প্রথম পাতা > অপরাধ, নারী, বাংলাদেশ, সমাজ > পুরুষ হলো ‘ভার্ব’, মেয়েরা হলো ‘অক্সিলারি ভার্ব’

পুরুষ হলো ‘ভার্ব’, মেয়েরা হলো ‘অক্সিলারি ভার্ব’

rape-3-artশারফুদ্দিন আনাম : বহু বছর আগে উপমহাদেশের বিখ্যাত গীতিকার জাভেদ আখতারের একটা সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। সেখানে অনেক কথার মাঝে তিনি বলেছিলেন, কমবেশি সব পুরুষই ধর্ষকামী। হয়ত কারও ক্ষেত্রে তার প্রকাশ ঘটে, কেউবা সেটা দমিয়ে রেখে ধীরেধীরে সেই খারাপ বোধটাকে সামলে নেয়।

এরপরের বেশ কিছুদিন মাথায় ‘ধর্ষকামী’ শব্দটা ঘুরছিল। ভাবছিলাম, ‘ধর্ষণ’ শব্দটা শুনলেই পুরুষ হয়েও আমি পুলকিত হই না কেন? আমার আত্মমর্যাদায় লাগে? একটা অপরাধ হিসেবে তো নিশ্চয়ই, তবু সে অপরাধের অস্তিত্বকে ছাপিয়ে, বেশ ভারী রকমের একটা অপমানবোধও যেন তৈরি হয় ভেতরে—কিন্তু কেন? কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেক কিছুর সঙ্গে এও মনে হয়, যা নিতে যাচ্ছি, তা পুরোটাই জোরপূর্বক। আর জোরের দান তো ভিক্ষাবৃত্তির চেয়েও অনেক নিম্ন মানের।

তাই যদি হয়, তাহলে কিভাবে একজন পুরুষ তার ‘পৌরুষের’ দম্ভে জঘন্য এ ঘটনা ঘটিয়ে বীরের বেশে হাসে? তার ইন্দ্রিয়ের ভেতরে যে চেতনা, তাকে বীররসে সিক্ত করা দম্ভ এনে দেয়, তা তো বাহিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আজও মনে আছে, স্কুল জীবনে ব্যাকরণ বোঝাতে কোনও এক শিক্ষকের মুখে শোনা সেই তথাকথিত পুরুষবাণী—পুরুষ হলো ‘ভার্ব’, মেয়েরা হলো ‘অক্সিলারি ভার্ব’। ছোট্ট সে মনটা এত হিসাব সেদিন কষেনি, বয়স তাকে ততটা বুঝতেও দেয়নি। কিন্তু বেশ মনে আছে, খুব করে অস্বস্তিতে ভুগেছিলাম। বাড়িতে ফিরে মা, বোন, ফুপু, পাশের বাড়ির চাচি সবাইকে নতুন করে দেখলাম। তাদের নিয়ে নতুন করে ভাবলাম। এই তালিকায় ছিলেন স্কুলেরই আরও দু’জন শিক্ষিকা। সবাইকেই যেন নতুন করে বোঝার চেষ্টা করলাম। অবশেষে যা থাকার থেকে গেলো, যা ঝরার ঝরে পড়লো, কিছুরই পরিবর্তন হলো না। ‘মেয়ে হচ্ছে মায়ের জাত, মায়ের সেই জাতকে যে সম্মান জানাতে পারে না, সে নিজেও কোনও দিন সম্মান পায় না’ —নিজের মায়ের কাছে অজস্রবার শোনা এই কথাটি সেদিন বেশ ভালোভাবেই ‘ভার্ব’ ও ‘অক্সিলারি ভার্ব’ আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল। বড় হলাম, আস্তে আস্তে বুঝলাম, মানুষের শরীর ও মনের মাঝখানে একটা অদৃশ্য ফিল্টার থাকে। তার নাম ‘শিক্ষা’। পুথিগত শিক্ষার কথা বলছি না, বলছি বিবেক ও মর্যাদাবোধ জাগরণের শিক্ষার কথা, যা পরিবার শেখায়। যে ছেলেটি পরিবারে নারীদের মর্যাদা সমুন্নত হতে দেখে ধাপে ধাপে বড় হয়, সে আর যাই হোক, কখনোই একজন ধর্ষক হতে পারে না।

তবে পুরুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষালয় তার নিজের মন। পুরুষ নাম নিয়ে পরিবারের বা সমাজের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নয়, মানুষ নাম নিয়ে ভালোমন্দ মেলানো একজন হিসেবে নিজেকে দেখতে শেখাটাও একটা শিক্ষা। মানুষ হিসেবে প্রায় সবরকমের বোধ, আকাঙ্ক্ষা মনের উপলব্ধিতে আসে। কিন্তু প্রকাশ ভঙ্গিমায় তা কতটা থাকবে, থাকলেও তা কিভাবে সংযত করা যায়, শরীরে খাদ্য পরিপাকক্রিয়ার মতো কিভাবে ভালো নির্যাসটুকু রেখে উচ্ছ্বিষ্টটুকু পরিহার করা যায়, তা কেবল নিজেই নিজেকে শেখানো যায়। সেই শিক্ষার ছাকনিতেই প্রেমময় আলিঙ্গন আর খুবলে তুলে মুখে পুরবার তফাৎটা ধরা পড়ে। সেই শিক্ষার আয়নায় ভোগ আর উপভোগের বিভেদের প্রতিবিম্ব পরিষ্কার হয়।

চারপাশে হঠাৎ করেই যেন জোর করে জাহিরের সেই ‘পৌরুষ’ মেলা বসেছে। আসলেই কি তাই? নাকি আগে অভিজাতের বাইরে গণমানুষের সংবাদপত্র পাঠ ছিল কেবল চায়ের টেবিলে, তাই বড় ঘটনা ছাড়া বাকি সব রয়ে যেত লোকচক্ষুর অন্তরালে; আর এখন প্রতিমুহূর্তে মুঠোফোনে নোটিফিকেশন, অনেক বেশি সচেতন গণমাধ্যম, তাই চোখ এড়ায় না কারও? জানি না, এই নিরীক্ষা হয়ত প্রাসঙ্গিক। তবে তার চেয়েও অনেক বড় আলোচ্য ‘ধর্ষণ’এর মতো ঘৃণ্য শব্দের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া ‘শিশু’ শব্দটি। ঘৃণায় মুখের ভেতর জট পাকানো থুথুর দলা এতে হয়ত আকারে আরও অনেক বড় হয়েছে, তাই বলে আমি কিন্তু অবাক হইনি। কারণ নিজের মনের ভেতরে এই ঘৃণ্য কাজ করার তাড়না যাকে চালিয়ে ফেরে, বয়স ভেদ করার মানবিকতা বা মানসিক সুস্থতাটুকু তার এখনও অবশিষ্ট আছে, আমি তা একদমই মানতে নারাজ। এ কারণেই আড়াই থেকে শুরু করে পাঁচ, দশ, বারো, তেরোসহ যেকোনও বয়সী শিশুই বাদ পড়ছে না। যেমনভাবে বাদ পড়ছেন না, মাসখানেক আগে সাভারে তিরিশ বছর বয়সী এক ধর্ষকের লালসার শিকার এক বৃদ্ধা। যার মেয়ের বয়স ৬৩ আর নিজের বয়স ৯০। বোঝাই যায়, আড়াই নাকি নব্বই, সমস্যাটা সেখানে আটকে নেই। ধর্ষকও কিন্তু আটকে নেই। আটকে আছি কেবল আমরা, সাধারণ মানুষগুলো, যারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি একে অন্যের দিকে। যাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য জীবনের অর্ধেকটা সময় বইয়ে দিতে হয় হাঁটে, মাঠে, পথে, ঘাটে, বাজারে, অফিসে। ১২/১৪ ঘণ্টা কাজ করা সাধারণ মানুষ, যাদের কাছে সাপ্তাহিক ছুটির দিনটা ‘নাগরিক ঈদ’ হয়ে ধরা দেয়, তারা এখন নিজের বোন, মেয়ে, কন্যাশিশু এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ পুত্র কিংবা বালক শিশু নিয়ে ‘ধর্ষণভাবনা’ ভাবছেন নতুন করে।

দম বন্ধ লাগছে? একটু হাফ ছাড়ি চলুন। আচ্ছা কেউ বলতে পারেন, একেবারে বিলুপ্তপ্রায় জায়গা থেকে সবার প্রিয় ইলিশ কিভাবে প্রতুলতার বন্যায় ভেসে গেল? কিভাবে ক’বছর আগেও সোনার দামে বিকোনো এই জিনিস ‘সোনারমাছ’ না থেকে মনভোলানো গন্ধ নিয়ে আপনার মনের মতো দামেই ‘মাছ’ হয়ে ফিরে এলো আপনার পাতে—ভেবেছেন? তার ফিরে আসার কারণ, এর পেছনে কঠোরভাবে আইন ও বিধিনিষেধের প্রয়োগ। মাইলের পর মাইল অবৈধ জাল পোড়ানো হয়েছে, শাস্তি হয়েছে, কঠোর মনিটরিং হয়েছে। ফল হাতেনাতে। যেকোনও অপরাধে আইনের তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ খুব জরুরি। ধর্ষণ বা শিশুধর্ষণ যাই বলি, কঠোর শাস্তির মাত্র ২/১ টা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, তা হতে হবে সর্বনিম্ন সময়সীমার মধ্যে এবং অবশ্যই তা বেশ ফলাও করে। তাহলেই এই বর্বরতার চলন থেমে যাবে অনেকাংশে, ধর্ষণের শিকার হয়ে কেউ পড়ে থাকবে না, ধর্ষক নিজেই মুখ থুবড়ে পড়বে। শকুনগুলোর অন্তরাত্মা নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কোন বিকল্প নেই। যত ব্যস্ততাই থাকুক, যত সমস্যায় আমরা জর্জরিত থাকি না কেন, এই আবেদনের চেয়ে বড় এই মুহূর্তে আর কোন দাবি থাকতে পারে না।

মনের সবচেয়ে নিচুস্তর থেকে ক্ষোভ নিঙ্‌ড়ানো ধিক্কার জানাই তাদের, যাদের কারণে ঘৃণার থুথু, পুরুষ হিসেবে কখনও কখনও আমাকেও সিক্ত করে চলেছে।

লেখক: অ্যাসোসিয়েট নিউজ এডিটর ও সিনিয়র প্রেজেন্টার, একাত্তর টেলিভিশন

মূল শিরোণামঃ ‘পুরুষ হয়েছ ঢের, এবার মানুষ হও’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ৫ নভেম্বর ২০১৬

এই হত্যানির্যাতনের শেষ কোথায়?

নাসিমা হক : খাদিজা এখনো স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। প্রায় এক মাস ধরে খাদিজা যে হাসপাতালের শয্যায় দুঃসহ মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছেন, তার জন্য কে দায়ী? এই অমানুষিক যন্ত্রণা ভোগ কি খাদিজার প্রাপ্য ছিল? এর জবাব কে দেবে? খাদিজা আক্তারের (নার্গিস) আগে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী কিশোরী রিসাকে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। তারপরই মাদারীপুরের মেয়ে নিতু মণ্ডলকেও একইভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এ বছরের মার্চে খুন হন কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। তনু হত্যার পর কুমিল্লা, ঢাকাসহ সারা দেশে দীর্ঘদিন তীব্র আন্দোলন হয়েছে দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে। কিন্তু কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। তদন্তকাজ শেষ হয়নি। মানুষের মনে আশঙ্কা জন্মেছে, এ ঘটনার বিচার হবে না। যেমন বিচার হয়নি সাংবাদিক দম্পতি সাগররুনি হত্যার।
তদন্তকাজে কেন এই অনীহা, কী এর রহস্য, তা কিন্তু আজও অজ্ঞাত। তা এক প্রশ্ন হয়েই রয়ে গেছে দেশবাসীর মনে। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। তনু হত্যাকারীকে আমরা খুঁজে না পেলেও খাদিজা আক্তারের ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগের নেতা বদরুলকে কিন্তু ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। গত মাসে মিরপুরে দুই বোন এবং গাজীপুরে আরেক স্কুলছাত্রী দুর্বৃত্তদের হাতে আক্রান্ত হয়েছে। দিনাজপুরে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করেছে সাইফুল নামের এক দানব। আরও অনেক জায়গায় নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর শেষ কোথায়?

মনে প্রশ্ন জাগে, খাদিজা, রিসার পর আবার কে এই হামলার শিকার হবে? মেয়েরা কি স্কুলে যেতে পারবে না? পারবে না পরীক্ষা দিতে? পারবে না ঘরের বাইরে অন্য কোনো কাজে যেতে? ঘরের বাইরে বেরোলেই তাদের এভাবে নৃশংস হামলার শিকার হতে হবে? বছর দুই আগে এক নারী চিকিৎসক একই ধরনের হামলার ও হত্যার শিকার হয়েছিেলন। একটি মেয়েকে প্রেম নিবেদন করলে তাতে সাড়া দিতেই হবে? আর সাড়া না দিলেই হত্যা অথবা নির্যাতন! এ কেমন নৃশংস প্রেম! এই প্রেমিকদের মনে বাসা বেঁধেছে এমন ভাবনা, ‘আমি তোমাকে না পেলে তোমাকে আর কেউ পাবে না’, অথবা ‘তোমার আর বেঁচে থাকারই অধিকার নেই’। কেন? মেয়েরা কি মানুষ নয়? তাদের কি নিজের মতো বেঁচে থাকার অধিকার নেই? তাদের মেধা, মনন, ব্যক্তিত্ব অথবা পছন্দঅপছন্দ কিছু নেই? বিষয়টি নিয়ে আমাদের সবাইকে ভাবতে হবে। আজ সমাজতাত্ত্বিকদের গবেষণা করে বের করা দরকার, কেন ধর্ষণ, নারী নির্যাতন বাড়ছে। অনুসন্ধান করা দরকার, কী এর কারণ এবং কোথায় এর সমাধান।

আমাদের চিন্তায় পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে, পুরুষের ভাবনায়। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে মিডিয়া, বিশেষ করে টেলিভিশন। অন্যদিকে বিদ্যালয়গুলোও সমাজে তরুণদের মানস গঠনে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদের সব শিক্ষাদীক্ষা হয় বিদ্যালয়ে। তাদের মন ও মনন গঠিত হয় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাত ধরে। শিশুরা অভিভাবকদের চেয়েও বেশি শোনে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীকে শ্রদ্ধা করার বিষয়টি বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি, শিক্ষকদের কথাবার্তা ও পাঠদানের মধ্য দিয়ে শৈশবেই গড়ে দিতে হবে। তাদের বুঝতে দিতে হবে, নারীপুরুষ মিলেই এই সমাজ। নারীরাও এ দেশের নাগরিক।

আমাদের বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে সব শ্রেণিতে সপ্তাহে একটি এথিকস বা নৈতিকতা শিক্ষার ক্লাস। এই ক্লাসে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের শেখাবেন, নারীকে শ্রদ্ধা করতে হবে। শেখাবেন গুরুজনকে শ্রদ্ধা করার বিষয়ে। জানাবেন মাদকের ভয়াবহতার কথা, জঙ্গিবাদের বিপদ সম্পর্কে। ক্লাসেই শিক্ষকেরা তাদের জানাবেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস। জানি না শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আমাদের সমাজের পুরোধা ব্যক্তিরা এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবেন কি না। তবে এগিয়ে আসার এখনই সময় এবং বিষয়টা খুবই জরুরি।
অন্যদিকে পর্নোগ্রাফির প্রসারও এই অপরাধের পেছনে কাজ করছে। প্রযুক্তির এই ভয়ংকর দিকটা বন্ধ করতে প্রযুক্তির সাহায্য ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, সবাইকে সচেতন করতে হবে। এ ব্যাপারেও বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শিশুর মানস গঠনে পরিবার, অর্থাৎ পিতামাতা ও অন্য স্বজনদেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সেই ভূমিকা আমরা যথাযথভাবে পালন করছি কি? বিষয়টি সবাইকে ভেবে দেখতে বলব।

সমাজে নারী ধর্ষণ, নারী হত্যা, শিশু হত্যা, শিশু নির্যাতন ও অন্যান্য অপরাধ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। মানুষকে এ কথা দৃঢ়ভাবে ও স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে যে অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালী সংস্থার লোকই হোক বা যত প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের অনুসারী হোক, ধর্ষণহত্যার মতো অপরাধ বা যেকোনো অপরাধ করে তারা পার পেতে পারবে না। অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অবশ্যই রহিত করতে হবে।
কয়েকটি শিশু হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার করে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এটি প্রশংসার দাবি রাখে। তেমনি প্রতিটি নারী হত্যানির্যাতনের বিচারও দ্রুততর সময়ে করতে হবে। নারী হত্যা, নারী ধর্ষণের ঘটনার দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক। রিসা, খাদিজা, তনুসহ সব হত্যানির্যাতনের বিচার হোক।

লেখিকা : সভানেত্রী, নারী সাংবাদিক কেন্দ্র।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ৮ নভেম্বর ২০১৬

ধর্ষণ ও ধর্ষকাম: মনস্তত্ত্বে পৌরুষ নির্মাণ

সাদিয়া নাসরিন : দেশে কোনও যুদ্ধাবস্থা নেই, তবু আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের প্রতিটি মা এখন মেয়েকে বুকে নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটায়। আমার সোনার বাংলাদেশ অবরুদ্ধ আজ আগ্রাসী পৌরুষের হাতে। মধ্যবয়সী নারী, তরুণী, কিশোরী থেকে আড়াইতিনপাঁচ বছরের শিশু, সবাই নিরন্তর শিউরে পথ চলছে সবুজে মিশে থাকা ধর্ষকামী, হিংস্র পুরুষের ভয়ে। গ্রাম, শহর, রাস্তা, খেলার মাঠ, ফসলের মাঠ, হলুদের ক্ষেত, যানবাহন, হাসপাতাল, কর্মক্ষেত্র, সেনানিবাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, থানা, নিজের ঘর—এক ইঞ্চি জায়গাও আর বাকি নেই যেখানে একটু নিরাপত্তা পাওয়া যাবে। কোথাও কেউ নেই, কোথাও কিছু নেই যাকে আঁকড়ে ধরে আমাদের কন্যারা, বাঁচতে পারে এই মড়ক থেকে।

কী নির্মম এক অসঙ্গতিপূর্ণ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই সময়! যখন নারীর প্রতি বঞ্চনা, নির্যাতন, বৈষম্যের ইতিহাসকে বদলে দিয়ে সম্ভাবনার নতুন ইতিহাস গড়ার স্বীকৃতি হিসেবে এই দেশে জাতিসংঘের ভারি ভারি পুরস্কার আসছে ঠিক সেই সময় এ দেশে আক্ষরিক অর্থেই ধর্ষণের সর্বগ্রাসী মড়ক লেগেছে। গত ৯ মাসের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি মাসে গড়ে ৫২ জন নারী ও শিশু ধর্ষিত হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৩০১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬৯ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৯৩ জনকে, ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে ৩২ জন শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১৬৫ জন শিশু। পরিসংখ্যানের বাইরে প্রতিদিন প্রতিটি ঘরে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নিজেদের বড় আব্বাছোট আব্বামেঝ আব্বাদাদাভাইনানাভাইমামাখালুফুফাআঙ্কেল, স্যার, হুজুরদের হাতে।

এই শঙ্কার দেশে, অবিশ্বাসের দেশে তোকে কোথায় লুকোবো কঙ্কাবতী আমার? কাছেই স্কুল, তবু শক্ত করে মুঠো ধরে স্কুলে দিয়ে আসি। বাসার দারোয়ান, ড্রাইভার, স্কুলের গার্ড সবাইকে ভয় পাই। কৃষকের মেয়ে মাঠে যাবে—সে আর কোনও ভয় পাচ্ছে না, ভয় পাচ্ছে ধর্ষণের; শহরের মেয়েটি স্কুলে বা কলেজে যাবে—সে ভয় পাচ্ছে ধর্ষণের; গার্মেন্টস এর মেয়েটি কাজে যাবে—ভয় পাচ্ছে ধর্ষণের, কাজ শেষে মেয়েটি রাতে বাসে বা ট্রেনে ঘরে ফিরবে—ভয় পাচ্ছে ধর্ষণের; মেয়েকে ঘরে রেখে মা বাইরে যাবে—সে আর কোন ভয় পাচ্ছে না, ভয় পাচ্ছে ধর্ষণের। একা পুরুষ দেখলে নারী ভয় পাচ্ছে ধর্ষণের, দলবদ্ধ পুরুষ দেখলেও নারী ভয় পাচ্ছে ধর্ষণের। সুজান গ্রিফিন এর মতো বাংলাদেশের প্রতিটি কন্যার ভবিষ্যত বলছে ‘আমি কখনোই ধর্ষণের ভয় থেকে মুক্ত থাকতে পারিনি’।

দুঃসময়ে যে যেমন পারে নিদান নিয়ে আসে। এই ধর্ষণ মড়ক ঠেকাতে কেউ ধর্ষকের লিঙ্গ কেটে ফেলতে চাইছেন, কেউ কেমিক্যাল ক্যাসট্রেশন এর কথা বলছেন। এই প্রক্রিয়ায় কখনও কখনও কাজ হতে পারে হয়তো। তবে রোগটা যেখানে, ঠিক সেই সেখানটাতেই ওষুধটা পড়া জরুরি। এটা তো প্রমাণিত সত্য যে, এই ধর্ষকাম, আগ্রাসন, হিংস্রতা শুধুমাত্র পুরুষের লিঙ্গে তৈরি হয়নি। বরং এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষের মগজে ‘পৌরুষ’ নামে এই ধর্ষকাম আর আগ্রাসন এর বীজ বপন করেছে, তাকে যত্ন করেছে, বড় করেছে।

সেই ‘পৌরুষ’ এর ফল ভোগ করছি আমরা নারীরা। ধর্ষণকে তাই শুধুমাত্র মানসিক রোগ বলে একপাশে সরিয়ে রাখলে আর চলবে না। সময় এসেছে ধর্ষিতার থেকে ধর্ষকের দিকে মনোযোগ দেওয়ার। ধর্ষণ ও এর মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে লৈঙ্গিক সম্পর্ক ও রাজনীতি এবং পুরুষের সামগ্রিক মূল্যবোধের আলোকে। আমাদের বুঝতে হবে এই পুরুষদের মনস্তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে, তাদের চিন্তা, আচরণ এবং কল্পনাশক্তির ওপর পুরুষতন্ত্র কী ধরনের প্রতিক্রিয়া করে।

কেইট মিলেট প্রথম বলপ্রয়োগ নামে ধর্ষণ বিষয়টি আলোচনা করেন এবং দেখান যে, ‘নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলগুলোর একটি হচ্ছে ধর্ষণ’। এই যে বিশাল সংখ্যক পুরুষ, যারা প্রতিনিয়ত শিশু ও নারীদের ধর্ষণ করছে, নৃশংসতা করছে, হত্যা করছে, তা কিন্তু পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে করছে না। বরং নিজের চাহিদা মেটানোর জন্য, পরিস্থিতিকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার জন্য হিংস্রতার আশ্রয় নেওয়াটা এই পুরুষদের কাছে একটা সঠিক পদক্ষেপ এবং পৌরুষের প্রকাশ। কারণ, ধর্ষণ যতোটা না অবদমিত কামের প্রকাশ, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রকাশ নারীবিদ্বেষের।

এই ধর্ষকাম আর নারীবিদ্বেষ আমরাই তৈরি করেছি আমাদের ছেলেদের মনস্তত্ত্বে। দুটো সন্তানের ভেতরে লিঙ্গের বিভাজন তৈরি করে একজন কে বলেছি, তুমি ছেলে, তুমি পবিত্র, শক্তিশালী, তেজস্বী, উচ্ছৃঙ্খল, শৌর্যশীল, কর্তৃত্বকারী। সে দেখলো, তার ‘শিশ্ন’ নামক একটি অঙ্গ আছে যার কোনও ভয় নেই, লজ্জা নেই বরং গর্ব আছে, শৌর্য আছে। সে দেখলো শিশ্নের নাম দেওয়া হয়, খেলা করা হয়, ঘুঙুর পরানো হয়, পূজা করা হয়, অগ্রভাগের চামড়া কর্তনের উৎসব করা হয়। এর পাশাপাশি সে নিজ ঘরেই দেখেছে ‘স্ত্রীলিঙ্গের’ ভার নিয়ে মেয়েদের ভীত হয়ে, কুঁকড়ে থেকে, বিব্রত, লজ্জিত, অবাঞ্ছিত, অসহায়, অধস্তন হতে। সে জেনেছে, মেয়ে অপবিত্র, তাকে শরীর লুকিয়ে রাখতে হয়, নত হতে হয়, লজ্জাশীল হতে হয়। পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গপাঠ এভাবেই তাকে ধীরে ধীরে করে তুলে প্রবল পরাক্রমশালী পুরুষ, যার যৌনতা নির্ভর করে কেবল তার স্বাধীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ লিঙ্গের ওপর, নারী সেখানে ‘কর্ম’ মাত্র।

পুরুষতন্ত্র যৌনক্ষমতাকে সম্মানিত করেছে, পুরুষ তাকে ক্যাপিটালাইজ করেছে। এই সমাজ এমন করে পুরুষ নির্মাণ করেছে যেখানে পুরুষের সমস্ত শক্তি, বিশ্বাস, সাহস ওই একটি লিঙ্গে পড়ে থাকে। যৌনতাকে কীভাবে পৌরুষেরমূল শক্তি হিসেবে প্রকাশ করে তা পথের মোড়ে মোড়ে যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধের প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন ও বেচাকেনা দেখলেই বোঝা যায়। যে সমাজের বিজ্ঞাপনচিত্রে যৌনসক্ষমতাকে ‘আসল পুরুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যে সমাজে শান্ত ছেলেরাও ‘মাইয়ালি বা মেয়েলি’ বলে আগ্রাসী পুরুষের ঘৃণা আর র‍্যাগিং এর শিকার হয়, সে সমাজ বাই ডিফল্ট ধর্ষক তৈরির কারখানা। এখানে লিঙ্গ ফ্যাক্টর নয়, ফ্যক্টর হলো ‘পৌরুষ’; ধর্ষণ লিঙ্গ করে না, করে পৌরুষ।

ব্রাউনমিলান এর ভাষায়, ‘‘পুরুষতন্ত্র ‘পৌরুষ’কে দেখে যে মুগ্ধ চোখে, তাতে গড়ে উঠে এমন গণমনস্তত্ত্ব—যা ধর্ষণকে উৎসাহিত করে। পুরুষের মধ্যে কেউ কেউ ধর্ষণের কাজটি করে, সবাই করে না; তবে সব পুরুষই সম্ভাব্য ধর্ষণকারী’’। যে পুরুষ ধর্ষণ করে, যে ধর্ষণের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে চায়, যারা ধর্ষকদের রক্ষা করতে চায়, যারা রগরগে কাহিনী ছেপে নিউজ ভ্যালু বাড়ায়, যারা ধর্ষককে আইনি সেবা দেয়, যারা জিজ্ঞাসাবাদের নামে মেয়েটিকে বারবার ধর্ষণ করে, যারা ভিক্টিম ব্লেইমিং করে তারা সবাই তখন ধর্ষকামী পুরুষের কাতারে দাঁড়িয়ে যায়।

এভাবে মনস্তত্ত্বে পৌরুষের বড়শি গিলে আটকে যায় সাইফুল, পরিমল, বদরুল, পান্না মাস্টার, মানিক আর পুরুষতন্ত্র তাদের শিকার করে। এই পুরুষের কাছে যৌনতা যখন যুদ্ধজয়ের আবেদন তৈরি করে, তখন নারীর প্রত্যাখান বা অস্বীকার তাদের মধ্যে ভয়াবহ ইগো সংকট তৈরি করে। যেহেতু পৌরুষ হেরে যেতে শেখেনি, ‘আমি না পেলে আর কেউ পাবে না’—এই আত্মশ্লাঘা তাদের হিংস্র করে। তারা কোপায়, এসিড মারে, ধর্ষণ করে, যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে দেয়, মেরে ফেলে। এই নৃশংসতার পেছনে আত্মতৃপ্তির চেয়ে বেশি কাজ করে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, জয় করা এবং অধীনস্ত করার মনস্তত্ত্ব। যৌনতা এখানে সাফল্যের সমার্থক, যা এক সময় প্রায় জুয়া খেলায় পরিণত হয়। যৌনবৃত্তি কিংবা ভালোবাসাহীন দাম্পত্য, এসব ও ধর্ষণেরই বিভিন্ন লুকানো রূপ।

যে সমাজে ‘পৌরুষ’ মানে লজ্জাহীনতা আর রুচিহীনতার বোধ তৈরি করে সে সমাজে ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বিকৃতিও তৈরি হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই পুরুষরা নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে মূত্রত্যাগ করতে দ্বিধা করে না, প্রকাশ্যে যৌনাঙ্গে আঁচড়ায়, যৌনাঙ্গ দেখিয়ে ভয় দেখায়, বা নির্বিকার চিত্তে খালি গায়ে ঘুরে বেড়ায়, অর্ধনগ্ন হয়ে সাঁতার কাটে। লিঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের কুৎসিত উল্লাসের সৃষ্টি হয়েছে পৌরুষের ক্ষমতার কাছে নারীত্বের আত্মসমর্পন থেকে। কেবল লিঙ্গ নয়, বরং সমস্ত পৌরুষত্ব দিয়ে নারীকে ধর্ষণ করে পুরুষ। একটি মেয়েকে জোর করে, কষ্ট দিয়ে ধর্ষক যে আনন্দ পায়, মেয়েটি ব্যথায় চিৎকার করলে ধর্ষকের যে বিকৃত উল্লাস হয়, সে আনন্দ ক্ষমতার, দমননিপীড়নের। অসহায় নারী হাতে পায়ে ধরে বাঁচার আঁকুতি করবে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাবে, করুণা ভিক্ষা করে বলবে, ‘বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট, একজন একজন করে আসো’—তবেই না পৌরুষের মহান সম্মান টিকে থাকবে। নারীত্ব হেরে গেলে পৌরুষ আনন্দ পায়, জিতে যায়।

এই মড়ক থেকে রক্ষা পেতে চাইলে পুরুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই জীবাণু দূর করতে হবে, ঠিক এখানেই কাজ করতে হবে আমাদের। যে সমাজ, লিঙ্গপাঠ শিখিয়ে শিশুর দেহে পৌরুষ বপন করে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে গোড়াতেই। প্রথমেই ঘর থেকেই শুরু হোক প্রতিরোধ। আপনার ছেলেকে সন্তান হিসেবেই বড় করুন, তার মগজে পৌরুষ ভরে দেবেন না। শক্তিমান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান, হিরো ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে শিশুটির মনের ভেতরে তার ওই ছোট্ট লিঙ্গ নিয়ে কোনও ফ্যান্টাসি, ক্রেডিবিলিটি, আনন্দ অথবা ভীতি তৈরি করবেন না। এই রঙ মেয়েদের, ওই রঙ ছেলেদের, অথবা এই খেলা ছেলেদের, ওই খেলা মেয়েদের এই বিভাজনে তাকে ফেলবেন না। তাকে শক্তির সঙ্গে নয়, মানবিক বোধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। তাকে ধৈর্যশীল হতে শেখান, তার আবেগকে প্রশমিত হতে দিন।

তার ভেতরে লজ্জার বোধ তৈরি করে দিন। তাকে শিক্ষা দিন যেন সে কোনও ভাবেই নগ্নঅর্ধনগ্ন/খালি গায়ে না থাকে। না, মানে না। তাকে শেখান শিশ্ন তার শরীরের একটা অঙ্গ মাত্র, এটি নিয়ে খেলা বন্ধ করুন। যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে হিস্যু করে লিঙ্গ সুবিধা নিতে দেবেন না শিশুকে, আপনিও নিবেন না। শরীরের ব্যক্তিগত সীমানা চিনতে শেখান। ওকে বুঝিয়ে বলুন, এই ব্যক্তিগত সীমানায় অন্যের প্রবেশ নিষেধ, দরকার না হলে আপনারও। যত দ্রুত সম্ভব নিজের শরীর পরিষ্কার করার কাজ তাকে শিখিয়ে দিন। আপনার শিশুকে বলুন, বড়ছোটমাঝারি কোনও আব্বার কাছেই সে নিরাপদ নয়। আপনার সন্তানকে অভয় দিন, তার অপ্রয়োজনীয় কথাও শুনুন, তাকে প্রশ্ন করতে দিন, উত্তর দিন। বিকৃত পৌরুষকে মোকাবিলা করার সাহস আর আত্মবিশ্বাস আপনার শিশুকে আপনিই দিতে পারবেন।

মনে রাখবেন, আপনার হাতেই সে হয়তো পুরুষ হবে, নয়তো মানুষ হবে। তাই পরীক্ষা পাশের যুদ্ধের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে এই যুদ্ধ করতে হবে আপনাকে। আপনি, আমি যদি নিশ্চিত করতে পারি আমাদের সন্তান আর যাই হোক, ধর্ষক বা ধর্ষকামী হবে না, তবে এই দেশের একটি মেয়েও আর পুরুষের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকবে না। মনে রাখবেন আগে আমাদের ছেলেদের বাঁচাতে হবে এই ধর্ষকামী পৌরুষ নির্মাণের নষ্ট রাজনীতি থেকে। ছেলে বাঁচলে তবেই কন্যারা বাঁচবে।

অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। ধর্ষণ কোনোভাবেই ব্যক্তিগত বা সামাজিক ইস্যু নয়, এটা রাজনৈতিক ইস্যু। মনে রাখতে হবে ধর্ষণের উৎপত্তি শক্তিচর্চা আর লৈঙ্গিক রাজনীতি থেকে, যা নারীপুরুষের শক্তি সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। তাই যতদিন না পর্যন্ত ধর্ষণের (আবার বলি, ধর্ষণের, শুধু ধর্ষকের নয়) বিচার প্রক্রিয়ার পুরুষতান্ত্রিক ফাঁকগুলো বন্ধ করার জন্য রাজনৈতিক কমিটমেন্ট তৈরি না হবে, যতদিন পুঁজিবাদী রাজনীতিকে উপেক্ষা করে পর্নসাইট নিষিদ্ধ না করা হবে, ততদিন ধর্ষণ মহামারির প্রকোপ কমবে না। যেখানে শাজনীন ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের জন্য ট্রান্সকমের মতো প্রভাবশালী পরিবারকে এক যুগ আইনি লড়াই করতে হয়, সেখানে অতি দরিদ্র, সাধারণ পরিবার কীভাবে বিচার পাবে?

সব কিছুর পরেও সবাইকে নেমে আসতে হবে অফলাইনে, হার্ডকভারে। সামাজিক প্রতিরোধের বিকল্প নেই। পৃথিবীর সব ধর্ষক কারও না কারও ভাই, কারও স্বামী, কারও পিতা, কারও সন্তানদেশ ছাড়া, গোত্র ছাড়া, পরিবার ছাড়া তারা আসমান থেকে নাজিল হয়নি। তারা আমাদেরই আশেপাশে আছে। তাদের প্রতিহত করতে হবে সমুখেই। গণ প্রতিরোধ গড়ে কীভাবে এই দেশে ইয়াসমিন, সীমার ধর্ষণ ও হত্যার বিচার করতে বাধ্য করা হয়েছিল সে উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। তাই ধ্বংসের বার্তা নিয়ে নেমে আসি মিছিলে, কথা হোক প্রতিবাদে, পথ হোক প্রতিরোধে।

লেখক: প্রধান নির্বাহী, সংযোগ বাংলাদেশ

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ৮ নভেম্বর ২০১৬

এযে এক দুর্নিবার আকর্ষণ!

দিলরুবা শরমিন : আমরা যারা কন্যা শিশু, মেয়ে, নারী বা মহিলাতারা কিন্তু কোনো না কোনোভাবে জীবনের শুরু থেকেই শারীরিক, মানসিক, সামাজিকভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েই যাচ্ছি। এই কাজটি প্রথম শুরু হয় পরিবার থেকে (কেউ স্বীকার করুক বা নাই করুক)।তারপর ধীরে ধীরে এটা আমাদেরকে ঘিরে ফেলে সকল দিক থেকে। আর আমরা মেনেও নিই।

সামান্য একটু আধটু অনাকাঙ্খিত স্পর্শকে আমরা আমলে নিই না। তাই এই সামান্য স্পর্শ এক সময়ে তার নিজস্ব মাত্রা হারায়। পুরুষ ধর্ষণ করে বটে কিন্তু তার এই লালসা নিভৃত বা প্রতিহত করার জন্যে আমরা কি করি? অন্যায় ও অনাকাঙ্খিতভাবে যখন আমাদের শরীর কোনো পুরুষ স্পর্শ করে আমরা কি সেটা আমাদের পরিবার বা কাছের মানুষদের জানাই? জানালে তারা কি আমাদেরকে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে আসে? আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিবাদ করে? নাকি আমাদেরকেই নিভৃত করে এটা যেন আর কোথাও না বলিএই কড়া শাসনে?

তাই একদিন ধীরে ধীরে এই মাত্রা ছাড়িয়ে ঘর থেকে বাইরেগ্রাম থেকে শহরেলোক থেকে লোকান্তরে! একে থামাবে কে? এ যে এক দূর্নিবার আকর্ষণ! একজন নারীর শরীর তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে ভোগ করার মাঝে যে দখলবাজ মন মানসিকতা লুকিয়ে আছে এর চেয়ে তৃপ্তি আর কিসে আছে? আজকাল গণমাধ্যমের কল্যাণে আসলেই আমরা যা দেখি বা পড়ি তা সংখ্যায় যতই হোকতারপরও যৎসামান্য! তবে ধর্ষণের ধরন বা প্যার্টান বদলেছেএটা বলতে পারি। কারণ দিনে দিনে নানাভাবে আমাদের মানসিক বিকৃতির পরিধি বদলেছে কিনা তাই! কিন্তু আমাদের প্রতিবাদের ভাষা? আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের বন্ধন, সংকল্প, একের প্রতি অন্যের সহানুভূতি, সহমর্মিতা! সবচেয়ে বড় কথা আমরা ধর্ষণকেই একটি স্বাভাবিক বিষয় বলে মেনে নিয়েছি। এত আইন দিয়ে কি হবে? অথবা ধর্ষণের পর পুরুষ চিকিৎসক দিয়ে পরীক্ষা? বা ট্রাইব্যুনালগুলিতে কেবল পুরুষ সরকারি আইনজীবী নিয়োগ? এইগুলি কি আদৌ কারো মাথায় নাই? আমি তো প্রমাণ দিয়ে বলতে পারি ধর্ষণের শিকার মেয়েটি বার বার ধর্ষিত হয় ঘরেবাইরে–চিকিৎসালয়েআদালতে। কেউ কি আছেন আমার এই কথাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন???

লেখক : আইনজীবী

সূত্রঃ পরবর্তন, ৬ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: