প্রথম পাতা > ইতিহাস, বাংলাদেশ, শিল্প > ইতিহাসের সাক্ষী ‘উত্তরা গণভবন’

ইতিহাসের সাক্ষী ‘উত্তরা গণভবন’

uttara-gonobhabanনাজমুল হাসান : ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিঘাপতিয়া রাজবাড়িকে ‘উত্তরা গণভবন’ হিসেবে ঘোষণা করেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তখন থেকেই গণভবনে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ ছিল। স্থানীয় জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর গণভবন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই দূরদূরান্তের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে রাজবাড়ির আঙ্গিনা।

নাটোরের মাদ্রাসা মোড় থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি তথা উত্তরা গণভবনের অবস্থান। দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দয়ারাম রায়। দয়ারাম ছিলেন নাটোরের রানী ভবানীর অধীনস্থ নায়েব। তিনি তাকে এত বিশ্বাস করতেন যে, রানীর পক্ষে দয়ারাম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও স্বাক্ষর করতেন। তাকে দিঘাপতিয়া পরগনার জমিদারি উপহার দেন রানী। ১৭৩৪ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর দয়ারাম রায় স্থাপত্যকলার অন্যতম নিদর্শন এই দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেন। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে প্রাসাদটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেলে রাজবাড়িটি

পুনর্নির্মাণ করা হয়। দিঘাপতিয়া রাজবংশের রাজারা ১৭১০ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিঘাপতিয়া রাজবাড়িকে ‘উত্তরা গণভবন’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর বেশ কয়েকবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এখানে।

দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয় সব বয়সী মানুষ। এর দৃষ্টিনন্দন মূল ফটকের ওপরে রয়েছে ইতালির ফোরেন্স থেকে আনা বিশালাকার ঘড়ি, যা এখনও সঠিক সময় দিচ্ছে এবং এর ঘণ্টাধ্বনি বহু দূর থেকে শোনা যায়। প্রতি বুধবার দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তি চাবি ঘোরান। এমনিভাবেই চলছে বছরের পর বছর। চারদিকে সুউচ্চ প্রাচীর ও সুগভীর পরিখা পরিবেষ্টিত রাজবাড়ির ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধান প্রাসাদ ভবন, কুমার প্যালেস, কাচারি ভবন, তিনটি কর্তারানী বাড়ি, রান্নাঘর, মোটর গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা। প্যালেসের দক্ষিণে রয়েছে ইতালিয়ান গার্ডেন, যাতে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন মূল্যবান মার্বেল পাথরে কারুকাজ করা ভাস্কর্য। দেশিবিদেশি নানা জাতের শোভা বর্ধনকারী গাছ। ভাস্কর্যগুলো একটা পাথর খণ্ড কেটে তৈরি। অত্যন্ত নিপুণ হাতের কারুকাজ। মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে যায়। প্রধান ভবনের সামনে ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশদের নির্মিত দুটি কামানসহ রাজবাড়িতে মোট ছয়টি কামান রয়েছে। মূল রাজপ্রাসাদে প্রবেশের পথে সিঁড়ির দু’পাশে দুটি কালো কৃষ্ণমূর্তি ছিল। দর্শনার্থীর অসতর্কতায় একটি ভেঙে যাওয়ার পর অপরটি ভবনের মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ গণভবনের বিভিন্ন স্থানে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করে ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর জনপ্রতি ১০ টাকা প্রবেশ মূল্যের বিনিময়ে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত গণভবন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পরে প্রবেশ মূল্য বাড়িয়ে জনপ্রতি ২০ টাকা করা হয়। তবে ইতালিয়ান গার্ডেন এবং ভবনের ভেতরের অংশ দেখতে আগেভাগেই জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়।

নাটোরের সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন ‘জেগে ওঠো’র আহ্বায়ক কবি রফিকুল কাদির জানান, গণভবনের সামনের জায়গায় বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এগুলো সরিয়ে গণভবনের জায়গা দখলমুক্ত করা দরকার। গণভবন হল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটা রক্ষা করা অতিব জরুরি।

নাটোরের জেলা প্রশাসক সাহিনা খাতুন জানান, নাটোরকে পর্যটন নগরী হিসেবে সেই সঙ্গে ‘দ্য সিটি অব কুইন’ হিসেবে পরিচিত করে তুলতে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই গণভবন আরও দৃষ্টিনন্দন করতে কাজ শুরু করা হয়েছে। উত্তরা গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে যাতে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক করানো যায় সে বিষয়ে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সূত্রঃ দৈনিক সকালের খবর, ৩০ অক্টোবর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: