প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, জীবনযাপন, পরিবেশ, বাংলাদেশ > বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি চরমে : সতর্কতা জরুরি

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি চরমে : সতর্কতা জরুরি

অক্টোবর 25, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

tree-in-2-seasonsমুসাহিদ উদ্দিন আহমদ : অতীতের সকল দৃষ্টান্ত ভঙ্গ করে চলছে বিশ্ব উষ্ণায়ন। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে তা আজ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসের তাপমাত্রা বিগত ১৩৬ বছরের বিশ্ব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নাসার প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৪ সালের তাপমাত্রা ছিল বিশ্বের তাপমাত্রার সর্বোচ্চ রেকর্ড, যার চেয়ে এবারের সেপ্টেম্বরে ০.০০৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই তাপমাত্রা ১৯৫১ থেকে ১৯৮০ সালে সেপ্টেম্বরের গড় তাপমাত্রার ০.৯১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বিশ্বের ৬ হাজার ৩০০ আবহাওয়া দফতরের তথ্যউপাত্ত যাচাই করে এ ধরনের বৈশ্বিক তাপমাত্রার হ্রাসবৃদ্ধি হিসাব করা হয়।

বিশ্বজুড়ে নগরায়ণ, শিল্প বিকাশ, প্রকৃতির বৃক্ষরাজি, জলাধার বিনাশ ছাড়াও এলনিনোর প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়ার তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। এলনিনো হল সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরিভাগের জলরাশি তাপমাত্রার নিরবচ্ছিন্ন পরিবর্তনের সঙ্গে গড়মাত্রার তুলনামূলক বিশ্লেষণ। জলবায়ুর জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ শীতল, পুষ্টিসমৃদ্ধ বিষুবীয় হাবল্ট জলস্রোত যখন এলনিনোর প্রভাবে উষ্ণ অপুষ্টিকর বিষুবীয় স্রোতে রূপান্তরিত হয়ে সমুদ্রের বিশাল জলরাশির উত্তাপ স্বাভাবিকের তুলনায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়ে ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের পানির স্বাভাবিক রূপের পরিবর্তন এনে দেয়। ফলে দেখা দেয় আবহাওয়ারও পরিবর্তন।

বৈশাখের শেষ প্রান্তে এসেও বৃষ্টির দেখা মেলে না। খরতাপে পুড়ে যায় সারাদেশ। শীত মৌসুমে বাংলাদেশের বেশির ভাগ এলাকায় শীত তেমন অনুভূত হয় না। আবহাওয়ার এ ধরনের বৈপরীত্য প্রায়শই লক্ষ করা যায়। কখনও জ্যৈষ্ঠের প্রখর তাপের পরিবর্তে দেখা যায় প্রবল বর্ষণ। তলিয়ে যায় মাঠঘাট। আষাঢ়ে কখনও লক্ষণ থাকে না বৃষ্টির, খরতাপে পুড়ে যায় গাছপালা লতাগুল্ম। এসবই স্বাভাবিক নিয়মের ব্যত্যয়। গেল বছরই আমাদের দেশে যখন আষাঢ়ের সামান্য বৃষ্টিপাত হচ্ছে, ঠিক তখন ভারতের উত্তরাখণ্ডে অসময়ে টানা বর্ষণে দেখা দিয়েছে বিপর্যয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গত ১০০ বছরের পরিসংখ্যান বিবেচনায় আগামীতে বাংলাদেশে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা, মরুময়তা, ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে অতিরিক্ত জোয়ার এবং জলোচ্ছ্বাসের লবণাক্ত পানি ভূখণ্ডে ঢুকে ভূমির উত্পাদনক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে সুস্বাদু পানীর প্রাপ্যতা হ্রাস পেয়েছে, বাড়ছে লবণাক্ততা। হারিয়ে গেছে বাংলার হাজারো প্রজাতির পশুপাখি, জলজ প্রাণী; শুকিয়ে গেছে নদনদী, হাওর, খালবিল। ঋতুচক্র পরিবর্তনের কারণে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির বন্য প্রাণী, পশুপাখি। জীববৈচিত্র্যে পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। ইতোমধ্যে ৫ হাজার প্রজাতির গাছের ১০৬টির অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত। বৃক্ষ নিধনের ফলে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রা হরিণ আজ বিপন্নপ্রায়। জার্মানির ওয়াচ ও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাপল ক্রফ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগদুর্বিপাক ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি উত্পাদন ৩০ ভাগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় ২২ শতাংশ কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং পরিবেশগত সমস্যা অনেক দেশের চেয়ে প্রকট। গবেষণার তথ্যানুসারে এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের বিচারে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা পূর্বাঞ্চলের হাওরবাঁওড়, উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকা বিশ্বের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবেশের অবক্ষয়, পৃথিবীর উত্তাপ বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্ব নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি নিশ্চিতকরণের জন্য জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, কার্বন নিঃসরণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘন জনবসতি, জীবিকার জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা এবং দারিদ্র্যসহ নানা কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

এক আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্যমতে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে পৃথিবীজুড়েই আলোচনা চলছে তিন দশক ধরে। কিন্তু অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ বন্ধে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে অর্থ বরাদ্দে তেমন সাফল্য অর্জিত হয়নি। আইনি কাঠামো বাস্তবায়নে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যে আসেনি অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো। অথচ ২০১৫ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার জন্য বাধ্যতামূলক চুক্তিরও সিদ্ধান্ত ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ঝুঁকিপ্রবণ দেশগুলোকে সাহায্য প্রদান এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা লাঘবে অধিক মাত্রায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী ও উন্নত দেশগুলোকে অভিযোজন কার্যক্রমে জোরালোভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। ইতিপূর্বে মেক্সিকোর কানকুন সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং এর প্রভাব মোকাবেলায় দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তার জন্য গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড নামে তহবিল গঠনে সমঝোতায় পৌঁছায়। কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে একটি আইনি বাধ্যবাধকতামূলক চুক্তিতে পৌঁছানো, অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে আনা এবং পরিরর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ধনী দেশগুলো কার্বন নির্গমনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তহবিল প্রদানে সম্মত হয়েছিল।

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে এক অঙ্গীকারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি যাতে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে কম থাকে সে ব্যাপারে সকল দেশ একাত্মতা ঘোষণা করে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীন দেশের আন্তর্জাতিক সাহায্যসহযোগিতার জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উন্নত বিশ্বের কাছে নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একযোগে কাজ করা অত্যাবশ্যক। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার প্রশ্নে বিশ্বের ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে জ্বালানি সংরক্ষণ, গতানুগতিক জ্বালানি চাহিদা হ্রাস, বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি দক্ষতার উন্নয়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার জোরদার করাও জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবেলায় এবং সঙ্কটাপন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে টেকসই পরিবেশ উন্নয়নের জন্য ব্যক্তিগত, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সারাবিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব প্রতিরোধ নিশ্চিত করে সামষ্টিক উন্নয়নে সাহায্যসহযোগিতা দান, উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ, জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ন্ত্রণসহ পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন ধারায় অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। ক্ষরাসহিষ্ণু কৃষিপণ্য উত্পাদন, আধুনিক পদ্ধতিতে শস্য ও বীজ সংরক্ষণ, বনভূমি উজাড়, জলাধার ভরাট বন্ধ করা ভিন্ন কোনো বিকল্প নেই। আর তা সম্ভব না হলে বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করে বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনধারা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

সূত্রঃ দৈনিক সকালের খবর, ২৩ অক্টোবর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: