প্রথম পাতা > অপরাধ, ইতিহাস, গ্রামবাংলা, বাংলাদেশ, সমাজ > গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালদের ওপর সশস্ত্র হামলা !

গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালদের ওপর সশস্ত্র হামলা !

rhyme-sautalবদরুদ্দীন উমর : এই তদন্ত দলের সরেজমিনে সফর এবং তদন্ত রিপোর্ট কী ধরনের হতে পারে এটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সরেজমিনে তদন্তকারী ক্ষমতাসীন ১৪ দলের রিপোর্ট থেকেই বোঝা যায়। এসবের দ্বারা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি এবং অপরাধীদের শাস্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। অতীতের ও বর্তমানের অভিজ্ঞতা থেকে যদি শেখার কিছু থাকে তাহলে সেটা হল এই যে, মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের পর যে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাতে গরিব ও দুর্বল জনগণের জীবন, জীবিকা, ঘরবাড়ি, জমিজমার কোনো নিরাপত্তা নেই। এদেশে ব্যাপক লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়ে অল্পসংখ্যক লোক মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে সবদিক দিয়েই ভালো আছে।

গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম এলাকায় চিনিকল ম্যানেজার আবদুল আওয়ালের গুণ্ডাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় সাতমারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বুলবুল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর এক যৌথ হামলার ঘটনা ঘটেছে দুটি সাঁওতাল পল্লীতে। সেখানে যে কিছুসংখ্যক বাঙালির বসবাস, তারাও এ হামলার শিকার হয়েছে। সাহেবগঞ্জে সাঁওতাল ও বাঙালিদের প্রায় ৬০০ ঘর ও স্কুলে অগ্নিসংযোগ করে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। গুলি করে কয়েকজন সাঁওতালকে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে বসবাসকারী প্রায় আড়াই হাজার লোক সবকিছু ফেলে দিয়ে প্রাণ রক্ষার জন্য গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ২০০ সাঁওতাল চিনিকলের পাশে জয়পুর ও মাদারপুর নামে দুটি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন এবং বাকিরা এখনও বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে আছেন। ঢাকা থেকে একটি তদন্ত দল চিনিকল এলাকার আক্রান্ত গ্রাম সফর করে ঢাকার প্রেস ক্লাবে এ বিষয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছে। তাতেও এসব কথা বলা হয়। (সমকাল, ১১.১১.২০১৬)

পাকিস্তান আমলে ১৯৫২ সালে সরকার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জে একটি চিনিকল স্থাপনের জন্য ১,৮৪০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল। এ এলাকায় ছিল কিছুসংখ্যক বাঙালিসহ প্রধানত সাঁওতালদের বাস। এই বিশাল এলাকা অধিগ্রহণের পর জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হয়েছিল মাত্র ৮ লাখ ৭ হাজার টাকা! জমি অধিগ্রহণের শর্ত হিসেবে বলা হয়েছিল যে, জমি শুধু আখ চাষের জন্য ব্যবহৃত হতে হবে। যদি আখ ছাড়া জমিতে অন্য কোনো ফসলের চাষ করা হয়, তাহলে সে জমি শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনকে ফেরত দিতে হবে সরকারের কাছে। কিন্তু মিল কর্তৃপক্ষ এই শর্ত লংঘন করে অধিকাংশ জমি অন্যদের ইজারা দেয় এবং তাতে আখের পরিবর্তে ধান, গম, তামাক, সরষে, ভুট্টা ইত্যাদি চাষ শুরু হয়। এ অবস্থায় ৬ মাস আগে এই জায়গায় সাঁওতালরা ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। চিনিকল জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাস্কে সংবাদপত্রে একথা জানান। তিনি আরও জানান যে, তাদের জমি সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কেউ যাতে স্থানীয় প্রশাসনের থেকে কোনো সাহায্য গ্রহণ না করেন, এজন্য তাদের সম্প্রদায়ের সবাইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংঘর্ষের সময় রমেশ সরেন নামে একজন সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছিলেন। তাকে ওই রাতেই সেন্তাজুরি গ্রামে কবর দেয়া হয়েছিল। কিন্তু গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রতকুমার সরকার বলেন, রমেশের মৃত্যু হয়েছে স্বাভাবিক কারণে! গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়নি!! (Daily Star, 12.11.2016)

পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সাঁওতালদের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে কোনো মামলা দেয়া হয়নি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কেউ মামলা দায়েরের জন্য থানায় যেতে সাহস করেন না। কারণ তাদের আশংকা থানায় গেলে মামলা নেয়া তো দূরের কথা, তাদের সেখানেই গ্রেফতার করা হবে। কাজেই প্রশাসন ও পুলিশ বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তাদের বক্তব্য হল, মামলা না দিলে তাদের করার কিছু নেই!! এর থেকে অদ্ভুত অবস্থা আর কী হতে পারে? এই পরিস্থিতি যেখানে বিরাজ করছে, সেখানে দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা বলে যে কিছু থাকার কথা নয়, এটাই বাস্তব ব্যাপার।

উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতালরা বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের একটা বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছেন সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের পার্শ্ববর্তী জয়পুর ও মাদারপুর গ্রামে। সেখানে তারা আছেন অবরুদ্ধ অবস্থায়। তারা গ্রামের বাইরে হাটবাজারে যেতে পারছেন না। তাদের ছেলেমেয়েরা আতংকে স্কুলে যেতে পারছে না। স্থানীয় কিছু লোকজন যেখানেই পাচ্ছে সাঁওতালদের মারধর করছে। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজন টাকাপয়সা, সাইকেল ইত্যাদি নিয়ে রাস্তায় বের হলেই কেড়ে নেয়া হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী কাটাবাড়ি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রফিকের লোকজন সাঁওতালদের হাটবাজারে যেতে দিচ্ছে না (যুগান্তর, ১১.১১.২০১৬)

এসব ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা যে শুধু স্থানীয় প্রশাসনের কর্তা তাই নয়, তারা ক্ষমতাসীন দলেরও লোক। এ অবস্থায় গরিব সাঁওতালদের খাদ্যেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। অবরুদ্ধ অবস্থায় তারা অনাহারেঅর্ধাহারে কোনোমতে বেঁচে আছেন।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ওপর আক্রমণ সব সময়েই আছে। কিন্তু কিছুদিন থেকে এটা খুব বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের জমিজমা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য স্থানীয় বদ লোকরা পুলিশের সহায়তায় তাদের ওপর হামলা করেই চলেছে। এক্ষেত্রে সরকারি প্রশাসন নীরবই থাকে। সরকারি দলের কাছে এটা কোনো হিসেবের ব্যাপারই নয়। কারণ তাদের দলীয় লোকরাই দেশজুড়ে এখন গরিবদের জমি দখলের তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে তারা এই লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। তারা নদীখালবিললেকসহ সব ধরনের জলাশয় পর্যন্ত দখল করে দেশব্যাপী এক বড় রকম পরিবেশ সংকট তৈরি করেছে। যেভাবে এসব চলছে তা থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, এক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে কোনো বাধা নেই।

সরকারের নাকের ডগাতেই এসব হচ্ছে। তা যদি না হতো তাহলে রাজধানী ঢাকা শহরের চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ইত্যাদি নদীর যে মৃতপ্রায় অবস্থা এখন হয়েছে, এটা সম্ভব হতো না। এসব নদী যারা দখল করছে তারা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত লোক। কাজেই দেশ ও জনগণের ক্ষতি ও সর্বনাশ হলেও তাদের বাধা দেয়ার কেউ নেই। এ পরিস্থিতিতে গরিব সাঁওতাল থেকে নিয়ে গরিব হিন্দু, বিহারি, চাকমা, মারমা ইত্যাদির জমির ওপর যে হামলা হচ্ছে, এটা এক স্বাভাবিক ব্যাপার।

মাত্র কয়েকদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘর ভাংচুর, মন্দির ও প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় লোকজন, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বলছে, এ কাজের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন এবং আওয়ামী লীগের লোকজন জড়িত। কিন্তু আওয়ামী লীগের কিছু বুদ্ধিজীবী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪ দলের একটি অনুসন্ধানী দল সেখানে ‘সরেজমিনে তদন্ত’ করে বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দুদের বিরুদ্ধে এই হামলা ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কাজ! কাজেই এসব সরকারি তদন্তের যে কানাকড়ি মূল্য নেই, এটা বোঝার কোনো অসুবিধা নেই। ক্ষমতার জোরে মিথ্যার রাজত্ব এখন এদেশে চলছে। সরকার এসব ক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করে যা করছে, তাকে কাপুরুষতা ছাড়া আর কী বলা যায়? কোনো সরকার এ অবস্থায় থাকলে তাদের থেকে জনগণ নিরাপত্তাই বা চাইবেন কীভাবে?

পত্রিকায় দেখা গেল (Daily Star, 12.11.2016) আওয়ামী লীগের পাঁচ সদস্যের একটি দল গোবিন্দগঞ্জে যাচ্ছে সরেজমিনে তদন্তের জন্য। তারা দেখবে সেখানে বাস্তবে কী ঘটনা ঘটেছে। এই তদন্ত দলের সরেজমিনে সফর এবং তদন্ত রিপোর্ট কী ধরনের হতে পারে এটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সরেজমিনে তদন্তকারী ক্ষমতাসীন ১৪ দলের রিপোর্ট থেকেই বোঝা যায়। এসবের দ্বারা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি এবং অপরাধীদের শাস্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। অতীতের ও বর্তমানের অভিজ্ঞতা থেকে যদি শেখার কিছু থাকে তাহলে সেটা হল এই যে, মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের পর যে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাতে গরিব ও দুর্বল জনগণের জীবন, জীবিকা, ঘরবাড়ি, জমিজমার কোনো নিরাপত্তা নেই। এদেশে ব্যাপক লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়ে অল্পসংখ্যক লোক মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে সবদিক দিয়েই ভালো আছে। কিন্তু দেশ ও জনগণের অবস্থা এখন খুবই করুণ। এই অবস্থা পরিবর্তনের দিকে সাধারণ মানুষ তাকিয়ে থাকলেও এর আশু কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের আকাশ এখন ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন থেকে চারদিকে গভীর অন্ধকার ছড়িয়ে রেখেছে।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ১৩ নভেম্বর ২০১৬

sautal-at-risk

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: