প্রথম পাতা > কবিতা, নারী, সাহিত্য > বনলতা সেনের সান্নিধ্য

বনলতা সেনের সান্নিধ্য

নভেম্বর 4, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

jibon-2ফজলুল হক সৈকত : র্যাঁবো বলেছিলেন : ‘ভোরবেলায় অপরূপ নগরে গিয়ে আমরা পৌঁছাব, জ্বলন্ত সহিষ্ণুতা বুকে নিয়ে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণীতে প্রবলভাবে আস্থাস্থাপনকারী চিলির কবি পাবলো নেরুদা নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে সুইডিশ একাডেমিতে বলেছিলেন : ‘আমি এসেছি এক অন্ধকার এলাকা থেকে, এমন এক দেশ থেকে যাকে নির্মম ভূগোল অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। কবিকুলে আমি সবচেয়ে পরিত্যক্ত একজন কবি, আর আমার কবিতা হল আঞ্চলিক, বিষণ্ণ বর্ষণসিক্ত। তবে, মানুষের প্রতি আস্থা সব সময়ই রয়ে গেছে। আমি কখনও আশা ছাড়িনি।’ বনলতার সান্নিধ্যলাভের জন্য যে আশাবাদের কথালিপি সাজিয়েছেন, সেসবের ভেতরে অন্তত র্যাঁবো ও নেরুদার ভাবনারাজির সঙ্গে, কবিতাবলয়ের সঙ্গে কিছুটা মিল খুঁজে পেলেও পেতে পারি।

জীবনানন্দ সমকালে এবং উত্তরকালে বিস্ময়কর কবিপ্রতিভা। দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশভারতসহ সারা বিশ্বে তার কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও পরিচিতি ব্যাপকতর হচ্ছে ক্রমাগত। আজকাল মধ্যে মধ্যে এমনও মনে হয় যে, বাংলা কবিতায় জীবনানন্দই বোধকরি সবচেয়ে শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান কবিএ শক্তি ও সামর্থ্য তার সৃজনশীলতা আর সাহিত্যবোধের বিবেচনায়। জীবনানন্দ জীবনকে দেখেছেন এক নতুন জীবনজিজ্ঞাসার আলোকে। সৃষ্টিজগৎ, প্রকৃতি আর মানুষের চলাচল তার কবিতাক্যানভাস। আর তিনি নির্মাণ করেছেন সাধারণ মানুষের বোধঅতীত অনন্যসব বোধ এবং ওইসব চেতনার নির্যাস। তাই তাকে বিবেচনা করা যায়, সাধারণেরঅবোধ্য অথচ অবশ্যবিবেচ্য চিন্তাভুবন প্রকাশের রূপকার আর বিস্তৃত ভাবনাবলয়ের নিরাবেগ ভাষ্যকার হিসেবে। বর্তমান আলোচনাকে আমরা জীবনানন্দের কবিতা– ‘বনলতা সেন’ পাঠউত্তর অনুভূতি প্রকাশের প্লাটফর বিবেচনা করব।

বনলতা সেন’ বোধ হয় জীবনানন্দের সবচেয়ে বেশি পাঠকপ্রিয় আর রহস্য সৃষ্টিকারী কবিতা। বিষ্ময়ের ব্যাপার, এ পর্যন্ত যত পাঠ হয়েছে কবিতাটির, বেশিরভাগই বিভ্রান্তিমোড়াভুল পাঠ; নিবিড় পাঠ তেমনটি হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমালোচক এটিকে প্রেমের কবিতা বিবেচনা করে খুঁজেছেন বনলতা নামক নারীর জন্মপরিচয়, পারিবারিক বৃত্তান্ত, কবির সঙ্গে পরিচয়সম্পর্ক আর মিলনবিরহের ব্যাপারাদি।

বাস্তবিক অর্থে, কবিতাটিতে জীবনানন্দ অনেকগুলো বিষয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। একটি সমতল ক্যানভাসে তিনি এঁকেছেন সভ্যতা আর জীবনের বিচিত্রসব প্রান্ত। হাজার বছরের ইতিহাসঐতিহ্যের ডানায় ভর দিয়ে কবি অগ্রসর হয়েছেন মানুষের প্রত্যাশাপ্রাপ্তি, বিষ্ময়বিভ্রান্তি আর জীবনঅবসানের দিকে। পথে স্পর্শ করেছেন রহস্যময়তা, অতিশব্দের মাহাত্ম, স্বস্তি এবং আনন্দের হাতছানি।

কবিতাকে কিংবা শিল্পসাহিত্যকে যদি আমরা বাজারের অন্যসব পণ্যের মতো বিবেচনা করি, তাহলে দেখব নিজের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণের জন্য জীবনানন্দের মার্কেটিং পলিসির কী দারুণ প্রয়োগ। আর তাই তো, ‘বনলতা সেন’ শেষ পর্যন্ত বাজারে অবিক্রিত আইটেম হয়ে পড়ে থাকে না; বিকোচ্ছে সন্তোষজনক মূল্যেদাম পাচ্ছে বিচিত্র ও ইতিবাচক বহুতর মূল্যায়নের পদ ধরে। জীবনানন্দের বর্ণনায় সাধারণ দৃশ্যবস্তু ধারণ করেছে মানবীয় অস্তিত্ব। আর তখনই তার বিবরণ ইতিহাস না হয়ে হল কবিতা আর পাঠকের জন্য তৈরি হয়ে গেল পাঠবিভ্রান্তির পূর্বঅনির্ধারিত পরিপ্রেক্ষিত। জীবনানন্দের বিমুগ্ধ পাঠক বনলতারূপী রমণীর অন্বেষায় আজও কেবল দোল খেতে থাকে কবির সভ্যতাক্লান্তিবিবৃতির নাগরদোলায়। ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির শুরু এরকম

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

দূর ‘সিংহল সমুদ্র’, ‘মালয় সাগর’, ভারতবর্ষের প্রাচীন রাজা অশোক আর বিম্বিসার এবং এ অঞ্চলের অতিপ্রাচীন নগরী ‘বিদর্ভ নগর’ পারি দিয়ে কবি প্রবেশ করেছেন বিশ শতকের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক ধস, ফলত চাকরিবাজারে অনিশ্চয়তাঘেরা জীবনযন্ত্রণায়। ব্যক্তিগত জীবনের অর্থনৈতিক টানাপড়েন আর সমাজরাষ্ট্রের সমূহ বিপদ তাকে বিচলিতবিভ্রান্ত করে তুলেছিল। বিশ্ব আর্থরাজনৈতিক আবহ তখন জীবনানন্দের কবিতার শরীরে ঢুকে পড়ে স্বাভাবিক উপাদান ও শক্তি হিসেবে।

অতঃপর কবি যাপিতজীবনে চলার পথে মোহাচ্ছন্নতা আর বিভ্রান্তির কথা লিখেছেন ঐতিহ্যের নিবিড় পতনের দক্ষ মাধুর্যে। কবিতাটির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে গিয়ে পুরুষপাঠক পড়ে দারুণ মুশকিলে। হারিয়েযাওয়া সভ্যতার গভীর অন্ধকার আর প্রিয়তমার চুলের কালোর অতলতার বিভ্রমে আটকে যায় তার চিন্তনবিলোড়ন। প্রাচীন নগরী ‘বিদিশা’ তখন তার বস্তুপরিচয় ঝেড়ে ফেলে নারীর কোমলকান্তির মোড়ক পরিধান করে নেয়; পথভোলা পথিককে দিকনিশানা বাতলে দিতেআসা অভিভাবকের দায় ও দায়িত্ব গ্রহণ করে। প্রেমকাতর কবিতাপাগল হৃদয়ের জন্য কবি নির্মাণ করেন ভালোবাসা আর আশ্বাসের বিরাট ভূমি।

জীবনানন্দ লিখছেন :

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনিদ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
(
বনলতা সেন)

তিরিশি (বিশ শতকের তৃতীয় দশকে বাংলাসাহিত্যে আবির্ভূত) কবিদের বড় সাফল্য তারা প্রেম ও প্রেমিকাকে কল্পনার রঙিন আকাশের ধোঁয়াশা থেকে বাস্তবে নামিয়ে আনতে পেরেছেন; জীবনানন্দেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায় নাবরং তার বিবরণে সে উপস্থিতি যেন আরও উজ্জ্বল এবং অধিক নিকটতর। শুদ্ধ প্রেম ও নিষ্ঠায় বাঙালিরও বিশ্বাস রয়েছে; তারা প্রেমিক বা প্রেমিকার জন্য হৃদয়ের সবচেয়ে গোপন ও প্রিয় অধ্যায়টি অতিযত্নে সংরক্ষণ করতে ভুল করেন না। মানুষ বারবার প্রেমে পড়তে পারে; আবার কেবল একজনকে ঘিরেও আবর্তিত হতে পারে তার প্রেমের ঘরবারান্দা। কবিরাও তাই প্রেমের কবিতায় অনেকের ছবি যেমন আঁকতে পারেন; তেমনি একজনকে নিয়েও লিখতে পারেন অনেক কবিতা। জীবনানন্দের বনলতাকে নিয়ে আমাদের যেমন রয়েছে হাজারো প্রশ্ন ও সংশয়; জীবনানন্দের মনেও বারবার ছায়া ফেলেছে বনলতার মুখ (নাকি ছায়া কিংবা মায়া!)। একটি উপন্যাসে এবং পরে পাঁচটি কবিতায় তিনি বনলতাকে হাজির করেছের নানানভাবে ও ভঙ্গিতে। কারুবাসনা (রচনাকাল: ১৯৩৩) উপন্যাসে জীবনানন্দ লিখেছেন

চারিদিকে তাকিয়ে দেখি শুধু মৌসুমির কাজলঢালা ছায়া। কিশোরবেলায় যে কালো মেয়েটিকে ভালোবেসেছিলাম কোনো এক বসন্তের ভোরে, বিশ বছর আগে যে আমাদেরই আঙিনার নিকটবর্তী ছিল, বহুদিন তাকে হারিযেছিআজ, সেই যেন পূর্ণ যৌবনে উত্তর আকাশে দিগঙ্গনা সেজে এসেছে। দক্ষিণ আকাশে সেই যেন দিগ্বালিকা, পশ্চিম আকাশেও সেই বিগত জীবনের কৃষ্ণা মণি, পুব আকাশ ঘিরে তারই নিটোল কালো মুখ। নাক। সত্রমাখা রাত্রির কালো দীঘির জলে চিতল হরিণীর প্রতিবিম্বের মতো রূপ তার।প্রেয় পরিত্যক্ত মৌনমুখী চমরীর মতো অপরূপ রূপ। মিষ্টি ক্লান্ত অশ্রুমাখা চোখ, নয় শীতল নিরাবরণ দুখানা হাত, ম্লান ঠোঁট, পৃথিবীর নবীন জীবন ও নবলোকের হাতে প্রেম, বিচ্ছেদ ও বেদনার সেই পুরনো পলীর দিনগুলো সমর্পণ করে কোনো দূর নিঃস্বাদ নিঃসূর্য অভিমানহীন মৃত্যুর উদ্দেশ্যে তার যাত্রা।

সেই বনলতাআমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে। কুড়িবাইশ বছরের আগের সে এক পৃথিবীতে : বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। সনের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলল সে। তারপর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকেই আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নত মুখে মাঝপথে গেল থেমে, তারপর কিড়কিড় পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে। নিবিড় জামরুল গাছটার নিচে একবার দাঁড়াল, তারপর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

তারপর তাকে আর আমি দেখিনি। অনেকদিন পরে আজ সে আবার এল; মনপবনের নৌকায় চড়ে, নীলাম্বরী শাড়ি পরে, চিকন চুল ঝাড়তে ঝাড়তে আবার সে এসে দাঁড়িয়েছে; মিষ্টি অশ্রুমাখা চোখ, ঠাণ্ডা নির্জন দুখানা হাত, ম্লান ঠোঁট, শাড়ির ম্লানিমা। সময় থেকে সময়ান্তর, নিরবচ্ছিন্ন, হায় প্রকৃতি, অন্ধকারে তার যাত্রা।’

বাঙালি জীবনে প্রেমের অবকাশ ও সম্ভাবনা সংকীর্ণ বলে অনেক সময় কল্পনার নারীকে নিয়েও রচিত হয়েছে প্রেমের কবিতা; সামনে কেউ নেই, হয়তো কখনও ছিল না, তবু কবি তার রক্তমাংস স্বপ্নের প্ররোচনায় লিখতে থাকেন কম্পমান পদাবলি। তাই বাঙালি কবিদের দয়িতার নাম আমাদের কাছে অজানা কিংবা অস্পষ্ট রয়ে যায়; যেমনটা জানা যায় কীটসবোদলেয়ার বা রিলকের প্রেমিকা বা প্রেমিকাদের নাম। জীবনানন্দ কার বা কাদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন যন্ত্রণা ও মধুমাখা কবিতাবলিএমন প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর মেলে না। জীবনানন্দের কবিতায় আছে কল্পনামাখা প্রেমের অবারিত শস্যভূমি। এই প্রেমিককবি প্রেমকে জীবনের মতো ব্যাপক করে তুলেছিলেন; তার কাছে প্রেম কোনো বিশেষ বয়সের সাময়িক উন্মাদনা ছিল নাতা ছিল জীবনেরই রূপান্তর। জীবনের যাবতীয় সাফল্যব্যর্থতায় প্রেমবিষ বা প্রেমঅমৃতে তার অবিচল আস্থা; তিনি বিশ্বাস করতেনসময়ের অন্ধকার দূর করতে পারে কেবল প্রেমিকার দেহসূর্য। জীবনানন্দ তার দয়িতাদের সবচেয়ে শরীরি কিংবা অশরীরি করে তুলেছিলেন নাম ধরে ডেকে ডেকে; বনলতা সেন, অরুণিমা সান্যাল, সুদর্শনা, সুরঞ্জনা প্রভৃতি নাম তার দয়িতাদের নারী (শরীরি) নয়, নিসর্গের (অশরীরি) গোত্রভুক্ত করেছে। বনলতা সেনের সৌন্দর্য: ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা/ মুখ তার শ্রাবস্তির কারুকার্য।’এ বিবরণে বনলতা হয়ে উঠেছে প্রাচীন ধূসর ভারতীয় ইতিহাসের মতো বিমূর্ত, আর প্রাচীন ভাস্কর্যের মতো নিষ্প্রাণ। বনলতা এমন এক নারী, যাকে নাটোরের পিচঢালা বা ধুলোমাখা রাস্তায় দেখা যায় না; শয্যায় পাওয়া যায় নাশুধু সন্ধ্যার নির্জন অন্ধকারে নির্বাক মুখোমুখি বসে থাকে অদৃশ্যঅধরা নারীর অস্পষ্ট ছবি হয়ে।

বনলতার সঙ্গে জীবনানন্দের পরিচয় কিংবা জানাশোনা থাকানাথাকা নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক, অনেক আশানিরাশার দোলা। সত্যিকার অর্থে কবির কল্পনায়, সংসার ও পৃথিবীর যাবতীয় যাতনা থেকে মুক্তির কিংবা পলায়নের অভিপ্রায়ে, এক মোহনীয় নারীর রূপকল্প জেগে থাকতে দেখা যায় নানানভাবে। জন্মজন্মান্তরে যার সঙ্গে পথ চলা যায়, এমন এক স্বপ্নমানবীর রূপ তিনি বারবার ভেবেছেন; হয়তো পৃথিবীর আলোবাতাসে খুঁজেছেনও তাকে। মাঝে মাঝে তার কল্পনায় সাজানো নায়িকার মতো দেখতে কাউকে দেখে চমকে উঠেছেনও বোধ হয়; কিন্তু শরীরি বনলতাকে তিনি দেখেননি কখনও; ছুঁয়ে দেখা তো স্বপ্ন মাত্র। বাস্তবে এই অদেখা কোনো এক বনলতাকে নিয়ে কবির অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে ‘একটি পুরনো কবিতা’য়। জীবনানন্দ লিখেছেন

একটি কি দুটো মুখতাদের ভিতরে
যদিও দেখিনি আমি কোনো দিনতবুও বাতাসে
প্রথম জানকীর মতো হয়ে ক্রমে
অবশেষে বনলতা সেন হয়ে আসে।’

যদিও জীবনানন্দ তার ‘দু’জন’ কবিতায় লিখেছেন : পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়/ প্রেম ধীরে মুছে যায়।’ কিন্তু বনলতার প্রসঙ্গে তিনি প্রেমের অমরতাকে এক রকম প্রশ্রয়ই দিয়েছেন বলা চলে। দুনিয়ার তাবৎ সভ্যতা আর বিস্ময় কিংবা অধরা আনন্দের আড়ালে কবি দেখেছেন নাপাওয়া কোনো এক শুভবোধের ছোঁয়া। আর সে আদরের মৃদু প্রলেপে জুড়ে দিয়েছেন বনলতার কোমল হাত। পথে পথে যেন জীবনানন্দ বিজ্ঞাপনের বোর্ডে লাগিয়ে দিয়েছেন বনলতার মুখ কিংবা মুখের আদলে গড়ে ওঠা অবিবরণীয় ছবি।

ক্লান্তিহীন পথ চলার আর অন্তহীন আনন্দের সঙ্গী হিসেবে যে মানুষকে (অবশ্যই বিপরীত লিঙ্গের) পাওয়া যায় বা মনে মনে ভাবা যায়, সে নারীর মোহময়তা যেন এই নিবিড় প্রেমলগ্ন কবির জীবনে বারবার বনলতার মুখ হয়ে ভেসে ওঠে। অন্য একটি কবিতায় জীবনানন্দ বনলতাকে তুলে ধরছেন এভাবে:

বনলতা সেন, তুমি যখন নদীর ঘাটে ম্লান করে ফিরে এলে
মাথার উপরে জ্বলন্ত সূর্য তোমার,
অসংখ্য চিল, বেগুনের ফুলের মতো রঙিন আকাশের পর আকাশ
তখন থেকেই বুঝেছি আমরা মরি না কোনো দিন
কোনো প্রেম কোনো স্বপ্ন কোনো দিন মৃত হয় না

(বাঙালি পাঞ্জাবি মারাঠি গুজরাটি)

বাস্তবের নারী নয় বনলতা; কল্পনার শোভন ঘরে তার সামনে কেবল নির্জন অবসরে নির্বাক বসে থাকার অভিনয় করা চলে। হাত বাড়ালে তাকে ধরা যায় না। চোখ মেললে তাকে দেখা যায় না। অবশ্য এমনও হতে পারে জীবনানন্দ যে নারীকে কল্পনার দয়িতারূপে ভেবেছেন, এরকম কেউ হয়তো কোনো কালে ছিল; হয়তো মরে গেছে বহু আগে। তার অপেক্ষায় হয়তো বহুকাল স্টেশনে ট্রেনের প্রতীক্ষায় যাত্রীর মতো অমিত সময় পার করেছেন কবি। কিংবা মনের টানাপড়েনে পুড়ে পুড়ে মরেছেন, মনের মতো হৃদয়ের রানীকে নাপাবার যাতনায়। কে জানে কী রকম এক নারীর জন্য সারাটা জীবন ধরে হাহাকার করতে হয়েছে নীরবঅন্তর্মুখী এই জীবনানন্দকে; কে বলতে পারে, হয়তো ওই নারীর জন্য জীবনের সব আনন্দ বিসর্জনও দিয়েছেন কবি। জীবনের সব আনন্দ বাতাসে মিলিয়ে যেতে দেখা কবি তাই, ঘোরের মধ্যে, লিখছেন ‘শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন’ কবিতা। এই কবিতায় আমরা জীবনানন্দের বনলতাকে দেখি গভীর রাতের অনুপস্থিতিউপস্থিতির দোলাচলের রঙিন মোড়কে :

শেষ হ’ল জীবনের সব লেনদেন
বনলতা সেন।
কোথায় গিয়েছ তুমি আজ এই বেলা
মাছরাঙা ভোলেনি তো দুপুরের খেলা
শালিখ করে না তার নীড় অবহেলা
উচ্ছ্বাসে নদীর ঢেউ হয়েছে সফেন,
তুমি নাই বনলতা সেন।…

কবির জীবনে বনলতার উপস্থিতিঅনুপস্থিতি বিষয়ে সব প্রশ্নের মধ্যে জড়িয়ে আছে প্রেম কিংবা স্বপ্নভঙের অথবা বিরহের ব্যাপারাদি; স্ত্রী লাবণ্যের সঙ্গে কবির সাংসারিক সাফল্যব্যর্থতার কতসব গল্প। আবার পাশাপাশি আছে পৃথিবীর তাবৎ মানুষের স্বপ্নভঙের নাবলা কাহিনী। মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর যখন লিখেছিলেন: ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’, তখন নিশ্চয় তিনি নিজের সন্তানাদির জন্য নয়দেবীর কাছে জগতের সব মানুষের কল্যাণ কামনা করেছিলেন। তাহলে জীবনানন্দও কি বনলতার অস্পষ্ট মুখচ্ছবি আঁকতে গিয়ে পৃথিবীর সব প্রেমবঞ্চিত বা বিরহকাতর প্রেমিকপুরুষের মনোযন্ত্রণাকে রূপ দিতে চেয়েছেন? কে জানে সে কথা! নাকি হাজার হাজার বছরের সভ্যতার পথে প্রকৃত অর্থে আমাদের মানসিকভাবে নাএগোবার গল্পই গেঁথে তুলেছেন তিনি। আর সে কারণেই বোধকরি, আবারও জীবনানন্দের কবিতায় সভ্যতার বিবরণে ভেসে ওঠে বনলতার মুখ; তার ছবি। কবি লিখছেন:

হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো:
চারিদিকে চিরদিন রাত্রির নিধান;
বালির উপরে জ্যোৎস্না দেবদারু ছায়া ইতস্তত
বিচূর্ণ থামের মতো: দ্বারকাক;- দাঁড়ায়ে রয়েছে মৃত, ম্লান।
শরীরে ঘুমের ঘ্রাণ আমাদেরঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন;
মনে আছে?’ শুধাল সেশুধালাম আমি শুধু ‘বনলতা সেন?’
(
হাজার বছর শুধু খেলা করে)

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ৪ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: