প্রথম পাতা > অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাংলাদেশ, শিল্প > শীতলক্ষ্যা তীরে তৈরি হচ্ছে আধুনিক জাহাজ

শীতলক্ষ্যা তীরে তৈরি হচ্ছে আধুনিক জাহাজ

নভেম্বর 2, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

ship-building-nganjনারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া এলাকায় তৈরি হচ্ছে আধুনিক জাহাজ। আর এ জাহাজ তৈরিকে কেন্দ্র করে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা কায়েতপাড়া ইতিমধ্যে জাহাজের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে এ গ্রামের দূরত্ব মাত্র ৯ কিলোমিটার।

স্থাণীয়দের মতে, আটদশ বছর আগেও বন্যাকবলিত এ এলাকায় একটি পাখি ডেকে উঠলে তার শব্দ বাতাসে ভেসে যেত অনেক দূর। বর্ষাকালে নৌকা ছিল যোগাযোগের একমাত্র বাহন। এক কথায় কায়েতপাড়া ছিল অজোপাড়াগাঁ। অথচ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এখানে গড়ে উঠেছে ২৫ থেকে ৩০টি জাহাজ তৈরির কারখানা। হাজারো মানুষের পদচারণায় কায়েতপাড়া এখন কর্মমুখর জনপদে পরিণত।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আগে বছরের অর্ধেকটা সময় জুড়ে এলাকাটি জলমগ্ন থাকত। এলাকার কৃষি নির্ভর মানুষ বছরে মাত্র একবার ফসল ফলাতে পারতেন। এতে করে তাদের দিন কাটতো অর্ধাহারেঅনাহারে। স্থানীয় বাসিন্দা আহাদুল হক ও জহিরুল ইসলাম খান নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার সোনাকান্দায় গিয়ে দেখতে পান শীতলক্ষ্যার বুকে জেগে ওঠা ছোট চরে ট্রলার তৈরি হচ্ছে। প্রায় পতিত চরের জমিকে এভাবে কাজে লাগাতে পারার চিন্তা ঢোকে তাদের মাথায়। সেই ভাবনা থেকেই তারা কয়েকজন ঢাকার দোহারে জাহাজ মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমে ২০০৫ সালে পূর্বগ্রাম এলাকায় দু’টি কারখানা চালু করেন। এটি লাভজনক হওয়ায় একে একে গড়ে ওঠে ২৫৩০টি কারখানা।

বর্তমানে কায়েতপাড়ায় শামস ডকইয়ার্ড, তালহা ডকইয়ার্ড, আমির ডকইয়ার্ড, মালেক ডকইয়ার্ড, মাসটাং ডকইয়ার্ড, খান ডকইয়ার্ড, ফাহিম ডকইয়ার্ড, ফটিক ডকইয়ার্ড, ভাই ভাই ডকইয়ার্ড, মনির ডকইয়ার্ড, মাসটাং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি নামে জাহাজ কারখানা রয়েছে। কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, ফেরি, জেটি, পল্টুন, বালুবাহী ট্রলার, বলগেট ও ড্রেজার তৈরি হয় শীতলক্ষ্যার তীর ঘেঁষা কায়েতপাড়ায়।

জাহাজ তৈরিতে মূলত ব্যবহার হয় লোহার প্লেনশিট ও অ্যাঙ্গেল। মেশিন আমদানি করতে হয় চীন থেকে। অতিরিক্ত প্রয়োজনীয় উপাদানের মধ্যে রয়েছে; টিগার্ডার, বিটগার্ডার, রং, ইট, বালি, সিমেন্ট, গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন, ওয়েল্ডিং রড আর লেদ মেশিনের কিছু খুচরা যন্ত্রাংশ। একটি বড় মাপের কোস্টার জাহাজ তৈরির জন্য প্রথমে রাজমিস্ত্রি বেইস লাইন তৈরি করেন। পরে ওয়েল্ডার ঝালাইয়ের মাধ্যমে জাহাজের খাঁচা তৈরি করেন। একটি কাঠামো দাঁড় করানোর পর চলে মেশিন স্থাপন ও রঙের কাজ। বড় জাহাজে তিনচারটি খুপড়ি বা হেস থাকে, যেখানে তিনচারশ’ টন পর্যন্ত মালপত্র বহন করা যায়। প্লেনশিট আসে চট্টগ্রাম থেকে। বিদেশী কাটা জাহাজের ৮ থেকে ১২ মিলিমিটার আকারের শিট ব্যবহার করা হয় জাহাজ তৈরিতে। ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে শিট কিনতে হয়। লোহার অ্যাঙ্গেল ৯৫১০৫ টাকা কেজিতে পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে। ৯ থেকে ১০ লাখ টাকায় জাহাজের মেশিন আমদানি করা হয় চীন থেকে। আর অন্যান্য মালপত্র পাওয়া যায় ঢাকার বংশাল অথবা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে। ২০ থেকে ২৫ জন কারিগরের মজুরিসহ একটি জাহাজ তৈরিতে ১০ থেকে ১১ কোটি টাকা খরচ হয়। এরপর নির্মাতারা সুবিধামতো লাভে তা বিক্রি করেন। ২০২৫ জন কারিগরের একটি জাহাজ তৈরিতে সময় লাগে ১২১৫ মাস।

বর্তমানে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কিছুটা দুর্দিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জাহাজের ফিটার আমির হোসেন, মোকতার হোসেন, জয়নাল আবেদিন, ওয়েল্ডার সাকের ও আল আমিন জানান, এখানে কাজের তুলনায় বেতন অনেক কম। এ জন্য মজুরি বাড়ানোর দাবি জানান তারা।

জাহাজ কারখানার মালিক ওসমান ঢালী, আনোয়ার হোসেন, লতিফ, কামাল, মাহফুজ ও আবদুল মজিদ জানান, শ্রমিকদের প্রতিদিনের মজুরি, মালপত্র ক্রয়, বিদ্যুৎ বিল ও জমির ভাড়ার ওপর জাহাজের লাভলোকসান নির্ভর করে। কিন্তু বর্তমানে প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা কিছুটা সংকটে পড়েছেন।

কায়েতপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, বন্যাকবলিত কায়েতপাড়ায় জাহাজশিল্প গড়ে উঠায় ইউনিয়ন ধীরে ধীরে স্বর্নিভর হয়ে উঠছে। জাহাজ কারখানার ফলে এলাকার পরিবেশ কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন। তাছাড়া এখানকার জাহাজ কারখানাগুলোর পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন অনুমোদন নেই।

জাহাজ মালিক সমিতির কর্ণধার এবং মাসটাং ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাসটাং ডকইয়ার্ডের স্বত্ত্বাধিকারী সাজ্জাদ হোসেন তুহিন জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য চাপ দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। অন্যদিকে রাজউক ও বিআইডব্লিউটিএর অনাপত্তিপত্র ছাড়া ছাড়পত্র দিচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তর। এ কারণে জটিলতা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ নির্ভর জাহাজশিল্পকে যদি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, তাহলে আশার আলো দেখেও হতাশায় হাবুডুবু খাবে রূপগঞ্জের জাহাজশিল্প।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা ইসলাম জানান, শীতলক্ষ্যার তীরে জাহাজ তৈরির কারখানা স্থাপনে এখানকার মানুষ লাভবান হচ্ছে। কৃষি নির্ভর এলাকা উন্নয়নের মুখ দেখছে। তাছাড়া জাহাজ কারখানার টুংটাং, ঠংঠং শব্দে স্থানীয়দের কিছুটা ঘুমের সমস্যা হচ্ছে। তবে ক্ষতির চেয়ে লাভের দিকটাই বেশি হচ্ছে বলে এলাকাবাসী মনে করছেন।

সূত্রঃ দৈনিক মানবকন্ঠ, ২ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: