মানবতার কবি ফররুখ

অক্টোবর 21, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

farrukh-ahmad-9শরীফ রুহুল আমীন :

রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী!

এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?

সেতারা হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?

তুমি মাস্তুলে আমি দাঁড় টানি ভুলে

অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।

রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?

এমন আহ্বান আর কে জানাতে পারেন ফররুখ আহমদ ছাড়া? কবি ফররুখই পারেন বলতে

এ কোন্ সভ্যতা আজ মানুষের চরম সত্তাকে করে পরিহাস?

কোন্ ইবলিস আজ মানুষেরে ফেলি মৃত্যুপাকে করে পরিহাস?

… … …

র হাতে হাত দিয়ে নারী চলে কাম সহচরী? কোন্ সভ্যতার?

কার হাত অনায়াসে শিশু কণ্ঠে হেনে যায় ছুরি? কোন্ সভ্যতার?

শ্রমিকের রক্তপাতে পানপাত্র রেঙে ওঠে কার? কোন সভ্যতার?

১৯১৮ সালের ১০ জুন কবি ফররুখ আহমদ বাংলাদেশের যশোর জেলার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতাসৈয়দ হাতেম আলী, মাতাবেগম রওশন আখতার। পিতা ছিলেন পুলিশের ইন্সপেক্টর। বড় ভাই সৈয়দ সিদ্দিক আহমদ, বড় বোন সৈয়দা শরফুন আরা মোকাদ্দেসা খাতুন। ছোট ভাই সৈয়দ মুশীর আহমদ। ফররুখ আহমদের পুরো নাম সৈয়দ ফররুখ আহমদ। কিন্তু তিনি ফররুখ আহমদ নামেই সাহিত্য রচনা করেন।

গ্রামের পাঠশালাতে ফররুখের শিক্ষার হাতেখড়ি। এরপর তাকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয় কলিকাতা মডেল স্কুলে। এরপর কলিকাতার বালিগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলে। বালিগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলে ফররুখ ছিলেন ক্লাসের ফার্স্ট বয়। এ সময় তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক, কবি গোলাম মোস্তফাকে। মেট্রিক পরীক্ষার আগে ফররুখ জলবসন্তে আক্রান্ত হওয়ায় পরীক্ষা দিতে পারেননি। পরে খুলনা জেলা স্কুলে ভর্তি হন। এখানে শিক্ষক হিসেবে পান সাহিত্যিক আবুল ফজল ও কবি আবুল হাশেমকে। ১৯৩৬ সালে ফররুখ খুলনা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে কলিকাতা এসে রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে তিনি রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। আইএ পাসের পর তিনি স্কটিশ চার্চে প্রথমে দর্শন শাস্ত্রে ভর্তি হয়ে কিছুকাল পড়াশুনা করেন। তারপর সিটি কলেজে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন।

ছোট থেকে যদিও ফররুখের কাব্যপ্রীতি ছিল তবুও কলেজে পড়াকালেই তার সাহিত্যপ্রতিভার প্রকাশ ছড়িয়ে পড়ে। একদিন বৃষ্টি মাথায় করে কলেজে এসে ফররুখ ভেজা কাপড়ে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসেছেন। সে সময় ক্লাস নিচ্ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ও অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশী। পড়াতে পড়াতে তাঁর দৃষ্টি চলে যায় ফররুখের ওপর। দেখেন মাথা নিচু করে ফররুখ একমনে কি যেন লিখছেন। অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশী ফররুখের কাছে এসে তার খাতাটি নিয়ে নিলেন। ফররুখের লেখা সনেট পড়ে তিনি এতই মুগ্ধ হলেন যে তিনি অন্যান্য অধ্যাপকদের আবৃত্তি করে শোনান এবং বলেন, “আমি একজন তরুণ শেক্সপিয়ারকে আবিষ্কার করেছি”। পরে এই খাতাটি থেকেই বুদ্ধদেব বসু ফররুখ আহমদের কয়েকটি কবিতা ছাপেন তাঁর বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায়।

কবি ফররুখ আহমদ অনবরত লিখে গেছেন পরিকল্পিতভাবে। কাফেলা, ডাহুক, সাত সাগরের মাঝি, সিন্দাবাদ, হাতেম তায়ী, লাশ প্রভৃতি রচনায় তার মানবতাবাদী ও জাতীয় মুক্তির চেতনার উন্মেষ পাওয়া যায়। অনেক কবিতায় তিনি অপূর্বভাবে ইসলামী ঐতিহ্য ও গৌরব তুলে ধরেছেন প্রতীকী ব্যঞ্জনায় এবং আরবিফার্সি শব্দের সমারোহ ঘটিয়েছেন। এজন্য তাঁকে অনেকেই ইসলামী রেনেসাঁর কবি বলে আখ্যায়িত করেছেন যদিও তার কবিতার মূল আদর্শ মানবতার মুক্তি।

ফররুখ ছিলেন প্রেমিক কবি, মানব দরদী কবি। অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার কলম ছিল সোচ্চার। ঊনিশ শ’ চুয়াল্লিশ সালের দুর্ভিক্ষে যখন মানুষ না খেয়ে ধুকে ধুকে মরেছে তিনি লিখেছেনজানি মানুষের লাশ মুখ বুঁজে পড়ে আছে জমিনের পর সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদিন রাখে না সে মৃতের খবর। শোসক শ্রেণির বিরুদ্ধে তিনি লিখলেন

তারপর আসিলে সময় বিশ্বময়

তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিন্ডে পদাঘাত হানি’

নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বারপ্রান্তে টানি’

আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যুদীর্ণ নিখিলের অভিশাপ

বও; ধ্বংস হওতুমি ধ্বংস হও।

এ সময় একটি ঘটনার কথা বলেছেন ফররুখের ভাগ্নে সুলতান আহমদ– “এরই মাঝে একদিন আমি আর মেজমামা কলকাতা স্টেশন থেকে ট্রেনে করে যাদবপুর স্টেশনে এসে নামলাম। কিছু দূরেই একটি লোক কাঁথা গায়ে শুয়ে আছে। মেজমামা এগিয়ে গেলেন। নাকের কাছে হাত দিয়ে বললেন, এখনো বেঁচে আছে, একটু গরম দুধ আনতে পারবি? আমার কাছে চার আনা পয়সা ছিল। তাই দিয়ে কাছের রেস্তোরাঁ থেকে একটু দুধ আনলাম। মেজ মামা খুব যত্নে লোকটাকে দুধটুকু খাওয়ালেন। তারপর দুজনে ধরে লোকটাকে জাদবপুরের এক লঙ্গরখানায় পৌঁছে দিয়ে এলাম। এরপর থেকে মেজ মামার খাওয়া কম হয়ে গেল। মেজ মামা আম্মা আর বড় মামানিকে বললেন, ‘আমার ভাতের অর্ধেক কোন লোককে দেবেন’। এরপর প্রায়ই দেখতাম মেজ মামা না খেয়ে বেরিয়ে যেতেন, যাওয়ার সময় বলে যেতেন, ‘ আমার ভাত কাউকে দেবেন’। মেজ মামার কাছে বেশি পয়সা থাকতো না। তিনি দিনের পর দিন এভাবে উপোস করে কাটিয়েছেন”।

রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে ফররুখ আহমদ প্রথম জীবনে ছিলেন কমরেড এমএন রায়ের অনুসারী। পরবর্তীতে পীর আব্দুল খালেকের সাহচর্যে ইসলামের অধ্যাত্মিক আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সুখ সম্পদের লোভ তাঁকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। তাই তিনি নির্দ্বিধায় আইয়ুবী আমলে সরকারি খরচে হজব্রত পালন এবং মুসলিম বিশ্বভ্রমণের সুযোগ প্রত্যাখান করেন। একবার রেডিও অফিসে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে গোলযোগ হয়েছিল। দাবি দাওয়ার আন্দোলনে ফররুখ আহমদ ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। খবর পেয়ে হেড অফিস করাচী থেকে ডাইরেক্টর জেনারেল এসে ফররুখ আহমদকে ডেকে বলেন, ‘শায়ের সাহাব, ম্যায় এ সোচ রাহা কে আপ এ কলমবন্দ স্ট্রাইক কে লীড দেতা হ্যায়। আপকা নোকরী টুট জায়েগা’। উত্তরে ফররুখ– ‘রিজিক কা মালিক আল্লাহ হ্যাঁয় আপ নেহী’ বলে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।

যখন রাষ্ট্রভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তখন তিনি সওগাত পত্রিকায় এ বিষয়ে এক প্রবন্ধ লিখে বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবেমর্মে দৃঢ়ভাবে মতামত প্রদান করেন। ফররুখ আহমদ পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছিলেন কিন্তু তিনি পাকিস্তানি শাসকচক্রের স্বৈরতন্ত্র ঘৃণা করেছেন। তাই ফররুখ আহমদ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সপক্ষে কথা বলেন। এ সময়, দৈনিক ইত্তেফাক অফিস পোড়ানো হলে ইত্তেফাকে কর্মরত সহায় সম্বলহীন আসফউদ্দৌলাহ ও সিরাজউদ্দিন হোসেনের কথা ভেবে দুটো খাম পাঠিয়েছিলেন। প্রতিটি খামের ভেতর ছিল একশ করে টাকা আর একটি করে চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিল– ‘তোদের প্রয়োজনের তুলনায় খুব সামান্য এটা। আশা করি এই বিপদ মুহূর্তে প্রত্যাখ্যান করবি না’।

ফররুখ আহমদ কর্ম জীবন শুরু করেন ১৯৪৩ সালে আইজি প্রিজন অফিসে। সিভিল সাপ্লাইতে ছিলেন ১৯৪৫ সালে। তারপর কিছুদিন মাসিক মোহামাদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। জলপাইগুড়িতে কিছুদিন একটি ফার্মেও কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি রেডিও পাকিস্তানে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতারের নিজস্ব শিল্পী হন। ফররুখ আহমদ ১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাইড অফ পারফরমেন্স পান। ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ১৯৬৬ সালে তিনি হাতেম তায়ী’র জন্য আদমজী পুরস্কার পান এবং ছোটদের কবিতা পাখির বাসার জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি একুশে পদক (মরণোত্তর) এবং ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন তাঁকে সাহিত্যে মরণোত্তর পুরস্কারে ভূষিত করে।

আজন্ম সংগ্রামী, মানবতার মুক্তি আন্দোলনের এই কবি ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকায় চির নিদ্রায় শায়িত হন।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ২১ অক্টোবর, ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: