নজরুলের কবিতায় আজান

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ : আজানের আবেদন শাশ্বত। প্রতিদিন সময়ের ক্রমবিবর্তনে সকালসন্ধ্যা পৃথিবীর সর্বত্র সব সময় মসজিদের মিনারে মিনারে বাজে আজানের সুমধুর সুর। আজান বাংলা, বাঙালির চেতনা ও অনুভূতিতে অসামান্য অভিব্যক্তির স্ফুরণরূপে অন্তরের অতলান্ত গভীরতায় স্থান করে নিয়েছে। সাহিত্যের নানা অঙ্গনে আজানের প্রাসঙ্গিক ব্যবহার লক্ষণীয়। হাদিসের বিবরণে পাওয়া যায়, যত দূর আজানের শব্দ পৌঁছে, ততটুকু এলাকা ছেড়ে শয়তান দৌড়ে পালায়। তাই তো কাজী নজরুল আজানের মধ্যে মানসিক প্রশান্তির ঠিকানা আবিষ্কার করেছেন—

মসজিদে ঐ শোন রে আজান, চল নামাজে চল।

দুঃখে পাবি সান্ত্বনা তুই বক্ষে পাবি বল।’

নজরুল প্রতিভা’ হলো চিরসবুজ, চিরনতুন, চিরজাগ্রত, চিরউন্নত শির। প্রেমপ্রাণ ও সুর সৃষ্টির জয়গাথায় নজরুল বাঙালির ধ্বনিতে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকল্প এঁকেছেন। আমাদের সংস্কৃতির পূর্ণতাদানে নজরুলের ঋণ অপরিশোধ্য। তাঁর কাছে ফিরে আসতে হয় বারবার। বাঙালি মননে মুসলিম আবহ তিনিই জাগিয়েছেন। ভূগোল ও রাজনীতির বাইরে তাঁর অনুভব :

দূর আরবের স্বপন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে

বেহুঁশ হয়ে চলেছি যেন কেঁদে কেঁদে কাবার পথে।’

মানবপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে তিনি ধারণ করেন ‘বাঁশের বাঁশরী’ ও ‘রণতূর্য’। তিনি সবার ও সারা বিশ্বের। কিন্তু তিনি ইসলাম ও মুসলমান—এই বৃত্তের বাইরের কেউ নন। তাই তো তাঁর অনুভবে আজান বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে—

আমার মনের মসজিদে দেয়

আজান হাজার মোয়াজ্জিন

প্রাণের ‘লওহে’ কোরআন লেখা

রুহ পড়ে তা রাত্রিদিন।”

আজান মুসলিম সংস্কৃতি ও ইসলামী সমাজব্যবস্থার পরিচায়ক। ‘আজান’ মহাকবি কায়কোবাদের নিবেদনে বাঙালির হৃদয়ে এক অমীয় সুধা, অপূর্ব সুরধ্বনি। তাঁর ভাষায়—

কে ওই শোনাল মোরে আজানের ধ্বনি

মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কী সুমধুর

আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।

কী মধুর আজানের ধ্বনি!’

অন্যদিকে নজরুল মনন আজানের মধ্যে খুঁজে ফেরে জাতীয় ও আত্মিক বিশ্লেষণ আর জাগরণী আহ্বান। তাঁর অনুভূতির সার্থক প্রকাশ হলো—‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথা সে মুসলমান।’

ভণ্ড, বর্ণচোরা, আবেগতাড়িত সর্বসাধারণের কাছে তাঁর নিবেদন—

ইসলামের ওই সওদা লয়ে এলেন নবী সওদাগর

বদ নসিব আয়, আয় গুনাহগার নতুন করে সওদা কর….।’

শুধু তাই নয়, তিনি মহান আল্লাহর প্রতি চরম ভক্তিতে ১৯৩৩ সালে চট্টগ্রামে কোনো এক সুন্দর সকালে আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে তাঁর অভিব্যক্তির সুরলহরি ঢেলে দেন—

কোথা পেলি এ পাপিয়া কণ্ঠ মধুর

কহে কোকিল পাপিয়া আল্লাহ গফুর

তারই নাম গাহি কুহু কুহু

আল্লাহু! আল্লাহু।’

এমনই যাঁর অনুভব, তাঁর কাছে আজান কত বড় আবেদন রাখতে পারে, তা তো বলাই বাহুল্য। নজরুলের বিবেচনায় আজানের শক্তি মানুষকে পৌঁছে দেয় এক অনন্য উচ্চতায়। তিনি আজানের মধ্যে শোনেন আত্মবিশ্লেষণের তাগিদ—

ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর

তখনো জাগিনি যখন জোহর

হেলায়ফেলায় কেটেছে আসর

মাগরেবের ঐ শুনি আজান….।’

নজরুলের গানগুলোর শ্রেণিবিন্যাসে দেখা যায়, মৌলিকত্বের বিচারে তা ৪৯ রকমের বা আরো ভিন্নমাত্রিক। ভজন, কীর্তন, ভক্তিমূলক, ভাটিয়ালি, কাওয়ালি, গজল এমনকি ফসলকাটা ও ছাদপেটানো গানেও নজরুলকে খুঁজে পাওয়া যায়। শব্দ চয়নে তিনি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সিদ্ধহস্ত। বাংলা ভাষায় কাজী নজরুল ইসলামের কৃতিত্ব আরবি, ফারসি, হিন্দিসহ নানা শব্দের সার্থক রূপায়ণ। সুরের ক্ষেত্রে ইরানি ও আরব মরুময়তার ঝঙ্কার এবং তুরস্ক, খোরাসান, তাসখন্দ, আফগানি আবার আদি ভারতীয় সুরের সঙ্গে উপজাতীয় ধারার সার্থক সমন্বয়ের প্রতিফলন লক্ষণীয় একমাত্র কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিসম্ভারে। খাম্বাজ, কাহারবা, ভৈরবী—কোনো সুরই তিনি বাদ দেননি। ইসলামের পরিভাষায় বিশেষ শব্দমালায় উচ্চ স্বরে নামাজের জন্য আহ্বান ধ্বনি আজানের মধ্যেও কাজী নজরুল শোনেন অসাধারণ সুধাময় সুর মূর্ছনা—

দূর আজানের মধুর ধ্বনি বাজে মসজিদেরই মিনারে।

এ কী খুশির অধীর তরঙ্গ উঠল জেগে প্রাণের কিনারে।’

আবার ‘উমর ফারুক’ কবিতার মাধ্যমে তিনি আমাদের শুনিয়েছেন এক মানবিক হাহাকারের চিরায়ত প্রতিধ্বনি ও পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির কান্না—

তিমির রাত্রি এশার আজান শুনি দূর মসজিদে।

প্রিয় হারা কার কান্নার মতো এ বুকে আসিয়ে বিঁধে।’

নজরুলপ্রতিভা ও শক্তি যে প্রাণময় ও চিরজাগ্রত, তা বোঝা যায় তাঁর স্বভাবজাত প্রবণতায়। একদিন শিল্পী আব্বাসউদ্দীন যখন মসজিদের আজান শুনে নামাজে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, তখন তাত্ক্ষণিকভাবে কবি গেয়ে উঠলেন—

হে নামাজি

আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ

দিলেম তোমার চরণ তলে হৃদয় জায়নামাজ।’

পরিশেষে ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও পাঠকের বিরক্তি চরমে পৌঁছার আগেই হৃদয়গ্রাহী অনুরণনে লেখাটির পরিসমাপ্তি ঘটানো শ্রেয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অন্তিম আকাঙ্ক্ষার সার্থক বাস্তবায়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে তাঁর সমাধিসৌধ। তাঁর আবেগঘন আকুতি—

মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।

যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ৪ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: