৃহৎ বলে কথিত কাঠের সেতু উ বেন, দুই পাহাড়ের মাঝের উপত্যকা সংযোগকারী বিশ্বের সর্বোচ্চ বলে কথিত আকাশচারী গ্যাটেইক রেলসেতু (ভায়াডাক্ট) প্রভৃতি দেখার স্মৃতি ভোলার নয়। আবাল্য লালিত আবেগ ও ভক্তিভাব নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম দুটি ঐতিহাসিক স্থান বর্মি স্বাধীনতার নায়ক, জাতির জনক বোজ্জো (মেজর জেনারেল) অং সানের বাড়ি এবং শেষ মোগল সম্রাট ও কবি বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি বা মাজার।

স্কুলে নিচু ক্লাসে পড়ার সময়ই আমার পুলিশ অফিসার বাবার কাছে শুনেছিলাম অং সানের নিহত হওয়ার কথা। আমার জন্মের পাঁচ মাস পর তিনি নিহত হন স্বাধীনতাঅভিমুখী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে মন্ত্রিসভার বৈঠকরত অবস্থায় আরও ছয়জন মন্ত্রীসহ। যে পুরনো সেক্রেটারিয়েট ভবনে সেই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল, সেটাও দেখেছি গত বছর ভ্রমণকালে। ১৯৫৭৬৪ সময়কালে আমার স্কুলজীবনে, তখন টেলিভিশন ছিল না, রেডিওর খবরে শুধু প্রথমদিকে উ নু এবং পরে নে উইন দুই সরকারপ্রধানের নাম বারংবার শোনা যেত। আর অং সান নিহত হওয়ার গল্পটি মনে দাগ কেটেছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সময় তো আমি সক্রিয় কমিউনিস্ট কর্মী ও সাংবাদিক। তখন কতবার যে বর্মি ইতিহাসের ওই অধ্যায় মনে পড়ত।

ইয়াঙ্গুনে অং সানের বাড়িটি একটি জাদুঘর। অঙ্গনের প্রবেশদ্বারের কাছেই গ্যারেজে তার ব্যবহৃত শেষ মোটরগাড়িটি রাখা আছে। বাড়ির ভেতরে সাধারণ চেয়ারটেবিল, বিছানাপত্র, ব্যবহার্য কাগজকলম আর পারিবারিক অনেক ছবি দর্শনীয়। অং সানের সংগ্রামী জীবনের ও সরকারি কার্যকালের কিছু ছবি, লড়াকু সহকর্মী ও বিদেশি অভ্যাগতদের সঙ্গে, পরিবারের কনিষ্ঠ কন্যা শিশু অং সান সু চি অন্য ভাইবোনদের সঙ্গে খেলায় রত, মায়ের সঙ্গে, বাবার কোলে এসব ছবি। আর আছে নেতার বক্তৃতার বিভিন্ন উদ্দীপিত অংশ বড় বড় ফলকে মুদ্রিত।

সু চির দীর্ঘ সংগ্রাম, গৃহবন্দি জীবন, তার আন্তর্জাতিক সম্মান আমাকে সব সময় আকর্ষণ করেছে। তিনি পড়েছেন ভারতের দিল্লীতে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। বিয়ে কিউবায় জন্মগ্রহণকারী আধাইংরেজ, ইতিহাসের অধ্যাপক মাইকেল অ্যারিসের সঙ্গে ১৯৭২ সালে। বাবা নিহত হওয়ার পর থেকে প্রথমে মায়ের সঙ্গে ভারতে ও পরে স্বামীর সঙ্গে লন্ডনে প্রবাস জীবন থেকে ১৯৮৮ সালে সু চি অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার জন্য ইয়াঙ্গুনে ফেরেন। তখন জড়িয়ে পড়েন মিয়ানমারের সামরিক শাসনবিরোধী জনগণের সংগ্রামে। আর যাননি। রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সাধারণ সম্পাদক হন। স্বামী কয়েকবার মিয়ানমারে এসেছেন। দুই সন্তান বাবার কাছে। ১৯৯৫ সালে ইয়াঙ্গুনে স্বামীস্ত্রীর শেষ দেখা। অ্যারিসের ক্যান্সার ধরা পড়লে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বহু আন্তর্জাতিক বড় বড় নেতার অনুরোধ সত্ত্বেও তাকে মিয়ানমারে যাওয়ার ভিসা দেয়নি। সু চিকে বলেছিল, আর ফিরে না আসার শর্তে দেশ ত্যাগ করতে পারেন। সু চি তার জনগণকে ত্যাগ করে যেতে রাজি হননি। অ্যারিসের মৃত্যু হয় ১৯৯৯ সালে অক্সফোর্ডে, সু চি যখন ইয়াঙ্গুনে গৃহবন্দি। ৫০ বছর ধরে বার্মা বা পরে মিয়ানমার ছিল বিশ্ব বলতে একমাত্র চীনের প্রভাবাধীন নিষ্ঠুর সব সামরিক জান্তার শাসনাধীনে এক আবদ্ধ রাষ্ট্র। ছাত্রসমাজ ও বৌদ্ধভিক্ষুদের কত সংগ্রাম, কত রক্ত, কত আত্মদান। ১৯৮৯ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ২১ বছরের মধ্যে ১৫ বছর সু চি ছিলেন নিঃসঙ্গ গৃহবন্দি। মাঝেমধ্যে ছেড়ে অনেক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রেখেও জান্তা আবার ধরে গৃহবন্দি করত। আন্দোলনের কারণে নির্বাচন দিতে বাধ্য হলেও জান্তা ক্ষমতা ছাড়েনি। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে সু চির দল পার্লামেন্টের ৮১ শতাংশ আসন পেয়েও ক্ষমতা পায়নি। ২০১০এর নির্বাচনে সু চিকে লড়তে দেওয়া হয়নি এবং এনএলডি বর্জন করে। কিন্তু ২০১২ সালে ৪৫টি আসনের উপনির্বাচনে ৪৩টিই এই দল পায় এবং সু চি নিজে পার্লামেন্ট সদস্য হন। প্রবল আন্তর্জাতিক চাপে ও পরিবর্তনের বাস্তবতায় মিয়ানমার ২০১০ থেকেই ধীরে ধীরে বিশ্ববাজারে নিজেকে উন্মুক্ত করতে থাকে, অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দরজা খুলতে থাকে।

ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে বার্মার গভীর ঐতিহাসিক নৈকট্য। সমকালীন ইতিহাসে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধী, পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা ও মিয়ানমারের অং সান সু চি প্রমুখ নারী নেতা আমাদের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তারা একাধারে দুঃখিনী রাজকন্যা ও সম্রাজ্ঞী। জনগণবন্দিতা। দুজন আততায়ীর হাতে নিহত, দুজনের পিতা ও একজনের স্বামী নিহত। আমার সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক সত্তার অতিরিক্ত অন্তরে এই নারী নেত্রীদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ আছে। ২০১০ সালের শেষভাগে প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ ও দেশের অগি্নগর্ভ অবস্থায় সু চি যখন গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেলেন, প্রথম যেদিন এনএলডির সদর দপ্তরে উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের মাঝে এলেন এবং তার পরে মুক্তভাবে দেশেবিদেশে কাজে নামলেন, তখন আমি টেলিভিশনের সংবাদচিত্রগুলোর দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকতাম। গত বছর মিয়ানমারে বেড়ানোর সময় আমার মেয়ে কয়েকটি বই উপহার দিয়েছিল, তার মধ্যে ছিল মাইকেল অ্যারিসের সম্পাদিত, ভাকলাভ হাভেল ও ডেসমন্ড টুটুর ভূমিকাসংবলিত সু চির ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার অ্যান্ড আদার রাইটিংসবইটি। সু চির কিছু স্মৃতি ও বক্তৃতার সংকলন। তার দেশের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের উপাখ্যান। স্বাধীনতা, সাহসিকতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মহৎ মূল্যবোধ ঊর্ধ্বে তুলে ধরে প্রেরণাদায়ক কত কথা। আমরা তো বইটি নেলসন ম্যান্ডেলার লং ওয়াক টু ফ্রিডমবইটির পাশেই রাখি। সু চি নোবেল শান্তি পুরস্কার (১৯৯১), সাখারভ পুরস্কার, জওয়াহেরলাল নেহরু পুরস্কার, সাইমন বলিভার পুরস্কার, ওলফ পাম পুরস্কার, কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডালসহ কত আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন।

আমার মেয়েটি বলল, এখানে সু চি খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু নির্বাচন অনিশ্চিত। মিয়ানমারের মানুষ দীর্ঘ সামরিক নিষ্পেষণে রাজনৈতিক কথা খুব কম বলে। তবু গত বছর আমরা মিয়ানমারে জিজ্ঞাসা করে জবাব পেতাম, নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারলে সু চির এনএলডি জিতবে। তবে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দেবে না।

ক্ষমতা দিতে হয়েছে। ১৯৯০ সালের পর প্রথম মুক্তভাবে হওয়া ২০১৫এর নির্বাচনে এলএনডি পার্লামেন্টের ৮৬ শতাংশ আসন পেয়েছে। নির্বাচনের বাইরে অবশ্য দুই কক্ষের পার্লামেন্টে সামরিক বাহিনীর নিযুক্ত সদস্য আছেন ২৫ শতাংশ। সংবিধান অনুযায়ী বিদেশি বিয়ের কারণে সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। এই পদের নির্বাচকমণ্ডলী হলেন পার্লামেন্ট সদস্যরা। এবারই প্রথম একজন বেসামরিক নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আছেন। কিন্তু পার্লামেন্টে আইন পাস করে সু চির জন্য একটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, যার নাম স্টেট কাউন্সেলর বা রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা। প্রধানমন্ত্রীর সমমানের, কিন্তু সরকারপ্রধান না হয়েও সু চিই সরকার চালান। তার আরও পদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টের অফিসমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও জ্বালানিবিদ্যুৎমন্ত্রী।

এহেন জনগণবন্দিত নেত্রী আজ বিশ্বব্যাপী সমালোচনার সম্মুখীন। এর শুরু তার গৃহবন্দিত্বের অবসান তথা ২০১১ সাল থেকেই। পর পর কয়েক দফা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে তিনি নিশ্চুপ থাকেন। নির্বাচনে তিনি এনএলডিতে একজনও মুসলমান প্রার্থী রাখেননি। মিয়ানমারে পাঁচ কোটির কিছু বেশি লোকের মধ্যে ২০১৩ সালের হিসাবে রোহিঙ্গা মুসলমানের সংখ্যা ১৩ লাখের মতো। তারা বসবাস করে আরাকান বা রাখাইন প্রদেশের শহরগ্রামে। সেখানে এলাকা বিশেষে তারাই ৮০ থেকে ৯৮ ভাগ। ১৯৯০ সাল থেকে বস্তুত অত্যাচার চলছে। সরকারের দাবি, তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বহিরাগত। স্থানীয় বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার তারা। ২০১০, ২০১২, ২০১৫তে তীব্র দাঙ্গা বা সহিংসতা হয়। এখন আবার হচ্ছে। রোহিঙ্গারা শরণার্থী হয়ে দলে দলে বাংলাদেশে এসেছে। কক্সবাজারে জাতিসংঘের শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় ৩২ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা থাকলেও দেশে অবৈধভাবে প্রায় পাঁচ লাখ রয়েছে বলে মনে করা হয়। একটি সরকারি শুমারি চলছে, যার ফল বেরোলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। গত কয়েক দিন আরাকানে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় দাঙ্গাবাজরা রোহিঙ্গাদের গুলি করে, কেটে হত্যা, এমনকি জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে বলে খবর বের হচ্ছে। শরণার্থী আসছে, আমাদের বর্ডার গার্ড ঠেকাচ্ছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন কাজ করছে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে। তারা মিয়ানমার ঘুরেছেন। বাংলাদেশে তাদের আসা উচিত। সু চির মনোভাব এত অনমনীয় যে হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে শুধু নিশ্চুপ নন, গত মে মাসে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্কট মার্সেলকে বলেছিলেন, তাদের রোহিঙ্গা নামে উল্লেখ না করতে। মিয়ানমার সরকার তাদের বাংলাদেশি মুসলিম বলে অভিহিত করতে চায়। বিবিসির সাংবাদিক মিশাল হুসেনকে সু চি একটি ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার নিন্দা জানাতে অস্বীকার করেন। পরে তিনি চটে গিয়ে নিজের কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, মিশাল হুসেন যে মুসলমান, তা তো তাকে আগে জানানো হয়নি। এ কথা ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়। নিউইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি এক নিবন্ধে রোহিঙ্গা প্রশ্নে সু চির নীরবতাকে কাপুরুষোচিতবলে সমালোচনা করেছে। টেলিগ্রাফ, ইকোনমিস্ট প্রভৃতি পত্রিকাও তার সমালোচনা করেছে। সু চির নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের জন্য নরওয়েজীয় কমিটির কাছে দাবি জানিয়ে একটি ওয়েবসাইটে লক্ষাধিক লোক স্বাক্ষর করেছে। তাকে নোবেল কমিটি সাইটেশনে বলেছিল, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য অহিংস পন্থায় সংগ্রামের জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হলো। তিনি এশিয়ায় গণসাহসিকতার অনন্যসাধারণ নজির; নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক।

কোনো কোনো বিশ্লেষক বলার চেষ্টা করেছেন যে, বহু জাতিসত্তার দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বামার জাতির সমর্থনের জন্য তিনি রোহিঙ্গা প্রশ্নে নীরব। কেউ কেউ বলেছেন, দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর, এখনও নিরাপত্তা ইস্যুতে সামরিক বাহিনীর প্রাধান্যে সু চির পক্ষে দ্রুত অগ্রসর হওয়া কঠিন হচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীতে সু চির মাপের নেতার জন্য এসব খোঁড়া অজুহাত বলেই কি মনে হয় না? এক নন্দিত নেত্রীর মুখচ্ছবিতে এই কালিমায় আমাদের মনে ক্রোধ সঞ্চারিত, আমরা দুঃখভারাক্রান্ত। রোহিঙ্গা মুসলিম প্রশ্নে সু চির পরিবর্তিত নীতি ও সিদ্ধান্ত দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

সূত্রঃ দৈনিক সমকাল, ২১ নভেম্বর ২০১৬
Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: