প্রথম পাতা > ইতিহাস, কবিতা, গ্রামবাংলা, ধর্মীয়, বাংলাদেশ, সমাজ, সাহিত্য > ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় মুসলিম ঐতিহ্য‘

‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় মুসলিম ঐতিহ্য‘

bkcvr-mymensigh-gitika-6মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ : বিস্ময়, স্মৃতি, শ্রুতি ও কিংবদন্তির অবাক ও অবিস্মরণীয় অমর লোকগাথা ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ বাংলা সাহিত্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী স্থান অধিকার করে আছে। সত্যতত্ত্ব, জ্ঞান ও গুরুত্বে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জনপদ ময়মনসিংহ। এ অঞ্চলের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের সুরসুবাসে মিশে আছে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র মধ্যে। বলা যায়, অমূল্য এ সাহিত্যভাণ্ডারের কোনো ধর্মীয় বিশেষত্ব নেই, বরং তা হলো ঐক্যসম্প্রীতির মেলবন্ধনের অসাম্প্রদায়িক ও আন্তধর্মীয় সহাবস্থানের অনন্ত প্রেরণা ও অপূর্ব সংহতি।

মৈমনসিংহ গীতিকা’র প্রাণ ও আবহে রয়েছে ‘মুসলিম ভাবনা’র প্রবল ও স্পষ্ট উপস্থিতি। তাই ড. দীনেশচন্দ্র সেন রায় বাহাদুর (বিএ ডিলিট) নিজেই মন্তব্য করেন, ‘এই সব পল্লীগীতিকা পড়িলে পাঠক একটা অজানিত রাজ্যের হাওয়া পাইবেনসেই হাওয়া নির্মল ও স্বতঃস্ফূর্ত এবং যাহাকে স্পর্শ করে তাহাকে নূতন জীবন দান করেএগুলি প্রেমতীর্থের তর্পণঢাকার মসলিনের মতোই এই পল্লীসাহিত্য গুণগরিষ্ঠ এবং ইহাদের মধ্যে মুসলমান কবিদের যে অবদান তাহারও কবিত্ব শক্তির তুলনা নাই। এখানে মুসলমান দীনদেশে বঙ্গসাহিত্যের ক্ষুদ্র কোণে জায়গা পাইলে কৃতার্থ হইবে না, এখানে তাহারা সিংহবিক্রমে সিংহাসন দখল করিয়া লইয়াছে।’

মৈমনসিংহ গীতিকা’য় মুসলিম ভাবনার স্বীকৃতি খোদ ড. দীনেশচন্দ্রের ‘তাহারা সিংহবিক্রমে সিংহাসন দখল করিয়া লইয়াছে।’—এ উক্তির মধ্যেই প্রমাণিত হয়। বাংলার সাহিত্য, শাসন অথবা স্থাপত্য আর সৃষ্টিনৈপুণ্যে মুসলমানদের অবস্থান সব সময়ই গর্বিত। তাই বাংলার মুসলমানদের মধ্যে বাঙালিয়ানা, বাউল ভাবনা, ধর্মীয় সংস্কার ও স্বদেশ ভাবনা একাকার হয়ে গেছে আলাদা ও আপন যোগ্যতায়। এ যেন রাবীন্দ্রিক চেতনার অনুরণন—‘পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার সেথা হতে সবে আনে উপহার/দেবে আর নিবে, মিলিবে মেলাবে—যাবে না ফিরে।’

মৈমনসিংহ গীতিকা’য় আন্তধর্মীয় মিলনভাবনা, ঐক্যের সুর, সহাবস্থানের সহজিয়া যে চেতনা, তাতে মুসলিম চেতনার স্বকীয়তা লোপ না পেয়ে বরং জীবনঘনিষ্ঠতার স্বাভাবিকতাকে শুনিয়েছে মানবতার শাশ্বত আহ্বান। ড. আশরাফ সিদ্দিকী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দীনেশচন্দ্র সেন মৈমনসিংহ ও পূর্ববঙ্গ গীতিকায় মোট ৫৫টি গীত সংকলন করেছেন। যার অধিকাংশ মুসলমান বয়াতির রচিতপূর্ব ময়মনসিংহের বিলঝিল, দিগন্ত বিস্তৃত হাওর, সুজলা সুফলা মাটি ও সবুজ অরণ্যাদি বেষ্টিত নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এবং সদরের নান্দাইল ও কিশোরগঞ্জের কিয়দাংশই আমাদের ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র ঐরহঃবৎ ষধহফ বা পশ্চাত্ভূমি।”

অন্যদিকে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় হিন্দুমুসলিম সহাবস্থানের অন্য রকম চেতনা পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার সৌন্দর্য, সমৃদ্ধি ও সম্প্রসারণে হিন্দুমুসলমান বিভাজন যে সত্য নয়, তার প্রমাণ আমাদের পুঁথি, যাত্রা, কথককাব্য, লোকগাথাগীতিকা ও পালা সাহিত্য। ড. দীনেশচন্দ্র তাঁর মূল্যায়নে ভাষার ক্ষেত্রে হিন্দুমুসলমান উদারতার সন্ধান দিয়েছেন ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় আমরা বাঙালা ভাষার স্বরূপটি পাইতেছি। বহু শতাব্দীকাল পাশাপাশি বাস করার ফলে হিন্দু ও মুসলমানের ভাষা এক সাধারণ সম্পত্তি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ইহা সব বঙ্গবাসীর ভাষা। এ ক্ষেত্রে জাতিভেদ নাই। এই ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় উর্দু উপাদান ততটা ঢুকিয়াছে, যতটা প্রকৃতপক্ষে এ দেশে আসিয়া বাঙালা হইয়া গিয়াছে। এই গীতি সাহিত্য হিন্দুমুসলমান উভয়ের, এখানে পণ্ডিতগণের রক্তচক্ষে শাসাইবার কিছু নাই।’

dineschandra-senমৈমনসিংহ গীতিকা’র প্রথম ও সবচেয়ে পরিচিত ও অভিনীত জনপ্রিয় পালা ‘মহুয়া’। পালাটি সাড়ে ৩০০ বছর আগে রচিত একটি প্রাচীন পল্লী নাটিকা। ‘মহুয়া’ পালার ছত্রসংখ্যা ৭৫৫ এবং তা ২৪টি অধ্যায়ে বিভক্ত। গীতিকার প্রথম ১৬ ছত্রের স্তোত্র জনৈক মুসলমান গায়েনের রচিত। ‘মহুয়া’ পালার বন্দনায় মানবিক সম্প্রীতি ও মুসলিম ঐতিহ্যের স্বীকৃতি মেলে ‘পশ্চিমে বন্দনা গো করলাম মক্কা এন (হেন) স্থান, উরদিশে (উদ্দেশ) বাড়ায় (হাত বাড়াইয়া) ছেলাম মমিন মুসলমান !/…চাইর কুনা (কোনা) পিরথিমি (পৃথিবী) গো বইন্ধা (বন্দনা করে)—মন করলাম স্থির/সুন্দরবন মুকামে বন্দালাম গাজী জিন্দাপীর।’

মহুয়া’ পালায় সার্থকভাবে কতগুলো আরবিফরসি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন—কোরআন, আসমান, আব, কয়বর (কবর), মক্কা, এছলাম, মমিন মুসলমান, মুকাম, গাজী, জিন্দাপীর, দরদি, শান, গাঙ্গ, সোয়ামি, দুষমন, আঁখি, বাইদ্যার তাম্শা, হিয়া (হায়া) ইত্যাদি।

তাই তো ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ভূগোল, বিশ্বাস ও ইতিহাসের সীমা ও সময় ছাড়িয়ে আজ বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ ও প্রাণময়। ‘মৈমনসিংহ গীাতিকা’ হলো মুসলিম বাংলার স্বতঃস্ফূর্ত ঐতিহ্যে সিক্ত সুর ও সুবাসের ঠিকানা। সরলতা, সমাজবাস্তবতায় প্রেম ও সৌন্দর্যের আবাহনে অনন্য এর প্রতিটি উপাখ্যান আর চরিত্র।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৮ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: