প্রথম পাতা > ইতিহাস, বাংলাদেশ, শিল্প > ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ভাণ্ডার পুঠিয়া রাজবাড়ী

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ভাণ্ডার পুঠিয়া রাজবাড়ী

নভেম্বর 7, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

puthia-rajbari-1.ম সাজু : রাজশাহীর যে স্থানটি পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করবে সেটি নিঃসন্দেহে পুঠিয়া। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার পূর্ব দিকে মন্দিরের শহর হিসেবে পরিচিত পুঠিয়া। পুঠিয়া রাজবংশের উত্পত্তি হয় মোগল সম্রাট আকবরের আমলে। সে সময় রাজশাহীর আলাইপুর এলাকার পাঠান জায়গীরদার লস্কর খাঁ ছিলেন। তারই নাম অনুসারে পুঠিয়া পরগনা লস্করপুর নামে পরিচিতি লাভ করে।

রাজা পিতাম্বর মূলত পুঠিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ষষ্ঠদশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পুঠিয়ায় রাজধানী স্থাপন করেন। একাধিক সুদৃশ্য ইমারত নির্মাণসহ জলাশয় খনন করেন। রানী ভুবন মোহিনী বিশাল একটি জলাশয়ের সম্মুখে ভুবনেশ্বর শিবমন্দির নির্মাণ করেন। এটি পঞ্চরত্ন শিবমন্দির নামেও খ্যাত। বাংলাদেশে বিশালাকারের সুউচ্চ ও বহু গুচ্ছচূড়া বিশিষ্ট শিবমন্দিরগুলোর মধ্যে পুঠিয়ার পঞ্চরত্ন শিবমন্দিরটি স্থাপত্যশৈলীতে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি স্থাপত্য নিদর্শন। পুঠিয়ায় অন্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে চৌচালা গোবিন্দমন্দির, পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির, দোল মন্দির বা দোলমঞ্চ, দোচালা ছোট আহ্নিক মন্দির, জগদ্বাত্রী মন্দির, রথ মন্দির ইত্যাদি। পুঠিয়ার জমিদাররা অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করেছিলেন। বিশালাকারের একই চত্বরে এরূপ মন্দির কমপ্লেক্স একমাত্র পুঠিয়া ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথাও দেখা যায় না। একমাত্র ভারতের পশ্চিমবাংলার বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে এরূপ মন্দির কমপ্লেক্স রয়েছে। পুঠিয়া রাজবাড়ী, মন্দিরগুলো, দীঘি ও জলাশয়সহ রাজবাড়ীর পুরো চত্বরটি পর্যটকদের বেড়ানোর জন্য একটি আদর্শ ও আকর্ষণীয় স্থান।

নানা কারণে পুঠিয়া রাজবাড়ীর ভগ্নদশা হলেও এর মনোরম সৌন্দর্য এখনও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। দেশের উত্তরাঞ্চলে যে ১৮৪টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি রয়েছে, এর মধ্যে পুঠিয়া রাজবাড়ী অন্যতম। এখানে ১৪টি স্থাপনা সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর রক্ষণাবেক্ষণ করছে। এসবের মধ্যে একটি রাজবাড়ী ও অবশিষ্ট ১৩টি মন্দির। অধিকাংশ মন্দিরে পোড়ামাটির চিত্রফলক স্থাপিত আছে। তবে কালের বিবর্তনে ক্ষয়ে যাচ্ছে এসবের সৌন্দর্য।

পুঠিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা নূরুল আমিন জানান, এখানে ১৯টি মন্দির ছিল। এর মধ্যে পরিচর্যার অভাবে ৯টি মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে। অযত্নঅবহেলা ও সংস্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এই অমূল্য প্রত্নসম্পদ। ছোট গোবিন্দ মন্দিরের প্রধান ফটকের ওপরে বাঁপাশে রয়েছে রামরাবণ যুদ্ধের খণ্ডচিত্র, ডানে রয়েছে রামায়ণমহাভারতের ইতিহাস নিয়ে তৈরি টেরাকোটার চিত্র। এর মাঝখানে ছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চিত্র, যা ইতোমধ্যে চুরি হয়ে গেছে। এ ছাড়াও মন্দিরের দুই কোনা থেকে মূল্যবান টেরাকোটা চুরি হয়ে গেছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে নিয়োজিত কয়েক তত্ত্বাবধায়ক বলেন, এই মন্দিরের ১৯৫টি টেরাকোটা নকশা চুরি হয়ে গেছে। এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে বড় আহ্নিক মন্দির। এর এক কোনা থেকে চুরি হয়ে গেছে টেরাকোটা। পাঁচ আনার রাজার অন্দর মহলে রয়েছে একটি ছোট আহ্নিক মন্দির। এই মন্দির থেকে প্রায় ৫০টির মতো নকশা খোয়া গেছে।

শিব মন্দির

ঢাকারাজশাহী মহাসড়ক থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে সুন্দর একটি মন্দির। পুঠিয়া রাজবাড়ীর প্রবেশপথে পুকুর পাড়ে বড় আকৃতির এ মন্দিরটির নাম শিব মন্দির। পুঠিয়ার রানী ভুবন মোহিনী দেবী ১৮২৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সবদিকে ৬৫ ফুট দীর্ঘ শিব মন্দিরটি একটি উঁচু ভিতের ওপরে নির্মিত এবং এর চার কোনায় চারটি আর কেন্দ্রে একটি রত্ন আছে। মন্দিরের দোতলায় একটি মাত্র কক্ষ এবং কক্ষের চারপাশে দুই স্তরে বারান্দা রয়েছে। মূল কক্ষের অভ্যন্তরে অধিষ্ঠিত আছে কষ্টিপাথরের বিশাল এক শিব লিঙ্গ। পুরো মন্দিরের দেয়াল পৌরণিক কাহিনি চিত্রখচিত। এর লাগোয়া পূর্ব পাশে গোল গম্বুজ আকৃতির আরেকটি ছোট মন্দির আছে। পুঠিয়ায় অবস্থিত মন্দিরগুলোর মধ্যে শিবমন্দির একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। এ মন্দির নির্মাণ করতে সাত বছর সময় লাগে। মন্দিরটি নির্মাণে ওই সময় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয় বলে জানা যায়।

দোল মন্দির

শিব মন্দির ছাড়িয়ে একটু দক্ষিণে গেলেই চোখে পড়বে চার তলাবিশিষ্ট দোল মন্দির। দোলমঞ্চের আকারে মন্দিরটি ধাপে ধাপে ওপরে উঠে গেছে। চতুর্থ তলার ওপরে আছে গম্বুজাকৃতির চূড়া। প্রত্যেক তলার চারপাশে আছে টানা বারান্দা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে পুঠিয়ার রানী হেমন্ত কুমারী দেবী এ মন্দির নির্মাণ করেন। ইট, চুন ও সুরকির তৈরি দোলমঞ্চ মন্দিরটি ক্রমশ ছোট ছোট থাকে উপরে উঠে গেছে। সমতল ভূমি  থেকে মন্দিরের উচ্চতা ২০ মিটার। চতুর্থ তলার ওপরে আছে মন্দিরের গম্বুজ আকৃতির চূড়া। প্রত্যেক তলার চারদিকে প্রশস্ত টানা বারান্দা আছে। নিচ তলায় ২৮টি, দোতলায় ২০টি, তৃতীয় তলায় ১২টি ও চতুর্থ তলায় চারটি প্রবেশপথ আছে।

পুঠিয়া রাজবাড়ী

দোল মন্দিরের সামনে ঘাসে ঢাকা বিশাল মাঠ। দক্ষিণ প্রান্তে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধ্বংসের প্রহর গুনছে বিশাল একটি স্থাপনা। ইট থেকে পলেস্তারা খসে যাওয়া এ প্রাসাদটি নিজের বয়সের জানান দেবে সবাইকে। এটিই বিখ্যাত পুঠিয়া রাজবাড়ী। রানী হেমন্তকুমারী দেবী তার শাশুড়ি মহারানী শরত্সুন্দরী দেবীর সম্মানার্থে ১৮৯৫ সালে নির্মাণ করেন এ রাজবাড়ী। দ্বিতল বিশিষ্ট আয়তাকার পরিকল্পনায় নির্মিত পুঠিয়া রাজবাড়ীটি একটি আকর্ষণীয় ইমারত। বহুকক্ষ বিশিষ্ট রাজবাড়ীর প্রধান প্রবেশপথ সিংহ দরজা উত্তর দিকে অবস্থিত। জমিদার বা রাজারা এখান থেকে তাদের রাজকর্ম পরিচালনা করতেন। এ রাজবাড়ীতে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তিদানের ব্যবস্থাসহ বন্দিশালার ব্যবস্থা ছিল। চুনসুরকির মসলা ও ছোট আকৃতির ইট দ্বারা নির্মিত রাজবাড়ীর সম্মুখভাগে আকর্ষণীয় ইন্দোইউরোপীয় স্থাপত্য রীতির প্রভাব লক্ষ করা যায়। রাজবাড়ীর নিরাপত্তার জন্য চারপাশে জলাশয়ের ব্যবস্থা ছিল। স্থানীয় জমিদার পরিবারের সদস্যদের দ্বারা ঊনবিংশ শতাব্দীতে এটি নির্মিত হয়েছিল। রাজবাড়ীটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণাধীন পুরাকীর্তি হলেও বর্তমানে লস্করপুর ডিগ্রি কলেজের একাডেমিক ভবন হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে ভবনটি। ভবনের পূর্ব পাশে আছে রানী পুকুর। রাজবাড়ীর সম্ভ্রান্ত নারীদের গোসলের জন্য রানী পুকুরের দেয়ালঘেরা শান বাঁধানো ঘাটের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান।

গোবিন্দ মন্দির

পুঠিয়া রাজবাড়ীর প্রাচীরের ভেতরে পোড়ামাটির অলঙ্করণে সমৃদ্ধ একটি মন্দির। বর্গাকারে নির্মিত এ মন্দিরের প্রত্যেক পাশের দৈর্ঘ্য ১৪.৬ মিটার। কেন্দ্রীয় কক্ষ ছাড়াও মন্দিরটির চারপাশে বর্গাকার চারটি কক্ষ আছে। মন্দিরটি ২৫০ বছরের পুরনো বলে প্রচলিত থাকলেও এর গায়ে চিত্র ফলক দেখে ধারণা করা হয় যে, এটি ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত। মন্দিরের গায়ে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক চিত্র আছে। রামায়ণ, মহাভারত ও পৌরাণিক কাহিনির রূপায়ণ ছাড়াও ফলক চিত্রের মাধ্যমে প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের ছবিও তুলে ধরা হয়েছে। মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে আছে একটি কক্ষ বা গর্ভ ঘর। চার কোণে চারটি বর্গাকৃতির ছোট কক্ষ। মন্দিরটির কার্নিশ সামান্য বাঁকানো। পিলার ও দেয়ালে অসংখ্য পোড়ামাটির চিত্রফলক প্যানেল দ্বারা সাজানো আছে।

বড় আহ্নিক মন্দির

পুঠিয়া রাজবাড়ীর পশ্চিম পাশে দীঘি। তার পশ্চিম তীরেই রয়েছে পূর্বমুখী বড় আহ্নিক মন্দির। কারুকার্যমণ্ডিত এ মন্দিরের নির্মাণশৈলী বেশ আকর্ষণীয়।

রানী হেমন্ত কুমারীর বাসভবন

রাজবাড়ীর দক্ষিণপূর্বপাশে একতলা বিশিষ্ট ভবনটি মহারানী হেমন্ত কুমারীর বাসভবন। এ ভবনের উত্তরপশ্চিম কোণে আছে ছোট আহ্নিক মন্দির। কেন্দ্রের আয়তকারে নির্মিত বিশালাকারের অভ্যর্থনা হলঘরকে কেন্দ্র করে ইমারতের অন্য কক্ষগুলো বিন্যস্ত। ভবনটি নির্মাণে ইট, চুন, সুরকি, লোহা ও কাঠ ব্যবহূত হয়েছে। মনোরম এ ভবনটি ১৮৯৫ সালে রানী হেমন্ত কুমারী নির্মাণ করান। এটি এখনও পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। বর্তমানে এটি উপজেলা সহকারী ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।

হাওয়াখানা

পুঠিয়াবাজার থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে তারাপুর গ্রামে একটি পুকুরের মধ্যবর্তী স্থানে দ্বিতল বিশিষ্ট হাওয়াখানা অবস্থিত। খিলান আকৃতির ভিত্তিবেদির ওপর নির্মিত এই হাওয়াখানার পশ্চিম পাশের দেয়ালে একটি ছোট আকৃতির কুঠুরি এবং দক্ষিণ পাশে দোতলায় ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে। ওপরের টানা বারান্দার চারপাশ অনুচ্চ দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ওপরের কক্ষটির পূর্বপাশে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে খিলান পথ আছে। স্থানীয়ভাবে এটি হাওয়াখানা নামে পরিচিত হলেও আসলে এটি একটি মন্দির। এর নির্মাণকাল জানা যায়নি।

কীভাবে যাবেন

নিজস্ব গাড়িতে পুঠিয়া রাজবাড়ী ভ্রমণে গেলে রাজশাহী শহরের প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার আগে পড়বে জায়গাটি। এ ছাড়া রাজশাহীগামী যে কোনো বাসে গিয়েও পুঠিয়া নামা যায়। আবার রাজশাহী থেকে লোকাল বাসে পুঠিয়া আসতে সময় লাগে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা। রাজশাহী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে নাটোরগামী বাসে চড়ে পুঠিয়া নামা যায়।

সূত্রঃ দৈনিক সকালের খবর, ৭ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: