প্রথম পাতা > অপরাধ, আন্তর্জাতিক, ইসলাম, ধর্মীয়, রাজনীতি, সমাজ > মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর অত্যাচার !

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর অত্যাচার !

rohingya-tortured

দিনের বেলা হেলিকপ্টার ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী

রাখাইন রাজ্যে নরকের মতো পরিস্থিতি’

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের বর্তমান অবস্থাকে নরকের সঙ্গে তুলনা করেছেন আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম। তিনি জানান, সেখানে গত প্রায় দেড় মাস ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কমপক্ষে ৩৫০ জন নিহত হয়েছেন। জীবন বাঁচাতে পলায়নপর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশের প্রতিও তিনি আহ্বান জানান। বিবিসি বাংলা।

লন্ডন থেকে নূরুল ইসলাম বিবিসিকে বলেন, সেখানে এমন অত্যাচার চলছে যা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। অক্টোবরের ৯ তারিখ থেকে তাদের হিসেবে কমপক্ষে ৩৫০ জন নিহত হয়েছেন। নূরুল ইসলামের ভাষায়, ‘বহু নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়েছেন ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষ।’ তবে মিয়ানমার সরকার কোনও সাংবাদিককেই রাখাইন রাজ্যে যেতে দিচ্ছে না। ফলে নিরপেক্ষ কোনও সূত্র থেকে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বলছে, তাদের অভিযানে ৬৯ জন নিহত হয়েছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নূরুল ইসলাম সেনাবাহিনীকে মিথ্যাবাদী উল্লেখ করে বলেন, এটা কোনওভাবেই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। কারণ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক কিংবা সাংবাদিকদের সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি জানান, রাখাইন রাজ্যের স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। সেখানকার লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তার ভিত্তিতে তারা যেসব খবর পাচ্ছেন সেই চিত্রটা আরও অনেক বেশি ভয়াবহ। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা উত্তর আরাকান এবং মংডু টাউনশীপে।

নূরুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তারা তল্লাশি চালাচ্ছে। লোকজনকে গুলী করে মেরে ফেলছে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে লোকজন যখন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে; তখন হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে গুলীবর্ষণ করে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা যেখানে গিয়ে লুকাচ্ছে সেখানে, রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পথেঘাটে, খালে নদীতে তাদেরকে মেশিনগান দিয়ে গুলী করে মেরে ফেলা হচ্ছে।’

rohingya-torture-1আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম বলেন, লোকজন নৌকায় করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে চাইলে তাদের নৌকার ওপর গুলী করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করায় তারা উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, যাদের নিরাপত্তা নেই তাদেরকে বাংলাদেশের আশ্রয় দেওয়া উচিত। তার ভাষায়, ‘আমাদের ওপর যে নির্যাতন চলছে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। বাংলাদেশের উচিত তাদের জন্যে সীমান্ত খুলে দেওয়া। না হলে এই লোকগুলো যাবে কোথায়?’

নূরুল ইসলাম বলেন, ‘মনে করুন, আপনার ঘরে যদি আগুন জ্বলে তখন প্রতিবেশীর বাড়িতে আপনার আশ্রয় নিতে হবে। এজন্যে আপনাকে তো কোন অনুমতি নিতে হবে না।’ মিয়ানমার সরকারের কাছে তিনি আবেদন জানান, বেসামরিক লোকজনের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর এই অভিযান এখনই বন্ধ করতে, সাংবাদিকদের আক্রান্ত এলাকায় যাওয়ার অনুমতি দিতে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব ঘটনা বন্ধ করতে।

বাংলাদেশে অনেকের আশঙ্কা, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী গ্রুপের সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এ রকম কোনও ভয়ের কারণ নেই। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের এই লোকগুলোকে আশ্রয় দেওয়া উচিত শুধুমাত্র মানবিক কারণেই।’ রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী বলে মিয়ানমার সরকার অপ্রচার চালাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব নিয়েই এখন টানাটানির সৃষ্টি হয়েছে।

হেলিকপ্টার আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অভিযানের ভয়ে পালিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে রোহিঙ্গারা। টেকনাফের স্থানীয়রা বলছেন সীমান্ত রক্ষীদের কড়া প্রহরা সত্ত্বেও গোপনে তাদের প্রবেশ চেষ্টা অব্যাহত আছে। টেকনাফে মিয়ানমার সীমান্তে নাফ নদী। তার পাড়েই উলুবনিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও মৎস্য ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ শিকদার। মি.শিকদারের বাড়ি থেকে সীমান্তের ওপারে পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত দেখা যায়। বাংলাদেশের সীমান্তে থেকে তারা দেখতে পাচ্ছেন দিনের বেলা ধোঁয়া উঠছে, তাদের ধারণা সেখানে বাড়ি ঘরে আগুন দেয়া হচ্ছে। মাঝে মাঝে হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। তবে সীমান্তে তাদের ‘পুশব্যাক’ও অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ শুক্রবার ১২৫ জনকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

শিকদার বলছিলেন ‘কিছু লোক বিজিবিকে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে। বিজিবি রয়েছে কঠোর প্রহরায়। তারপরেও রাতের অন্ধকারে ফাঁক ফোকর দিয়ে কিছু লোক কিন্তু ঢুকে যাচ্ছে। ব্যবসায়ের কারণে যারা বাংলাদেশে আসছেন তাদের কাছে থেকে জানতে পারছেন কিছু বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে মিয়ানমারে, কিছু লোককে টার্গেট করে গুলী করে মারা হয়েছে। মেয়েদের ধর্ষণের খবর তারা পেয়েছেন। বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।

এদিকে আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের অবস্থাকে নরকের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, সেখানে গত প্রায় দেড় মাস ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কমপক্ষে সাড়ে তিনশো জন নিহত হয়েছে। মিয়ানমারকে কেন চাপ দেয়া হচ্ছে না?

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অভিযানের ভয়ে পালিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে রোহিঙ্গারা। টেকনাফের স্থানীয়রা বলছেন সীমান্ত রক্ষীদের কড়া প্রহরা সত্ত্বেও গোপনে তাদের প্রবেশ চেষ্টা অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। কিন্তু মিয়ানমারকে কেন চাপ দেয়া হচ্ছে না?

শরণার্থী বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সি আর আবরার বলছিলেন মিয়ানমারকে যতটা চাপ দেয়া প্রয়োজন ততটা দেয়া হচ্ছে না। শুধুমাত্র সে কারণেই এই সমস্যা জিইয়ে ছিল এবং অবস্থা এখন আরো খারাপ হচ্ছে। অতীতে চীনের কিছুটা চাপ ছিল এখন সেটাও নেই বলছিলেন সি আর আবরার । জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের কমিশন রোহিঙ্গা ইস্যুতে খুব একটা কাজ করতে পারবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।

সি আর আবরার বলেন আন্তর্জাতিক কমিউনিটি সময় নেয়ার জন্য এমন কমিশন গঠন করা হচ্ছে। তবে মূল উৎস রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের প্রধান দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। সে হিসেবে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার বিষয় রয়েছে বাংলাদেশের। সি আর আবরার বললেন লোকগুলো যখন জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে আরেক দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করছে, তখন শুধু বাংলাদেশ না সব দেশের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করার বিষয় রয়েছে। এটা একটা মানবিক সমস্যা।

ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে মিযানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিয়ানমারের সরকারকে সেখান মানুষদের নিয়ম অনুযায়ী রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেযারম্যান নূরুল ইসলাম মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের অবস্থাকে নরকের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, সেখানে গত প্রায় দেড় মাস ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কমপক্ষে সাড়ে তিনশো জন নিহত হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের জীবন

rohingya-torture-2তসলিমা নাসরিন : মিয়ানমারের রাখাইন বা আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গারা আক্ষরিক অর্থেই দেশহীন মানুষ, কোনও দেশই তাদের দেশ নয়। মিয়ানমারে বংশ পরম্পরায় বাস করেও তারা মিয়েনমারের নাগরিক নয়। তাড়া খেয়ে বাংলাদেশে, ইন্দোনেশিয়ায়, মালয়েশিয়ায়, থাইল্যান্ডে বা ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা সেসব দেশেরও নাগরিক নয়। সব দেশেই তারা শরণার্থী। অনাকাঙ্ক্ষিত শরণার্থী।

বাংলাদেশ থেকে নাফ নদী পেরোলেই মিয়ানমার। টেকনাফ থেকে নৌকো নিলে ওপাড়েই মংডো। আরাকান রাজ্যের উত্তরে এই মংডো অঞ্চলেই বাস রোহিঙ্গাদের। এক সময় বঙ্গের পূর্বাঞ্চল থেকে মানুষেরা মংডোতে গিয়ে বসত শুরু করেছিল। সম্ভবত পনেরো শ’ শতকে। অথবা তারও আগে। মানুষ গিয়েছে ইংরেজ আমলে। গিয়েছে ইংরেজ বার্মিজ যুদ্ধের পর। গিয়েছে একাত্তরে।

দুটো অঞ্চল, একটি নদীর এপার ওপার। এপারে মড়ক, ওপারে চলে যাও। ওপারে হানাহানি, এপারে চলে এসো। এভাবেই তো মানুষ বেঁচেছে পৃথিবীর সর্বত্র। আফ্রিকা থেকে আমাদের পূর্ব পুরুষ চলে এসেছিল অনুকূল আবহাওয়ার দিকে। দল বেঁধে গিয়েছিল যেদিকে খাদ্য সেদিকে, যেদিকে নিরাপত্তা সেদিকে। মানুষের ইতিহাস বলে মানুষ এক প্রান্ত থেকে ভ্রমণ করেছে আরেক প্রান্তে। বাঁচার জন্য। রোহিঙ্গারাও তেমনি। অথচ তাদের আজ দেশ বলে কিছু নেই। রাষ্ট্রপুঞ্জ তো রোহিঙ্গাদের নাম দিয়েছে, ‘জগতের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী’। দেশ থেকেও দেশ নেই—এই অনুভূতিটা আমি বেশ অনুভব করতে পারি। আমিও তো ওদের মতো বাঁচার তাগিদে এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়েছি, কেবল শরণার্থী হয়েই থেকেছি জীবনভর।

ভারত ভাগ হওয়ার সময়ই রোহিঙ্গাদের মধ্যে গড়ে ওঠা কট্টর ইসলামপন্থী মুজাহিদিন দল গোলমাল বাঁধায়। তারা জিন্নার সঙ্গে দেখা করে বলে ‘আমরা পাকিস্তানের অংশ হতে চাই, রাখাইনের পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে জুড়ে দাও’। জুড়ে দেওয়ার অনুরোধ জিন্নাহ রাখেননি! দেশভাগ হওয়ার পর থেকে মুজাহিদিনরা রাখাইনের পূর্বাঞ্চলকে মিয়ানমার থেকে আলাদা করার সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়ে যায়। ওরাই এক সময় রাখাইনের পুর্বাঞ্চল শাসন করতে শুরু করে। এ সময় বাংলাদেশ থেকেও মুজাহিদিনদের আমন্ত্রণে প্রচুর মুসলিম রাখাইনে এসে মিয়ানমার সরকারের বিনা অনুমতিতে বসত শুরু করে। প্রতিক্রিয়ায় রাখাইন অঞ্চলের শত শত বৌদ্ধ ভিক্ষু মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে। এরপরই সরকার মুজাহিদিনদের শক্তি চুরমার করে দিতে উদ্যোগ নেয়। একদিন মুজাহিদিনদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয় মিয়ানমার আর্মি। নেতাদের অনেকেই মরেছে, কেউ পালিয়েছে। এসব ঘটেছে এক দশকের মধ্যেই।

সেদিনও রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে আর্মি। ১৩০ জনকে হত্যা করেছে, এক লক্ষ রোহিঙ্গাকে উদ্বাস্তু করেছে। ২০১২ সালেও ১০০ রোহিঙ্গাকে মেরে ফেলা হয়েছিল, দেড় লক্ষ রোহিঙ্গাকে উদ্বাস্তু করা হয়েছিল। মনে আছে রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে পালাচ্ছিল মিয়ানমার থেকে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সমুদ্রে নৌকো ভাসিয়ে দিয়ে যেদিকেই যাচ্ছিলো, সেদিকেই পাড় ছিল কিন্তু অনুমতি ছিল না নৌকো ভেড়াবার। মানবতার কী বীভৎস অপমান!

জানি না কী করছেন শান্তির দূতআং সান সু চি। মিয়ানমার আর্মিদের বর্বরতার বিরুদ্ধে মোটেও তো মুখ খোলেন না। আসলে গদিতে এতই আরাম যে ওটি ধরে রাখার জন্য শান্তির দূত হয়েও চূড়ান্ত অশান্তি করতে দ্বিধা করেন না। মানবাধিকারের জন্য সারাজীবন লড়াই করেও অন্যের মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে এতটুকু লজ্জিত হন না।

সব রোহিঙ্গা মুজাহিদিন নয়, সব রোহিঙ্গাই জিহাদি নয়। বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই শান্তিতে বাস করতে চায়, জীবনের নিরাপত্তা চায়।

ইমতিয়াজ মাহমুদ খুব ভালো লিখেছেন, –‘আমাদের দেশের একদল লোক রোহিঙ্গা সমস্যাকে মুসলিমদের সাথে বৌদ্ধদের বিবাদ হিসাবে দেখিয়ে উত্তেজনা তৈরি করতে চায়। এতো সরলীকরণ করলে হবে না। সবার আগে যে কথাটা আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে, বার্মার রোহিঙ্গারা সেখানকারই একটা এথনিক গ্রুপ। সংখ্যায় যত কমই হোক, ওদের অধিকার আছে সেই দেশের নাগরিক হিসাবে সেখানেই মর্যাদার সাথে বসবাস করার আর সেই দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার। কেবলমাত্র রোহিঙ্গা বলেই ওদের সাথে রাষ্ট্র বৈষম্য করবে সেটা তো অন্যায়।

আর এই যে আমরা রোহিঙ্গাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার খবর পাই, রোহিঙ্গা হত্যার খবর পাই, সে যে অন্যায় সেটা তো আর নানারকমভাবে ব্যাখ্যা করে বলার দরকার নাই। কিন্তু ওদের সেই দুর্দশা তো আপনি ফটোশপ করে বা বানানো ফটো পোস্ট করে সমাধান করতে পারবেন না। এইসব করে আপনি এখানে দাঙ্গা লাগাতে পারবেন, তাতে রোহিঙ্গাদের বিশেষ কোনও লাভ হওয়ার তো কোনও সম্ভাবনা দেখি না। ওদের জন্যে যদি কিছু করতে চান, আমাদের সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা পর্যায়ে সমস্যাটি তুলে ধরার জন্যে। আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করা বার্মার পুরনো অভ্যাস। কিন্তু বার্মাও তো পাল্টাচ্ছে। আঞ্চলিক আর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া আপনি বার্মার বিরুদ্ধে আর কি করতে পারেন?

আর প্রতিবাদ সে তো করতেই হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তো আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। প্রতিবাদও করতে হবে যেন বার্মার শাসকরা বুঝতে পারে বিশ্বের মানুষ এই অন্যায় সহ্য করবে না। কিন্তু আমরা যখন রোহিঙ্গাদের এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিবাদ করবো সেটা যেন ওদের মৌলবাদী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর প্রতি নৈতিক সমর্থনে রূপ পরিগ্রহ না করে, সেটাও তো একটু খেয়াল রাখা দরকার। দুনিয়ার যেখানেই এইসব জ্বিহাদীরা সন্ত্রাসের পথে নেমেছে তার কোনটাই কি শেষ বিচারে মানুষের পক্ষে গেছে?

রোহিঙ্গাদের প্রতি অন্যায় মানুষের প্রতি অন্যায়। মেহেরবানী করে এটাকে আপনাদের ইসলামি আন্দোলনের সাথে মিলিয়ে নিবেন না। তাহলে এই অসহায় জনগোষ্ঠীটি সারা দুনিয়ার মানুষের সহমর্মিতা হারাবে।’

—- আমারও এই একই কথা। রোহিঙ্গাদের নিয়ে দু’ পক্ষই প্রচারণা চালাচ্ছে। কট্টর মুসলিমরা দেখাচ্ছে মিয়ানমারে মুসলিমদের মেরে কয়লা বানিয়ে ফেলেছে। মুসলিম বিরোধীরা বলছে রোহিঙ্গারা সকলেই জিহাদি, ওদের কোনও ফেভার কোরো না।

কিন্তু মানবাধিকারে বিশ্বাস করলে আমাকে ওই দু’পক্ষের কোনোটিতেই ভিড়লে চলবে না। যদি প্রমাণিত হয় কোনও রোহিঙ্গা জিহাদি কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তার শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু সে যদি নিরপরাধ হয়, তবে তাকে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব সহ সব মৌলিক অধিকারই ফিরিয়ে দিতে হবে। মিয়ানমারে যদি রোহিঙ্গারা নিরাপদ বোধ না করে, তবে যে দেশে তাদের যেতে ইচ্ছে হয়, বাস করতে ইচ্ছে হয়, সে দেশেই যেন তাদের যাওয়ার, এবং বাস করার অধিকার থাকে। জগতের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে জীবন বাঁচাতে সাহায্য না ক’রে যেন কোনও দেশ বড়াই না করে যে তারা গণতন্ত্রে বা মানবাধিকারে বিশ্বাস করে।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: