জঙ্গিবাদের তাত্ত্বিকগণ

terrorist-5ফায়যুর রাহমান : প্রশ্নটা ঘুরেফিরেই আসছে। কেনো অসীম সম্ভাবনাময় তরুণরা জঙ্গি হয়? কেনো তারা উদ্ভ্রান্ত হয়ে মৃত্যুনৃত্যে ঝাপিয়ে পড়ে? কোন্ সে বিষের বাঁশী, যা তাদের আকৃষ্ট করে? আর কে সেই বংশীবাদক, যে তাদের উদ্ভ্রান্ত করে? কোন্ সে চিন্তক, যে তাদের মাথাকে আউলে দেয়, চিন্তাকে উসকে দেয়? কোন্ সে তাত্ত্বিক, যে তাদেরকে উন্মাদ করে? উত্তরটা খুঁজতে হলে তাকাতে হবে পেছন দিকে।

শুনতে বিস্ময়কর মনে হলেও এটাই সত্যি যে, আধুনিককালে জিহাদের ডাক আলেমওলামাদের কাছ থেকে আসেনি, এসেছে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে। ১৯৮০এর দশকে আফগান জিহাদ শুরুর আগের প্রায় একশো বছরে সশস্ত্র জিহাদের ডাক শোনা না গেলেও ঠান্ডা যুদ্ধের গোড়ার দিকে অন্তত দু’জন উগ্রপন্থী ইসলামি চিন্তাবিদ এ রকম একটা জিহাদের কথা বলেছিলেন। এদের একজন পাকিস্তানের সাংবাদিক ও রাজনীতিক আবুল আলা মওদুদী। অপরজন মিশরের সাইয়েদ কুতুব।

১৯৪০এর দিকে মওদুদী তার মতাদর্শ মুসলিমবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে নিজের লেখা আরবিতে অনুবাদ শুরু করেন। ১৯৫১ সাল থেকেই তার লেখা মিশর থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে। মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের জঙ্গিবাদী কার্যকলাপে মওদুদীর লেখার সর্বোত্তম ব্যবহার করে। সাইয়েদ কুতুব মওদুদীর অবদানকে স্বীকৃতি দেন প্রকাশ্যে। এভাবেই ইখওয়ান ও জামায়াতের লক্ষ্য এগিয়ে যায় একই সূত্রে গ্রথিত হয়ে, একটি শব্দকে ভিত করেসেটি জিহাদ।
মওদুদীর ভাষ্য : ‘সালাত, জাকাত, সিয়াম ও হজ এতো বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, এগুলোকে ইসলামের স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলো অন্যান্য ধর্মের আচারঅনুষ্ঠানের মতো নয়। এগুলোর বাহ্যিক পালন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে নয়, ইবাদতের এইসব কার্যাবলী মূলত মহত্তম কর্ম সম্পাদনের প্রস্তুতিপর্ব, এবং মহত্তম কর্তব্য পালনের জন্যে নিজেদের প্রশিক্ষিত করাসালাত, জাকাত, সিয়াম ও হজ এসব তোমাদেরকে জিহাদের জন্যে প্রস্তত করে।’

সালাত, জাকাত, সিয়াম ও হজের গভীরতর স্তরে একজনকে প্রস্তুত ও প্রশিক্ষিত করে ন্যায়সঙ্গতভাবে ক্ষমতা দখলের জন্যে। চাকরিতে নিয়োগের আগে সরকার যেমন তার সৈন্য, পুলিশ বাহিনী ও বেসামরিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়, তেমনি ইসলামও তাই করে যে দ্বীন আল্লাহ তাকে দিয়েছেন, তার জন্যে। এতে প্রথম এই ট্রেনিং দেয় যে, তারা আল্লাহর রাহে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে জিহাদে যোগদান ও পৃথিবীতে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্যে।’ (আবুল আলা মওদুদী, ফান্ডামেন্টালস অব ইসলাম)

সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকারের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মওদুদীর চিন্তা থেকেই উগ্রবাদী ধারণা নেয় ব্রাদারহুড। আবুল আলা মওদুদী ও তাঁর দলের ‘তাকফিরি’ মতাদর্শই ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় ‘সহিংসতার ব্যবহারকে উৎসাহিত করে’। আর মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক গুরু সাইয়েদ কুতুব এ মতাদর্শ গ্রহণ করেন মওদুদীর কাছ থেকেই। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৪০এর দশকে সংগঠনটির আদর্শিক গুরু সাইয়েদ কুতুব মওদুদীর প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামির তাকফিরি মতাদর্শকে গ্রহণ করেন।

তাকফিরি মতাদর্শের ব্যাখ্যায় প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘এটি জামায়াত ছাড়া অন্য মুসলিমদের অবিশ্বাসী বা ধর্মত্যাগী বলে কলঙ্ক লেপন করে। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অনৈসলামিক ঘোষণা করে এবং পছন্দের সমাজ গড়তে সংঘাতের আশ্রয় নেয়।’ এতে বলা হয়, তাকফিরি মতাদর্শ গ্রহণের পর বিভিন্ন সময়ে সংঘাত ও রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে ব্রাদারহুডের জড়িত হওয়ার নজির রয়েছে। ( প্রথম আলো : ৪ জানুয়ারি ২০১৬)

maududi-2আবুল আলা মওদুদীর আবির্ভাব এমন একটা সময়ে, যখন মুসলিম ওলামাগণ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ (ভারতের ওলামাদের সোসাইটি)-এর মধ্যে সংঘবদ্ধ। এবং তারা মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের পাকিস্তান দাবির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বহুধর্মবিশিষ্ট অখন্ড ভারতের দাবিকেই সমর্থন জানিয়েছিলেন।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের কালেই ওলামাদের সঙ্গে রাজনীতিকবুদ্ধিজীবীদের বিচ্ছেদ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। সেখানে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও রাজনৈতিক রক্ষণশীলতা হাত ধরাধরি করে এগোতে পারেনি। ওলামাদের বদলে বুদ্ধিজীবীরাই ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন; ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। পরিণতিতে তারা ডাক দেন মুসলমানদের জন্যে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের, যার নাম পাকিস্তান।

সাধারণভাবে যা ভাবা হয়, এখানে ঘটেছিলো তার উল্টো। রক্ষণশীল ওলামারা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে রয়ে গেলেন। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা ইসলামি শাসনব্যবস্থা চেয়ে নতুন রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুললেন। ওলামারা যদিও ইসলামকে একটা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে অন্যান্য রাজনৈতিক পরিচয় থেকে আলাদা করে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা ইসলামকে কেবল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে রাজি ছিলেন না; তারা নিশ্চিতভাবেই ইসলামকে একটা রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। বিপরীতে ওলামারা চেয়েছিলেন সংস্কৃতিকে দেশীয় গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ না রেখে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর ইসলামি সমাজ তৈরি করতে। কেননা পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র গঠন ওলামাদের কাছে ছিলো নেহাত ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার বাহক।

ভারতের এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি কথা স্পষ্ট, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পক্ষে থাকা লোকেরা যে সবসময় প্রগতিশীল হবে, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আবার ধর্মীয় রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের ধ্বজা তোলা লোকগুলি যে সবসময় প্রতিক্রিয়াশীল হবে, এমনটারও গ্যারান্টি নেই। এই দুই শিবির মোটেও গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের সরল বিভাজনে বিভক্ত নয়।

কবি মুহাম্মদ ইকবাল ও মুহাম্মদ আলি জিন্না দু’জনেই মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকারের প্রবক্তা ছিলেন। ছিলেন নিশ্চিতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার অধিকারী। পাকিস্তানচিন্তার জনক হিসেবে পরিচিত কবি ইকবাল সেইসব হাতেগোনা মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম, যারা ১৯২৩ সালে তুর্কি খিলাফতের অবসানে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। ওসমানি খিলাফতের অবসানের ফলে মুসলমান রাষ্ট্রে কার্যত ধর্ম ও রাষ্ট্র পরিচলনার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হয়। ইকবাল চেয়েছিলেন মুসলিমসমাজে প্রচলিত আইনকে ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব মোল্লাদের (ওলামা) ওপর ছেড়ে না দিয়ে মুসলিমসমাজ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভাকে (উম্মাহ) দেওয়া হোক। এককথায় তিনি চেয়েছিলেন, প্রচলিত আইনকে সমসাময়িক নিরিখে ব্যাখ্যা করার (ইজতিহাদ) প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে। জিন্না চেয়েছিলেন স্বাধীন পাকিস্তানের সংবিধান হবে ধর্মনিরপেক্ষ। যদিও ইসলামি শাসনব্যবস্থার কথা বলে নতুন রাষ্ট্র গঠনের দাবি তুলেছিলেন।

allamah_iqbalইকবাল ছিলেন আদতে ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক পরিচয়কে কোনো জাতিরাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বেধে রাখতে আগ্রহী ছিলেন না। তার কাছে এই অভীষ্ট পরিচয় ছিলো সীমান্তহীন, একই সংস্কৃতির শরিক মানুষজনের সমাজ। যাকে বলে উম্মাহ।

ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ফলে সেখানকার মুসলিমরা আত্মনিন্ত্রণের সুযোগ পেলেও তারা সেটা পেলো একটা গন্ডির মধ্যে, নির্দিষ্ট ভূখন্ডের বাসিন্দা হিসেবেই। বৃহত্তর মুসলিম সমাজ বা উম্মাহ হিসেবে নয়।

ইকবাল নিজে নির্দিষ্ট ভূখন্ডে গন্ডিবদ্ধ জাতীয়তাবাদভাবনার কট্টর সামালোচক, কিন্তু তার স্বপ্ন ও কল্পনার পাকিস্তানের সঙ্গে বাস্তবের পাকিস্তানের বিস্তর ফারাক। ইকবালের পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত অন্য দশটা গতানুগতিক দেশের মতোই নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মওদুদী এই স্ববিরোধিতার দিকেই উপনিবেশপরবর্তী মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তান এখনো পাকিস্তান (পবিত্র ভূমি) হয়ে উঠতে পারেনি, নাপাকিস্তান (অপবিত্র ভূমি) রয়ে গেছে। পাকিস্তানকে পাকিস্তান (পবিত্র ভূমি) হয়ে উঠতে হলে কেবল মুসলমানদের নিয়ে গঠিত দেশ হলে হবেনা, তাকে অবশ্যই মতাদর্শগতভাবে ইসলামি রাষ্ট্র হতে হবে। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যে ১৯৪১ সালে তিনি করাচিতে জামায়াতে ইসলামি গঠন করেন। এবং নিজেকে এই দলের আমির ঘোষণা করেন।

মওদুদীর জিহাদি চিন্তার মূল কথা ছিলো ক্ষমতা হবে কেন্দ্রীভূত; এবং আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্যে জিহাদকে ব্যবহার করা হবে। তার মতে, পৃথিবীতে মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে সবাইকে এক আল্লাহর অধীনে নিয়ে আসাই ইসলামের চূড়ন্ত লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর নিরন্তর প্রয়াসই হলো জিহাদ। ‘তোমার সর্বস্ব, এমনকি তোমার জীবনপণ করে হলেও ওই লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টাই জিহাদ।তাই আমি বলছি, আল্লাহর জমিন এখন দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে, সত্যি যদি তোমরা আল্লাহর জমিন থেকে দুর্নীতিকে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে চাও, তাহলে দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাচক্রের বিরুদ্ধে লড়াই করো, ক্ষমতা দখল করো, এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে শাসনভার চালাও।’

ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মওদুদী দ্বীন (ধর্ম) কথাটাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করেন। ‘কাউকে নিজের শাসক হিসেবে স্বীকার করে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশে রাজি হওয়ার অর্থ হলো তুমি তার দ্বীনকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। ফলে প্রকৃত অর্থে দ্বীন এবং রাষ্ট্র বা সরকারের মধ্যে কোনো তফাত নেই।’ (প্রাগুক্ত)

একই সঙ্গে তিনি ইসলামকে ধর্মনিরপেক্ষ তত্ত্বগুলির সঙ্গে একাসনে বসানোর চেষ্টা করেন। অন্য ধর্মের সঙ্গে তুলনা করার বদলে তিনি ইসলামকে জনপ্রিয় সার্বভৌম শাসন, রাজতন্ত্র এবং সর্বোপরি কমিউনিজমের মতো সেইসব রাজনৈতিক তত্ত্বগুলির পাশে বসানোর চেষ্টা করেন, যেখানে ক্ষমতা দখলই মূল কথা। ‘সার্বিক দ্বীন বা ধর্ম সেটাই, তার চরিত্র যাই হোক, নিজের জন্যে ক্ষমতা পেতে আগ্রহী। ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার ভাবনা এখানে অকল্পনীয়। তা সে জনপ্রিয় সরকারই হোক, রাজতন্ত্র বা কমিউনিজম বা ইসলাম অন্য কোনো দ্বীনই হোক, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যেই শাসনক্ষমতা নিজের হাতে রাখা দরকার। ক্ষমতার লাগাম নিজের হাতে না রেখে শাসন করার যে দ্বীনভাবনা, তার সঙ্গে হাওয়ায় প্রাসাদ তৈরির ভাবনার কোনো তফাত নেই।’ (প্রাগুক্ত)

মওদুদীই প্রথম ব্যক্তি যিনি আল জিহাদ নামক বই লিখে সাম্প্রতিক বিশ্বের মুসলমানদের কাছে জিহাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন; জিহাদের মূল কথা যে সংগ্রাম, এ কথা তিনিই প্রথম দাবি করেন। তার আগের অন্য সব মুসলিম চিন্তাবিদরা যেটা করেন নি, সেটাও তিনিই প্রথম করেন, বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জিহাদের জন্যে ডাক দেন।
জিহাদকে সশস্ত্র সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরার মওদুদীর এই চিন্তার প্রভাব সাইয়েদ কুতুবের ওপর ভালোভাবেই পড়েছিলো। তবে মওদুদী যেমন ইতিহাসের পরিবর্তনের জন্যে হাতিয়ার হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতার উপযোগিতা নিয়েই বেশি মাথা ঘামিয়েছেন, কুতুবের চিন্তা ছিলো সেই তুলনায় অনেক বেশি সমাজকেন্দ্রিক।

sayyid_qutub-2সাইয়েদ কুতুব ১৯৩৩ সালে কায়রোর বিখ্যাত শিক্ষকশিক্ষণ কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট হওয়ার পর মিশরের শিক্ষা দফতরে সরকারি কাজে যোগ দেন। তার প্রথম বই ‘দ্য টাস্ক অব দ্য পোয়েট ইন লাইফ’ থেকেই মনে করা হয়েছিলো তিনি সাহিত্যের দিকেই ঝুঁকবেন। কিন্তু সেটা হয়নি। ১৯৪৮ সালে কুতুবকে গবেষণার জন্যে আমেরিকায় পাঠায় সরকার। সেখানে যাওয়ার আগেই বইয়ের পান্ডুলিপি তৈরির কাজ শেষ হলেও তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই ‘সোশাল জাস্টিস ইন ইসলাম’ আমেরিকাতেই প্রকাশিত হয়। বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদে কুতুব তার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন :

একবার আমাদের চারপাশে চোখ মেলে তাকালেই বুঝতে পারবো আমাদের সামাজিক পরিস্থিতি যতটা খারাপ হওয়া সম্ভব, ততটাই খারাপ। দেখা যাচ্ছে, আমাদের সমাজের নিয়মকানুনের সঙ্গে ন্যায়বিচারের কোনো সম্পর্ক নেই। সে জন্যেই আমরা ইউরোপ আমেরিকা বা রাশিয়ার দিকে তাকাচ্ছি। আশা করছি ওইসব দেশ থেকে আমাদের সমাজের সমস্যাগুলির সমাধান আমদানি করত পারবো। আমাদের যা কিছু ছিলো আধ্যাত্মিক, যা কিছু ছিলো বৌদ্ধিক, সে সবই আমরা দূরে ছুড়ে ফেলছি। সেই সঙ্গে ছুড়ে ফেলছি সেইসব সমাধানের চাবিকাঠিও, যা ওইসব ঐতিহ্যের দিকে তাকালে আমাদের চোখে ধরা পড়ার সম্ভবনা ছিলো। আমাদের নিজস্ব শাস্ত্র, ধর্মীয় নীতি সবই ছড়ে ফেলে দিয়ে আমরা বরণ করে আনছি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমকে।’
এভাবেই ইসলামকে আঁকড়ে ধরে আধুনিক যুগে প্রবেশের পথ খোঁজার চেষ্টায় কুতুব তার পূর্বসূরি জামাল উদ্দিন আফগানি ও হাসানুল বান্নার সমগোত্রীয় হয়ে ওঠেন। হাসানুল বান্না মুসলিম ব্রাদার্সহুডের প্রতিষ্ঠাতা ও জামাল উদ্দিন আফগানি ইসলামি চিন্তার সংস্কারপন্থীদের অন্যতম। বিশ শতকে ইসলামি রাজনীতির আবির্ভাবের অনেক আগেই জামাল উদ্দিন আফগানি জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছিলেন সা¤্রাজ্যবাদই মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আফগানি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্যারিসের এর্নেস্ত রেনঁএর বক্তব্য খন্ডন করে পাল্টা যুক্তিবিস্তারের জন্যে বিখ্যাত। আফগানির জন্ম ইরানে। তিনি সনাতনি মাদরাসা থেকে ফিকহ (আইন), ফলসফা (দর্শন) ও ইরফান (অতীন্দ্রিয়বাদ) নিয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি বহুদেশ ভ্রমণ করেছিলেন। পূর্বে ভারতবর্ষ থেকে পশ্চিমে ফ্রান্স ঘোরার পর মিশরে আসেন। ভারতবর্ষ ভ্রমণের কালে তিনি লক্ষ করেছিলেন ভারতে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদীরা কী নির্মমভাবে সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭) দমন করেছিলো। তাঁর আগে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে যেসব ইসলামি চিন্তাবিদ প্রগতির পথে হাঁটছিলেন, তারা সাধারণত পশ্চিমী আধুনিকতার প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে প্রগতির অগ্রদূত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আফগানি এই আধুনিকতার দুই বিপরীতমুখী অভিঘাতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ‘একদিকে মুসলমানদের আধুনিক বিজ্ঞান চাই, কিন্তু সেটা শিখতে হবে ইউরোপের কাছ থেকে। অন্যদিকে ওই প্রয়োজনটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আমাদের সমাজের নিকৃষ্ট অবস্থান ও অবক্ষয়কে। কারণ আমরা নিজেদের সভ্য করে তুলতে ইউরোপের অনুকরণ করছি।’ আফগানি বুঝতে পারেন, এই উভয় সঙ্কটের মূল কারণ ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যেই নিহিত। যদি আধুনিকতা বলতে বুঝায় মানুষের সৃজনশীলতা ও মৌলিক চিন্তার স্বাধীন ও মুক্ত প্রকাশ, তাহলে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন কোনো সমাজ নেহাত অনুকরণের মাধ্যমে কী করে আধুনিক হয়ে উঠতে পারে?’

এটা এক অর্থে ঔপনিবেশিকতা ও স্বাধীনতার বিতর্কও ছিলো বটে। স্বাভাবিকভাবেই প্রগতিপন্থী মুসলিম চিন্তাবিদরা ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যেই পরিবর্তন, পুনরুজ্জীবন ও উদ্ভাবনের রসদ অনুসন্ধান করছিলেন। আর সংস্কারপন্থী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনপন্থীরা কেবল ইসলামি শাস্ত্র ও ইতিহাসের মধ্যেই ধারাবাহিকতা খুঁজছিলেন না, সেই সঙ্গে পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টাও করছিলেন। তাই পশ্চিমী আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিকতার চ্যলেঞ্জ মোকাবেলায় তারা ভিন্ন ভিন্ন পন্থা বলে দিচ্ছিলেন। এ নিয়ে বিশ শতকে যে বিতর্ক উঠেছিলো, তার প্রধান তিনটি ধারা পুষ্ট হয়েছিলো ভারত, মিশর ও ইরানে।

কিন্তু উপনিবেশপরবর্তী যুগে ইসলামের এই সংস্কারপন্থী চিন্তা ধীরে ধীরে উগ্রপন্থী চিন্তায় রূপ নিলো। কীভাবে রূপ নিলো, সেটা বুঝতে হলে তাকাতে হবে এই তিন দেশের দিকেই। দেখতে হবে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের ইতিহাস ও ইরানে মোল্লাতন্ত্রের সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠা। আর মওদুদী ও কুতুবের হাত ধরে মিশর ও ভারতবর্ষে উগ্রপন্থার জেগে ওঠা।
জামালউদ্দিন আফগানির চিন্তায় অনুপ্রাণিত হাসানুল বান্না ১৯২৮ সালের মার্চে ইসমাইলিয়া শহরে শ্রমিকদের আর্জিতে সাড়া দিয়ে ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা করেন। আফগানির কথারই প্রতিধ্বনি শোনা যায় তার কণ্ঠে : ‘অন্যদের অনুকরণের বদলে নিজেদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের মধ্যেই মুসলমানদের উন্নতির পথ খুঁজতে হবে।’ তিনি ছয় দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন, তাতে ব্যাপক হারে সামাজিক উন্নয়নের সংগঠন গড়া ও সেই সঙ্গে হিংসাকে পরিত্যাগ করার কথা বলা হয়।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধে আরব সেনাবাহিনীর পরাজয় ও ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘটনা থেকেই মুসলিম সমাজের উপলব্ধিতে পরিবর্তন আসে। তারা উন্নয়নকর্মসূচি থেকে হিংসাত্মক রাজনীতির পথে সরতে থাকে। হাসানুল বান্না ফিলিস্তিনে যুদ্ধের জন্যে একটি বিশেষ ব্যাটালিয়ন তৈরি ডাক দেন। নিজস্ব সেনা, হাসপাতাল, স্কুলকলেজ, কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ব্রাদারহুড এমনিতেই মিশর রাষ্ট্রের মধ্যে কার্যত আলাদা একটা রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করছিলো। ১৯৪৮ সালের ৬ ডিসেম্বর ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করা হয়। ’৫১ সালে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। ’৫২ সালে তরুণ সেনা অফিসার জামাল আবদুন নাসের ক্ষমতা দখল করেন। ব্রাদারহুড প্রথমে তাকে সমর্থন জানায়। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই নাসেরের সঙ্গে ব্রাদারহুডের সম্পর্কচ্ছেদ হয়। যেসব রাজনৈতিক মহল অসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া জন্যে সেনাবাহিনীকে চাপ দিচ্ছিলো, ব্রাদারহুড তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। নাসের যখন অসামরিক সরকারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার শুরু করেন, তখন ব্রাদারহুডের একহাজারেরও বেশি সদস্য বন্দি হয়। নাসেরের জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় ব্রাদারহুডের অনেকে সংস্কারপন্থী চিন্তা ছেড়ে ইসলামি রাজনীতির এক নতুন ও হিংসাত্মক কার্যকলাপের চিন্তা নিয়ে নাড়াছাড়া শুরু করেন। ফলে ব্রাদারহুডের আদিপর্বে হাসানুল বান্নার সংস্কারপন্থী চিন্তা থেকে এরা উগ্রপন্থী চিন্তায় অগ্রসর হন। ব্রাদারহুডকে এই উগ্রপন্থী চিন্তার দিকে পরিবর্তনের জন্যে সাইয়েদ কুতুব অনেকখানি দায়ি। নাসেরের জেলে বসেই কুতুব তার উগ্রবাদী চিন্তাকে একের পর এক লেখায় রূপ দেন।
অনেকের মতে, ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের হাতে দমনপীড়নের এই অভিজ্ঞতাই মিশরে ইসলামি চিন্তায় উগ্রপন্থাকে আমদানি করার ক্ষেত্রে একটা উপাদান যোগায়। অন্য উপাদানটা আসে তাত্ত্বিক আকারে। মার্কসবাদলেলিনবাদ থেকে। কেননা ততদিনে ইসলামি রাজনীতির বিকল্প হিসেবে মার্কসবাদলেলিনবাদ এসে হাজির হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সব পথ বন্ধ করে দেয়, তখন তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী হতে পারে, সেই তত্ত্ব নিয়ে।

আগেই বলেছি, যেসব মুসলিম বুদ্ধিজীবী উগ্রপন্থী চিন্তার পথপ্রদর্শকের কাজ করেছিলেন, সাইয়েদ কুতুব তাদের অন্যতম। ১৯৫১ সালে ব্রাদারহুডের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার বছরই কুতুব আমেরিকা থেকে ফিরে আসেন। আমেরিকা যাওয়ার আগে ছিলেন রাজতন্ত্রবিরোধী ওয়াফদ পার্টির সক্রিয় সদস্য। দেশে ফেরার পর ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি বিপ্লবী পরিষদের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। এবং একমাত্র অসামরিক ব্যক্তি হিসেবে পরিষদের বৈঠকে যোগ দেওয়ার অধিকার পান। ১৯৫২ সালে নাসের তাকে বন্দি করে জেলে পাঠান। জেলে বসেই তিনি তার বোনের মাধ্যমে তার চিঠিপত্র বাইরে পাচার করতে সক্ষম হন। সেইসব চিঠি ব্যাপকহারে বিলি করা হয়। ওই চিঠিপত্রের সংকলনই পরবর্তীতে ‘মাইলস্টোনস’ নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। (বাংলায় অনূদিত হয়েছে ‘ইসলামি সমাজ বিপ্লবের ধারা’ নামে)। আর এটাই বিপ্লবী ইসলামি রাজনীতির ইশতেহার হয়ে ওঠে।

সাইয়েদ কুতুব মওদুদীর চিন্তাধারাকেই পুষ্ট করেছিলেন। এবং সেই সঙ্গে মওদুদীর চিন্তাধারাকে আরো বিপ্লবী পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন। কুতুব যেভাবে জিহাদকে ব্যাখ্যা করেন, সেই চেষ্টার সঙ্গে সমসাময়িক মার্কসবাদলেলিনবাদের অনেকটা মিল পাওয়া যায়। মার্কসবাদীরা যেভাবে জনগণের মধ্যে থাকা বিভিন্ন দ্বন্দ্বের ব্যবহার ও শ্রেণীশত্রুর সঙ্গে দ্বন্দ্বের ব্যবহারের মধ্যে বিরাট পার্থক্য করে থাকেন, কুতুবও তেমনি মনে করেন জিহাদের মধ্যে বলপ্রয়োগ ও বুঝিয়ে রাজি করানোর দু’টি দিকই আছে বন্ধুশ্রেণীর জন্যে বোঝানোর প্রক্রিয়া, আর শত্রুশ্রেণীর জন্যে বলপ্রয়োগ। চূড়ান্ত বিচারে শুধুমাত্র বলপ্রয়োগের সাহায্যেই রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বাধাগুলি সরিয়ে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তার মতে, স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়ার মধ্যে কোনো দ্বিচারিতা নেই। তার বক্তব্য, ইসলামি বিধানে দাসত্বের শৃঙ্খল মোচন করে স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে বলপ্রয়োগের ব্যবহার মানুষের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

অন্য মানুষের দাসত্ব থেকে প্রতিটি পুরুষ ও নারীর মুক্তির ঘোষণাই ইসলাম। যেসব সমাজব্যবস্থা বা সরকার অধিকাংশের ওপর অল্পসংখ্যক মানুষের শাসনের নীতির ওপর দাঁড়িয়ে, ইসলাম তার অবসান চায়। এই বাহ্যিক চাপ থেকে মানুষকে মুক্ত করে ইসলাম যখন তার নিজস্ব আধ্যাত্মিক বাণীর প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তখন সে তাদের যুক্তিবোধের কাছেই আবেদন জানায়। ইসলামের বাণী গ্রহণ বা বর্জন করার ব্যাপারে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে।’

আদতে ‘ইসলাম মানুষকে জোর করে তার বিশ্বাস গ্রহণ করতে বলে না। বরং ইসলাম এমন একটা মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে চেষ্টা করে, যাতে তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে পারে।’

কুতুবের মতানুযায়ী, এই জায়গায় মার্কসবাদলেলিনবাদের সঙ্গে ইসলামের সাদৃশ্য কিছুটা বেশি। মার্কসবাদীলেলিনবাদীরা যেমন ‘ভ্যানগার্ড অব প্রলেতারিয়েত’ বা শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার কথা বলে, কুতুবও তেমনি যুক্তি দেন, জিহাদের প্রক্রিয়ার গোড়ার পর্বে অগ্রবর্তী বাহিনীকে নিয়েই সংগঠন গড়া হবে। পরে এই অগ্রবর্তী বাহিনী সরে এসে সংগঠন গড়া ও পড়াশোনার কাজে মনোনিবেশ করবে। পরে আবার তারা ফিরে এসে লড়াইয়ে যোগ দেবে।

এখানে কুতুব লেলিনবাদী তত্ত্বেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের প্রতিধ্বনি করছেন। ‘ইসলামের পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়া কীভাবে শুরু করা যায়? অগ্রগামী বাহিনীকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে শুরু করতে হবে। তারা প্রচার চালিয়ে যাবে, জাহিলিয়ার বিশাল জনসমুদ্রের মধ্য দিয়েই তারা মার্চ করে এগিয়ে যাবে, ক্রমে সারা বিশ্বকে ছেয়ে ফেলবে।এই অগ্রগামী বাহিনীর কথা ভেবেই আমি মাইলস্টোনস লিখেছি। আমি মনে করি আগামি দিনে এটাই বাস্তব হয়ে উঠবে।’

এভাবেই মুসলিম সমাজে সংস্কারপন্থী চিন্তা ধীরে ধীরে উগ্রপন্থী চিন্তার কাছে হেরে গেছে। এভাবেই ইরানে মোল্লাতন্ত্রের নাটকীয় জয় হয়েছে। আলি শরিয়তির মতো বুদ্ধিজীবীরা তাদের লেখায় মানবিক ও ন্যায়পরায়ণ ইসলামি সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে শিয়াদের একটা বিপ্লবী পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইরানের বিপ্লবের সময় দেখা গেলো মোল্লারা শুধুমাত্র অমুসলমান বা বিধর্মী বুদ্ধিজীবীদের প্রভাবের বিরদ্ধেই লড়াই পরিচালনা করছেনা, ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমানদের বিরুদ্ধেও লড়াই শুরু করছে। মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একাংশ ইসলামকে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে শুরু করলে কার্যত মোল্লাতন্ত্রের কর্তৃত্বই খর্ব হতে পারে ভেবে কট্টরপন্থীরা শিয়া মতবাদকেই অনেকটা পাল্টে দেয়। বিলায়তফকিহ বা বিচারকদের মাধ্যমে সরকারি প্রশাসন পরিচালনার এক নতুন ব্যবস্থা শুরু করলেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। ঈশ্বরের সার্বভৌম কর্তৃত্বের অছি হিসেবে এই প্রতিষ্ঠান অসামরিক সরকারের সমান্তরাল প্রশাসন ব্যবস্থা চালাতে শুরু করে। তারা পার্লামেন্টের কাছে নয়, দায়বদ্ধ শুধু ইরানের মোল্লাদের কাছে। ইরানে এই মোল্লার সংখ্যা তখন এক লাখেরও বেশি।

মিশরে মুসলিম ব্রাদার্সহুডের ইতিহাসে হাসানুল বান্নার নরমপন্থার তুলনায় সাইয়েদ কুতুবকে উগ্রপন্থী ইসলামি রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। নরম ও চরম পন্থার মধ্যে পার্থক্যটা এ রকম : নরমপন্থীরা যেমন সমাজের মধ্যে থেকেই সংস্কারের চেষ্টায় লড়াই করছে, চরমপন্থীরা সেরকম কিছু আশা করছে না। তারা বিশ্বাস করছে, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল না করে কোনো অর্থপূর্ণ সামাজিক সংস্কার সম্ভব নয়। একই সমাজে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের সহাবস্থান অসম্ভব এ রকম ধারণা নাসেরের জেলে ১৫ বছর সশ্রম কারাভোগের কারণে কুতুবের মনে দৃঢ়বদ্ধ হয়েছিলো কিনা, বোঝার উপায় নেই। তবে এই সহাবস্থান ও সংস্কারের পথ ছেড়ে লড়াইকে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্যে অগ্রগামী বাহিনীর প্রয়োজনের কথা যে কুতুব বলেছেন, তাতে মার্কসবাদলেলিনবাদসহ সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তাগুলির প্রভাব পড়েছিলো।

মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক অভিধা ও রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে যেভাবে চুলচেরা বিচার ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাতে একটা ব্যাপারে তাদের সঙ্গে ধর্মীয় জগতের বাইরের বুদ্ধিজীবীদের খুব একটা তফাত নেই। ইসলামি বুদ্ধিজীবীরা তাদের মতাদর্শগত বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় শুধু ওলামাদের সঙ্গেই লড়েন নি, তাদেরকে সেইসব ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গেও লড়তে হয়েছে, যারা ইসলামি ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে প্রধানত পশ্চিমী উদারনৈতিক ভাবাদর্শ বা মার্কসবাদ থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছিলেন। এই দু’মুখী লড়াই লড়ে মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা যে ইসলামি রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, তা স্বাভাবিক কারণেই বহুমখী দিশা নিয়েছিলো। তার মধ্যে যেমন মানুষের মুক্তির কথা ছিলো, তেমনি একনায়কতন্ত্রের উপাদানও ছিলো। ধর্মীয় মৌলবাদের সঙ্গে ইসলামি রাজনীতিকে এক করে দেখাটা যেমন ভুল, তেমনি ইসলামি রাজনীতির সব ক’টি ধারাকেই উগ্রবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও ভুল। মুহাম্মদ ইকবাল, মুহাম্মদ আলি জিন্না, আবুল আলা মওদুদী ও সাইয়েদ কুতুব এই চার বুদ্ধিজীবীর মধ্যে একমাত্র মওদুদীই ইতিহাসের চালিকাশক্তি হিসেবে একটা আদর্শ ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের কথা খোলাখুলি বলেছিলেন। তার তুলনায় কুতুবের চিন্তা অনেকখানি সমাজকেন্দ্রীক ছিলো। যদিও কুতুব তার চিন্তাকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়েছিলেন। আর ইকবাল চেয়েছিলেন নির্দিষ্ট রাজনৈতিকভৌগোলিক মানচিত্রের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে মুসলিম সংস্কৃতির পরিচয়ের ভিত্তিতে এক বৃহত্তর ইসলামি সমাজ বা উম্মাহ গড়তে। জিন্না ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমান, তার কাছে ইসলাম ঔপনিবেশিক ভারতে একটা উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবেই গ্রহণযোগ্য ছিলো। তিনি চেয়েছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়তে, যেখানে মুসলমানঅমুসলমান সকলের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
এর বিপরীতে চরমপন্থী মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একাট্টা করছিলো একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা কী করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা যায়? তারা বিশ্বাস করতেন, কমিউনিম ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামকে দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের কাছে একমাত্র বাস্তবোচিত মতাদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। ১৯৬৩ সালে সাইয়েদ কুতুব তার চরমপন্থী রাজনীতির ইশতেহার মাইলস্টোসন এভাবেই শুরু করেছিলেন :

মানবজাতি এখন খাদের একবারে কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য নয় যে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সত্যিকার আশঙ্কা মাথার উপর ঝুলছে। কারণ তা শুধুই রোগের লক্ষণ, রোগ নয়। এর কারণ মানবসভ্যতার সত্যিকারের অগ্রগতি ও বিকাশের জন্য যেসব গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ খাতা দরকার, মানবজাতি আজ তা হারিয়ে ফেলেছে। পশ্চিম ইউরোপে এখন গণতন্ত্র এতটাই বন্ধ্যা হয়ে পড়েছে যে তাদের বুদ্ধিজীবীদের এখন পূর্ব ইউরোপ থেকে চিন্তা ধার করতে হচ্ছে। এটা বিশেষ করে ঘটছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, সমাজতন্ত্রের নামে। অথচ মার্কসবাদ যুক্তির দিক থেকে আগেই পরাজিত। এবং এটা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবেনা যে, বিশ্বে এমন একটা দেশও নেই যাকে সত্যিকার অর্থে মার্কসবাদী রাষ্ট্র বলা যায়। .. বিজ্ঞানের অগ্রগতির যে জোয়ার এসেছিলো, সেই কালও শেষ হতে চলেছে। .. আধুনিক যুগে যত ধরনের জাতীয়তাবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হয়েছে, এবং তা থেকে যত ধরনের মতাদর্শগত তত্ত্ব এসেছে, সেসবও তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। এককথায়, মানুষের তৈরি সব রকমের চিন্তা ও তত্ত্ব, তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক উন্নয়নই হোক বা সমষ্টিকেন্দ্রিক হোক, বাস্তবে ব্যর্থ প্রমাণিত। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে ইসলাম ও মুসলমান সমাজের সামনে সুযোগ এসেছে, কারণ তার কাছে সেই মূলোবোধ আছে।’

ইসলামি আইন বা শরিয়তের গুরুত্ব কতটা হবে এবং তার ফলে ইসলামি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অবস্থান কী হবে, এই প্রশ্নকে ঘিরেই চরমপন্থী ইসলামি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে গুরুতর মতপার্থক্য রয়েছে। ইজতিহাদ, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠনিকভাবে শরিয়তের উপযুক্ত ব্যাখ্যা জোগানোর ব্যবস্থায় সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন ভিন্ন মতের জন্ম দিতে বাধ্য। ফলে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল সমাজের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে শরিয়তি আইনের নানা ব্যাখ্যা নিয়ে ক্রমাগত নতুন নতুন আইন তৈরি হতে থাকে। প্রধানত এই ইজতিহাদ বা শরিয়তি আইনের ব্যাখ্যাকে ঘিরেই ইসলামি সমাজ দুই বিপরীতমুখী মতাদর্শ আকড়ে ধরে সমাজকেন্দ্রিক বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। প্রগতিশীল বা প্রতিক্রিয়াশীল। সমাজকেন্দ্রিক ইসলামপন্থীরা দাবি করেন, আধুনিক মুসলিম সমাজে ইজতিহাদ বা শরিয়তি আইন ব্যাখ্যা করার প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা আবশ্যিক। অন্যদিকে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ইসলামি ভাবনায় ইজতিহাদ পুরোপুরি খারিজ। আর ইজতিহাদের দরোজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মানে হলো এক্সট্রিমিসমকে স্বাগত জানানো। তাই ইকবাল চেয়েছিলেন ইজতিহাদকে গণতান্ত্রিক ও সময়োপযোগী করে ঢেলে সাজানো হোক। সেখানে ওলামারা নয়, মুসলিম সমাজের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকুক। অন্যদিকে কুতুবের চিন্তায় ইজতিহাদ কিছুটা গুরুত্ব পেলেও মওদুদীর রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চিন্তায় এটা পুরোপুরি খারিজ। ফলে ইসলামি রাজনৈতিক সন্ত্রাসের তাত্ত্বিক ভিত্তি মওদুদীর রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চিন্তার মধ্যেই নিহিত।

ইসলামি রাজনীতির যে চেহারাটা এখন আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠেছে, এটা মতাদর্শগত, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক এই তিন ভিন্ন ধারার মিলনের ফল। মতাদর্শগত দিকটি পুষ্ট হয়েছিলো মওদুদী ও কুতুবের মতো বুদ্ধিজীবীদের চিন্তাধারার সঙ্গে মার্কসবাদীলেলিনবাদী চিন্তাধারার লড়াইয়ের ফলে। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র সংগ্রামকেই একমাত্র পথ বলে আঁকড়ে ধরে বিভিন্ন মার্কসবাদীলেলিনবাদী চিন্তাধারা যেভাবে জনপ্রিয় হচ্ছিলো, তার কিছুটা রেশ ইসলামি চিন্তার মধ্যেও পড়েছিলো। তার সাংগঠনিক জমি তৈরি করেছিলো আফগানিস্তানে জিহাদ সংগঠিত করার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। আর এর রাজনৈতিক দিকটি ‘ইসলামকে শয়তানের চিন্তাধারা ও ইসলাম মানেই সন্ত্রাস’ হিসেবে প্রচারের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া। এই প্রচার ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের কালে শুরু হয়ে নাইন ইলেভেনের পরে আরো গতি পেয়েছে।

যাই হোক, ইসলামি রাজনীতিতে কেনো রাষ্ট্রকেন্দ্রিক উগ্রপন্থী চিন্তাধারার জন্ম হলো, এই প্রশ্নটা এখন অপ্রাসঙ্গিক। বরং কীভাবে এই চিন্তাধারা বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার চেষ্টা শুরু করলো, সেই উত্তরটা আমাদের খুঁজতে হবে। দেখতে হবে, কীভাবে একটা তাত্ত্বিক ভাবনা ইসলামি দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশের রাজনীতির মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে গেলো। আর সেই উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে তাকাতে মওদুদী ও কুতুবের মতো বুদ্ধিজীবীদের তাত্ত্বিক স্রোত ও তাদের অনুগামীদের প্রতি। জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াইয়ে সাফল্য অর্জন করতে হলে মওদুদী ও কুতুবের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চিন্তাকে বুঝতে হবে। যতোদিন মওদুদী ও কুতুবের জঙ্গিবাদী চিন্তার প্রতিচিন্তা প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততোদিন জঙ্গিবাদের বিষের বাশী ও বংশীবাদকদের থামানো কঠিন। খুবই কঠিন।

ফায়যুর রাহমান : সাংবাদিক

সূত্রঃ দৈনিক ফুলকি, ১১ অগাস্ট ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: