প্রথম পাতা > জীবনী, বাংলাদেশ, বিনোদন, সংস্কৃতি > অমর কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ

অমর কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ

abbasuddinমোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল : আব্বাস উদ্দীন বাংলার লোক সঙ্গীতের এক প্রবাদ পুরুষের নাম। গায়ক আব্বাস উদ্দীন আহমদের জন্ম কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার অর্ন্তগত বলরামপুর গ্রামে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর। বাবার নাম মোহাম্মদ জাফর আলী। কোচবিহার জেলার একজন স্বনামধন্য আইনজীবী ও জোতদার ছিলেন। মা’ হিরামন নেসা।

আব্বাস উদ্দীন আহমদ শৈশব কাল থেকেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও মেধা সম্পন্ন ছিলেন। লেখাপাড়ায় তিনি খুবই ভাল ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের খুব আদরের। মাটির পৃথিবীর চিরন্তন ঐকতান তার কন্ঠে বাসা বেধেছে শৈশব কাল থেকেই। তিনি একজন ভাল শিল্পী ছিলেন শিশুকাল থেকেই। কিন্তু শৈশবে তিনি কোন ওস্তাদের কাছে গান শেখার সুযোগ পাননি। তিনি গান শিখেছেন গ্রাম্য গায়ক এবং ক্ষেতে কর্মরত কৃষকের মুখের গান শুনে শুনে। বাড়ীর সামনে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে কৃষকের উদাত্ত কণ্ঠের ভাওয়াইয়া গান তার শিশুমনে আলোড়ন তুলতো। তাকে ভাওয়াইয়া শিখতে বিশেষ ভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল তারই গ্রামের শিল্পী পাগারু এবং নায়েব আলী টেপুর ভাওয়াইয়া গান ও দোতারার ডাং। স্কুলে যাবার সময় এবং স্কুল থেকে ফেরার পথে তিনি গলা ছেড়ে গাইতেন ভাওয়াইয়া।

কোচবিহারের বলরামপুর প্রাইমারি স্কুলে তাঁর লেখাপড়ার হাতে খড়ি। পঞ্চম শ্রেণীতে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তুফান গঞ্জে অধ্যয়ন কালে স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন।

আব্বাস উদ্দীন আহমদ ১৯২০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন তুফান গঞ্জ হাই স্কুল থেকে। ম্যাট্রিক পাস করার পর ভর্তি হয়েছিলেন কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজে। কৃতিত্বের সাথে আইএ পাস করার পর বিএ পড়তে আসেন রংপুর কারমাইকেল কলেজে এবং পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজেও ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তিনি এ দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশিদিন লেখাপাড়ার সুযোগ পাননাই। এরপর বিএ ভর্তি হন কোচবিহার কলেজে। কিন্তু এখানে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন নাই।
কলকাতা মহানগরীতে বিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করেন সংগ্রামী শিল্পী জীবন। বাংলাদেশের মুসলমানের হৃদয়ে পৌঁছানোর ছিল সে সময় দু’টি পথ। তার একটি তাদের মনের কথা এ দেশের লোকগীতি, অপরটি তাদের প্রাণের কথা ইসলামী গান। আব্বাস উদ্দীন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এবং সুকৌশলে বেছে নিয়েছিলেন এই দুটি পথ। বাংলা গানের ইতিহাসে নজরুল ও আব্বাসউদ্দীন এ দু’টি নাম যেদিন যুক্ত হলো সেদিন থেকে সঙ্গীতে অনুপস্থিত বাঙালি মুসলমানের দীনতা ঘুচলো।

হিন্দু সমাজে যখন মুসলমান শিল্পীরা ছিলেন অস্পৃশ্য তখন বাংলার সঙ্গীত জগতে এক নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হলো। এ নব দিগন্তের স্রষ্টা হলেন অমর কণ্ঠ শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ। নজরুল এলেন সঙ্গীতের জগতে ধূমকেতুর মতো কাল বৈশাখী ঝড় তুলে, আব্বাস উদ্দীন এলেন সুরের রঙ্গ মশাল নিয়ে।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট এর পর তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন। চাকরি নিয়েছিলেন পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে। কোচবিহারের এক অনুষ্ঠানে আব্বাস উদ্দীনের গান শুনে কাজী নজরুল ইসলাম বিমোহিত হয়েছিলেন। তাকে তিনি কলকাতায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

আব্বাস উদ্দীন আহমদ মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানীতে দু’টি আধুনিক গান রেকর্ড করেছিলেন বিমল দাশ গুপ্তের সহায়তায়। গান দু’টি ছিল “কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো” এবং “স্মরণ পারের ওগো প্রিয়”। গান দু’টি সে সময় যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল।

এরপর আব্বাস উদ্দীন আহমদ কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এ সময় কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সান্নিধ্যে আসেন আব্বাস উদ্দীন। কাজী নজরুল ইসলামের অনুপ্রেরণা এবং সহযোগীতায় আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ইসলামী গানের পাশাপাশি একাধিক ভাওয়াইয়া গানের রেকর্ড হয়েছিল। বলা বাহুল্য এই গানগুলো সে সময় যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

পরবর্তীতে রেকর্ডে আব্বাস উদ্দীনের কী গান বাজারে আসছে সেই গান শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন গ্রামোফোন কোম্পানীর লাখ লাখ শ্রোতা।

নজরুল গান লিখছেন, সুর দিয়েছেন। আব্বাস উদ্দীনের বলিষ্ঠ দরদী কণ্ঠে সে গান রেকর্ড, জনসভা ও মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে বাংলা দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। ভাওয়াইয়া গানে মানুষের অন্তর আবহমান কাল হতে হয়েছে সমৃদ্ধ। শিল্পী আব্বাস উদ্দীন ভাওয়াইয়া গান কে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি ভাওয়াইয়া গানকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অশিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত মানুষের মুখ থেকে তুলে এনে শহরের শিক্ষিত মানুষের ড্রইংরুমে জায়গা করে দিয়েছিলেন। ভাওয়াইয়া গানকে যারা গ্রামের অভব্য শ্রেণীর গান বলে ঘৃণা করতেন তারাও গোপনে তাদের ড্রইং রুমে বসে বিমুগ্ধ হয়ে শুনতেন আব্বাস উদ্দীন আহমদের মধুঝরা কণ্ঠের ভাওয়াইয়া।
আব্বাস উদ্দীন আহমদের কণ্ঠে গীত গ্রামোফোন কোম্পানীতে তাঁর বহুগানের রেকর্ড এর সন্ধান পাওয়া গেছে এর মধ্যে ৮৪টি ইসলামী গান, পল্লীগীতি ৫৮টি, ভাওয়াইয়া ৩৭টি, কাব্যগীতি ৩১টি এবং তাঁর আধুনিক গানের সংখ্যাও অজস্র। এমনকি ইসলামী গানকে তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন বলেই তৎকালীন মুসলিম রেনেসাঁর সূত্রপাত হয়েছিল। আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে অবাক বিস্ময়ে শুনতেন ‘মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ‘ত্রিভূবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়’ প্রভৃতি বিখ্যাত ইসলামী গান। পরবর্তীতে নজরুলের লেখা ও সুর করা রোজা, নামাজ, হজ্ব, যাকাত, শবেবরাত, ঈদ, ফাতেহা, নাতে রসূল, ইসলামী গজল প্রভৃতি অনেক কণ্ঠ দিয়েছিলেন আব্বাস উদ্দীন।

ছাত্রদের মিলাদের সভায়, স্কুল কলেজের চ্যারিটি শো, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপনের জন্য বিচিত্রানুষ্ঠানে। এছাড়াও হাজার রকমের জন সমাবেশে সারা দেশের সভায় সভা গায়কের সম্মান পেয়েছিলেন তিনি। ভাওয়াইয়া ও ইসলামী গানের পাশাপাশি তিনি গেয়েছেন অসংখ্য পল্লীগীতি, মুর্শিদী, মর্শিয়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালী, হাম্দ, নাত, পালাগান ইত্যাদি।

শুধু গান গেয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। গায়কের পাশাপাশি একজন শক্তিশালী অভিনেতা ও ছিলেন। তিনি সেকালের বিষ্ণুপ্রিয়, মহানিশা, একটি কথা এবং ঠিকাদার ছবিতে ও অভিনয় করেছিলেন।

শুধু দেশ নয়, শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, লল্ডন, প্যারিস, টোকিও, মেলবোর্ণ সহ পৃথিবীর বহুদেশে তিনি ইসলামী গান, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি পরিবেশন করে বিশ্বসভায় আমাদের বাংলা গান কে সম্মানের আসনে অলংকৃত করে গেছেন। ১৯৫৫ সালে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ এশিয়া সঙ্গীত সম্মেলনে এবং ১৯৫৬ সালে জার্মানী আন্তর্জাতিক লোক সঙ্গীত সম্মেলন সহ আরও নানা সম্মেলন ও উৎসবে অংশ নিয়ে তিনি এ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিলেন।

আব্বাস উদ্দীন আহমদ যখন গায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন তখন মুসলমানদের গান গাওয়া ছিল নিষেধ। কিন্তু আব্বাস উদ্দীন আহমদ মুসলমান নাম নিয়েই গান গেয়েছেন এবং তাঁর বিশেষ গায়কি ঢং ও সুরেলা কণ্ঠ জয় করেছিল সে যুগের প্রতিকূল অবস্থাকে। এটি ছিল আব্বাস উদ্দীন আহমদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব।

পল্লীগীতি, ইসলামী গান ও ভাওয়াইয়া গানের জনক আব্বাস উদ্দীন আহমদ দীর্ঘদিন পক্ষাঘাতগ্রস্থ রোগ ভোগের পর ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৭৩০ মিনিটে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর (১৯০১১৯৫৯ খ্রি🙂 তাঁকে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: