প্রথম পাতা > অপরাধ, ধর্মীয়, বাংলাদেশ, সমাজ > নাসির নগরে হিন্দুদের ওপর হামলা নিয়ে কিছু মতামত

নাসির নগরে হিন্দুদের ওপর হামলা নিয়ে কিছু মতামত

নভেম্বর 2, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

হায় বি.বাড়িয়া, ছিঃ সাম্প্রদায়িকতা

temple_vendalisedঅজয় দাশগুপ্ত : হিন্দুরা এখন কী করবে? আবার কিছুদিন পর আর কোন আক্রমণ বা মূর্তি নিধন উৎসবের অপেক্ষা? না পলায়ন? পালাতে পালাতে তো আর বাকী রইলো না কিছুই। যারা তাদের ভোটে জয়ী হয় তারাও কিছু করে না, আর যারা ভাবে হারে, তারা তো মারতে পারাটাই ‘সওয়াব’ বলে মানে। যে কোনো ঘটনার জের ধরে একটি সম্প্রদায়ের ওপর এমন নির্যাতন কোথাও চোখে পড়ে না। পাকিস্তানেও না। কারণ তার দফারফা করে নিয়েছে আগেই। আমরা সবসময় দু’নৌকায় পা দিয়ে চলা জাতি। মনে অন্তরে কাজে সাম্প্রদায়িকতা আর মুখে উদারতা। এর মাশুল দিতে গিয়ে উজাড় হবার পথে হিন্দু সম্প্রদায়।

কিছুদিন পরপর এত উৎসাহ আর উত্তেজনায় ঝাঁপিয়ে পড়ার পরও আমরা বলি দেশে কোন সাম্প্রদায়িকতা নাই। যুগে যুগে আক্রমণের কারণ বা কৌশল বদলালেও মূল বিষয়টা এক। এখন শুরু হয়েছে ডিজিটাল আক্রমণ। ভাইরাস মিডিয়া বাহিত। খোলা দুনিয়ার যুগে সামাজিক মিডিয়া নামে পরিচিত ফেইসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে রাতদিন মানুষের আনাগোনা চালু থাকে। জীবন জগতের সব বিষয়ে মানুষ বলছে, লিখছে, ছবি দিচ্ছে। সব বিষয়ের মতো এখানেও ভেজাল ঢুকে আছে। চুরি করে লেখা, ছবি চুরি করা একজনের দায় আরেকজনের ওপর চাপানো ফেইক আইডি খুলে কাউকে বিপদে ফেলা কিছুই বাদ নাই। এসব কথা কারো অজানা না। দেখবেন আর কোন বিষয়ে এত উগ্রতা বা উত্তেজনা তৈরি হয় না। ধর্মেও না। যেই জানবে কোন সংখ্যালঘু বা হিন্দু ধর্মকে কটাক্ষ করে কিছু করেছে সত্য মিথ্যার ধার না ধরেই শুরু হয়ে যাবে মূর্তি ভাঙ্গা। হিন্দুদের বাড়িঘর লুট আর মারধরের পালা। যে একাজ করলো বা যারা ধর্মকে অপমান করলো তাদের খুঁজে বের করে আইনের হাতে দেয়া বা শাস্তি নিশ্চিত করার মত কাজে নেই কেউ। একদল উগ্র কিছু মানুষ শুরু করে দেবে তাদের আসল এজেন্ডার বাস্তবায়ন। এই একদল লোক বাইরে একদল হলেও এদের পেছনে এদের ভেতরে এদের নীরব সমর্থনে আছে বিশাল জনগোষ্ঠী। এটাই হলো আসল চিত্র।

এটা একদিনে তৈরি হয়নি। সমাজের সর্বত্র উগ্রতা আর সাম্প্রদায়িকতা জাগিয়ে রেখে কীভাবে অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা সম্ভব? কেউ যদি আসল জায়গায় হাত না দেয় আর বলতে থাকে এগুলো কিছু মব বা উগ্র মানুষের কাণ্ড এ সমস্যা ইহজীবনেও কূল কিনার খুঁজে পাবে না। এটা মানি বেশীরভাগ মানুষ এসব করেন না। তারা দাঙ্গা হাঙ্গামায় নাই। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের মৌনতা কি এটা বোঝায় না যে, হলে হোক আমাদের কিছু করার বা বলার নেই? অনেকে বলেন রাজনীতি দায়ী। ভুল। রাজনীতি উস্কে দেয়ার কাজটি করে। কিন্তু মনে বা অন্তরে যে বিভেদ ও বিদ্বেষ তার বীজ কোথায় জানলেও বলা নিষেধ।

খেয়াল করবেন কোন রাজনীতি বা সামাজিক সংগঠনও আর এ বিষয়ে মাথা ঘামায় না তেমন। যাদের মাথা ঘামে তারাও আছে বিপদে। রাজনীতি মনে করে ভোটের বাক্সে বিপদ টেনে লাভ নেই। পেলেন তো জবাব এবার? ভোটের বাক্স মানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ফলে এটাই বুঝতে হবে বেশীরভাগ মৌনতা মানেই প্রশ্রয়। এভাবে হিন্দুরা যাবে। মূর্তি যাবে। রামুর বুদ্ধ যাবে। দিনাজপুরের যীশু যাবে। ভালো ভদ্র আধুনিক মননশীল মুসলমান থাকতে পারবে তো? কর্মা বা কর্মের নিয়মই হচ্ছে যা করা হবে তার ফল ভোগ করা। জানি আমাদের পরিচিতজন মিডিয়া বন্ধু অজস্র সাধারণ মানুষ এসব ঘৃণা করেন। এখনো দেশে বিদেশে উদার অসাম্প্রদায়িক বাঙালিই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু উহু আহাতে তো কাজ হবে না। চাই প্রতিরোধ। সরকার ও আওয়ামী লীগ মুখে বললেও কাজে ওলামা লীগ। আর বিএনপি কবরের মত নীরব নিথর। সাধারণ মানুষও আক্রান্ত রা জোট না বাধলে রুখে না দাঁড়ালে কথিত মানববন্ধন আরো হাস্যকর হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ বাঁচাতে এখন শক্ত হবার বিকল্প কোথায়?

সূত্রঃ রাইজিং বিডি, ১ নভেম্বর ২০১৬

নাসিরনগরের ঘটনায় প্রশ্ন ও প্রত্যাশা

nasir-nagar-destruction-8সোহরাব শান্ত : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে গত রোববার যে ঘটনা ঘটে গেল তা আমাদের সবাইকে ব্যথিত করেছে। পবিত্র কাবা ঘর তথা ইসলাম ধর্মের অবমাননাকে কেন্দ্র করে সেখানে হিন্দুদের বাড়িঘর এবং তাদের বেশ কয়েকটি মন্দিরে হামলাভাঙচুর হয়েছে। প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো বাড়িতে বাসিন্দাদের উপর শারীরিক আক্রমণসহ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ইত্যাদি লুট হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একইদিন হিন্দুবাড়ি ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জের মাধবপুরেও। এ ধরণের ঘটনা খুবই দুঃখজনক, বেদনাদায়ক, নিন্দনীয় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

নাসিরনগরের সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষজন বর্তমানে ভয়ানক আতঙ্কের মধ্যে আছেন। গণমাধ্যমে খবর এসেছে, হিন্দু পাড়াগুলোর অনেক ঘরেই তালা ঝুলছে। অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কোনো কোনো হিন্দু পরিবার সুহৃদ মুসলমান বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়নের রসরাজ নামক জনৈক সনাতন ধর্মাবলম্বীর ফেসবুক ওয়ালে ফটোশপের মাধ্যমে সম্পাদনা করে বানানো একটি আপত্তিকর ছবি পোস্ট করা নিয়ে। ফেসবুকে ছবিটা কিছু মানুষের নজরে আসার পরই গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে মারধর করে গত শুক্রবার পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ রাতেই আইসিটি আইনে মামলা দিয়ে পরদিন রসরাজকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজাতে পাঠায়। ঘটনা জানাজানি হলে উপজেলা সদরে বিক্ষুব্ধ মুসলমানরা এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে থাকে। শনিবার সারাদিন বিক্ষিপ্তভাবে এ ঘটনার প্রতিবাদ হয়। উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে রোববার সকালে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেয় স্থানীয় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত। হেফাজতে ইসলামও আলাদা কর্মসূচি দেয়। তবে সরাসরি হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে নয়, ‘খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ নামে!

পরদিন রোববার দুপুরের ঘটনা তো গণমাধ্যমের কল্যাণে কমবেশি সবাই আমরা জানি। ‘তৌহিদী জনতা’ নাম দিয়ে একদল মানুষ পুরো নাসিরনগর সদরের হিন্দু পাড়াগুলোয় নজিরবিহীন ভাঙচুর চালায়। হামলা হয় অভিযুক্ত রসরাজের গ্রাম হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামে। একইদিন সন্ধ্যায় হামলা হয় পাশ্ববর্তি মাধবপুর উপজেলার (হাবিগঞ্জ জেলা) হিন্দু পাড়াগুলোয়। গণমাধ্যমে খবর এসেছে এ ঘটনার জের ধরে সোমবার সন্ধ্যায় একদল মুসলমান সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার কয়েকটি মন্দিরে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে। এটুকু অবলোকন করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

অবশ্য আশার কথা হচ্ছে, নাসিরনগর উপজেলা সদরে যখন হিন্দুদের উপড় হামলা হয়, তখন তা ঠেকানোর চেষ্টা করে তাদের প্রতিবেশি মুসলমানেরা। অনেক মুসলমান পরিবার তাদের পরিচিতঅপরিচিত হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছেন। বিবিসি বাংলা’র মতো গণমাধ্যমের খবরে এ বিষয়টা উপস্থাপন করা হয়েছে। আক্রান্ত হিন্দুরা এ জন্য মুসলমান প্রতিবেশিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

বর্তমানে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা, বিশেষত নাসিরনগর উপজেলার হিন্দুরা ভয়ানক ঝুঁকির মধ্যে আছেন। আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে তারা আতঙ্কগ্রস্ত। পালিয়ে বেড়ানোর পাশাপাশি তাদের কোনো কোনো পরিবার অদূর ভবিষ্যতে ভারত চলে যাওয়ার কথা বিবেচনা করলে ভুল বলঅ হবে না। ছোটবড় নানা ইস্যুতে এ দেশের হিন্দুরা বাপদাদার ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে ভারত চলে যেতে বাধ্য হয়েছেস্বাধীনতার পর থেকে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে।

এদিকে সোমবার বিকেলে নাসিরনগর উপজেলা সদরে একটি ‘শান্তি ও সম্প্রীতি সমাবেশ’ হয়েছে। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ নেতাসহ স্থানীয় মুসলীম সংগঠনগুলোর (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এবং হেফাজতে ইসলাম) নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, হিন্দুদের নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে কাজ করবেন।

আমরা মনে করি, সম্প্রীতি সমাবেশে ভাল ভাল কথা বলার চেয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আস্থা ফেরানোটা প্রশাসনের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত ভাল কাজ করে দেখানো জরুরী। যেন তারা নিজেদর নিরাপদ ভাবতে পারে। তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া জরুরী। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো মহল কোনো ইস্যুতে সংখ্যালঘুদের উপড় হামলা করতে না পারে, এজন্য বর্তমান ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরী।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নাসিরনগরের ঘটনায় করা পৃথক তিন মামলায় কয়েক হাজার মানুষকে আসামী করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা অতীতের মতো প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে স্থানীয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে ‘আইওয়াশ’ করা হবে না। কয়েক মাস আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরে মাদ্রাসা ছাত্রদের তাণ্ডবের ঘটনায় এ ধরণের প্রাশাসনিক উদ্যোগ আমরা দেখেছি। যেখানে প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে স্থানীয় বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে আইওয়াশ করা হয়েছে।

নাসিরনগরের ঘটনার পেছনের কারণ বের করতে এবং প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করতে কিছু প্রশ্নের উত্তর বের করাও জরুরীপ্রথমত, গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অভিযুক্ত রসরাজ একজন জেলে। পিছিয়ে থাকা ওই পেশার একজন মানুষ হঠাৎ কেন এমন একটা কাজ করতে গেলেন? ফটোশপে এত নিখুঁতভাবে এমন নোংরা ও আপত্তিজনক ছবি তৈরির মতো শিক্ষা, যোগ্যতা ও দক্ষতা তার আছে কিনা? যদি না থাকে তাহলে এর পেছনে কে বা কারা? রসরাজের ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড অন্য কেউ জেনে তা ব্যবহার করতো কিনা? যারা বড় কোনো স্বার্থ হাসিল বা সামাজিক সম্প্রিতি নষ্টের ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্যে এ কাজ করেছে? তদন্তে বিষয়টা বের করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। তা রসরাজ নিজে হোক বা পেছনে থাকা মানুষজন যেই হোক। যেন ভবিষ্যতে কেউ ইসলাম ধর্মসহ অন্য কোনো ধর্মের মৌলিক বিষয়াদি নিয়ে অবমাননাকর কোনো কাজ করার সাহস না করে।

দ্বিতীয়ত, ‘খাঁটি’ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতনামের সংগঠনটির উদ্ভব কখন হলো? কেন হলো? কয়েকটি সূত্র বলছে, হেফাজতে ইসলামের স্থানীয় নেতাকর্মীরাই ‘খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ নাম নিয়ে নাসিরনগরের খেলার মাঠে সমাবেশ করেছে। গণমাধ্যমে আসা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা হেফাজতে ইসলামের বক্তব্যও এ তথ্যের সত্যতা জানান দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, হেফাজতে ইসলাম কোন উদ্দেশ্যে, ‘খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ নাম দিয়ে মাঠে এলো? নাসিরনগর সদর ও হরিপুর ইউনিয়নে হিন্দু বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার পেছনে তাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের কোনো প্রভাব আছে কি না? ‘তৌহিদী জনতা’ নাম দিয়ে কারা হামলা চালালোএই প্রশ্নের উত্তর বের করাও জরুরী। অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এই ব্যানারে প্রতিবাদ এবং আক্রমণাত্মক কাজ হয়েছে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত (যাদের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কোনো যোগ নেই) তাদের প্রতিবাদ সমাবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে অনুসারীদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে? নাসিরনগর কলেজ মোড়ে তাদের প্রতিবাদ সমাবেশ চলার সময় তাদরে অনুসারীরা হামলায় অংশ নিয়েছে কিনা? হামলার ঘটনার পর তাদের ভূমিকা কি? সংগঠনটির নেতারা কি হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন?

চতুর্থত, গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী উপজেলা সদরের পূর্বদিক থেকে ট্রাকে করে একদল তরুণ এসেছিল। স্থানীয়রা বলছে হামলাকারীরা বেশিরভাগই ছিল অচেনা মুখ। ট্রাকে করে আসা তরুণরাই কি তাহলে মূল হামলা ভয়াবহভাবে চালালো? ওই তরুণের দল কারা? কোথা থেকে এসেছিল? কে বা কারা তাদের মদতদাতা? নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়ন লাগোয়া হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলায় হামলার পেছনেও কি ওই গ্রুপটার কোনো যোগসূত্র বা অংশগ্রহণ আছে?

পঞ্চমত, রোববার হামলা হওয়ার আগে থেকেই হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিল। শনিবার রাতে মাইকিং করে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উত্তেজিত করা হয়েছে। প্রতিবাদের নামে ফেসবুকে অনেকেই আপত্তিজনক সেই ছবি শেয়ার করেছেন। এতেও সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ছবি শেয়ারকারীদের মধ্যে স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতাসহ নানা পেশার মানুষ ছিলেন। এতকিছু জানার পরও প্রশাসন কেন ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় নি?

গণমাধ্যমে এসেছে নাসিরনগরের হিন্দু বাড়িঘর এবং মন্দিরগুলোতে হামলার সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল। এটা কেন হলো? থানার ওসি এবং অন্য পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা কেন ওতোটা সক্রীয় ছিল না? সোমবারের শান্তি ও সম্প্রীতি সমাবেশে জেলা প্রশাসক এবং জেলা এসপির উপস্থিতিতে নাসিরনগর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নিজে শনিবার রাতের মাইকিংয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজেও সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাহলে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তার বা তার পরিষদের ভূমিকা কি ছিল? তার কথা কি থানাপুলিশ পাত্তা দেয় নি? না দিয়ে থাকলে কারণ কি? পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাসিরনগরের ইউএনও কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সহযোগিতা চেয়েছিলেন কিনা? চেয়ে থাকলে তাদের ভূমিকা কী ছিল?

ষষ্ঠত, স্থানীয় সংসদ সদস্য তথা মৎস ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী এ ঘটনার খবর কখন পেয়েছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা কী ছিল? তিনি পরিস্থিতি সামলাতে কাদের কীভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন? নির্দেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ঠরা সঠিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা?

সপ্তমত, হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার পেছনে কি শুধুই ধর্মীয় উন্মাদনা কাজ করেছে, নাকি উপজেলা বা নাসিরগরের বাইরের কোনো গোষ্ঠির পূর্বপরিকল্পনা জড়িত ছিল? এ ঘটনায় ভয়ার্ত হিন্দুরা এদেশ ছেড়ে ভারত চলে গেলে স্থানীয় কাদের লাভ? সম্পত্তি দখলের লোলুপ চোখ কারো কারো আছে কিনা?

তদন্ত কমিটিগুলোর উচিৎ হবে এ প্রশ্নগুলোর যথাযথ জবাব খোঁজা। এছাড়াও তারা তাদের নিজস্ব পদ্ধতীতে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ রহস্য উদ্ঘাটন, বিশ্লেষণ এবং দোষীদের চিহ্নিত করে আইনী ব্যবস্থার সুপারিশ করবেনএটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মঙ্গলবার নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দুপাড়া ও মন্দিরগুলো পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিনিধি দল। এর আগে প্রশাসনের নানা স্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এসব স্থান পরিদর্শন করেছেন। সরকার হিন্দুদের নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সবকিছু করবেন বলে বিশ্বাস রাখি। সামাজিক সম্প্রিতি রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসবেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই প্রত্যাশা করতেই পারি। নাসিরনগরের স্থানীয় মুসলমানদের একটা অংশ তাদের প্রতিবেশীদের রক্ষায় যেভাবে সাহস করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন, তা এখনো এই প্রত্যাশার খোরাক যুগিয়ে যাচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও গদ্যকার

সূত্রঃ রাইজিং বিডি, ২ নভেম্বর ২০১৬

পুষিয়ে দেওয়া’ নীতি, রামু থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া

গোলাম মোর্তোজা

দৃশ্যপট এক:

কয়েকদিন আগে তার একটি ঘর ছিল। ঘরে খুব সাধারণ কিছু আসবাবপত্র ছিল। মেলামাইনের প্লেট, সিলভারের পাতিল। এখন ঘর নেই। কুপিয়ে ঘরের টিনগুলো ঝাঁঝরা করে ফেলা হয়েছে। প্লেট, পাতিল কিছুই অবশিষ্ট নেই। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি এখন রাস্তায় পরিবার পরিজন নিয়ে। মাথার ওপর আশ্রয় নেই, পকেটে অর্থ নেই।

দৃশ্যপট দুই:

কয়েকটি ঘর নিয়ে একটি স্বচ্ছল পরিবার। ঘরগুলো কুপিয়ে, ভেঙেচুরে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। ঘরের ভেতরের প্রায় সবকিছুই ভাঙচুর করা হয়েছে। টাকাপয়সাস্বর্ণলুটপাট করে নিয়ে গেছে। কয়েকদিন আগে যাদের সব ছিল, এখন তাদের প্রায় কিছুই নেই। না, কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে নয়, বন্য পশুর আক্রমণেও নয়কিছু মানুষরূপী প্রাণী এই কর্ম করেছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লিখছি। লেখাটি পড়ে কারও হৃদয় বেদানসিক্ত হবে, আবার কেউ ক্ষিপ্ত হয়ে প্রশ্ন করবেন ‘মসজিদ বা ইসলামকে অসম্মান করার সময় তো কিছু লেখেন না’। এদেরও নাম মানুষ, দেখতে হুবহু মানুষের মতো।
বাবরি মসজিদ যারা ভাঙে, গরুর মাংস খাওয়ার জন্যে যারা মানুষ পিটিয়ে হত্যা করে, মহানবী (.)- কে যারা অসম্মান করে, তাদেরকে ঘৃণা করিমানুষের মতো মনে করি, মানুষ মনে করি না। যা সবসময় বলি এবং লিখি। যারা অভিযোগ করেন ‘লেখেন না’ তারা আসলে মানসিকভাবে অন্ধ। মানসিক অন্ধদের থেকে দূরে থাকতে চাই। বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয়ে আমরা যারা সংখ্যায় বেশি, তাদের কারও দ্বারা সংখ্যায় কম এমন কোনও জনগোষ্ঠী যখন আক্রান্ত হন, তখন লেখা এবং পাশে দাঁড়ানোর তাগিদটা বেশি অনুভব করি। কারণ তাদের দেখে রাখার দায়িত্ব আমাদের। ইসলাম ধর্মও তাই বলে।

দৃশ্যপট এক ও দুই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাণ্ডব প্রসঙ্গে আসি।

. ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনাটি চার বছর আগের রামুর ঘটনার হুবহু ফটোকপি। রামুতে আক্রমণের আগে একজনের ফেসবুকে ধর্মীয় অসম্মানজনক পোস্টের অভিযোগ এনে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। ফেসবুকের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে মাইকিং করে লোক জড়ো করে বৌদ্ধদের বাড়িমন্দিরে আক্রমণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে জানা গিয়েছিল যার নামে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে পোস্ট দিয়ে উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছিল, তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিল না। পরিকল্পিতভাবে তার নামে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় এখনও প্রমাণ হয়নি যে, ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি রসরাজের নয়। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা যাচ্ছে, রসরাজ প্রায় নিরক্ষর যুবক। প্রাথমিক শিক্ষাও শেষ করেনি। তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে এবং সেই ফেসবুক থেকে এমন পোস্ট দিয়েছিলেন, নিশ্চিত বিশ্বাস করা একটু কষ্টকর। তদন্তে প্রকৃত চিত্র নিশ্চয়ই জানা যাবে। তবে বলে রাখা ভালো যে, গ্রামেগঞ্জের খুব সাধারণ, শিক্ষা যাদের রসরাজের মতো তাদেরও অনেকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। এবং তারা ফেসবুকের ভয়াবহতা বা নিরাপত্তা বিষয়ে কোনও জ্ঞান রাখেন না। অ্যাকাউন্ট কেউ একজন খুলে দেয় এবং পাসওয়ার্ড শুধু যার অ্যাকাউন্ট তার কাছেই থাকে না।

এক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে সঠিক তদন্তে তা জানা যাওয়ার কথা। ঘটনার একদিন পর রসরাজকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। পুলিশের ভূমিকা এক্ষেত্রে সমর্থন করি। যদিও কালো আইনের ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করাটা সমর্থন করি না। প্রচলিত আইনেই তাকে গ্রেফতার করা যেত, এবং তাই করা উচিত ছিল। যেহেতু তার ফেসবুককে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, সেহেতু তাকে গ্রেফতার করা সঠিক সিদ্ধান্ত।

রামুর আক্রমণ সংঘটিত হয়েছিল আওয়ামী লীগবিএনপিজামায়াতজাতীয় পার্টির সমন্বয়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আক্রমণ হয়েছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের দু’টি গ্রুপের দু’টি পৃথক সমাবেশ থেকে। একটি গ্রুপের সমাবেশে স্থানীয় আওয়ামী নেতাকর্মীরা যোগ দিয়েছিলেন। চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সুরুজ আলী মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। সমাবেশে বক্তৃতা করেছেন।

অভিযোগ আছে তিনি উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়েছেন। সুরুজ আলী বলেছেন, তিনি উত্তেজনাকর বক্তব্য দেননি। শুধু রসরাজের ফাঁসি চেয়েছেন বক্তৃতায়। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য না মিথ্যা তা জানার আগেই মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দিয়ে ‘ফাঁসি’ চাওয়া উত্তেজনাকর বক্তব্য নয়!

. এলাকায় উত্তেজনা ছিল। একটির নামের আগে ‘খাঁটি’ শব্দ দিয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত দুই ভাগ হয়েছে। তারা উত্তেজনাকর পরিবেশে প্রশাসনের কাছে সমাবেশের অনুমতি চেয়েছে। প্রশাসন অনুমতি দিয়েছে। স্থানীয় ইউএনও অনুমতি কেন দেওয়া হলো, প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, সমাবেশ করলে উত্তেজনা কমতে পারে, এই বিবেচনায় অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সমাবেশকারীরা কথা দিয়েছিল শান্তি বজায় রাখা হবে, কোনও অঘটন ঘটবে না। ‘সমাবেশ করলে উত্তেজনা কমতে পারে’ এই বিবেচনার প্রতি সম্মান রাখলেও, কিছু গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে।

. সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। হিন্দুদের মন্দির বা বাড়ির নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

. প্রতিমামন্দিরবাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় ধরে। এই দীর্ঘ সময়ে পুলিশের প্রতিরোধ দৃশ্যমান ছিল না। বিজিবিকেও ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

. সমাবেশের অনুমতি চেয়েছিল দু’টি সংগঠন। নিশ্চয়ই সংগঠনের পক্ষে ‘ব্যক্তি’ আবেদন করেছিল। তারা ‘অজ্ঞাতনামা’ হতে পারে না। কিন্তু মামলা হয়েছে ‘অজ্ঞাতনামা’ এক হাজারের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে।

. আক্রমণ হয়েছে দু’টি সমাবেশ থেকে। সংগঠন দু’টির নেতারা সবাই পরিচিত, ‘অজ্ঞাতনামা’ নয়।

. দু’টি সংগঠনের মধ্যে একটি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজতে ইসলামের অঙ্গসংগঠন। হেফাজতের সঙ্গে প্রকাশ্য এবং গোপনে সরকারের ভালো সম্পর্ক।

. এত বড় তাণ্ডব চলার পরও, প্রথমাবস্থায় ঘটনা চাপা দিতে চেয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এসপি স্বীকারই করতে চাননি যে, ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা ধরে আক্রমণ হয়েছে।

. ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২ জন মন্ত্রী। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী সাইদুল হক। উত্তেজনা চলাকালীন থেকে তাণ্ডবের ৩ দিন পরে পর্যন্ত তারা এলাকায় যাননি। ঘটনাস্থল নাসিরনগর মন্ত্রী সাইদুল হকের নির্বাচনি এলাকা।

. নাসিরনগর উপজেলায় ১৩ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ৭৫ জন মেম্বার, ১ জন উপজেলা চেয়ারম্যান, ২ জন ভাইস চেয়ারম্যান, অনেক চৌকিদার, আক্রমণ প্রতিরোধে কারও কোনও ভূমিকা দৃশ্যমান ছিল না।

. ফকিরাপুল বা যাত্রাবাড়িতে গাড়ি পোড়ানো মামলার হুকুমের আসামী হন মির্জা ফখরুল বা খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা যে সমাবেশে যোগ দিয়ে ফাঁসি দাবি করেন এবং সেই সমাবেশ থেকে আক্রমণ হয় হিন্দুদের মন্দিরবাড়িতে, এক্ষেত্রে হুকুমের আসামী কার বা কাদের হওয়ার কথা?

. ঘটনার তিন দিন পর আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তার প্রেক্ষিতে করা সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, ‘… আমরা তাদের ক্ষতির পরিমাণ জেনে তা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।’

কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এটাই মূল কথা। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র হিন্দুবৌদ্ধ বা পাহাড়িদের নিপীড়ননির্যাতনের বিষয়টি দেখে ‘ক্ষতি পুষিয়ে’ দেওয়ার নীতিতে। রামুতে ৪০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে নতুন মন্দির বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ‘ক্ষতি পুষিয়ে’ দেওয়া হয়েছে। ‘ঐতিহ্য’ আবার কী? ৪০০ বছরের পুরানো জিনিসের জায়গায় নতুন ঝকঝকে মন্দির বানিয়ে দিয়েছি, আবার কথা কিসের!

যখন যারা বাংলাদেশের সরকার পরিচালনা করেন, এটা তাদের নীতি। এই নীতি অনুযায়ী নাসিরনগরের মন্দিরবাড়িগুলো তৈরি করে ‘ক্ষতি পুষিয়ে’ দেওয়া হবে। প্রতিমাগুলো তাদের কাছে শুধুই ‘মাটির মূর্তি’! তা তৈরি করার জন্যে টাকা দেওয়া হবে। যশোরের অভয়নগরে বা পাবনার সাথিয়াতে ঠিক একই কাজ করা হয়েছে।

একজন ধর্মবিশ্বাসী হিন্দুর কাছে, তা যে ‘মাটির মূর্তি’ নয়, প্রাণসম্পন্ন প্রতিমাদেবতা, নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন প্রতিমাদেবতাকে, নিজের ওপর আঘাতের চেয়ে অনেকগুণ বেশি আঘাত পান, প্রতিমার ওপর আঘাত আসলে, আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকরা তা কোনও দিন অনুধাবন করার চেষ্টাই করেন না।

হিন্দুবৌদ্ধ বা পাহাড়িদের যে ‘মন আছে’ ‘হৃদয় আছে’রাষ্ট্র তা বিবেচনায় নেয় না। ‘মনহৃদয়ে’ আঘাত লাগতে পারে, সেই আঘাত যে অর্থ দিয়ে দূর করা যায় নাতা বোঝার মতো বোধই আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনকারীদের থাকে না। তারা সবকিছু বিবেচনা করেন ‘অর্থ এবং ক্ষমতা’র মাপকাঠিতে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হলেও যেহেতু তার নির্বাচনি এলাকায় নয়, এ কারণে আইনমন্ত্রী সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকা হলেও, তিনি যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এখন এমপি হওয়ার জন্যে ভোটার বা এলাকার মানুষের প্রয়োজন নেই। তার না যাওয়ার পেছনে এটাই হয়তো বড় কারণ। আর একটি কারণ হতে পারে, তিনি হয়তো হিন্দুদের ‘মৎস্য ও প্রাণী সম্পদে’র মতোও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন না। সুতরাং তারা থাকলবাঁচল না মরল, তাতে কী যায় আসে!

. আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে হিন্দুবৌদ্ধ বা পাহাড়িদের ওপর, তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়ের ওপর আক্রমণের কোনও সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। বিচার হয়নি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ‘পুষিয়ে দেওয়া’ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কিছুই করা হয়নি। অধিকাংশ জায়গায় আক্রমণের সঙ্গে আওয়ামী লীগবিএনপিজামায়াতজাতীয় পার্টি অর্থাৎ সব রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ থাকে। কোনও কোনও জায়গায় যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তাদের একক অংশগ্রহণে আক্রমণনির্যাতন হয়।

যেমন পূর্ণিয়াদের নিপীড়ন করেছিল বিএনপিজামায়াত ২০০১এর নির্বাচনের পর। এই সরকারের সময় অভয়নগর, সাথিয়াসহ অনেক জায়গায় আক্রমণ হয়েছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দ্বারা। রামুতে প্রশাসনের সহায়তায় সবাই মিলে, পার্বত্য চট্টগ্রামেও প্রশাসনের সহায়তায় সবাই মিলেই আক্রমণ করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইতিমধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বারদের নিষ্ক্রিয়তা দৃশ্যমান। প্রশানের নির্বিকারতত্ত্ব গোপন থাকছে না। সরকারি তদন্তে প্রকাশ হবে কিনা জানি না, তবে গোপন থাকবে না যে কারা নিষ্ক্রিয় ছিল, কারা আক্রমণে উৎসাহ যুগিয়েছে, আর কারা আক্রমণ করেছে।

তদন্তের আগেই বলছি এবং প্রত্যাশা রাখছি বলাটা মিথ্যা প্রমাণ হোক। রামুর ক্ষেত্রে যেমন অপরাধীদের শাস্তির দিকে দৃষ্টি না দিয়ে মন্দিরবাড়ি বানিয়ে, অর্থ দিয়ে ‘পুষিয়ে দেওয়া’ হয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটতে যাচ্ছে।

. আক্রমণকারীরা ‘নরকে যাবে, হুর পরীও পাবে না’। কেন বলছেন, কার উদ্দেশে বলছেন? তারা স্বর্গে গেল না নরকে গেল, হুর পরী ৭০ টি না ৭০ হাজারটি পেল কী না পেল, তাতে আক্রান্তদের কী যায় আসে? ‘আক্রমণকারীরা নরকে যাবে’ বুঝলাম, তো সহায়তাকারীরা কোথায় যাবে? আক্রমণ যাদের ঠেকানোর দায়িত্ব ছিল, অথচ ঠেকায়নিতারা কোথায় যাবে?

নির্যাতন নিপীড়ন করে নরকে যাবে, যারা নিপীড়িতদের নিয়ে পুষিয়ে দেওয়ারর রাজনীতি করে সুবিধা নিবে কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি দিবে নাতারা কোথায় যাবে?

ক্ষমতা তুমি অর্থ বোঝো, দখল বোঝো, দমন বোঝো! মন বোঝো না, হৃদয় বোঝো না!! মানুষ বোঝো না!!!

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ২ নভেম্বর ২০১৬

লাঠিসোটা নিয়েই প্রতিবাদ সমাবেশে ছিল আ. লীগ নেতাকর্মীরা

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, উসকানি দেওয়ায় জড়িত থাকার কারণেই হামলা ও ভাঙচুরের সময় স্থানীয় কোনও জনপ্রতিনিধিকে তারা পাশে পাননি।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে এলাকার একাধিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য অভিযোগ করেন, ‘যাদেরকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি বানিয়েছিলাম হামলার দিন তারা যেন কেমন অচেনা হয়ে গেলেন। আবার হামলার পরদিন যখন বিভিন্ন স্থান থেকে সরকারিবেসরকারি এবং রাজনৈতিক নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে আসলেন, তখন সবার সামনে তোষামোদি করা হচ্ছে।’ নেতাদের এই ভূমিকা ভবিষতে ভোট চাওয়ার সময় মনে রাখবেন বলেও জানান তারা। তাদের দাবি, জনপ্রতিনিধিদের এমন আচরণের কারণ অনুসন্ধান করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ আলী। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে রসরাজের (যার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে বিতর্কিত ছবি আপলোডের অভিযোগ রয়েছে) ফাঁসি দাবি করেছি।’

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের উপজেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক মুফতি ইসহাক আল হোসাইনও স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ আলী তাদের সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে তিনি কোনও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি ইসহাক আল হোসাইন বলেন, ‘সম্ভবত তার (সুরুজ আলী) বক্তব্য রেকর্ড আছে। সেটা না শুনে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে আমাদের সমাবেশ থেকে কেউ গিয়ে হামলা চালায়নি। ইসলাম সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করে না। অন্য ধর্মের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইসলামে স্পষ্ট করে বলা আছে।’

এ ব্যাপারে নাসিরনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এটি এম মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ওই দিন সমাবেশে অংশ নিলেও আমি প্রতিবাদকারীদের থামানোর চেষ্টা করেছি। উসকানিমূলক কিছু বলিনি।’

বুধবার দুপুরে হরিপুর গ্রাম পরিদর্শনকালে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর৩ আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বলেন, ‘তদন্তে কারও নাম বের হয়ে আসলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সে দলেরই হোক বা বাইরের হোক।’ এ সময় তিনি ব্যর্থতার জন্যে নাসিরনগর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তার অপসারণের দাবি জানান।

.লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার বলেন, ‘উসকানি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ঘটনার উৎপত্তিস্থল হরিপুর। যে রসরাজ দাসের ফেসবুক থেকে কাবা শরিফ অবমাননার কথা বলা হচ্ছে, সে পেশায় একজন জেলে এবং হরিপুর মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ওই সংগঠনের সভাপতি হলেন ১৯৭১ সালের রাজাকার তাইজুদ্দিন এর ছেলে ফারুক মিয়া। ফারুক আবার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। ফেসবুকে ঘটনার পর রসরাজকে ফারুক বেধড়ক পিটিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।’

এ ঘটনার পেছনে দূরভিসন্ধি রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উসকানিদাতা চিহ্নিত করতে হলে আগে ফারুককে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলে ঘটনার প্রকৃত উসকানিদাতারা বের হবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এভাবে একের পর এক ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। হামলাকারীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’। তদন্ত কাজে সহযোগিতা করার জন্য তিনি সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করেন।

ঘটনার তিন দিন পর মঙ্গলবার রাতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মৎস্য, প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক নাসিরনগরে আসেন। তবে তিনি বুধবার সারাদিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাননি। স্থানীয় ডাক বাংলোয় অবস্থান করেন। এ নিয়েও এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এদিকে মন্দির ও বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনায় গঠিত পুলিশের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে মঙ্গলবার সকাল থেকে। প্রাথমিকভাবে ঘটনার নেপথ্যে কারা, কী কারণে এমন হলো এ বিষয়ে তারা খোঁজ নিতে শুরু করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং পুলিশের তদন্ত টিমের প্রধান মুহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার ব্যাপারে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। সময় মতো সব কিছু জনানো হবে।’

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এলাকার পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত। তবে আক্রান্তদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক এখনও রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে মোট ১৪টি মন্দিরে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১১টি ব্যক্তিগত মন্দিরকে পাঁচ হাজার টাকা করে ও নাসিরনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বজনীন তিনটি মন্দিরকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ১০টি মন্দিরকে ১০ হাজার টাকা এবং ২৯টি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রসরাজ দাস নামক এক যুবকের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গত রবিবার হামলা চালিয়ে মন্দির ও বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। এর আগে শনিবার উপজেলার হরিণবেড় গ্রামের ওই যুবককে পুলিশ গ্রেফতার করে।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ৩ নভেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: