প্রথম পাতা > অর্থনীতি, ইতিহাস, ইসলাম, ধর্মীয়, সমাজ > কারূনের সম্পদাদি ধ্বংস হওয়া : আজকের বাস্তবতা

কারূনের সম্পদাদি ধ্বংস হওয়া : আজকের বাস্তবতা

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী : নবী ও রাসূল হযরত মূসা (.)’র আপন চাচাতো ভাই কারূন। অপরদিকে হযরত মূসা (.)’র আপন ভাই হারুন (.)। হযরত হারুন (.) হযরত মূসা (.)’র সাথে থেকে মহান আল্লাহ পাকের একত্ববাদ প্রচার করে গেছেন। অপরদিকে অভিশপ্ত চাচাতো ভাই কারূন তখন মিশরের জালেম বাদশা ফিরআউনের তোষামোদে থেকে থেকে বিশাল ধন সম্পদের মালিক বনে যায়। এতে কারূন অহংকারী হয়ে নিজের অর্জিত সম্পদ মনে করে আল্লাহ পাককে ভুলে যান এবং যাকাত দিতে অস্বীকার করেন। সে ছিল সুদর্শন ও সুকণ্ঠের অধিকারী। জালেম বাদশা ফিরআউনের সহচর ও অন্যতম সহকর্মী। ফলে বিশাল সম্পদের মালিক হতে বেশি সময় লাগেনি। পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লাহ পাক বলেন, “আমি তাঁকে দান করেছিলাম এমন ধন ভান্ডার যাঁর চাবিগুলি বহন করার একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল।”

কোন কোন মুফাসসির বলেন, ষাটটি বচ্ছর তা বহন করত। বস্তুত কারূন মনে করত তার বুদ্ধি বিবেচনায় জ্ঞানগরিমায় সে বিশাল ধন সম্পদের মালিক হন, সে ছিল বড় কৃপণ। ধন সম্পদ তাঁকে উদ্ধত ও অহংকারী করে, স্বীয় বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, নিজ সম্প্রদায়ের লোকজনকেও নিচ এবং হেয় মনে করত। সে বাহ্যিকভাবে ইমান আনলেও অন্তর থেকে হযরত মূসা (.)’র প্রতি চরম বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করত। অর্থাৎ সেও ছিল মুনাফিক। তার মনক্ষুন্নতার আরও একটি কারণ হল, চাচাতো ভাই হযরত মূসা (.) ও হযরত হারুন (.) আল্লাহ পাকের নবী এবং সম্প্রদায়ের নেতা। অপরদিকে সে বিশেষ সম্মানের অধিকারীতত নয়ই, গণনার মধ্যেও তাকে আনা হত না। অথচ সে ছিল বিশাল ধন সম্পদের মালিক।

কারূন অহংকার বশে হযরত মূসা (.)-কে বলে এ ধন সম্পদ আল্লাহ দেয়া নহে এটা তার জ্ঞান বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার দ্বারা অর্জন করেছে। তারপরেও হযরত মূসা (.) বারে বারে কারূনকে যথাযথ যাকাত প্রদান করে আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায়ে নছিহত প্রদান করতে থাকে। কিন্তু কাজের কাজত কিছুই হয় না বরং কারূনের মানসিকতা অহংকার আরও বেড়ে যায় এবং এক দুষ্ট নারী লেলিয়ে দিয়ে হযরত মূসা (.)’র চরিত্র হননের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়।

অবশেষে হযরত মূসা (.)’র দোয়ায় আল্লাহ পাক কারূনকে তার প্রাসাদ ধনসম্পদসহ ধ্বংস করে ফেলা হয়। পবিত্র কুরআন মাজীদে দুই জায়গায় কারূনের কথা উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন, “এবং আমি ধ্বংস করেছিলাম কারূন, ফিরআউন ও হামানকে। মূসা ওদের নিকট স্স্পুষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিল, তখন তারা দেশে দম্ভ করত, কিন্তু ওরা আমার শাস্তি এড়াতে পারেনি। ওদের প্রত্যেককেই তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম, ওদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচন্ড ঝটিকা, ওদের কাকেও আঘাত করেছিলাম, কাকেও পানিতে পতিত আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূগর্ভে এবং কাকেও করেছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন জুলুম করেন নি, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।”

মিশরের কায়রো নগরী থেকে প্রায় ১০০ কি. মি. দূরত্বে কারূন তার ধন সম্পদসহ মাটির নিচে ধ্বসে গিয়ে পানি জমে লেকে পরিণত হওয়ার দৃশ্য বিদ্যমান। মহান আল্লাহ পাকের হুকুমে কারূন তার সমস্ত ধন ভান্ডার মাটি গ্রাস করে নেয়। মাটি প্রথমে কারূনকে হাঁটু পর্যন্ত গ্রাস করে তখন সে হাসতে থাকে। কিন্তু মাটি যখন তাকে কোমর পর্যন্ত গ্রাস করে তখন বুঝতে পারে তার অবস্থা কাহিল। অতঃপর মাটি গ্রাস করে তার মাথা। এভাবে ধাপে ধাপে মাটি প্রাসাদ ধনরত্নসহ কারূনকে গ্রাস করতে করতে অতল তলে তলিয়ে যায়। কারূন তার প্রাসাদ ধন সম্পদসহ যে এলাকায় ধ্বংস প্রাপ্ত হয় তাকে মিশরীয়রা আরবিতে বোহাইরা কারূন বলে থাকে। বোহাইরা অর্থ হ্রদ বা লেক। অভিশপ্ত এলাকার এ লেইকের গভীরতা প্রায় ১২ মিটার। আয়তন প্রায় ৮/১০ বর্গ কি.মি.
আমাদের দেশে শূন্য থেকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিশাল ধন সম্পদের মালিক হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা কম নয় কিন্তু শতকরা কয়জনই বা মহান আল্লাহ পাককে ভয় করছে ভাবতে হবে। অঢেল অর্থ সম্পদ লাভ করার পর বিশাল প্রাসাদ সাদৃশ্য ঘর বাড়ি নির্মাণের জন্য গ্রামের গরীব আত্মীয় স্বজনকে উচ্ছেদ করে দেয় এ রকম সংখ্যাও কম নয়। কোটি টাকার গাড়িতে গরীব আত্মীয় স্বজনের মধ্যে কয়জনইবা পাশে বসতে পারে। গরীব আত্মীয় কয়জনইবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িং রুমে সোফায় গিয়ে বসতে পারে। আরও অবাক করা ব্যাপার রমজানে যাকাতের নামে গরীবকে সাহায্যের নামে কোটি কোটি টাকা প্রদান করা হয় কিন্তু এ টাকাগুলো হালাল কিনা? হালাল ধন সম্পদের যাকাত কিনা?

এ কালে কারূনের মত অর্থ সম্পদে বলীয়ান হয়ে প্রকাশ্যে সরাসরি দাম্ভিকতা প্রদর্শন না করলেও কাজে কারবারে চালচলনে দাম্ভিকতা প্রকাশ পাচ্ছে। আল্লাহ পাক প্রকৃতই ভয় করা ব্যক্তিগণের মধ্যে গণ্য হতে হলে প্রথমেই হালাল উপার্জনের মাধ্যমে ধন সম্পদ উপার্জন করতে হবে। সাথে সাথে নামাজ রোজা হজ্বের পাশাপাশি যথাযথ হিসাব নিকাশ করে যাকাত প্রদান করতে হবে।
কিন্তু এ সংখ্যা কয়জনই বা পাওয়া যাবে বরং উল্টো চিত্র সাম্প্রতিককালে দেশে বেশি বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর তা হল হারামের অর্থ সম্পদের পাহাড় করে ঐ সম্পদ থেকে বেশি বেশি দান খয়রাত করা হচ্ছে। সাথে সাথে বেশি বেশি নামাজ রোজার সাথে হজ্ব ওমরা বেশি বেশি পালন করে অতি ধার্মিকতা দেখা যাচ্ছে। যা আমাদের জন্য ভাববার বিষয়। নামাজ পড়ছি কাপড় হালাল কিনা? সেহেরী ইফতারে হালাল খাচ্ছি কিনা? হজ্ব ওমরায় হালাল টাকা খরচ করছি কিনা?

একালে নিজেকে নব্য মুফতি মনে করার সংখ্যা অসংখ্য অবৈধ আয়ের টাকায় ঘরবাড়ি, গাড়ি, আসবাবপত্র ইত্যাদিতে ব্যয় করে। আর চাকুরির টাকার মূল বেতন দিয়ে এবং অবসরে গিয়ে পাওয়া টাকা দিয়ে হজ্ব ওমরা, কুরবানী ইত্যাদিতে খরচ করতে চায়। এটা মহান আল্লাহ পাকের সাথে মশকরা (নাউজুবিল্ল্যাহ) ছাড়া আর কি হতে পারে। আমাদের ভাবতে হবে দুনিয়া আখিরাত সমান্তরালে চলতে পারে না। পরকালের কল্যাণে দুনিয়াতে আয় রোজগারসহ নৈতিকতায় ধর্মের দিক নির্দেশনা অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

সূত্রঃ দৈনিক পূর্বকোণ, ৭ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: