প্রথম পাতা > কবিতা, জীবনী, বাংলাদেশ > সোনালী কাবিনের কবি আল মাহমুদ

সোনালী কাবিনের কবি আল মাহমুদ

নভেম্বর 4, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

সাইফুদ্দিন সাইফুল : বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য অনন্য অপার বিরল সৃষ্টি কালজয়ী কাব্য সোনালী কাবিনের স্রষ্টা বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভাবান ও শক্তিমান কবি এবং এক প্রবাদতুল্য অনিবার্য কিংবদন্তির নাম আল মাহমুদ। প্রথমেই কবি আল মাহমুদ সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে বলতে হয় যে, সমকালীন বাংলা সাহিত্যাকাশে তার সমতুল্য মেলা ভার। বিগত কয়েক দশক বাংলা কবিতা যার হাত ধরে আজ চরম উৎকৃষ্ট ও উন্নত শিখড়ে অবস্থান করছে তিনি কবি আল মাহমুদ। বাংলা কবিতাকে নতুন রূপে নতুন ভাবে নতুন আঙ্গিকে চিত্রকল্পের রঙে রাঙিয়ে নতুন ধারায় আধুনিকতার পরশে নির্মাণ করেছেন কবিদের কবি কবিতার নাবিক শব্দশ্রমিক আমাদের প্রিয় কবি আল মাহমুদ। সত্য যে, তিনি কবিতার সোনার চামচ মুখে নিয়ে এই বাংলায় জন্মেছেন। কবিতার সঙ্গেই গড়ে তুলেছেন একান্তে ঘরসংসার। তিনি বলেছেন– ‘কবিতা আমার জীবন।

অবশ্য কবি আল মাহমুদ শুধুমাত্র কবি হিসেবেই নয়, তিনি একাধারে একজন শক্তিমান গাল্পিক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। সাহিত্যের অনেক শাখাতেই তার অবাধ বিচরণ। তার সৃষ্টির পরিধি সাহিত্যের বিশাল এলাকা জুড়ে। কিন্তু এত কিছু ছাড়িয়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন কবি এবং শুধুই কবি। একথা বলতে পারি যে, বাংলা কবিতা মানেই আল মাহমুদ, আর আল মাহমুদ মানেই বাংলা কবিতা। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিমউদদীন এবং জীবনানন্দ দাশের পরে বাংলা কবিতায় হাতেগোনা যে কজন কবির নাম বারবার ঘুরে ফিরে আমাদের সামনে আসে তার মধ্যে আল মাহমুদ অন্যতম প্রধান কবি। কেননা, আল মাহমুদের নিপুণ হাতের জাদুর ছোঁয়ায় কলমের কালিতে বাংলা কবিতা যেন একটা একটা নক্ষত্রের মতো কাব্যাকাশে ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে। আল মাহমুদ একজন কবি হিসেবে নিজের চিন্তাচেতনা, ভাব, রূপরসগন্ধ, ছন্দতাল, বোধ, আবেগ, অনুভূতি ও ইচ্ছা শক্তি দ্বারা বাংলা কবিতাকে করে তুলেছে দীপ্তমান, বৈচিত্র্যময় ও সৃজনশীলতার এক সৌন্দর্যের অরণ্যভূমি। একজন কবি হয়ে তাই তিনি চরম সফলতার মানদন্ডে জয়লাভ করেছেন। কাব্যজগতে যে নতুনের ভাবধারা ভাষা তিনি সৃষ্টি করেছেন, তার সমসাময়িক (৫০ দশকে) সময়ে অন্য অনেক কবি তা করে উঠতে পারেনি। কবি আল মাহমুদ তার কবিতায় সাধারণত আঞ্চলিক শব্দের সমাহার ঘটান এবং আধুনিক বাংলা ভাষার ভেতরে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করে কবিতা নির্মাণ করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন– ‘আঞ্চলিক ভাষা মানেই হলো জীবন্ত ভাষা।কবিতাকে তিনি সত্যি আধুনিকতার রঙে রাঙিয়ে প্রকৃত কবিতা করে তুলেছেন। তিনি বাংলা কবিতার মহানায়ক। বাংলা কবিতায় কাব্যরাজা হয়ে তিনি বাংলা কবিতাকে কাব্যময় শিল্পময় পাঠক প্রিয়তা করেছেন।

আমরা যারা কবি আল মাহমুদকে কবিতা পাঠ করি তারা জানি যে, ১৯৫৪ সাল থেকে তার তুরুণ বয়সে লেখা কবিতা ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। আর তখন থেকেই তার কবি নাম ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। এবং কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতানামক সাহিত্য কাগজে লেখা প্রকাশ হলে কবি মহলে আল মাহমুদকে নিয়ে আলোচনা হতে থাকে। সেই থেকে বাংলা সাহিত্যাকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিশেষ করে আধুনিক বাংলা কবিতার ভুবনে সুনিপুণ শক্তিমান কবি হিসেবে এখন পর্যন্ত বাংলা কবিতাকে সুনির্মাণ করে চলেছেন কবি আল মাহমুদ। একথা আজ সর্বজনবিদিত যে, কবি আল মাহমুদ তিনি তার অশেষ অপার বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল হাতে বাংলা কবিতাকে বহালদর্পে শাসন করছেন। এবং দক্ষ কারিগর হয়ে কবিতা তৈরি করে আসছেন। একজন ভালো ও বোদ্ধাপাঠক এবং সমালোচক (যারা বাংলা কবিতার পাঠক কিংবা খোঁজখবর রাখেন) মাত্রই জানেন যে, কবি হিসেবে আল মাহমুদ বাংলা কবিতার জগতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও দিকপালের মতো বড় একটা অংশ এককভাবে দখল করে আছেন। আমরা দেখি যে, বাংলা কবিতার আকাশে কালজয়ী সৃষ্টি সোনালী কাবিনকাব্যগ্রন্থটি কবি আল মাহমুদকে সত্যিকারার্থে অন্যতম প্রতিভাবান প্রতিশ্রুতিশীল প্রজ্ঞাবান, সৃজনশীল এবং শ্রেষ্ঠরূপকার কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কেননা, ‘সোনালী কাবিনকবি আল মাহমুদকে কাল থেকে কালান্তরে যুগ থেকে যুগান্তরে অতীত থেকে বর্তমানে আর বর্তমান থেকে সুন্দর আগামীতেও বহমান খরস্রোতা নদীর মতো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। এই জন্য বলতে পারি যে, কবি আল মাহমুদের অপার সৃষ্টি সোনালী কাবিনলেখার পরে তিনি যদি আর কোনো কবিতা নাও লিখতেন তবুও তিনি বাংলা কাব্যকাশে অমর অক্ষয় এবং চির ভাস্মর হয়ে জাগ্রত থাকতেন ও থাকবেন। এই সোনালী কাবিনের জন্যই কবি মানুষ ও সমাজের কাছে, পাঠক ও কালের কাছে শতাব্দী থেকে শতাব্দীকাল বেঁচে থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সোনালী কাবিনসম্পর্কে কবি আল মাহমুদ বলেছেন সোনালী কাবিন নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেও আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওর ইশারা ইঙ্গিত কোনো দৈব কারণে হয়তো উচ্ছাসিত হয়ে উঠেছে। অবশ্য আমি এটি বুঝি সোনালী কাবিনআমার রচনার মধ্যে প্রিয় কবিতা হয়ত বা। সোনালী কাবিনলিখে আমি মনে করেছি যে আমি এক ধরনের স্বার্থকতায় পৌঁছেছি। এটি আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সোনালী কাবিনের শব্দগুলো আমি এ মাটির গন্ধ থেকেই আহরণ করেছি, ব্যবহার করেছি। ভাটি বাংলার মানুষের মুখের ভাষাকে আমি কাব্যের আধুনিকতায় জাগিয়ে দিতে চেয়েছি, এবং দিয়েছি। যা সোনালী কাবিনধরে রেখেছে তার বুকে।

আসলে সোনালী কাবিন কবিতার মধ্য দিয়ে কবি বাংলা কাব্যজগতে নিজস্ব এক বলয় সৃষ্টি করেছেন। যেখানে বাংলা কবিতাকে নতুন করে চেনা যায়, নতুন ভাবে দেখা যায়, নতুন রসে রসাদ্বন করা যায় এবং নতুন ভাষায় আঙ্গিকে উপলব্ধিও করা যায়। এখানেই কবি আল মাহমুদ অনন্য এবং অন্যতম। আর তাই বর্তমানে আধুনিক সৃজন ও মনন এবং স্বাদেশিকাতার আদলে রাঙানো শিল্পবোধ ও কবিতার নির্মাণ শৈলী কবিতার রূপ রস ছন্দ গন্ধ ভাব ভাষা সবকিছু মিলে কবি আল মাহমুদকে এক বিরাট মহাকায় রূপে তৈরি করেছে।

একজন কবি মূলত পৃথিবীর মধ্যে অন্যদের চেয়ে বড় প্রেমিক এবং বিশ্বাসী। আর সেই প্রেম ও বিশ্বাসের জায়গা থেকে গভীর মনে কবি আল মাহমুদ সোনালী কাবিনে বলে উঠেছেন

সোনার দিনার নেই দেনমোহর চেয়ো না হরিণী

যদি নাও দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দুটি

ভালোবাসা দাও যদি আমি দেবো আমার চুম্বন

ছলনা জানি না বলে আর কোনো ব্যবসা শিখিনি।

সত্যি যে, এমন ভালোবাসা সত্য দৃঢ় কথা কজনই বলতে পারে? কিন্তু একজন কবিই অকপটে তা বলতে পারে। কেননা কবি হয় প্রেমের কান্ডারি সত্যের সাধক ও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। আর তাই কবির হাত দুটি কোনো স্বার্থ ছাড়াই সব চাইতে বিশ্বাসী, এখানে কবি প্রেমিকার জন্য কোনো ছলনা ছলচাতুরী ধোকা ভন্ডামি চালাকি প্রতারণা বিশ্বাসঘাতকতা তিল পরিমাণ করে না, করতে পারে না। তাই কবি জীবনে প্রেম ভালোবাসা বিশ্বাস ছাড়া কোনো স্বার্থপরতার ব্যবসা শিখতে পারে না। এখানেই কবি আলাদা সত্তা রূপে দিব্য প্রকাশ।

কবির মননে ও চিন্তায় বাউল সম্রাট ফকির লালনের উপস্থিতি আমরা টের পাই তার সোনালী কাবিনের কয়েকটি পঙক্তিতে। এখানে কবি তার মনের প্রিয় মানবীকে বাউলের এক তারার সঙ্গে তুলনা করে নিজে হতে চেয়েছেন একজন সত্যিকারের প্রেমিক তরুণ লালন। এক তারার সাথে একজন বাউলের কিংবা লালনের আসলে সম্পর্কটা কি এবং কতটা সেই প্রেমময় সুধাময় গভীরতা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কবি তাই প্রেয়সীকে একতারায় বেঁধে নিজে ভাবুক দরিদ্র বাউল সেজে গেয়ে উঠেছেন

এর চেয়ে ভালো নয় হয়ে যাওয়া দরিদ্র বাউল

আরশী নগরে খোঁজা বাস করে পড়শী যে জন

আমার মাথায় আজ চুড়ো করে বেঁধে দাও চুল

তুমি হও একতারা, আমি এক তরুণ লালন।

কাব্যচর্চা মূলত সুন্দর ও নন্দনচর্চা। আর তাই সাহিত্যে অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে কাব্যচর্চা অত্যন্ত সৃজনশীল শিল্পময় কিন্তু ঢের কঠিন। যদিও কবিতা সৃজনশীল মননশীলতার বহিঃপ্রকাশ। এ বিষয়ে কবি আল মাহমুদ বলেছেন– ‘কাব্য সহজ শিল্প নয়। কারণ কাব্য হলো ভাষারই অমরতার সোপানে আরোহণের বর্ণনা মাত্র। সবাই পারে না। কেউ কেউ পারে। আমরা তাদেরই একবাক্যে বলে উঠি এইতো কবি।কবি আল মাহমুদের কবিতায় উপমা প্রতীক ও চিত্রকল্প দেখে অবাক হতে হয়। এসব সমন্বয়ে কবি তার কবিতায় নারী, নদী ও পাখিকে বারংবার তুলে ধরেছেন। তার কবিতায় মাটি মানুষ জীবন নদী নারী আর প্রকৃতির নিবিড় সানি্নধ্য গভীরভাবে স্থান পেয়েছে। সত্যি কথা কি! তিনি নারীকে নদীকে এবং পাখিকে করে তুলেছেন কবিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু তাই নয়, কবি প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি সৌন্দর্য কবিতার পরতে পরতে রূপ দিয়েছেন। তার কবিতা পাঠ করলে নারীকে নতুন রূপে, নদীকে পাখিকে অন্যভাবে এবং এই সবুজ প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আকারে চেনা যায় ও জানা যায়। তার কবিতা খুব সহজেই পাঠককে নিবির করে কাছে টানে, অন্য এক আলাদা জগতে আপন মহিমায় নিয়ে যায়; কবিতার নতুন রসে আচ্ছাদন করে রাখে। পাশাপাশি তার কবিতায় প্রেম আছে, বিরহ আছে, না পাওয়ার যন্ত্রণা আছে, রাজনীতি আছে, দ্রোহের কথা আছে_ আর আছে সুন্দর সুস্থ সমাজ নির্মাণ ও পরিবর্তনের কথা। আবার তার কবিতায় সত্য ন্যায় সততা সাম্য মানবতাবোধ ও সহমর্মিতাবোধ জোড়ালোভাবে ফুটে উঠেছে। এখানেই কবি আল মাহমুদের কবিতা হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় মানবিকতার প্রেমময় ভাবের মাতাল তরণী। তিনি বলেছেন– ‘আমার রচনায় শুধু প্রেম নয়, বরং মানবিক ভালোবাসার বিজয় হয়েছে।একথাটি কবি তার নিজের লেখা সম্পর্কে একেবারে সত্যিটাই ব্যক্ত করেছেন।

এই লেখালেখি নিয়ে বলতে গিয়ে কবি আল মাহমুদ বলেছেন– ‘আমি যখনই কিছু লিখেছি সেটি আমার হৃদয়ের অনুপ্রেরণা এবং একই সঙ্গে মস্তিস্কের উন্মাদনা মিশিয়ে সৃষ্টি করেছি। এ সৃষ্টির কোনো তুলনা দেয়া অসম্ভব।এই কথার মধ্যদিয় কবি সকল কবির মনের চরম অভিব্যক্তিকেই পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। আসলে একজন কবি যখন কোনো কিছু লেখেন তখন সেটি তার একান্তে মনের অনুপ্রেরণারই প্রকাশ এবং আপন মস্তিস্কের সৃজনশীলতার উন্মাদনার অপার শিল্পময় সৃষ্টি। আর কবির এই সৃষ্টিকে পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়ে তুলনা দেয়া একেবারে কঠিন ও অসম্ভব। একজন সত্যিকারের কবি তার সৃষ্টি কবিতায় মানুষের কথা, জীবনের কথা, দেশের কথা, সুখদুঃখের কথা, সত্যন্যায়আদর্শের কথা, চেতনাবিশ্বাসের কথা, সংস্কৃতিঐতিহ্যের কথা, প্রকৃতির কথা, মহান স্রষ্টার মহিমার কথা তুলে ধরে। এই সমাজে বিদ্যমান অন্যায়অত্যাচারজুলুমনির্যাতননিপিড়নের বিরুদ্ধে, অপসংস্কৃতিবেহালীপনার বিপক্ষে, ছোটবড় বৈষম্য ভেদাভেদের বিরুদ্ধে এমনকি যত অনিয়ম দুর্নীতি লুটপাট অগণতান্ত্রিক নষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে একজন কবির কবিতা হয়ে ওঠে চরম বিদ্রোহের হাতিয়ার। কবি তাই বাধাহীন বিপ্লবী লড়াকু সৈনিক হয়ে কবিতাকে শব্দে শব্দে গেঁথে প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করে।

এই দিকটা দেখলে দেখা যায় যে, কবি আল মাহমুদ তিনি নিজেও একজন দক্ষ শব্দশ্রমিকের মতো কবিতা নির্মাণের মাধ্যমে সকল অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সতত আলোকিত পথে ছুটে চলেছেন। আর তাই তার কবিতায় স্বপ্ন আছে, আবেগ আছে, প্রেম আছে, আছে সুখের অনুভূতি, আছে সুন্দরের জয়গান, আছে আনন্দের মহিমতা। এছাড়া তার কবিতার পরতে পরতে আলাদা রকমের গন্ধ পাওয়া যায়, নতুন সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখা যায়, অন্য রসে অন্য রঙে অন্য ঢঙে অন্য বোধে অন্য আবেদনে সুর খুঁজে পাওয়া যায়। এবং একজন পাঠকের সঙ্গে তার কবিতার অন্তরঙ্গ প্রেমের ভাবের মিলন ঘটে। কবিতা কি এ প্রসঙ্গে কবি আল মাহমুদ বলেছেন একটি কবিতা তখনই কবিতা হবে, কবিতা পড়ে হৃদয় তৃপ্ত হবে, বারবার পড়তে ইচ্ছে করবে এবং স্মৃতিতে গেঁথে যাবে। আমিতো তাকেই কবিতা বলি।

আমরা দেখতে পাই আমাদের বাংলা সাহিত্যে চিরাচরিত কালজয়ী উপাখ্যান হিসেবে সাক্ষী হয়ে আছে বেহুলালখিন্দরের অমর প্রেমের কাহিনী। এখানে পতিভক্তির প্রতি এক নারীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা স্মরণ করে দেয়। জীবনের সকল মায়াকে তুচ্ছজ্ঞান করে প্রিয়তম স্বামীর সাপে কাটা জীবন রক্ষার্থে সকল বাধা উপেক্ষা করে একা এক অসহায় সতী নারীর আপ্রাণ চেষ্টা একজন কবির হৃয়দকে কতখানি উদ্বেলিত আবেগতাড়িত করে তুলতে পারে তারই প্রতিচ্ছবি কবি আল মাহমুদ তার সোনালী কাবিন কবিতায় এভাবে তুলে ধরেছেন।

বিষের আতপে নীল প্রাণাধার করে থরো ধরো

আমারে উঠিয়ে নাও হে বেহুলা, শরীরে তোমার

প্রবল বাহুতে বেঁধে এ গতর ধরো, সতী ধরে

তোমার ভাসানে শোবে দেবদ্রোহী ভাটির কুমার।

আমরা জানি যে, পাঠক নন্দিত যুগস্রষ্টা মৌলিক কবি আল মাহমুদ তিনি কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য ও গবেষণামূলক রচনাও অনেক লিখেছেন। এক্ষেত্রে তিনি গল্পে উপন্যাসে শিশুসাহিত্যে ও প্রবন্ধে ইত্যাদি বিষয়ে কতটা সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছেন অথবা সফতার অর্জন করেছেন তা এখানে বলাটা হয়তো সম্ভব নয়, তবে এসব ছাড়িয়ে তিনি অনেক অনেক বেশি সফলতা অর্জন করেছেন কবিতায়। একমাত্র কবিতাই তাকে করে তুলেছে কবিতার বরপুত্র। বাংলা কবিতায় তিনি এক কাঙ্ক্ষিত অঘোষিত শক্তিমান ক্ষমতাধর সম্রাট। এই জন্য কবিতাকে ভালোবেসে তিনি হয়ে উঠেছেন নমস্য। এখানে ব্যক্তি আল মাহমুদ আরাধ্য বা পূজনীয় নয়, কবি আল মাহমুদ আমাদের আরাধ্য। সাধারণত একজন বিজ্ঞানী স্রষ্টা, পক্ষান্তরে একজন কবি তিনি স্রষ্টা ও দ্রষ্টা। কবি যেমন সৃষ্টি করেন তেমনি আবার নিবিড়ভাবে সব কিছুকে দেখতে পান। কবির থাকে অন্তর্নিহীত দিব্য চোখ। কবির সৃষ্টি যেমন শিল্পময় অপার তেমনি তার দেখার পরিধি আকাশের সীমানা পেরিয়ে অনেক দূরে পৌঁছে যায়। একজন কবি এভাবেই তার কবিতায় সকল দ্বার খুলে দেন। কবি আল মাহমুদ ঠিক এমনই একজন কবি। আমরা জোর গলায় বলতে পারি মানুষের মরণ হয়, কবির মৃত্যু হয় না, ব্যক্তির হয় পরাজয়; আর কবি চির অপরাজেয়।
কেননা, একজন কবি সব সময় মানুষের পক্ষে থাকে মানুষের কল্যাণের কথা ভাবে এবং তা লেখায় প্রকাশও করেন। কবি সবকালে সবদেশে সবখানে মানুষের পক্ষে, মানুষের অধিকারের পক্ষে, সুষম বণ্টনের মাধ্যমে মানবধর্মের জয়গান গেয়ে থাকে। কবি এই জন্য বলেছন

আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন

পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণির উচ্ছেদ

এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ

যেনো না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।

এখানে কবি শুধু কবি থাকে না কবি হয়ে ওঠেন সাধারণ থেকে একেবারে অন্যরকম অসাধারণ এক বিপ্লবী সত্তা। যার হৃদয় ভরে থাকে সাম্যময় সুষম বণ্টনের অপার স্বপ্ন। সমাজে শ্রেণি সমাজে মানবজীবনে বৈষম্য সৃষ্টি করে মানুষের অধিকারকে ভেদাভেদের দেয়াল টেনে জাতপাতের পার্থক্য তৈরি করে। একজন কবি এসব ভেদাভেদের তোয়াক্কা না করে শ্রেণি উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে ফসলের সুষম বণ্টন দ্বারা প্রেমের কথা উচ্চারণের জয়গান গেয়েছেন।

কবি আল মাহমুদ সত্যিই বলেছেন, ‘পরাজিত হয় না কবিরা।আসলে একজন প্রকৃত কবিকে, মানুষের কবিকে, নদীর কবিকে, ফুলের কবিকে, প্রকৃতির কবিকে, বৃক্ষের কবিকে, পাখিদের কবিকে, সুন্দরের কবিকে, নীলাকাশের কবিকে গাঙচিলশরতের কবিকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যায় না, তাকে শত ষড়যন্ত্র চেষ্টাতে পরাজিত করা যায় না।

কবির দীর্ঘদিনের ইচ্ছা বাংলা ভাষায় একটি মহাকাব্য লেখা। বাংলা সাহিত্যে বর্তমান কালে কোনো লেখক বা কবি মহাকাব্য লেখার সাহস তেমন একটা দেখায় না। কিন্তু কবি আল মাহমুদ অবশ্য ইতোমধ্যে তিনি তার মহাকাব্য লেখাটি শুরু করেছেন। এই মহাকাব্যটির নামও দিয়েছেন এ গল্পের মেষ নেই শুরুও ছিল না।আমরা জানি যে, মহাকাব্য রচনা করা খুবই কষ্টকর ও কঠিন কাজ। তারপরেও কবি এই বয়সে এসে মহাকাব্য লেখায় হাত দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কতটা তা করতে পারবেন একমাত্র সময়ই বলে দেবে। তবে আমরা আশা করব তিনি যেন তার জীবদ্দশায় মহাকাব্যটি লিখে যেতে পারেন। তাহলে যারপরনায় বাংলা সাহিত্য উপকৃত ও সমৃদ্ধ হবে এবং বাংলা ভাষার পাঠকেরা নতুন চিন্তা ভাব ছন্দ রস রূপ ভাষা ও লেখার সহিত পরিচিত হতে পারবে।

কবি আল মাহমুদ ১১ জুলাই ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মীর আবদুর রব এবং মাতার নাম রওশন আরা মীর। স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগমকে নিয়ে তার সংসার। কবি ব্যক্তিগত জীবনে ৫ পুত্র ও ৩ কন্যার জনক।

বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলাকাব্যে অনবদ্য বহুমাত্রিকতার সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কবি আল মাহমুদ দেশের জাতীয় পদকসহ বেশ কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। যেমন, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮), একুশে পদক (১৯৮৬), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার (১৪০৯), লেখিকা সংঘ পুরস্কার, হরফ সাহিত্য পুরস্কার (১৪০৯), অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার (১৪০৯), সুফী মোতাহার হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক এবং ভানুসিংহ সম্মাননা পদক (২০০৪) ইত্যাদি পুরস্কার কৃতিত্ব স্বরূপ অর্জন করেছেন।
এ পর্যন্ত কবি আল মাহমুদের প্রায় নব্বইটির মতো গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। পাঠকের জানার স্বার্থে এখানে কযেকটি গ্রন্থের নামের তালিকা তুলে ধরা হলো। যেমন, বিরামপুরের যাত্রী (কবিতা/২০০৪), বারুদগন্ধী মানুষের দেশ (কবিতা/২০০৬), কলংকিনী জ্যোতির্বলয় (গল্প/২০০৭), গন্ধ বণিক (গল্প/২০০০), সৌরভের কাছে পরাজিত (গল্প/১৯৮৩), চেহারার চতুরঙ্গ (উপন্যাস/২০০১), কাবিলের বোন (উপন্যাস/১৯৯৩), যেভাবে বেড়ে উঠি (আত্মজীবনী/১৯৯৭), তুমি তৃষ্ণা তুমিই পিপাসার জল (কবিতা/২০০৭), আল মাহমুদের গালগল্প (গল্প/২০০৬), কবির আত্মবিশ্বাস (প্রবন্ধ/১৯৯১), লোক লোকান্তর (কবিতা), কালের কলস (কবিতা), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (কবিতা), অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না (কবিতা), বখতিয়ারের ঘোড়া (কবিতা) ও পানকৌড়ির রক্ত (গল্প/১৯৭৫) ইত্যাদি।

পরিশেষে বাংলা কবিতার শক্তিমান ও অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কাব্যভান্ডার শতাব্দী থেকে শতাব্দীকাল দীপ্ত আলো ছড়াক এবং বাংলা সাহিত্যকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করুক অন্তরে এই দীর্ঘ কামনা।

সূত্রঃ দৈনিক যায় যায় দিন, ৪ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: