প্রথম পাতা > প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য > পারমাণবিক চুল্লির বিপজ্জনক ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ ব্যবস্থাপনা

পারমাণবিক চুল্লির বিপজ্জনক ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ ব্যবস্থাপনা

নভেম্বর 2, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

ix. জাকিয়া বেগম : তেজস্ক্রিয় পদার্থ সম্পর্কিত কাজে যুক্ত এমন যে কোন স্থাপনা থেকেই পারমাণবিক বর্জ্য উৎপাদিত হতে পারে। তবে ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ বলতে বোঝা যায় পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে উৎপন্ন পারমাণবিক বর্জ্যসমূহ, যা পারমাণবিক চুল্লি পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বর্তমান বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত পারমাণবিক চুল্লিগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইউরেনিয়ামের আইসোটোপ। ফিশন প্রক্রিয়াতে ইউরেনিয়ামের আইসোটোপে শৃঙ্খল বিক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটানো হয়, যা সুনির্দিষ্ট মাত্রায় অবিরামভাবে চলতে থাকে এবং প্রচুর শক্তি উৎপাদন করে যার সাহায্যে বিদ্যুত উৎপাদন করা হয়। কিন্তু ৪ থেকে ৫ বছর ব্যবহারের পর জ্বালানিগুলোর প্রয়োজনীয় মাত্রায় নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটানোর ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং এগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের যোগ্যতা হারিয়ে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এগুলোকেই ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ বলা হয়। পরিত্যক্ত এই জ্বালানি থেকে ফিশন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ থাকার কারণে প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হতে থাকে এবং উচ্চ মাত্রার ক্ষতিকর বিকিরণ নির্গত হতে থাকে। তাই এ ধরনের ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে সুদীর্ঘকাল ধরে মানুষসহ সব ধরনের জীব এবং পরিবেশের প্রভূত ক্ষতি সাধন করতে পারে।

স্পেন্ট ফুয়েল’ এতটাই বিপজ্জনক যে, মাত্র ৩ মিনিটের জন্যও যদি কেউ ১০ বছরের পুরনো ‘স্পেন্ট ফুয়েল’এর কাছে এসে দাঁড়ায় তবে তার মৃত্যু অনিবার্য। তাৎক্ষণিক মৃত্যু ছাড়াও সম্পাদিত ব্যক্তির সমস্ত শরীর পুড়ে যাওয়া, স্থায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে কয়েকদিন বা মাসের মধ্যে মৃত্যু ঘটতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত তেজস্ক্রিয়তার দ্বারা সম্পাদিত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকে তাদের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাছাড়া অন্য যে কোন বিকিরণপাতের ন্যায় এক্ষেত্রেও ভবিষ্যত বংশধরদের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা, প্রতিবন্ধী ও মৃত শিশুর জন্মদানের হার বৃদ্ধি পায়, যা কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

পারমাণবিক স্থাপনায় বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন মাত্রার বর্জ্য উৎপাদিত হয়। বর্জ্যগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকিরণ নির্গত করার মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। ক্ষয়প্রাপ্তির পরিমাণ নির্ভর করে এগুলোর অর্ধায়ুর (হাফ লাইফ) ওপর। যে পদার্থের হাফ লাইফ যত বেশি সেটি তত দীর্ঘ সময় ধরে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত করতে থাকে। নির্গত বিকিরণের মাত্রা, অর্ধায়ু, ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে বর্জ্যগুলোকে প্রধানত উচ্চ, মধ্যম এবং স্বল্প এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুত স্থাপনায় উৎপাদিত বর্জ্যগুলোর প্রায় ৯০% –ই স্বল্পমাত্রার এবং এগুলো থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় বিকিরণের পরিমাণ মাত্র ১%। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই মাত্রা ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ মাত্রার কাছাকাছি হওয়ায় মানুষ বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে না। এ ধরনের বর্জ্য তৈরি হয় চুল্লি পরিচালনার সময়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক হাতিয়ার (টুলস্), চুল্লি পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত কর্মীদের পরিধেয় কাপড়, গ্লাভস্ ইত্যাদি থেকে। তবে স্বল্পমাত্রার কম অর্ধায়ুবিশিষ্ট কোন কোন বর্জ্যরে ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বিদ্যমান তেজস্ক্রিয় বস্তুর উপস্থিতি যখন বিপদসীমার নিচে চলে আসে তখন এগুলোকে সাধারণ বর্জ্যরে মতোই পরিত্যাগ করা হয়। কোন কোন তরল এবং বায়বীয় বর্জ্যরে ক্ষেত্রে বিদ্যমান তেজস্ক্রিয় বস্তুর ঘনত্ব কমিয়ে এনে সাধারণ বর্জ্যরে মতো পরিবেশে ছেড়ে দেয়া হয়।

মধ্যম মাত্রার তেজস্ক্রিয় বস্তুর পরিমাণ ৭%, যেগুলো থেকে প্রায় ৪% বিকিরণ নির্গত হয়। এ ধরনের বর্জ্য উৎপাদিত হয় চুল্লিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধাতব যন্ত্রাংশ, পানি শোধনের কাজে ব্যবহৃত ফিল্টার, রেজিন, গলিত রাসায়নিক আবর্জনা, বাষ্প উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, যেগুলো নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া দ্বারা সম্পাদিত হয়েছে সেগুলো থেকে। এ জাতীয় বর্জ্যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের পরিমাণ স্বল্পমাত্রার চেয়ে বেশি থাকে এবং ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য কোন কোনটির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণে ‘শিল্ডিং’এর ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

মধ্যম মাত্রার বর্জ্যরে মধ্যে যেগুলো কঠিন পদার্থ নয় এবং যেগুলো স্বল্প আয়তনবিশিষ্ট সেগুলোকে কংক্রিট অথবা বিটুমিনের তৈরি আঁধারে সংরক্ষণ করা হয়। আয়তনে বেশি বর্জ্যরে ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগে অথবা পুড়িয়ে ফেলে আয়তন কমিয়ে আনা হয়। বর্জ্যগুলোকে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানোর প্রক্রিয়ায় যে সমস্ত গ্যাস এবং ভস্ম বের হয় সেগুলোকে পরিবেশমুক্ত করার আগে বিদ্যমান তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ নিরাপদ মাত্রার নিচে নামিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করা অথবা ফিল্টার করা হয়। তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত ভস্মগুলোকে কখনও কখনও বিশেষ ধরনের রাসায়নিকের সাহায্যে কঠিন পদার্থে রূপান্তরিত করে কিছুটা স্থায়ী আকার দেয়া হয়, যাতে করে এগুলো নড়াচড়া করাতে অসুবিধা কম হয় এবং বিকিরণ নির্গমনের সম্ভাবনাও কমে যায়। মাটির উপরিভাগের স্তর সংলগ্ন স্থানে অগভীর স্থাপনা তৈরি করে মধ্যম মাত্রার বর্জ্য আবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হয়। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফলে এগুলো থেকে ২ কিলোওয়াট/মিটারের চেয়ে কম তাপ উৎপন্ন হয়, যার জন্য এ ধরনের স্থাপনায় তাপ নিরোধক কোন ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয় না। এই অবস্থায় যতদিন পর্যন্ত না জ্বালানিগুলো থেকে নির্গত বিকিরণ মাত্রা প্রাকৃতিক পর্যায়ে বিদ্যমান তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মাত্রার সমপর্যায়ে পৌঁছে ততদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়।

স্বল্প ও মধ্যম মাত্রার তেজস্ক্রিয় বস্তুর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তেমন জটিল নয় এবং অনেক সহজেই পারমাণবিক স্থাপনা সীমানার মধ্যেই এ ধরনের বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। কিন্তু ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ জাতীয় উচ্চমাত্রার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বেশ জটিল, উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

যদিও উৎপাদিত বর্জ্যরে মাত্র ৩% উচ্চমাত্রার; কিন্তু এগুলো থেকেই সর্বোচ্চ পরিমাণে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত হয়, যার পরিমাণ সম্পূর্ণ বর্জ্যরে প্রায় ৯৫%। দীর্ঘ অর্ধায়ুবিশিষ্ট তেজস্ক্রিয় বস্তুর উপস্থিতির কারণে সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত এই ধরনের বর্জ্য থেকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত হয় বলে এগুলোর ক্ষেত্রে সুদৃঢ় ও স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। চুল্লি থেকে অপসারণের পর প্রচউত্তপ্ত এবং উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তাযুক্ত থাকায় ‘স্পেন্ট ফুয়েল’কে তাৎক্ষণিকভাবে এবং সরাসরি স্থাপনার মধ্যে স্থাপিত পানি ভর্তি জলাধারে স্থানান্তরিত করা হয়। প্রক্রিয়াটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণভাবে স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছে। জলাধারগুলো অধিক ভার বহন ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বেশ কয়েক ফুট পুরু কনক্রিট দিয়ে সুদৃঢ়ভাবে ভূমির উপরস্থ তল থেকে প্রায় ৩০ মিটার গভীরে নির্মাণ করা হয়, যেগুলো প্রায় ৮ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট পানির নিচে পরিত্যক্ত জ্বালানিগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ডুবন্ত অবস্থায় সংরক্ষণ করে। জলাধারগুলো একাধারে কর্মীদের তেজস্ক্রিয়তা থেকে সুরক্ষা দেয়, অন্যদিকে জ্বালানি শীতলীকরণেও সহায়তা করে। উত্তপ্ত জ্বালানির সংস্পর্শে জলাধারের পানিও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তাই বিশেষ ‘শীতলীকরণ’ পদ্ধতির মাধ্যমে পানিকে সব সময় ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। হঠাৎ কোন কারণে শীতলীকরণ পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে গেলে প্রচবিস্ফোরণ ঘটার বা বিপজ্জনক মাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই যে কোন জরুরী অবস্থায় উত্তপ্ত বর্জ্যগুলোকে শীতলীকরণের জন্য আলাদাভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকাটাও অত্যন্ত জরুরী।

পানির নিচে জ্বালানিগুলো আস্তে আস্তে শীতল হতে থাকে এবং নির্গত তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রাও আস্তে আস্তে কমে আসতে থাকে। তবে তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিপদসীমার যথেষ্ট ওপরেই থেকে যায়। তাই সাধারণত ৫৮ বছর পর ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ জলাধার থেকে অপসারণ করে নিষ্ক্রিয় গ্যাস দ্বারা পূর্ণ ইস্পার তৈরি ঢাকনাযুক্ত সম্পূর্ণ শুষ্ক আধারে রেখে আধারগুলো খুব শক্ত ঢালাইয়ের মাধ্যমে বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ইস্পাতের এই আধারগুলোকে আরও পুরু ইস্পাত, সীসা বা কংক্রিট অথবা বিকিরণ নিরোধক কোন পদার্থ দ্বারা তৈরি কয়েক প্রস্থ আস্তরণবিশিষ্ট পাত্রে রেখে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়ে মধ্যবর্তী সংরক্ষণাগারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। তবে মধ্যবর্তী সংরক্ষণাগারের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হলে পানিতে ডুবন্ত অবস্থাতেই জ্বালানিগুলো দীর্ঘদিন রেখে দেয়া যায়।

আয়তন কমিয়ে আনার জন্য উচ্চমাত্রার বর্জ্যগুলোকেও বিশেষ প্রক্রিয়ায় কঠিন আকার প্রদান করা হয়। ফলে সংরক্ষিত অবস্থায় দ্রবীভূত হয়ে অথবা দৈবাৎ সৃষ্ট কোন ছিদ্রপথে এগুলো থেকে বাষ্পীয় অথবা তরল আকারে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, সংরক্ষণ প্রক্রিয়া এবং স্থান সঙ্কুলানও সহজতর হয়।

স্পেন্ট ফুয়েল’ থেকে উৎপাদিত পদার্থের কোন কোনটির অর্ধায়ু কয়েক মিলিয়ন বছর হওয়ায় এগুলো হাজার হাজার বছর ধরে বিকিরণ নির্গত করতে থাকে। তাই ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিরাপদে রাখার জন্য এগুলোকে মধ্যবর্তী সংরক্ষণাগার থেকে স্থায়ী সংরক্ষণাগারে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরী।

স্থায়ী সংরক্ষণাগারগুলো লোকালয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভূতাত্ত্বিকভাবে স্থায়ী মাটির গভীরে কয়েক ধাপবিশিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা সংবলিত কাঠামোর দ্বারা উচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয়। যদিও কোন দেশই এখন পর্যন্ত এ ধরনের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংক্ষণের উপযোগী কাঠামো তৈরি করে উঠতে পারেনি। তবে কয়েকটি দেশ এ ধরনের কাঠামো তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ সম্পন্ন করেছে এবং নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণকার্য পরিচালনার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।

তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রচুর সাবধানতা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী। কারণ আবদ্ধ অবস্থায়ও এগুলো থেকে উচ্চ ভেদন ক্ষমতাযুক্ত গামা এবং নিউট্রন রশ্মি বের হয়ে আসে। তাই এক্ষেত্রে পরিবহন কর্মী ছাড়াও সাধারণ জনগণ এবং পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া হঠাৎ কোন দুর্ঘটনার কারণে শিল্ডিং অর্থাৎ বর্জ্যধারক পাত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলো থেকে বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বাতাস ও পানি দ্বারা বাহিত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি, পানি ও পরিবেশকে দূষণযুক্ত করে তুলতে পারে। এ ধরনের দূষণ থেকে মানুষ ও পরিবেশকে মুক্ত করা যেমন উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর, তেমনি অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ।

জনসাধারণের জন্য ব্যবহৃত যানবাহনে কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় বস্তুই বহন করা নিষিদ্ধ হওয়ায় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। যে কোন ধরনের পরিবহনই হোক না কেন পারমাণবিক বর্জ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এগুলোর মধ্যে কয়েক ধাপবিশিষ্ট শিল্ডিংয়ের ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পরিবহনের যাত্রাপথও যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত।

সবদিক বিশ্লেষণের দ্বারা এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখে সব ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞের মতে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নয়, বরং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

তাই যেসব দেশ নতুন করে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তাদের চুল্লি পরিচালনার ক্ষেত্রে যেমন নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য পরিবহনের ক্ষেত্রগুলোর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। উভয়ক্ষেত্রেই আছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য কতগুলো নিয়ম ও নীতিমালা। সেসব নীতিমালা বিবেচনায় রেখেই এগুতে হবে। নতুবা দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম এবং পরিবেশ মারাত্মক পারমাণবিক ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।

লেখক : পরমাণু বিজ্ঞানী এবং অধ্যাপক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ২ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: