ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ

অক্টোবর 21, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

sona-mosqueমনোয়ার হোসেন জুয়েল : চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা গৌড়ের সোনা মসজিদ। মুসলিম শাসনামলে বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে ফিরোজপুর গ্রামে মসজিদটি তৈরি করা হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি নির্মাণশৈলীর কারণে পর্যটকদের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয়।

১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহর শাসনামলে তার সভাসদ ওয়ালী মুহম্মদের তত্ত্বাবধানে মসজিদটি নির্মিত হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জ উপজেলায় মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটির সামনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কবর। উঁচু মঞ্চের ওপর অবস্থিত বড় কবর দুটি কার তা জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এর একটি ওয়ালী মুহম্মদের এবং অন্যটি তার স্ত্রীর। মতান্তরে এই দুটি কাল্পনিক কবর। বরং এতে মসজিদ প্রতিষ্ঠাতার গুপ্তধন রক্ষিত রয়েছে। এছাড়া অন্য কবরগুলো তত্কালীন মুসলিম যোদ্ধাদের। ঐতিহাসিকদের মতে, জনৈক খোঁজা (নপুংসক) কর্তৃক এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত। সেজন্য এর অপর নাম ‘খোঁজা কি মসজিদ’। প্রাচীন গৌড়ে আরেকটি মসজিদ রয়েছে, যা বড় সোনামসজিদ নামে পরিচিত।

এটি তৈরি করেছিলেন সুলতান নুসরত শাহ। বর্তমানে এটি ভারতের মালদহ জেলার মহোদিপুরে অবস্থিত। ছোট সোনামসজিদে মোট ১১টি দরজা বা প্রবেশপথ রয়েছে। উত্তর দিকের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় একটি কক্ষ রয়েছে। মসজিদের চারকোণে চারটি বুরুজ রয়েছে। এগুলোর ভূমি নকশা অষ্টকোণাকার। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে পাঁচটি খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে তিনটি করে দরজা। তবে উত্তর দেয়ালের পশ্চিমের দরজাটির জায়গায় রয়েছে সিঁড়ি। এই সিঁড়িটি উঠে গেছে মসজিদের অভ্যন্তরে উত্তরপশ্চিম দিকে দোতলায় অবস্থিত একটি বিশেষ কামরায়। কামরাটি পাথরের স্তম্ভের ওপর অবস্থিত। মসজিদের গঠন অনুসারে এটিকে ‘জেনানা মহল’ বলেই ধারণা করা হয়। তবে অনেকের মতে, এটি জেনানা মহল ছিল না, এটি ছিল সুলতান বা শাসনকর্তার নিরাপদে নামাজ আদায়ের জন্য আলাদাভাবে তৈরি একটি কক্ষ।

মসজিদের ছাদে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ১৫টি গুম্বুজ। এই মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বাইরের যে কোনো পাশ থেকে দেখলে কেবল পাঁচটি গম্বুজ দেখা যায়, পেছনের গম্বুজগুলো দৃষ্টিগোচর হয় না। মসজিদের বাইরের দিকে সোনালি রংয়ের আন্তরণ ছিল, সূর্যের আলো পড়লে এই রং সোনার মতো ঝলমল করত। তবে জনশ্রুতি রয়েছে গম্বুজগুলো সোনার পাতে মোড়ানো ছিল বলে এর নামকরণ করা হয় সোনা মসজিদ। মসজিদের দেয়ালের গায়ে কালো পাথরের ওপর খচিত রয়েছে বিভিন্ন গাছপালা ও ফুলের কারুকার্যময় নকশা। মসজিদের ভেতরে মেহরাবের ওপর ছিল শ্বেত পাথরের দুটি উজ্জ্বল শিলাখণ্ড। সূর্যালোকে শ্বেতপাথর দুটি উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করায় আলোকিত হয়ে উঠত পুরো মসজিদ ঘর।

১৮৯৭ সালের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদটির একাংশ ও মেহরাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে তা ইট দিয়ে মেরামত করা হয়। এ সময় মধ্যবর্তী মেহরাবের ওপর স্বতন্ত্র দুটি শ্বেত পাথরের উজ্জ্বল শিলাখণ্ড ও আরও কয়েক টুকরো মূল্যবান পাথরখণ্ড ইংরেজরা নিয়ে যায়। এমনকি পশ্চিম দেয়ালের কারুকার্যপূর্ণ কতকগুলো দুষ্প্রাপ্য ও বহু মূল্যবান শিল্প নিদর্শনও স্থানান্তরিত হয়ে বিলেতে চলে যায়।

বর্তমানে এর পাশ ঘেঁষেই রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জসোনামসজিদ স্থলবন্দর মহাসড়ক। ফলে হুমকির মুখে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যকলার এই নিদর্শনটি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ বছরের পুরনো এই নিদর্শনটি এখন অযত্নঅবহেলায় জর্জরিত। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সুপরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণার দাবি এখানে আসা দর্শনার্থীদের। ঐতিহাসিক এই মসজিদ প্রাঙ্গণে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি। তার পাশের কবরটি তত্কালীন সেক্টর কমান্ডারস মেজর নাজমুল হকের। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তারা শহীদ হন।

ঐতিহাসিক জেনারেল ক্যানিংহামের মতে, কিছুসংখ্যক স্বর্ণশিল্পী এই মসজিদের সাজসজ্জার নকশা প্রস্তুত করেছিলেন। ভারতের বেনারস থেকে আগত শিল্পীদের মাধ্যমে এই মসজিদের কারুকার্য সম্পাদিত হয়েছিল। মূল মসজিদের উত্তর দিকে একটি দীঘি রয়েছে। জনশ্রুতি আছে, ‘এক প্রহর বেলা পর্যন্ত সোনা বর্ষিত হয়েছিল, মতান্তরে প্রচুর সোনা পাওয়া গেছেসেজন্য স্বর্ণপ্রাপ্ত ব্যক্তি কর্তৃক এখানে দীঘি খনন ও মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে ‘সোনামসজিদ’ নামকরণ করা হয়েছে।’ এই দীঘিতে তামার বড় বড় হাঁড়িতে গুপ্তধন পাওয়া গিয়েছিল বলেও জনশ্রুতি আছে।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: