প্রথম পাতা > জীবনী, সমাজ, সাহিত্য > লেভ তলস্তয়ের ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’ গল্প

লেভ তলস্তয়ের ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’ গল্প

নভেম্বর 4, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

death-of-ivanহানযালা হান : লেভ তলস্তয়ের (জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৮২৮, মৃত্যু ৭ নভেম্বর ১৯১০) ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’ গল্পের শুরুটা একেবারে সাদামাটা। অন্য হাজারটা গল্প যেমন শুরু হয়, এ থেকে খুব বেশি ভিন্ন নয়। কিন্তু আপাতসাধারণভাবে শুরু এই গল্পের আড়ালে তলস্তয় মানবজীবনের গভীর সত্য তুলে ধরেছেন।

তলস্তয় লিখেছেন, ‘ইভান ইলিচের জীবন কাহিনী খুবই সহজ, খুবই সাধারণ এবং খুবই ভয়াবহ।’ এই ভয়াবহ শব্দটা যে মূল রুশে কী, তা আমার জানা নেই। তবে এটা বলতে পারি, এই একটা শব্দ দিয়ে লেখক জীবনের হাহাকারের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের বেশির ভাগ মানুষের জীবন খুবই সহজ ও সাধারণ। দুএকটা জটিলতা হয়তো আছে। কিন্তু ভয়াবহ জিনিসটা কী? হ্যাঁ, এটা সবার জীবনে ঘটে। একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ কিছু আর আছে কি? এই মৃত্যু, রোগে ভুগে মৃত্যু, ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু, অপেক্ষা করে মৃত্যু, করুণার পাত্র হয়ে মৃত্যু, এড়াতে না পেরে মৃত্যু, বাধ্যগত মৃত্যু ও যন্ত্রণার মৃত্যু। এ যে কতটা ভয়াবহ, যে মরে সে বুঝতে পারে, যেমন বুঝতে পেরেছেন ইভান ইলিচ। তাঁরই বর্ণনা এ বই।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়া সরকারের এক কর্মকর্তার ছেলে ইভান। সরকারি আইন কলেজ থেকে স্নাতক। পেশা হিসেবেও আইন বেছে নেন। পদোন্নতি পেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হন। অন্য সবার মতো একঘেয়ে হয়ে আসা জীবনটা সাবলীল করতে বিয়ে করেন। প্রথম প্রথম দিনগুলো কাটছিল আনন্দে। নতুন পরিস্থিতি, দাম্পত্যসোহাগ, নতুন আসবাবপত্র, নতুন বাসনকোসন, নতুন জামাকাপড়, স্ত্রীর প্রথম সন্তান ধারণ—এ সবই কাটল খুব আনন্দে। বাস্তবে এতটা ভালো কাটল যে অন্য সবার মতো তিনি ভাবতে লাগলেন, ‘খাসা, নিরুদ্বেগ, হাসিখুশি এবং সর্বদাই সভ্যভব্য ও সমাজঅনুমোদিত জীবনের পথে বিয়েটা কোনো বাধাই নয়, বরং সহায়।’ হ্যাঁ, এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। এর পরই শুরু হয় বিপত্তি। স্ত্রীর মধ্যে শুরু হলো অস্বাভাবিকতা। ইভান এটা সহ্য করতে পারতেন না, ‘একেবারে অকারণে ঈর্ষা করতে লাগলেন তাঁকে, জিদ ধরতেন তাঁর মনোযোগ কাড়তে, যা কিছু ইভান ইলিচ করেন তাতে খুঁত ধরা আরম্ভ হলো, শুরু হলো স্থূলঅপ্রীতিকর তুলকালাম কাণ্ড।’ এই জীবনও প্রীতিকর হলো না। তত দিনে তাঁর মেয়ে বড় হয়ে গেছে।

এবার কৌশল হিসেবে চাকরিতে পদোন্নতি নিলেন। বিশাল একটা বাড়ি কিনলেন। আরো সচ্ছল জীবনযাপন শুরু হলো। প্রথম কিছুদিন এখানেও স্বাচ্ছন্দ্যে কাটল। কিন্তু কিছুদিন পর তাঁর মনে হলো, যেমন অন্য মানুষদের হয়, আরো ভালো রোজগার করতে পারলে আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা যেত। বাসায় আরেকটা কক্ষ থাকলে আরো ভালো হতো। তার পরও দিনগুলো কাটছিল ভালোই। ঘর সাজাচ্ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে সামান্য বিষয়ে মনোমালিন্য হলে তা মিটিয়ে ফেলতেন। থাকতেন খোশমেজাজে। আনন্দে অন্যদের মতোই তাঁর মনে হয়েছে, জীবন পূর্ণ হয়ে উঠছে।

ঘড়ির কাঁটায় সময় মেপে তাঁর দিন চলত। ঘুম থেকে উঠতেন সকাল ৯টায়, কফি খেতেন, খবরের কাগজ পড়তেন, পোশাক পরে আদালতে যেতেন। এরপর এসে ঘটনার বর্ণনায় তলস্তয় লিখেছেন, ‘সেখানে তাঁর জন্য প্রস্তুত দৈনন্দিন কাজের জোয়ালে সহজে ঘাড় পেতে দিতেন।’ এই বাক্যটা, হ্যাঁ, এই বাক্যটা পড়ে মুহূর্তে আমি নড়ে উঠেছিলাম। এর চাপটা নিতে পারছিলাম না। সত্যি, প্রতিদিন এই আমাকে কাজের জোয়ালে ঘাড় পেতে দিতে হয়। জোয়াল টানা কী যে কষ্টের, তা জানে কেবল গরু বা ঘোড়া—যেসব নিরীহ প্রাণী টানার কাজটা করে। এই টেনে যাওয়ায় নিজের কোনো লাভক্ষতি নেই। কেবল মালিকের নির্দেশ পালন। তার পণ্য পরিবহন অথবা কৃষিকাজ অথবা ঘানি টানা। বিনিময়ে খাবার হিসেবে সামান্য খড়বিচালি—এই সব। আর কিছু না। কোনো সঞ্চয় নেই। নেই কোনো ভবিষ্যৎ। দিন এনে দিন খাওয়া। উল্টো সামান্য ভুল হলে শাস্তি, সেও কম ভয়ের না, কম যন্ত্রণার না।

জোয়ালে ঘাড় পেতে দেওয়ার এই চাপে প্রথম যেদিন পড়ি, সেদিন আমি স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না। মনে পড়ে, স্পষ্ট মনে পড়ে, অকারণে এক নিরানন্দ আমাকে ঘিরে ধরেছিল। আমি সেদিন এক ঘণ্টা দৌড়িয়েছি। সাধারণত রাতে আমি এক ঘণ্টা হাঁটি। আট বছর ধরে এ আমার অভ্যাস। না হাঁটলে অসুস্থ বোধ করি। সেদিন থেকে শুরু হয়েছে দৌড়ানো। এখনো প্রতি রাতে আমি দৌড়াই। আর দেখি, ইভান ইলিচ মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছেন। একা, একলা, একাকী। তাঁর স্ত্রীসন্তানের সময় নেই পাশে থাকার। বন্ধু বা সহকর্মী হয়তো আছে। কিন্তু তাঁদের যথেষ্ট সময়ের অভাব।

মাত্র ৪৫ বছর বয়স। খুব বেশি না, কিন্তু তাতে কী? শেষ পর্যন্ত ইভান ইলিচ মারা গেলেন। হ্যাঁ, এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। এর তো অন্যথা হওয়ার কথা না। এখানেই গল্পের শেষ। কিন্তু তলস্তয় উপন্যাস শুরু করেছেন এখান থেকেই। ইভান ইলিচের মৃত্যুর খবর পত্রিকায় বেরিয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা মারা গেলে যেমনটা হয়, তেমনি। সেই খবর পড়ছেন তাঁর এক সহকর্মী, আদালতে। অন্যদের মধ্যে কেউ কেউ এ খবর শুনছে। কিন্তু এতে তাদের সাপ্তাহিক ব্রিজ খেলায় বিঘ্ন ঘটছে।

এরই মধ্যে এক সহকর্মী পিওতর ইভানোভিচের কাছে আসেন ইভানের বিধবা স্ত্রী প্রাস্কোভিয়া ফিওদরভনা। পেনশনের টাকাটা দ্রুত পাওয়া যায় কি না, ভাতাটা বাড়ানো যায় কি না—তাঁরা এসব নিয়ে আলোচনা করেন। পিওতর চেষ্টা চালানোর কথা দেন। এরপর তলস্তয় ইভানের জীবনকাহিনী বর্ণনা করেছেন।

এই আপাতসরল কাহিনীর আড়ালে তলস্তয় বলছেন আরেকটি গল্প। সমালোচকরা মনে করেন, এই গল্পের মূল কথা হচ্ছে পাপ ও পাপমুক্তি। সেটা কিভাবে? ইভান মূলত সুখের মোহে পড়েছিলেন। তিনি কর্ম, অর্থ ও সম্পদ নিয়ে মেতেছিলেন। পরিবারকে অবহেলা করেছেন। এটাই তাঁকে মানসিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। যা থেকে তিনি আর বেরোতে পারেননি। শরীর অসুস্থ হওয়ার পর এই সংকট ইভানকে জটিলতায় ফেলে দেয়। যা তাঁর মৃত্যু ডেকে আনে।

এ তো গেল পাপের কথা। এ থেকে কি তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন? হ্যাঁ, পেয়েছিলেন। ইভান অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছিল। তিনি ঈশ্বরের কাছে জানতে চান, তিনি তো স্বাচ্ছন্দ্য চেয়েছিলেন, এর বদলে কেন ভোগান্তি পাচ্ছেন? ইভান বিগত জীবনটা যাচাই করেন। তিনি বুঝতে পারেন, বস্তুগত জীবনের আনন্দহীন কাজে তিনি ডুবেছিলেন। এতে না ছিল প্রেম, না ছিল মানবিকতা। মৃত্যুশয্যায় ইভান তাঁর ছেলে ও ঈশ্বরের কাছে ভুলের জন্য ক্ষমা চান। এই স্বীকারোক্তি ও মৃত্যু তাঁকে মুক্তি দেয়।

তাঁর চাকরি, নিয়মানুবর্তিতা, সততা, সম্পর্ক, ধনীর কন্যাকে বিয়ে—এ সবই ছিল লোক দেখানো। তিনি সত্যিকার অর্থে কাউকে কোনো দিন ভালোবাসেননি। মধ্যবিত্তীয় মানসিকতা তাঁকে গ্রাস করেছিল। সমাজে বাস করতে হলে একজন স্ত্রী থাকা দরকার। সুন্দর সাজানোগোছানো বাড়ি থাকা দরকার। সন্তান থাকা দরকার। এ সবই তিনি করেছেন, অন্যরা যেমনটা করে। এটা হচ্ছে বস্তুবাদী মূল্যবোধ। এর মধ্যে সত্যিকারের প্রেম নেই। নেই গভীর বন্ধুত্ব। শেষে ইভান বুঝতে পারেন, তাঁর জীবনটা অপচয় হয়ে গেছে। মৃত্যু ছাড়া এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। মৃত্যুতেই তাঁর শান্তি।

এই গল্প পড়ে ‘সেভেন সামুরাই’খ্যাত জাপানি ফিল্মমেকার আকিরা কুরোসাওয়া গভীর বেদনায় ডুবেছিলেন। যা তাঁকে ‘ইকিরু’ (১৯৫২) সিনেমা বানাতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

ইভান ইলিচের মৃত্যু’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮৬ সালে। এ বছর বইটির ১৩০ বছর পূর্তি। এত দিন পরও ইভানের মৃত্যুর ভয়াবহতা এতটুকু কমেনি। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে এ বই পাঠের এটাই সবচেয়ে বড় আবেদন।

(ঋণ স্বীকার : লেভ তলস্তয়, ইভান ইলিচের মৃত্যু, অনুবাদ সমর সেন, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো।)

তলস্তয় ও তাঁর মহাপ্রয়াণ

স্বকৃত নোমান : মহান রুশ ঔপন্যাসিক কাউন্ট লেভ তলস্তয়ের সামগ্রিক জীবনটাই আমার কাছে একটি উপন্যাস বলে মনে হয়। এত বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন খুব কম লেখকই যাপন করেছেন। জীবনকে তিনি উপভোগ করেছেন সত্যি, একই সঙ্গে জীবনের যন্ত্রণাও কম ভোগ করেননি। এই অমর কথাশিল্পীর অন্তিমযাত্রা যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি তাত্পর্যপূর্ণও।

১৯০১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যাজকীয় বিচারসভা সিনোদ তলস্তয়কে ধর্মত্যাগী ঘোষণা করল। তাঁকে অভিশপ্ত ঘোষণা করে তাঁর ধর্মাপরাধের বিস্তারিত ফিরিস্তি দিয়ে ঘোষণাপত্র জারি হলো, ‘অতএব, গির্জা আর তাকে সন্তানদের মধ্যে গণ্য করছে না এবং করতেও পারে না, যতক্ষণ না সে অনুশোচনা করে এবং গির্জার সঙ্গে নিজেকে পুনরায় আবদ্ধ করে।’ ঘোষণাপত্রটি সারা দেশের সব গির্জাদ্বারে সেঁটে দেওয়া হলো।

চার্চ কর্তৃক বহিষ্কৃত হলেও মস্কোর রাজপথে তলস্তয়কে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানাল জনতা। তলস্তয় ‘সিনোদ প্রদত্ত রায়ের জবাবে’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখলেন, ‘আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। তাঁকে আমি আত্ম, প্রেম ও যাবতীয় বস্তুর সারাৎসার হিসেবে উপলব্ধি করি। আমি বিশ্বাস করি, তিনি আমার মধ্যে আছেন, যেমন আমিও তাঁর মধ্যে। আমি বিশ্বাস করি, প্রেমোপলব্ধিতে অগ্রসর হওয়ার একটিই পথ—প্রার্থনা। ধর্মমন্দিরে গণপ্রার্থনা নয়, যিশুখ্রিস্ট স্পষ্টভাবে তার নিন্দা করেছেন। সেই প্রার্থনা, যা তিনি নিজে আমাদের শিখিয়েছেন—একক প্রার্থনা, যার মধ্যে মনুষ্যজন্মের সার্থকতা সম্পর্কে সচেতনতা ও ঈশ্বরেচ্ছায় আমরা চালিত হতে বাধ্য—এই বিশ্বাস কোনো লোক নিজের মধ্যে পুনরুদ্ধার ও বলবতী করে তোলার ক্ষমতা পায়।’

বিচারসভা তবু তাদের সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রাখল। বিচারসভার ঘোষণার পর আলেক্সিয়েই সুভোরিন তাঁর পত্রিকায় লিখলেন, ‘আমাদের জার দুজন—দ্বিতীয় নিকলাই ও লেভ তলস্তয়। কোন জন বেশি শক্তিশালী? তলস্তয়ের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় নিকলাই শক্তিহীন এবং সিংহাসন থেকে তলস্তয়কে একটুও নড়াতে পারবেন না। অন্যপক্ষে তলস্তয় তর্কাতীতভাবে দ্বিতীয় নিকলাইয়ের সিংহাসন ও তাঁর সমগ্র বংশ ধরে নাড়া দিচ্ছেন। কেউ তলস্তয়ের বিরুদ্ধে একটা আঙুল তুলে দেখুক, সারা পৃথিবী লড়াইয়ে নেমে যাবে। তাতে আমাদের প্রশাসন লেজ গুটিয়ে পালাতে পথ পাবে না।’

হয়তো স্বামী তলস্তয়ের প্রতি স্ত্রী সোফিয়া আন্দ্রেইয়ের ভালোবাসার কমতি ছিল না। তবু তলস্তয়ের পূর্ণাঙ্গ জীবনী পড়ে শেষ করে সোফিয়াকে খুব নিপীড়নকারী এক নারী বলেই মনে হয়েছে। বিয়ের পর থেকেই বাকি জীবন এই মহিলা স্বামীকে মারাত্মকভাবে উত্পীড়ন করেছেন। তলস্তয়ের মতো একজন ‘চরিত্রহীন’কে তিনি বিয়ে না করলেই তো পারতেন। বিয়ের আগেই তো তলস্তয় তাঁর ‘চরিত্রহীনতা’র দলিল দিনপঞ্জিগুলো সোফিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘পড়ে দেখো, এই হচ্ছি আমি।’ তখন এই ‘চরিত্রহীন’কে বিয়ে করবেন না বলে বেঁকে বসতে পারতেন না সোফিয়া? কেন বেঁকে বসলেন না? কেন বিয়ে করলেন? করে কেন সারা জীবন স্বামীকে চরমভাবে উত্পীড়ন করলেন?

৮২ বছর বয়সে স্ত্রীর নিষ্ঠুর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত চিকিৎসক দুশান মাকোভিিস্ককে নিয়ে বাড়ি ছাড়লেন মহান তলস্তয়। শেষ হেমন্তের কনকনে ঠাণ্ডা, স্যাঁতসেঁতে, পথ কর্দমাক্ত ও ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। মাকোভিিস্ককে নিয়ে চুপিচুপি উঠানে নামলেন তিনি। কোচোয়ানকে জাগিয়ে ঘোড়ার গাড়ি বের করা হলো। ঘোড়া জোড়ার সময় তিনি নিজেও হাত লাগালেন। আহা, এরই মধ্যে মাথার টুপিটা পড়ে গেছে। টর্চের আলোয় খুঁজে পাওয়া গেল না। টুপিহীন খালি মাথায় হিম পড়তে লাগল। মাকোভিিস্ক তাঁর একটা বাড়তি টুপি তাঁকে দিলেন। স্টেশনে পৌঁছে টিকিট কেটে গর্বাচভগামী ট্রেনে উঠে পড়লেন দুজন। তখন তাঁর পকেটে মাত্র ৩৯ আর মাকোভিিস্কর কাছে ৩০০ রুবল। তলস্তয় ঠিক করলেন যে তিনি নানা জায়গায় দুচার দিন করে থাকবেন, যাতে সোফিয়া তাঁর নাগাল না পান। বিকেল ৪টায় তাঁরা কজেলস্কে নামলেন। ঝিসদ্রা নদী পার হয়ে এক আশ্রমে উঠলেন। পরদিন চলে গেলেন একমাত্র বোন মারিয়ার কাছে, যিনি থাকেন শামর্দিন ভিক্ষুনি মঠে।

ততক্ষণে তলস্তয়ের খোঁজখবর করা শুরু হয়ে গেছে। গভর্নরের হুকুমে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী তাঁর খোঁজে চতুর্দিক ছুটে বেড়াচ্ছে। বোন মারিয়ার কাছে এক রাত থেকে পরদিন আবার কজেলস্কের উদ্দেশে রওনা হলেন তলস্তয়। সেখান থেকে রিয়াজানউরাল রেলপথের ওপর রস্তোফনাদুন শহরের টিকিট কাটবেন। সকাল পৌনে ৮টায় ট্রেনে উঠলেন। বিকেল ৪টার দিকে প্রচণ্ড জ্বর উঠল শরীরে। ঠিক সাড়ে ৫টায় দিকিন স্টেশনে গাড়ি থামলে পুলিশের কাছে খবর চলে গেল যে তলস্তয় এই ট্রেনেই আছেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ট্রেন আস্তাপভ স্টেশনে থামল। তলস্তয় তখন প্রচণ্ড জ্বরে কাঁপছেন। স্টেশন মাস্টারের সহযোগিতায় তাঁকে ট্রেন থেকে নামানো হলো। মাস্টার তাঁর বাড়ির একটা কামরা ছেড়ে দিলেন তলস্তয়ের জন্য।

পিতার খোঁজে মেয়ে শাশা উপস্থিত হলেন দিকিনে। পরদিন বড় মেয়ে তানিয়াও এলেন। তারও পরের দিন স্ত্রী সোফিয়া এলেন; কিন্তু তাঁকে স্বামীর কাছে যেতে দেওয়া হলো না তখন। তলস্তয় গুরুতর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। সারা দেশে হুলস্থুল পড়ে গেছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে সংবাদ বুলেটিন বেরোচ্ছে। বিরতিহীন টেলিগ্রাফ অফিস কাজ করে যাচ্ছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, রেলওয়ে প্রশাসন, রিয়াজান, তামবোফ ও তুলা প্রদেশের গভর্নররা মুহূর্তে মুহূর্তে খোঁজখবর নিচ্ছেন। রাশিয়ার সর্বত্র ও সারা পৃথিবী থেকে তলস্তয়পরিবারের কাছে টেলিগ্রাম আসছে। ৩ নভেম্বর রাতে অচেতনের ঘোরে তলস্তয় বিছানায় উঠে বসে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘মাশা, মাশা।’ এই মাশা তাঁর মেয়ে, যে চার বছর আগে মারা গেছে। পরদিন সন্ধ্যায় বকতে লাগলেন, ‘পালাতে হবে। পালিয়ে আমি যাবই। কেউ বিরক্ত করবে না এমন জায়গায় আমি চলে যাব। একটু একা থাকতে চাই।’ এ সময় স্ত্রীকে তাঁর পাশে আনা হলো। গির্জার পক্ষ থেকে যাজক পাঠানো হলো, যদি তলস্তয় অনুশোচনা প্রকাশ করেন, তাহলে তাঁকে পুনরায় গ্রহণ করবে চার্চ। তলস্তয়ের শিষ্যমণ্ডলী পাদ্রিকে কাছেই ঘেঁষতে দিলেন না।

অবশেষে তিনি চলে গেলেন, ১৯১০ সালের ৭ নভেম্বর ভোরে। জন্মগ্রামে আনা হলো তাঁর লাশ। সমাহিত করার জন্য যখন কবর খোঁড়া শেষ হলো, সমাধিস্থলে অসংখ্য মানুষের ভিড় দেখে কয়েকজন পুলিশ এগিয়ে এলো। ভিড়ের ভেতর থেকে কে একজন চেঁচিয়ে উঠল, ‘হাঁটু গাড়ো, হাঁটু গাড়ো। টুপি খুলে ফেলো।’ হতচকিত পুলিশরা হাঁটু গেড়ে বসল, টুপি খুলে ফেলল মাথা থেকে। বাড়ির অনতিদূরে ছায়াচ্ছন্ন তরুতলে মহানিদ্রায় শায়িত হলেন গির্জা ও রাষ্ট্রের শত্রু, সামাজিক দ্রোহী ও সন্ত, অমর বাণীশিল্পী কাউন্ট লেভ তলস্তয়। কোনো ধর্মানুষ্ঠান, যাজক সমাবৃত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হলো না। রাশিয়া প্রথম একটি মৃত্যু দেখল, যেখানে গির্জার কোনো ভূমিকা রইল না।

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ৪ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: