প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, মিডিয়া, রাজনীতি > জয়ী ট্রাম্প, পরাজিত গোয়েবেলসীয় মিডিয়া ও জরিপ

জয়ী ট্রাম্প, পরাজিত গোয়েবেলসীয় মিডিয়া ও জরিপ

নভেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

এর সাথে আরো যুক্ত আছে ট্যাক্স ফাঁকি-দেওয়া দুর্নীতিবাজ অর্থলোলুপ মার্কিন বহুজাতিক কর্পোরেট (ফরচুন ৫০০) জগত, ওয়ালস্ট্রীট ও ফেডারেল রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণকারী রথচাইল্ডস ব্যাংকিং মোগল, যুদ্ধবাজ নিওকন রাজনীতিবিদরা ও তাদের পৃষ্ঠপোষক সমরাস্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানীরা, সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক বিভিন্ন মিডিয়া ও কিছু হলিউড নট-নটী ।

নির্বাচনের যে ফলাফল পাওয়া গেছে তাতে বাঘা বাঘা মতলববাজ জরিপকারীদের চেয়ে এখন থেকে বোধ হয় বানর, মাছ ও সাপ এসব প্রাণীদের ভবিষ্যতবাণীর দিকে আস্থা রাখা শ্রেয়তর হবে !

ধোঁকা খাওয়া মার্কিন মিডিয়া ও জরিপ

poll-nov03মশিউল আলম : মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাপর্ব শুরু হওয়ার পর থেকেই ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী, সাবেক ফার্স্ট লেডি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনের পক্ষে যে মাত্রার জনসমর্থনের খবর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, তাতে কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন পাগলাটে ও শ্বেত জাত্যভিমানী বাক্যবাগীশের কাছে তাঁর পরাজয় ঘটবে। লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ান ট্রাম্পের বিজয়কে অভিহিত করেছে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে অসম্ভব রাজনৈতিক বিজয়’ হিসেবে।

প্রথমত, আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের প্রধান অংশের প্রবল সমর্থন ছিল হিলারির পক্ষে। এমনকি প্রথাগত সাংবাদিকতার তথাকথিত নিরপেক্ষতার নীতি উপেক্ষা করে অধিকাংশ বড় পত্রিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে। যেমন, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান ঘোষণা করেছিল। সম্পাদকীয় নিবন্ধসহ প্রচুর বিশ্লেষণী লেখায় পত্রিকাগুলো বলেছিল, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট করা উচিত হবে না। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পের অযোগ্যতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা ডজন ডজন যুক্তি তুলে ধরেছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘হোয়াই ডোনাল্ড ট্রাম্প শুড নট বি প্রেসিডেন্ট’। হাফিংটোন পোস্ট লিখেছিল: ‘টেন রিজনস ট্রাম্প শুড নেভার বি প্রেসিডেন্ট’। একই ধরনের শিরোনামে অজস্র পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চলেছে।

সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমেরিকার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের সর্বাধিক প্রচারসংখ্যার দৈনিক দ্য অ্যারিজোনা রিপাবলিক। ১২৬ বছরের পুরোনো এই সংবাদপত্রটি রক্ষণশীল মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রচারক। প্রকাশনার শুরু থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আমেরিকার প্রতিটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই পত্রিকাটি রিপাবলিকান দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এতই অযোগ্য মনে করেছে যে ২৭ সেপ্টেম্বর এক সম্পাদকীয় লেখে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীর সমর্থনে : ‘হিলারি ক্লিনটন ইজ দ্য অনলি চয়েস টু মুভ অ্যামেরিকা অ্যাহেড।’ পত্রিকাটি সোজাসাপটা লেখে : ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার উপযুক্ত নন। বরং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীর হিলারি ক্লিনটনের যোগ্যতা অনেক।

যেমন, ‘দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন একটা দৃঢ় ও সুস্থির হাত, ঠান্ডা মাথা এবং কোনো কিছু করার আগে সবদিক ভেবেচিন্তে দেখার সামর্থ্য। হিলারি ক্লিনটন এটা বোঝেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বোঝেন না। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে ধরনের মানসিক গঠন ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, হিলারি ক্লিনটনের তা আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেই। হিলারি ক্লিনটন জানেন কীভাবে বোঝাপড়া বা আপসসমঝোতা করতে হয়; তিনি বুদ্ধিমত্তা ও সৌজন্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে জানেন; তাঁর পরিপ্রেক্ষিতজ্ঞান আছে। তাঁর আরও আছে ফার্স্ট লেডি, সিনেটর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পাবলিক সার্ভিসের রেকর্ড। হিলারি অসতর্কভাবে হুটহাট এমন কথা বলেন না, যা আমাদের প্রতিপক্ষদের সাহসী করে তোলে আর আমাদের মিত্রদের ভয় পাইয়ে দেয়। দেশ পরিচালনার ব্যাপারে তাঁর আচরণ পরিপক্ব, দৃঢ়প্রত্যয়ী ও যুক্তিবুদ্ধিসম্মত। তাঁর প্রতিপক্ষ সম্পর্কে এ কথা বলা যায় না। হিলারি ক্লিনটন চাপের মুখে স্থৈর্য বজায় রাখতে জানেন। তিনি দৃঢ়চেতা। তিনি পরাজয় মানেন না। ট্রাম্প সমালোচনার জবাবে অসহিষ্ণুভাবে এমন সব কথা বলেন, যেন থুতু ছুড়ে মারছেন। এটা আমাদের জাতীয় মর্যাদাবোধের পক্ষে হানিকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন কিছু বলেন, তখন বিশ্ববাসী তাঁর কথায় সারবস্তু প্রত্যাশা করে, হাড় জ্বালানো কিচিরমিচির নয়।’

আমেরিকার একমাত্র জাতীয়ভিত্তিক পত্রিকা দ্য ইউএসএ টুডে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয় না। ১৯৮২ সালে প্রকাশনার দিন থেকে পরবর্তী ৩৪ বছর পত্রিকাটি এই নীতি মেনে এসেছে। কিন্তু গত ৩০ সেপ্টেম্বর পত্রিকাটির সম্পাদনা পরিষদ একটি সম্পাদকীয় ছাপে এই শিরোনামে : ‘ট্রাম্প ইজ আনফিট ফর দ্য প্রেসিডেন্সি’। পত্রিকাটি লিখেছে, সম্পাদনা পরিষদের সব সদস্যই মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন। কারণ, ট্রাম্প তাঁর প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকে গত ১৫ মাস যেসব কথাবার্তা বলেছেন এবং যে ধরনের আচরণ করেছেন, তাতে পত্রিকাটির মনে হয়েছে যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে ধরনের মানসিক গঠন, জ্ঞানবুদ্ধি, দৃঢ়তা, স্থৈর্য ও সততা প্রয়োজন, ট্রাম্পের মধ্যে তার অভাব রয়েছে।

এখন দেখা যাচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের প্রচারণার প্রভাব আমেরিকান ভোটারদের আদৌ পড়েনি। কিন্তু নির্বাচনের আগে যেসব জনমত জরিপ হয়েছিল, সেগুলোর ফল এভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হলো কীভাবে এবং কেন? সব জনমত জরিপেই হিলারির রেটিং ট্রাম্পের চেয়ে বেশি ছিল। হিলারির ই–মেইল কেলেঙ্কারির পর এফবিআই যখন ঘোষণা করল যে তারা বিষয়টি তদন্ত করবে, তারপরের জনমত জরিপে হিলারির রেটিং কিছুটা কমে গেছে, কিন্তু তারপরেও সিএনএন/ওআরসি জরিপে হিলারি ট্রাম্পের চেয়ে ৩ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে সেটাও মিথ্যা প্রমাণিত হলো।

তাহলে আমেরিকান জনমত জরিপগুলোর পদ্ধতিতে কি কোনো গুরুতর গলদ রয়ে গেছে, যার কারণে এবার ভোটারদের প্রকৃত মনোভাব জরিপে ধরা পড়েনি? এই বিষয়টি নিয়ে আমেরিকায় ইতিমধ্যে বেশ কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে। যেমন, ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত গবেষণা সংস্থা পিআরআরআইয়ের প্রধান রবার্ট পি জোনস সিএনএনকে বলেছেন, জনমত জরিপের প্রশ্নগুলোর উত্তর সব সময় আন্তরিক হয় না; অনেক উত্তরদাতা তাঁর মনের কথাটি বলতে বিব্রত বোধ করতে পারেন। ‘সোশ্যালি অ্যাকসেপ্টেবল’ বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উত্তরই বেশির ভাগ উত্তরদাতা দিয়ে থাকেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এমন হয়ে থাকতে পারে যে যেসব ভোটার তাঁকে সমর্থন করেছেন, তাঁরা জরিপকারীদের সেটা বলেননি, কারণ তাতে করে ওই উত্তরদাতাকে বর্ণবাদী, অভিবাসীবিদ্বেষী, শ্বেত জাত্যভিমানী ও নারীর মর্যাদার প্রতি অসংবেদনশীল মনে হতে পারে। তাঁকে এ রকম ভাবা হোক, তিনি তা চান না। কিন্তু মনে মনে তিনি ট্রাম্পের এসব স্লোগানের প্রতিই একাত্ম বোধ করেন।

এবারের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল স্লোগান ছিল ‘উই আর গোয়িং টু মেক আওয়ার কান্ট্রি গ্রেট অ্যাগেইন’। সম্ভবত, এই স্লোগানই আমেরিকার ৭২ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে ট্রাম্পের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তাদের অধিকাংশের স্বপ্নের ‘গ্রেট আমেরিকা’ হলো শ্বেত জাত্যভিমানী আমেরিকা। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অভিবাসীরা গিয়ে সেই আমেরিকার ‘গ্রেটনেস’ নষ্ট করেছে। অভিবাসন বন্ধ করে দিয়ে, অবৈধ অভিবাসীদের তাড়িয়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই পুরোনো ‘গ্রেটনেস’ ফিরিয়ে আনবেন। এই হলো ট্রাম্পের ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা। এই ভোটারদের এক বিরাট অংশ ছিল ‘হিডেন’ বা অপ্রকাশ্য; এরা মনের কথা প্রকাশ্যে বলেননি, জনমত জরিপকারীদের ধোঁকা দিয়েছেন। কারণ গণতন্ত্র, মুক্তি, সর্বজনীন মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদ—এসব আমেরিকান আদর্শের বিপরীত কথা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করার সময় সেদেশে এখনো আসেনি। কিন্তু দেশটির সংখ্যাগুরু শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের বড় অংশই মনে মনে এসব আদর্শ আর মানতে চান না। ইউরোপসহ পৃথিবীর দেশে দেশে যে ‘বিশুদ্ধ’ জাত্যভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে; ধর্মীয়, বর্ণগত, জাতিগত—যাবতীয় রকমের সংকীর্ণতায় মোড়ানো জাতীয়তাবাদের যে বাতাস পৃথিবীব্যাপী বইছে, হ্যামিল্টনজেফারসনদের মহান দেশ আমেরিকাও যে তার বাইরে নেই, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে সেটাই প্রমাণিত হলো।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ৯ নভেম্বর ২০১৬

trump-rejects-bogus-pollstrump-on-pollstertrump-56hillary-to-win-90-per-centsick-of-propagandaru-not-to-be-blamedfish-prophecy

মাছ বানর বাঘ জানত ট্রাম্পের কথা, জানত না শুধু মিডিয়া

সারা বিশ্বের নজর তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে। হিলারি ক্লিনটন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের লড়াইয়ে জয়ী হবেন কে— সারা বিশ্ব তারই অপেক্ষায়। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রথম সারির পত্রিকাগুলোসহ বিশ্ব মিডিয়ায় চলছে হিলারি বন্দনা। হিলারি হচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট— এমন সংবাদ বিশ্ব মিডিয়াজুড়ে। প্রায় সব জরিপেও এগিয়ে রয়েছেন হিলারি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নাম উঠে আসে জ্যোতিষী বানরের ভবিষ্যদ্বাণীতে। ‘গেতা’ নামের চীনের এই জ্যোতিষী বানর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন নন, ডোনাল্ড ট্রাম্পই জয়ী হবেন। আর নির্বাচনের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে চাণক্য নামের এক জ্যোতিষী মাছ বলেছে, জয়ী হবেন ট্রাম্প। সাইবেরিয়ার একটি চিড়িয়াখানার এক জরিপে ভাল্লুকের পছন্দ হয়েছে ট্রাম্পকেই। তবে এখানে বাঘ পছন্দ করে হিলারিকে। অবশেষে বিশ্ব মিডিয়ার সব খবরকে পেছনে ফেলে এবং জরিপের তথ্য ভুল প্রমাণ করে বানর মাছ আর ভাল্লুকের ভবিষ্যদ্বাণীই সঠিক হলো। মার্কিন মুল্লুকের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হলেন ট্রাম্প। নির্বাচন নিয়ে সর্বমহলেই এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তু হলোবানর, মাছ, ভাল্লুক জানত ট্রাম্পের কথা, কিন্তু জানত না মিডিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন এমন কয়েকজন বলেছেন, প্রচারণা পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকেই ডেমোক্রেটিক প্রার্থী, সাবেক ফার্স্ট লেডি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে যে মাত্রার জনসমর্থনের খবর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, তাতে কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন প্রার্থীর কাছে তার পরাজয় ঘটবে। লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ান ট্রাম্পের বিজয়কে অভিহিত করেছে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে অসম্ভব রাজনৈতিক বিজয়’ হিসেবে। মিডিয়াগুলো একরকম নিশ্চিত হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে আসছেন হিলারি।

আমেরিকার সংবাদমাধ্যম যেমন নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান ঘোষণা করেছিল। সম্পাদকীয় নিবন্ধসহ প্রচুর বিশ্লেষণী লেখায় পত্রিকাগুলো বলেছিল, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট করা উচিত হবে না। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পের অযোগ্যতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা ডজন ডজন যুক্তি তুলে ধরেছিল।

নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘হোয়াই ডোনাল্ড ট্রাম্প শুড নট বি প্রেসিডেন্ট’। হাফিংটন পোস্ট লিখেছিল, ‘টেন রিজনস ট্রাম্প শুড নেভার বি প্রেসিডেন্ট’। একই ধরনের শিরোনামে অজস পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চলেছে। আমেরিকার একমাত্র জাতীয়ভিত্তিক পত্রিকা দ্য ইউএসএ টুডে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয় না। সেখানেও হিলারি ক্লিনটন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বলেই সংবাদ প্রকাশিত হয় নিয়মিতভাবে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পত্রিকাটির সম্পাদনা পরিষদ একটি সম্পাদকীয় ছাপে এই শিরোনামে, ‘ট্রাম্প ইজ আনফিট ফর দ্য প্রেসিডেন্সি’।

ভোটের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমের প্রচারণার প্রভাব আমেরিকান ভোটারদের কাছে আদৌ পড়েনি বা ভোটের আসল চিত্রও তাদের কাছে ছিল না। জনমত জরিপগুলোও ভুল প্রমাণিত হয়। নির্বাচনের আগে সব জনমত জরিপেই হিলারির রেটিং ট্রাম্পের চেয়ে বেশি ছিল। হিলারির ইমেইল কেলেঙ্কারির পর এফবিআই যখন ঘোষণা করল যে তারা বিষয়টি তদন্ত করবে, তার পরের জনমত জরিপে হিলারির রেটিং কিছুটা কমে গেছে, কিন্তু তারপরও সিএনএন/ওআরসি জরিপে হিলারি ট্রাম্পের চেয়ে ৩ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে সেটাও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বানর, মাছ আর ভাল্লুকের ভবিষ্যদ্বাণী

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে প্রাণী দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করানো আলোচনায় আসে। সেই হাওয়া এসে এবার লাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও। ‘গেতা’ নামের চীনের এক জ্যোতিষী বানর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন নন, ডোনাল্ড ট্রাম্পই জয়ী হবেন। আর নির্বাচনের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে গত মঙ্গলবার চাণক্য নামের এক জ্যোতিষী মাছ বলেছে, জয়ী হবেন ট্রাম্প।

এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভারতের চেন্নাইয়ে মশা ও ম্যালেরিয়া নিয়ে একটি জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে ওই জ্যোতিষী মাছ চাণক্য ট্রাম্পের জয়ের বিষয়েই ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। এ কারণে অনেকেই ওই মাছকে ‘পলিটিক্যাল পণ্ডিত’ হিসেবে ডাকছেন।

সাইবেরিয়ার একটি চিড়িয়াখানার জরিপে ভাল্লুক ট্রাম্প জয়ী হবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে। সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, সাইবেরিয়ার ওই চিড়িয়াখানায় দুটি কুমড়া পাশাপাশি রাখা হয়। যেগুলোর একটিতে ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন এবং অন্যটিতে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখচ্ছবি আঁকা হয়। আর মেরু অঞ্চলের ভাল্লুক ‘ফেলিক্স’কে আমন্ত্রণ জানানো হলে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই বেছে নেয় সে।

সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১০ নভেম্বর ২০১৬

গণমাধ্যম নিজের মতো করে দেখেছে

মার্গারেট সালিভান : খোলাখুলি বললে গণমাধ্যম খবরটা একদম ধরতেই পারেনি। শেষমেশ বলা যায়, বিপুল সংখ্যক মার্কিন ভোটার ভিন্ন কিছু চেয়েছিলেন। আর এই ভোটাররা অনেক চিৎকারচেঁচামেচি করলেও অধিকাংশ সাংবাদিকই তা শুনতে পারেননি। তাঁরা ব্যাপারটা ধরতেই পারেননি।

সাংবাদিকেরা আসলেই বুঝতে পারেননি ট্রাম্পের সমাবেশে যে মানুষেরা এসেছিলেন, তাঁরা সবাই তাঁকে ভোট দেবেন। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাঁরা চিনতেন, সেই দেশের মানুষ এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট বানাবেন, যিনি কিনা পঙ্গু মানুষদের উপহাস করেন। শুধু তাই নয়, এই ব্যক্তি নারীদের যৌন হেনস্তা করে গর্ববোধ করেন, নারীবিদ্বেষ ছড়ান, তার সঙ্গে বর্ণবাদ ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ান। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে ব্যাপারটা ভয়ংকর হবে। সে কারণে একধরনের জাদুকরি চিন্তার বশবর্তী হয়ে তাঁরা ভেবেছেন, এটা হতে পারে না।

ব্যাপারটা হয়েছে কী, সাংবাদিক, কলেজশিক্ষিত, নাগরিক ও সামগ্রিকভাবে উদার মানুষেরা নিউইয়র্ক শহর, ওয়াশিংটন ডিসি বা ওয়েস্ট কোস্টকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। যদিও আমরা গত কয়েক দিনে বড় বড় রিপাবলিকানসমর্থক রাজ্যে গিয়েছি এবং খনিশ্রমিক বা বেকার অটোশ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। আমরা আসলে তাঁদের গুরুত্ব দিইনি। অথবা বলা যায়, তাঁদের কথায় আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিইনি।

অন্যদিকে ট্রাম্প তো সাংবাদিকদের দুর্নীতিবাজ বলতেন। তিনি আমাদের এতটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন যে চোখের সামনে কী ঘটছে, আমরা তা দেখতে পাইনি। আমরা শুধু ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়া সাইটগুলোতে ঢুঁ মেরেছি আর আশ্বস্ত হয়েছি, যদিও সবাই জানত, জরিপের ফলাফল আর ভোটের ফলাফল এক নয়। সর্বোপরি আমরা কিন্তু এটা জানি না, কে ভোট দিতে আসবে আর কে আসবে না। তবে সবচেয়ে বেশি ক্লিনটনঘেঁষা পূর্বাভাস দিয়েছিল যে ওয়েবসাইটগুলো, তারাও বলেছিল যে ট্রাম্পের জেতার সম্ভাবনা আছে। আমরা তাতে কর্ণপাত করিনি।

কিন্তু কেউই তা গভীরভাবে বিশ্বাস করতে চায়নি। সাংবাদিকেরা প্রথাগত প্রজ্ঞা দিয়ে বলেছেন, হিলারি ক্লিনটনই প্রেসিডেন্ট হবেন। হ্যাঁ, তাঁর মধ্যে গলদ আছে, কিন্তু তাঁকে তো লোকে চেনে। এই চিন্তার মধ্যে একধ রনের আরাম ছিল। ভুল করবেন না পাঠক, এটা এক বড় ধরনের ব্যর্থতা। যারা এমন গর্ব করে ভুল প্রমাণিত হয়, তারা কিন্তু লোককে আকর্ষণ করতে পারে না। ফলে আগামী কয়েক মাস বা এমনকি বছর পর্যন্ত গণমাধ্যম আমাদের অখাদ্যকুখাদ্য খাওয়াবে।

এবার একটি আশ্চর্যজনক কথা বলি। গণমাধ্যম নিজেই ট্রাম্পকে সুযোগ করে দিয়েছে। কথা হচ্ছে গণমাধ্যম কি ট্রাম্পকে সৃষ্টি করেছিল! না, অবশ্যই না। কারণ, তাদের সেই ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারা তাঁকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে। রিপাবলিকানদের প্রাইমারি নির্বাচনের আগে থেকেই ট্রাম্প যা করেছেন, তাই গণমাধ্যমে স্থান পেয়েছে। ওদিকে হিলারি ক্লিনটনের ইমেইল কেলেঙ্কারির ও তার তদন্তের প্রতিটি ধাপ গণমাধ্যমে এমনভাবে স্থান পেয়েছে যে তাতে ট্রাম্পেরই লাভ হয়েছে। এমনকি গণমাধ্যম এফবিআই পরিচালকের বাগাড়ম্বরও প্রচার করেছে।

আমি বড় ব্যবসায়ী পিটার থিয়েলের ভক্ত নই। তাঁকে দেখলে আমার বিতৃষ্ণা জাগে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে যা বলেছেন, তাতে ট্রাম্প সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, গণমাধ্যম ট্রাম্পকে আক্ষরিকভাবে নিচ্ছে। তারা তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। সে কারণেই সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছেন, ট্রাম্প কীভাবে লাখ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত পাঠাবেন। আবার তিনি আইএসকে পৃথিবী থেকে কীভাবে দূর করবেন, সাংবাদিকেরা তাও জানতে চেয়েছেন। আমরা সব বিস্তারিত জানতে চেয়েছি।

কিন্তু অনেক ভোটারই ট্রাম্পকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাঁরা ট্রাম্পকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন, আক্ষরিকভাবে নয়। থিয়েল বলেছেন, এই ভোটাররা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে সত্যি সত্যি দেয়াল তুলবেন না। তাঁরা শুনেছেন (ট্রাম্পের কথা), ‘আমরা আরও যৌক্তিক ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন অভিবাসন নীতি প্রণয়ন করব।’

তবে এটা ঠিক, অনেক সাংবাদিক ও সংবাদ প্রতিষ্ঠান এই মার্কিনদের অধিকার হারানো ও হতাশা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছে, কিন্তু আমরা তাদের গুরুত্ব সহকারে নিইনি। আমরা সাংবাদিকেরা নিজেদের কখনো কখনো নৈরাশ্যবাদী ও পোড়খাওয়া মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করি, কিন্তু আমরা কখনো আদর্শবাদী ও এমনকি সহজসরলও হতে পারি।

আমরা এমন একটি দেশের ওপর নিজেদের বিশ্বাস রাখতে চেয়েছি, যেখানে শালীনতা ও সভ্যতা থাকবে। যে দেশে একজন স্থূল, বিদ্বেষপূর্ণ ও রগচটা মানুষ কখনোই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন না। কারণ, আমেরিকা এর চেয়ে ভালো ছিল। সাংবাদিকদের অনেক দোষত্রুটি ধরা যাবে, কিন্তু এ রকম ভাবনা ও বিশ্বাসের জন্য আমি তাদের দোষ ধরতে চাই না।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া।
মার্গারেট সালিভান: ওয়াশিংটন পোস্টের গণমাধ্যমবিষয়ক কলামিস্ট।

ম্যাজিক বুলেট, ফোর্থ স্টেট শব্দগুলো নিয়ে ভাবতে হবে!

মাহমুদ মেনন : সাংবাদিকতার তত্ত্বে ‘ম্যাজিক বুলেট’, ‘ফোর্থ স্টেট’ শব্দগুলো নিয়ে এবার ভাবতে হবে! মিডিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত এ দু’টি শব্দ বা তত্ত্ব আজ নিঃসন্দেহ প্রশ্নবিদ্ধ। ম্যাজিক বুলেট তত্ত্বটিতে বলা হয়, ‘মিডিয়ার এমন একটি ক্ষমতা রয়েছে যা সমাজে ম্যাজিক বুলেটের মতো কাজ করে। মিডিয়া যা বলবে, সমাজ, সমাজের মানুষ সেভাবেই কাজ করবে’। এখানে দু’টি শব্দএকটি ম্যাজিক‘, অন্যটি বুলেট। দু’টি শব্দই কিন্তু নিজ ক্ষমতা ও কার্যকারিতায় শক্তিশালী। যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় যেমন পাল্টে যায় কোনো কিছু, ঠিক তেমনটি ঘটলে আমরা বলি… ‘বাহ যাদুর মতো কাজ করেছে’। আর বুলেট যেমন ছুটে এসে দ্রুত আঘাত করে, তেমন কিছু ঘটলে আমরা বলি, ‘বাহ! বুলেটের মতো কাজ হয়েছে’। আর এই ম্যাজিক বুলেট তত্ত্বের যারা আবিষ্কারক, তারা মিডিয়ার ক্ষমতাকে এমনভাবে দেখেছেন যে, তার প্রকাশে এ দু’টি শক্তিশালী শব্দকে একসঙ্গে ব্যবহার করছেন। তারা বলেছেন, ‘মিডিয়া’ নামের ‘বন্দুক’ থেকে যখন গুলি বের হয়, তখন তা সরাসরি দর্শক, পাঠক শ্রোতার মস্তিষ্কেআঘাত করে। এটিকে ‘হাইপোডারমিক নিডল’ মডেলও বলেছেন তারা। অর্থাৎ বলা হয়, ‘মিডিয়ার কোনো বার্তা তার দর্শকের মস্তিষ্কে সরাসরি ইনজেক্ট করে দেয়। তখন মিডিয়া যেভাবে চায়, পাঠকদর্শক সেভাবেই আচরণ করে’।

কিন্তু মিডিয়ার সে ক্ষমতা আজ লোপ পেয়েছে। ১৯৩০এর দশকে নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি অব টোয়েন্টের দেওয়া এ আচরণতত্ত্বটি মূলত প্রণীত হয় নাৎসি প্রোপাগান্ডায় হলিউডের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে, যা আজ আর চলে না। সুতরাং, মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিডিয়ার ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ বললে ভুল হবে, বস্তুতপক্ষে ভুলুণ্ঠিত হয়েছে। একটি কথা অন্তত বলাই চলেএখানে মিডিয়ার ম্যাজিক বুলেট তত্ত্ব কাজ করেনি।

আরেকটি শব্দ ‘ফোর্থ স্টেট’। বলা হয়, ‘সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ (অথবা চতূর্থ শক্তি) এই মিডিয়া। সমাজ বা রাজনীতির যে শক্তিটির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয় না, কিন্তু তা রয়েই যায় তাকেই এ চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মিডিয়া রাষ্ট্রের কাঠামোর অবধারিত কোনো অংশ নয়। সে কারণেই একে চতুর্থ শক্তি নাম দিয়ে তার অস্তিত্ব ও শক্তিকে স্বীকার করে নেওয়া হয়। এ শব্দটির ইতিহাস আরও পুরনো। ১৭৮৭ সালে গ্রেট ব্রিটেনের হাউস অব কমনসে সংসদীয় বিতর্কে এডমুন্ড ব্রুক প্রথমে শব্দটির ব্যবহার করেছিলেন। তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজের তিনটি প্রধান স্তম্ভ ছিলো অভিজাত শ্রেণি (ফার্স্ট স্টেট), ধর্মযাজক শ্রেণি (সেকেন্ড স্টেট) ও সাধারণ মানুষ (থার্ড স্টেট)। টমাস কার্লাইল তার ‘বুক অন হিরোস অ্যান্ড হিরো ওরশিপবইয়ে লিখেছেনব্রুক সেদিন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘এই সংসদে আজ তিনটি স্তম্ভের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। কিন্তু ওই যে গ্যালারিতে বসে আছেন সাংবাদিকরা, তারা এই সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ। তারা কিন্তু এদের সকলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ’।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর মিডিয়ার জন্য এই ফোর্থ স্টেট তকমাটি কি প্রশ্নবিদ্ধ হয় নি? হয়েছে। কারণ, মিডিয়াকে, মিডিয়ার ক্ষমতাকে, মিডিয়ার বক্তব্য, মিডিয়ার প্রচেষ্টাকে আর মিডিয়ার সকল অনুমানকে মিথ্যা প্রমাণিত করে, পুরোপুরি ভুলুণ্ঠিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। মিডিয়া কতো কথা বলেছে, ট্রাম্প অযোগ্য, নোংরা মানসিকতার, ট্যাক্স ফাঁকিবাজ, জালিয়াত, অর্থদুর্বৃত্ত, নারীবিদ্বেষী, বর্ণবাদী, বিকৃত যৌনাচারী। এসবের কোনোটাই ম্যাজিক বুলেটের মতো, হাইপোডারমিক নিডলের মতো দর্শকপাঠকের মস্তিষ্কে আঘাতও হানেনি, ঢুকেও পড়েনি। ফলে তারা ট্রাম্পকেই পছন্দ করেছেন। এ নির্বাচনে মিডিয়া ফোর্থ স্টেট হিসেবেও বিবেচিত হয়নি। বরং ব্যবহৃত হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে। কারণ, এডমুন্ড ব্রুক যে ফোর্থ স্টেটের কথা বলেছিলেন, তা ছিলো মিডিয়ার বিবেকতার কলমের শক্তিকে বিবেচনা করে, মিডিয়ায় প্রকাশিত বা প্রচারিত বিজ্ঞাপনের বিবেচনায় নয়।

যুক্তরাষ্ট্র তথা গোটা বিশ্বের প্রায় সকল মিডিয়াই এ নির্বাচনে ট্রাম্পের জয় দেখতে পায়নি। যে কয়েকটি মিডিয়া দেখতে পেয়েছে, তারাও তা দেখেছে একটি পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। উপরিতল থেকে তারা স্রেফ ভাষার ব্যবহার ও বানোয়াট পরিসংখ্যানে ট্রাম্পকে এগিয়ে রেখেছিলো। তাদের ছিলো না সত্যিকারের পরিস্থিতির ওপর কোনো নজরদারি, কিংবা গভীরের কোনো বিশ্লেষণ। আর যারা ট্রাম্পকে পিছিয়ে রেখেছিলেন, তারাও ছিলেন পক্ষপাতদুষ্ট। ভেতরের খবর তাদের যে অজানা ছিলো কিংবা জানার চেষ্টাটুকুও ছিলো না, তা নিয়ে ০৮ নভেম্বর (মঙ্গলবার) দিবাগত মধ্যরাতের পর থেকে আর কেউই সন্দেহটুকুও করছেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী মিডিয়া ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের জয়ের সম্ভাবনা দেখেছিলো ৯৮.৫ শতাংশ। আর ট্রাম্পের মাত্র দেড় শতাংশ। অন্য প্রধান মিডিয়াগুলোর কোনোটিই (রিপাবলিকান সমর্থক মিডিয়াগুলো ছাড়া) হিলারির জয়ের সম্ভাবনা ৮০ শতাংশের নিচে দেখেনি। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে, তা এখন সবার জানা।

যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো যেভাবে প্রেডিক্ট করেছে, সারা বিশ্বের মিডিয়াগুলো সেটাই অনুসরণ করে গেছে। কেউই গভীরে যায়নি। ফলে সার্বিকভাবে আজ মিডিয়ার যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এতো মিডিয়ার এতো এতো চোখ, কেউ কি দেখতে পায়নি, আমেরিকানরা ভেতরে ভেতরে কতোটা রক্ষণশীল, কতোটা নারী বিদ্বেষী, কতোটা তারা ইসলামোফোবিয়ায় ভুগছে?

মিডিয়াগুলো স্রেফ ট্রাম্পকে নিয়ে পড়েছিলো। তারা এ খবর রাখেনি যে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৫ কোটি ৯৬ লাখ ১১ হাজার ৬৭৮ জন নাগরিক রয়েছেন যারা প্রত্যেকেই একেকজন ডোনাল্ড ট্রাম্প মনোভাবাপন্ন। এই মিডিয়াকে ফোর্থ স্টেট বললে এডমুন্ড ব্রুকের আত্মা কষ্ট পাবে। এই মিডিয়াকে ‘মিডিয়া গান’ বলা হলে ইউনিভার্সিটি অব টোয়েন্ট তা মানবে না। সুতরাং, ম্যাজিক বুলেট, ফোর্থ স্টেট শব্দগুলো নিয়ে ভাবতে হবে!

সূত্রঃ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ২০১৬১১১০

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: