প্রথম পাতা > ইতিহাস, ইসলাম, ধর্মীয়, বাংলা ভাষা > পবিত্র কোরআনের বঙ্গানুবাদ : শুরুর পর্ব

পবিত্র কোরআনের বঙ্গানুবাদ : শুরুর পর্ব

নভেম্বর 8, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল : পবিত্র কোরআন শরীফের বঙ্গানুবাদ এখন সহজেই চোখে পড়ে। মধ্যযুগে কোরআন ও হাদিসভিত্তিক পুঁথি সাহিত্যের বিপুল ভান্ডার গড়ে উঠলেও তখন পর্যন্ত পবিত্র কোরআন শরীফের প্রত্যক্ষ ও সরাসরি অনুবাদের কাজে কেউ হাত দিয়েছিলেন কিনা সে সম্পর্কে সঠিকভাবে কিছু জানা যায় না। বিভিন্ন মিউজিয়াম, প্রাচীন মসজিদ, খানকাহ প্রভৃতিতে সংরক্ষিত শিলালিপিগুলো সাধ্যমতো অনুসন্ধান করে দেখা গেছে সেগুলোতে কোরআনের আয়াত রয়েছে বটে কিন্তু তার কোন বাংলা তরজমা নেই। পবিত্র কোরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদক কে ছিলেন? এ প্রশ্নটি করলে শিক্ষিত সমাজের যে কেউ বলবেন, কেন, ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন। এ তথ্যটি ব্রিটিশ আমল থেকে অদ্যাবধি সবার জানা। সে সময়ে অবিভক্ত বাংলার ৩ কোটি মুসলমানের মাতৃভাষা যে বাংলা তাতে কোরআনের অনুবাদ প্রকাশের কল্পনা ১৮৭৬ খ্রি. পর্যন্ত কেউ করেননি। তখন আরবী, ফার্সী ভাষায় সুপন্ডিত মুসলমানের অভাব এদেশে ছিল না। এই গুরু কর্তব্য পালনে এগিয়ে এসেছিলেন ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন।

১৮৩৫ খ্রি. নরসিংদী জেলার অন্তর্গত মহেশ্বরদি পরগনার পাঁচদোনা গ্রামে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের জন্ম এবং ১৯১০ খ্রি. ১৫ আগস্ট ঢাকা শহরে তার ইহজীবনের অবসান। ১৮৮০ খ্রি. থেকে ১৮৮৬ খ্রি. পর্যন্ত টানা ৭ বছর তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে সমগ্র কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন করেন। অসাধারণ বিদ্যানুরাগী, ধীশক্তিসম্পন্ন এই মানুষটির ফারসী এবং সংস্কৃতি ভাষায় ছিল অগাধ পান্ডিত্য। তিনি পেশায় ছিলেন কখনও কাছারিতে নকল নবিস, কখনও শিক্ষক আবার কখনও বা পত্রিকা সম্পাদক। তবে নেশা ছিল তাঁর সব ধর্মের গ্রন্থ অধ্যয়ন। ইসলাম ধর্মের গ্রন্থ পাঠে তাঁর আগ্রহ ছিল অসীম। মাসিক মোহাম্মদীর সম্পাদক মাওলানা আকরাম খাঁ গিরিশ চন্দ্রের এই অসাধারণ সাধনা ও অনুপম সিদ্ধিকে জগতের অষ্টম আশ্চর্য বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু কোরআন শরীফ অনুবাদক হিসেবেই নন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (:)-এর ও প্রথম বাংলায় জীবনী রচয়িতাও তিনি। সেই মহামূল্যবান গ্রন্থটির নাম মহাপুরুষ চরিত (১৮৮৫১৮৮৭ খ্রি., মহাপুরুষ মোহাম্মদের জীবন চরিত)

কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখা দরকার, কোরআনের অংশ বিশেষ আমপারা অনুবাদের প্রচেষ্টা গিরিশ চন্দ্র সেনের কোরআন অনুবাদের বহু পূর্বে গ্রহণ করা হয়েছিল। আজ থেকে প্রায় দুইশ বছর পূর্বে ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলা চিলাখাল মটুকপুর গ্রাম নিবাসী মৌলভী আমির উদ্দীন বসুনিয়া আমপারার কাব্যনুবাদ করেছিলেন। বাংলা ভাষায় পবিত্র কোরআন শরীফ আংশিক অনুবাদের তিনিই পথিকৃৎ। এই আমপারা কাব্যানুবাদখানি সেকালের লিথো প্রেসে মুদ্রিত হয়েছিল। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১৬৮। মুদ্রণের তারিখ জানা না গেলেও মুদ্রণ রীতির বৈশিষ্ট্যে গ্রন্থখানি প্রাচীনত্বের দাবী করতে পারে। এর একটি খন্ড বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থাগারে অদ্যাবধি রক্ষিত রয়েছে। আমির উদ্দীন বসুনিয়াকৃত, আমপারার কাব্যানুবাদের প্রকাশকাল আনুমানিক ১৮০৮/১৮০৯ খ্রি.। চট্টগ্রামের প্রখ্যাত লেখক ও প্রাচীন পুঁথি সংগ্রাহক আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৭১১৯৫৩ খ্রি.) তার সংকলিত “বাংলা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ” গ্রন্থের একস্থানে আমীর উদ্দিন বসুনিয়ার বাংলা আমপারার কথা লিখেছেন গুরুত্ব সহকারে। তিনি বলেছেন, আমার বিশ্বাস, এদেশে বাংলা টাইপ প্রচলনের পূর্বে এ গ্রন্থটি ছাপা হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করে থাকেন, আমির উদ্দীন বসুনিয়ার এই সরল বাংলা কাব্যানুবাদখানি মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৬ খ্রি.। রংপুরের কুন্ডি পরগনার বিখ্যাত জমীদার কালীচন্দ্র রায় চৌধুরীর অর্থানুকুল্যে সর্বপ্রথম গোপালপুরের নিকট শ্যামপুর রেলস্টেশনের কাছে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করে পূর্ববঙ্গের সর্বপ্রথম পত্রিকা “সাপ্তাহিক রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ” প্রকাশ করেছিলেন ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে। খুব সম্ভব এই প্রেসেই পরবর্তীতে ছাপা হয়েছিল তাঁর এই কোরআনের বঙ্গানুবাদ গ্রন্থটি। কবি আমির উদ্দীন বসুনিয়ার পবিত্র কোরআনের আমপারার বঙ্গানুবাদ ১৮৬৬ খ্রি. ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেয়ে অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

গিরিশ চন্দ্র সেন পবিত্র কোরআন এর বঙ্গানুবাদ করেছিলেন ১৮৮১ খ্রি. থেকে ১৮৮৬ খ্রি. পর্যন্ত। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, গিরিশ চন্দ্র সেনের ২০ বছর পূর্বে (১৮৮৬১৮৬৬ = ২০ বছর পূর্বে) পল্লীর এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে রংপুরের আমির উদ্দীন বসুনিয়া আংশিক হলেও পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম বঙ্গানুবাদক হিসাবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। অবশ্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, মুসলমানদের মধ্যে টাঙ্গাইলের করটিয়ার মৌলভী মুহাম্মদ নঈমুদ্দীন (১৮৩২১৯১৬ খ্রি.), আখবার এসলামীয়া পত্রিকার সম্পাদক কোরআন শরীফের অনুবাদে প্রবৃত্ত হন। তিনিও কোরআন শরীফের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদে সক্ষম হন নাই। মুসলমান অনুবাদকদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কোরআন শরীফ বাংলায় অনুবাদের কৃতিত্ব পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত চব্বিশ পরগনা জেলার চন্ডিপুর গ্রামের অধিবাসী মৌলভী আব্বাস আলীর (১৮৪৬১৯২২ খ্রি.)। মৌলভী আব্বাস আলী পূর্ণাঙ্গ কোরআনের একখানি সুন্দর বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেন ১৯০৭ খ্রি.। তাই বলা চলে, মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ কোরআনের বঙ্গানুবাদের গৌরবের দাবীদার মৌলভী আব্বাস আলী (১৮৪৬১৯২২ খ্রি.)। এরপর যিনি পূর্ণাঙ্গ কোরআন শরীফ অনুবাদ করেন তিনি হলেন রংপুরের খান বাহাদুর তসলিম উদ্দীন আহাম্মদ (১৮৫২১৯২৭ খ্রি.)। তিনি বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ী প্রাইমারি স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য রংপুরে এসে উপনীত হন। রংপুর ছিল তখন হিংস্র শ্বাপদসংকুল বিজন বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ জনপদ। তিনি ছিলেন রংপুর জেলা স্কুলের কৃতী ছাত্র ও রংপুরের প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট (১৮৭৭ খ্রি. কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে বিএ পাস করেন)। খান বাহাদুর তসলিম উদ্দীনকৃত এই মহাগ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তরজমা ১৮৯১ খ্রি. থেকে ১৯১৩ খ্রি. পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২২ বছর ব্যাপী তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। তসলীম উদ্দীনের পূর্ণাঙ্গ কোরআন শরীফের বঙ্গানুবাদের প্রকাশ কাল হলো ১৯২৩ খ্রি. থেকে ১৯২৬ খ্রি. পর্যন্ত। অবশ্য আব্বাস আলীর পরে হলেও খান বাহাদূর তসলিম উদ্দীন (১৮৫২১৯২৭ খ্রি.) তাঁর সমসাময়িক অনুবাদদের এবং সম্ভবত এ যাবৎ প্রকাশিত কোরআনের উল্লেখযোগ্য অনুবাদকের অন্যতম। তসলিম উদ্দীনের নাম শুধুমাত্র সাহিত্য সাধক হিসেবেই নন, একজন তীক্ষ্ণদর্শী বুদ্ধিজীবী, স্বধর্মনিষ্ঠ সমাজসেবক হিসেবেও স্মরণীয়।

টাঙ্গাইল জেলার মৌলভী আবুল ফজল আবদুল করিমও সম্পূর্ণ কোরআনের অনুবাদ করেছিলেন। আবদুল করিমের অনুবাদে মূল আরবীও আছে। ইনি প্রথমে হাইস্কুলের হেড মৌলভী ছিলেন, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ও ফারসী ছাপার প্রুফ রিডার হন। উল্লিখিত অপূর্ণ কিংবা প্রায় পূর্ণ অনুবাদগুলো ছাড়া অনেকেই কোরআন শরীফের আংশিক অনুবাদ করেছেন এবং কেউ কেউ কোরআনের উৎকৃষ্ট আয়াত এবং অংশসমূহের বাংলা সংকলন বের করেছেন। কেউ আবার আংশিক কাব্যে কোরআন বের করেছেন। এদের মধ্যে আবুল মজিদ, মোহাম্মদ আবদুল হাকিম, আলী হাসান, কিরোন গোপাল সিংহ, মৌলানা রহুল আমীন, মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, এয়ার আহমেদ, কুদরতখুদা, কাজী নজরুল ইসলাম, মীর ফজলে আলী, মুহম্মদ আযহার উদ্দীন, ফজলুর রহীম, আবুল ফজল, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সিরাজুল ইসলাম, মুহম্মদ তৈমুর ও খন্দকার সাইদুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য।

লেখক : সাহিত্যিক, গবেষক ও কলামিষ্ট

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ২০১৬১১০৫

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: