প্রথম পাতা > অপরাধ, ইতিহাস, জীবনী, ধর্মীয়, বাংলাদেশ, রাজনীতি > জামাতের নতুন আমীর – নতুন বোতলে পুরনো মদ !

জামাতের নতুন আমীর – নতুন বোতলে পুরনো মদ !

অক্টোবর 19, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

জামাতশিবিরের পোঁধরা অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডি টুডে” মকবুলের পক্ষ নিয়ে যথারীতি সাফাই গাওয়ার অপচেষ্টা করেছে তারা মগজ ধোলাইকৃত জামাতশিবির কর্মীদের মতো মকবুলকে ধোয়া তুলসী পাতা হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছে সরকারবান্ধব ঢাকা টাইমস২৪ কি বললো সেটা তুলে ধরে বা গত ৫০ বছরে তাঁর নামে আদালতে কোন মামলা দায়ের করা হয়নি এসব খোঁড়া যুক্তি । কথা হচ্ছে, গত ৫০ বছরের সিংহভাগ সময় জুড়ে দেশের দুই বৃহত্তম দল তাদের স্বার্থে জামায়াতকে ব্যবহার করতে গিয়ে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কিত ব্যাপার নিয়ে কখনো মাথা ঘামাতে যায়নি । ঢাকা টাইমস২৪ ছাড়াও আরো অনেকের মকবুলের অতীত সম্পর্কে ভালোভাবে জানা না থাকতে পারে; তাই তারা জামাতের প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাস করে ভুলক্রমে মকবুলকে ক্লিন” সার্টিফিকেট দিয়ে থাকতে পারে । কিন্তু ফেনীর স্থানীয় জনগণ দাবী করেছে যে, মকবুল ছাড়াও ফেনীতে ২০০+ রাজাকার এখনো ধরাছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে । দল ও ব্যক্তিবিশেষকে বাঁচাতে (অর্থাৎ তাদের কাছে, ইসলামের স্বার্থে) মিথ্যা কথা বলা জামাতশিবিরের মজ্জাগত অভ্যাস মওদূদীর বাতলানো কৌশলের পদ্ধতি (যার নাম তিনি দিয়ে গেছেন, “হিকমাতে আমালী”) অনুসরণ করে তারা প্রয়োজনানুযায়ী মিথ্যার বেসাতি করতে পিছপা হয় না এরূপ মিথ্যা বলাকে তারা বরঞ্চ পূণ্যের কাজ বলে মনে করে ।

bd-today-on-maqbul-1

bd-today-on-maqbul-2

কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না” বা যাহা রটে তাহা কিছু না কিছু বটে” ইত্যাকার বাংলা প্রবাদপ্রবচনের সাথে আমরা পরিচিত । জামায়াতের নতুন আমীর সম্পর্কে সে কথা মানসপটে স্মরণ রাখা অতীব কর্তব্য ।

জামায়াতের নতুন আমীর রাজাকার ছিলেন

ফেনী প্রতিনিধি : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নতুন আমির হিসেবে শপথ নিয়েছেন মকবুল আহমাদ। তার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন, মকবুল রাজাকার। জামায়াতের আমির হিসেবে শপথ নেওয়ার পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, মকবুল আহমাদ ৭১ সালে স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেছেন। তিনি ফেনীর রাজাকার কমান্ডার ছিলেন।

কেন্দ্রীয় ও ফেনী জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, মকবুল আহমাদের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার দাগনভূঁঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপূর ইউনিয়নের ওমরাবাদে। পেশায় তিনি স্কুল শিক্ষক ছিলেন। ফেনী মডেল হাইস্কুলের শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

আওয়ামী লীগ গত মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর গ্রামের বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত থাকেন মকবুল। পারিবারিক জীবনে চার সন্তানের জনক মকবুল আহমাদ। রুকন থেকে পর্যায়ক্রমে দলটির অঞ্চলভিত্তিক পরিচালক, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জেলা নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন।

জামায়াতের প্রাক্তন আমির মতিউর রহমান নিজামী গ্রেপ্তার হওয়ার পর ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি দলটির ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি আত্মগোপনে থেকেই দল পরিচালনা করেছেন। জামায়াতের নেতাকর্মীদের কাছে মুখলিস (সৎ) চরিত্রের মানুষ হিসেবে বিবেচিত মকবুল আহমাদ। দলের নেতাকর্মীদের কাছে একাত্তরে তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা কোনো কিছু বলতে রাজি হননি।

রাজনৈতিক জীবনে ফেনী২ আসন থেকে ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যান মকবুল। প্রচারের আড়ালে থাকা জামায়াতের নতুন আমিরকে নিয়ে অন্যান্য দলের মধ্যেও আলোচনা কম। যদিও গত মাসে তার আমীর হওয়ার খবর প্রকাশের পর তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপি বলেছিলেন, মকবুলের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার চিত্র খতিয়ে দেখা হোক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে তার বিষয়ে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এমএ আউয়াল এমপি।

মঙ্গলবার দুপুরে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এম এ আউয়াল এমপি বলেন, ‘আমি আগেও এ বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলেছিলাম। এখন যদি এ ধরনের অভিযোগ ওঠে তাহলে আমার আশঙ্কাই সত্যি হবে। আমি মনে করি, শিগগিরই মকবুলের একাত্তরের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। তার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার খোঁজখবর নেওয়া উচিত।

ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মীর আবদুল হান্নান অভিযোগ করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের কাজ চলমান থাকলেও ৭১এর ঘাতক, তালিকাভুক্ত রাজাকার জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমির মকবুল ও ফেনীর দুই শতাধিক রাজাকার এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী ও রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত ২০০ জনের বিচারের দাবিতে গত বছরের মে মাসে ফেনী শহীদ মিনার চত্বরে মানববন্ধন করা হয়। ফেনী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা এই মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন।

ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মীর আবদুল হান্নান বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিকামী মানুষের রক্তে রঞ্জিত এমন একজনকে দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতার আসনে বসিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের কলঙ্ককে অলঙ্কার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে জামায়াত।’

তিনি বলেন, ‘৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন মকবুল আহমাদ রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তারই নির্দেশে ফেনীর স্থানীয় রাজাকার, আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ফেনী কলেজ ছাত্র সংসদের প্রাক্তন ভিপি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা ওয়াজ উদ্দিনকে চট্টগ্রামে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।’

দাগনভূঁঞা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার শরিয়ত উল্যাহ বাঙ্গালী বলেন, ‘মকবুল আহমাদের নির্দেশে দাগনভূঁঞা উপজেলার জয়লস্কর ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় আগুন দিয়ে ১০ জনকে হত্যা করা হয়।’ এই হত্যাকান্ডের তদন্ত সাপেক্ষে মকবুল আহমাদের বিচার দাবি করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘মকবুল আহমাদের নির্দেশে রাজাকার মোশাররফ হোসেন মশা দাগনভূঁঞা উপজেলার খুশিপুর গ্রামে আহসান উল্লাহ নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকেও হত্যা করেন। রাজাকার মোশাররফ হোসেন মশা জীবিত আছেন। তার বাড়ি একই উপজেলার সাফুয়া গ্রামে।’

এদিকে জেলা জামায়াতের প্রাক্তন আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী দলের কেন্দ্রীয় আমিরের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার মতো একজন ইসলামি আন্দোলনের নেতাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করছে কিছু অসাধু ব্যক্তি। তার মতো একজন সৎ ও আদর্শ রাজনীতিবিদকে এই ধরনের মিথ্যা কলঙ্ক দিয়ে আদর্শের পথ থেকে কেউ সরাতে পারবে না।’

সূত্রঃ রাইজিং বিডি, ১৮ অক্টোবর, ২০১৬

complaint-against-maqbool-kk261016

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ২৬ অক্টোবর ২০১৬

জামায়াত পাঠ

হারুন উর রশীদ : মকবুল আহমাদ জামায়াতের নতুন আমির হিসেবে শপথ নিয়েছেন সোমবার রাতে। আর শপথ নেওয়ার পরই তিনি তার লিখিত বক্তব্যের একটি কপি পাঠিয়েছেন সংবাদ মাধ্যমে। মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হওয়ার পর অনেকেই বিচারকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একটা রাজনৈতিক নাটক মনে করেছিলেন। এমনকি জামায়াত নিজেও ভাবতে পারেনি যে তাদের শীর্ষ নেতাদের এইভাবে একের পর এক ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তাই হয়েছে। একারণেই সবদিক দিয়ে কোণঠাসা জামায়াত শেষ পর্যন্ত তার অস্তিত্ব রক্ষায় কোনদিকে যায় তা দেখতে আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ আগ্রহী ছিলাম। সোমবার জামায়াতের নতুন আমির মকবুল আহমাদের লিখিত বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আমি সেটা কিছুটা হলেও তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

আমার ধারণা কেউ কেউ এরই মধ্যে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তার দীর্ঘ লিখিত বক্তব্যের চুম্বক অংশ পড়েছেন। আমি তার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি না করে মূল ভাব তুলে ধরার চেষ্টা করছি

. বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আত্মত্যাগকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা।

. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে স্বীকার করা।

. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, মাওলানা ভাসানী, এম এ জি ওসমানীসহ স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা।

. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকর হওয়া পাঁচ জামায়াত নেতা শাহাদাৎ বরণ করেছেন। তারা জুলুমের শিকার হয়েছেন।

. দেশের সংকট থেকে উত্তরণে সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংলাপের আহ্বান।

. ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

. নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য পরিহার করে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান। দলের মধ্যে গঠনমূলক সমালোচনার পরিবেশ তৈরি করা।

. ইসলামের নামে চরমপন্থা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি।

আমি যা বুঝতে পারি

জামায়াত ইসলামী যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ এবং মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসলেও মকবুল আহমাদের লিখিত বক্তব্যে তা অনুপস্থিত। এমনকি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কারাগারে আটক জামায়াত নেতাদের বিচার বন্ধ বা মুক্তির দাবি করেননি তিনি। করেননি বিচারের সমালোচনা। শুধু বলেছেন তারা জুলুমের শিকার হয়েছেন। সেই জুলুম কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তা স্পষ্ট করেননি জামায়াতের নতুন এই কাণ্ডারি।

তার বক্তব্যে দলের মধ্যে মতভেদের বা মতপার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে তা কী ধরনের তা তিনি স্পষ্ট করেননি। একই সঙ্গে দলের মধ্যে যে সমালোচনা তেমন গ্রহণ করা হতো না তাও স্পষ্ট।

মকবুল আহমাদ মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের ‘শহীদ’ বা তারা শাহাদাৎ বরণ করেছেন বলে উল্লেখ করেননি। বলেছেন তাদের আত্মত্যাগ। বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যে পাঁচজন জামায়াত নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে তাদের শাহাদাৎবরণকারী বলে উল্লেখ করেছেন। আর মুক্তিযুদ্ধের যারা বিরোধিতা করেছে, গণহত্যা চালিয়েছে তাদের ব্যাপারে তিনি নীরব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বলে উল্লেখ করলেও তাঁর নামের আগে ‘জাতির জনক’ শব্দটি ব্যবহার করেননি তিনি।

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেননি মকবুল আহমাদ। বলেছেন ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা। একই সঙ্গে ইসলামের নামে চরমপন্থা বা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তার দলের জিরো টলারেন্স নীতির কথা জানান।

তাহলে যা দেখা যাচ্ছে মকবুল আহমাদ যা বলেছেন তাতে জামায়াত তার পুরনো নীতি থেকে সরছে না। তবে কৌশলে কয়েকটি বিষয় সামনে এনে সরকারের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর নীতি থেকে না সরলেও পুরানো নেতৃত্ব আকড়ে ধরে থাকতে চাইছেন না তিনি। তিনি চাইছেন না যারা গেছেন তাদের নিয়ে আর তেমন ভাবতে। চান না আরও যারা যাবেন তাদের জন্য আর সময় নষ্ট করতে। তাদের জন্য যেটুকু না বললেই নয় তাদের জন্য সেটুকুই বলেছেন তিনি।

যে কারণে কৌশল:

এর কারণও আছে আমার কাছে মনে হয়। যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের তাদের আগের লাইনের পুরোপরি ব্যর্থতা তাকে নতুন উপলব্ধি দিয়েছে অথবা ব্যর্থতাকে ভেতরে রেখে জামায়াত রক্ষায় কৌশলী হয়েছেন তিনি। যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালে তাদের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সব কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে তারা আড়াই কোটি ডলার ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্রের লবিস্ট ফার্ম কেসিডি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটকে নিয়োগ করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফল আসেনি। তাদের প্রধান মিত্র সৌদি আরব কেন সহায়তা করেনি। তুরস্ক শেষ পর্যন্ত রণেভঙ্গ দিয়েছে। তাদের একমাত্র মিত্র হিসেবে আছে শুধু পাকিস্তান জামায়াত ও পাকিস্তান। আর শুরুতে ‘স্বচ্ছতার’ কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে একধরনের অবস্থান নিলেও পরে তারা অবস্থান বদলায়।

যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের জন্য জামায়াত দেশের অভ্যন্তরেও ব্যাপক সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণা করার পর দেশের অন্তত ৩৪টি জেলায় জামায়াত ব্যাপক নাশকতা চালায়। আর শুরু থেকে হরতাল ও নাশকতা তো ছিলই। কিন্তু এই নাশকতা জামায়াতের বিরুদ্ধেই গেছে। জামায়াত ‘সন্ত্রাসী’ দল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর এখন বলছে ইসলামের নামে সন্ত্রাস সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা।

ইতিহাস কী বলে

১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট এই উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু হয় ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’ নামে। দলটির প্রতিষ্ঠা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক। এই দলটির ইতিহাস সব সময়ই গণবিরোধী ভূমিকা নেওয়ার। আর সময় বুঝে খোলস পরিবর্তন করার।

১৯৪৭ সালে জামায়াতে ইসলামী দেশ বিভাগের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তারা তখন মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র চায়নি। পরে সুযোগ বুঝে মওদুদী পাকিস্তানে হিযরত করেন। প্রতিষ্ঠা করেন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান। বাংলাদেশ অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী। যার প্রধান ছিলেন গোলাম আযম। ১৯৬৪ সালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হয়। আর দাঙ্গা বাধানোর অভিযোগে মওদুদীর ফাঁসির আদেশও হয়েছিল পাকিস্তানে। পরে যাবজ্জীবন এবং আরও পরে তিনি ছাড়া পান।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আবারও গণবিরোধী ভূমিকা নেয় জামায়াত। তারা শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাই করেনি; গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আছে দলটির বিরুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়।

বাংলাদেশ পর্ব

তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান সুযোগ করে দিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে জামায়াত কাজ শুরু করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই পালিয়ে যাওয়া গোলাম আযম ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে ফিরে এলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে কাজ শুরু হয়। পরে তারা বিএনপির সঙ্গে জোট করে, সংসদে যায় মন্ত্রী হয়যা সবার জানা।

তবে এখন আর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। নির্বাচন কমিশন ২০১৩ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশের পর জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে। বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে জামায়াতের গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় নিবন্ধন বাতিল করা হয়। যদিও জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশএর পরিবর্তে এখন তারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নাম ধারণ করেছে।

আর মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাধিক রায়ে জামায়াতকে দল হিসেবে সন্ত্রাসী এবং যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করেছে। এই ধরনের দলের বিচারে আইনও হয়েছে। তাই দল হিসেবে জামায়াত যে চরম কোণঠাসা অবস্থায় তা আর ব্যখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। এমনটি তার প্রধান মিত্র বিএনপিও যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতাদের ফাঁসির পর ছিল নিশ্চুপ।

আবারও খোলস পরিবর্তন!

জামায়াতে ইসলামী বাংলা ট্রিবিউনকে পাঠানো এবং প্রতিবাদ লিপিতে মকবুল আহমাদকে ‘ক্লিন ইমেজ’এর অধিকারী একজন নেতা বলে দাবি করেছে। তবে বাংলা ট্রিবিউন তার প্রতিবেদনে বলছে, ‘মকবুল আহমাদ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফেনীর দাগনভুঁঞা এলাকার রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। আর তার নির্দেশে দাগনভুঁঞা উপজেলার জয়লস্কর ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় আগুন দিয়ে ১০ জনকে হত্যা করা হয়।’

আমার কাছে মনে হয়েছে ‘ক্লিন ইমেজে’র এই দাবি একই সঙ্গে জামায়াতে ‘ডার্টি ইমেজে’র নেতা আছে বা ছিল’র কথা মনে করিয়ে দেয়। যে প্রেক্ষাপটে ক্লিন ইমেজের দাবি সেই প্রেক্ষাপটটা হলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, যুদ্ধাপরাধ।

আগেই বলেছি জামায়াত বরাবরই একটি গণবিরোধী দল১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০১৩ সালে তারা তার প্রমাণ রেখেছে। গণবিরোধী ভূমিকার পর প্রতিবারই তারা খোলস পাল্টে মাঠে নেমেছে সুযোগ বুঝে। এবং সময়মত তারা তাদের গণবিরোধেী চরিত্র প্রকাশ করেছে। এবারও তারা খোলস পরিবর্তন করছে বলেই আমার মনে হয়। কারণ জামায়াতের নতুন আমির মকবুল আহমাদ গত ছয় বছর ধরে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ছিলেন। মুখে যাই বলুন না কেন, তিনি তো জামায়াতেরই আমির। তাই সময় আসলে আবারও এই দলটির গণবিরোধী ভূমিকা দেখা যাবে বলেই আমার ধারণা। আর তা না হলেতো ইতিহাসের ধারাই বদলে যাবে। আমরা তাই সেই অবস্থা দেখার অপেক্ষায় থাকবো, না জামায়াতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব?

লেখক: সাংবাদিক

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১৮ অক্টোবর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: