প্রথম পাতা > অপরাধ, ইসলাম, ধর্মীয়, বাংলাদেশ, সমাজ > ওরা কেন জঙ্গিবাদে ঝুঁকছে ?

ওরা কেন জঙ্গিবাদে ঝুঁকছে ?

অক্টোবর 18, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

militancy-6-art. এ কে এম শাহনাওয়াজ : দেশের অসংখ্য সচেতন মুক্তমনের মানুষের প্রশ্নঅনেকটা হঠাৎ করেই আমাদের ভাইবোন, পাড়াপড়শি, বন্ধুবান্ধবদের কেউ কেউ জঙ্গি হয়ে গেল কেমন করে? ভোজবাজির মতোই যেন সব পাল্টে গেছে। বেশ তো ছিলাম আমরা শত শত বছর ধরে। ধার্মিক মুসলমান, ধর্মেকর্মে নিবেদিত মুসলমানসবাই তো ভাইবন্ধুর মতো বসবাস করেছি। ধার্মিক মুসলমান বা ধর্মনেতারা ওয়াজ নছিহতে দুর্বল ধর্মপালনকারী মুসলমানদের ধর্মনিষ্ঠ হওয়ার জন্য হেদায়েত করেছেন। এতে কারও ধর্মকর্ম করায় মতি ফিরেছে, কারও ততটা নয়। এজন্য মারমুখী হয়ে যায়নি কেউ। তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছে সবার মধ্যে ধর্মবোধ জাগিয়ে তুলতে। কে পুণ্যবান আর কে পাপী, খালি চোখে দেখে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব! আল্লাহই জানেন বাতেনি খবর। পাপীকে শাস্তি দেয়া আর পুণ্যবানকে পুরস্কৃত করা আল্লাহরই এখতিয়ার। তাই শেষ পর্যন্ত ধর্মপ্রবণ মানুষের মধ্যেও অস্বস্তি থাকত না। এ কারণে সবাই সামাজিক ও ধর্মীয় জীবন শান্তিতেই অতিবাহিত করত।

কিন্তু হঠাৎ করে কী এমন হয়ে গেল! এ শান্তির দেশে ‘উগ্রপন্থী মুসলমানের’ জন্ম হল। যারা বিশ্বাস করতে শিখল নিজেদের ঘরানা ছাড়া অমুসলিম থেকে শুরু করে ধার্মিক মুসলমানও কাফের। আর এ কাফেরদের হত্যা করলে সাচ্চা মুসলমানের দায়িত্ব পালন করা হবে। অথচ পবিত্র কোরআন শরিফ ও আল হাদিসের শিক্ষা থাকলে এসব উগ্রবাদী বুঝতে পারত মানুষ ধার্মিক বা অধার্মিক তা বিচার করা এবং শাস্তিদান অথবা পুরস্কৃত করার একমাত্র এখতিয়ার মহান আল্লাহর। যারা তা না করে ইসলাম রক্ষার নামে মানুষ হত্যা করছে, তারা যে শুধু খুনি হিসেবে অপরাধ করছে তাই নয়, স্পষ্ট ‘শিরক’ও করছে। কারণ আল্লাহর সংরক্ষিত ক্ষমতা তারা প্রয়োগ করছে।

ধর্ম গ্রন্থে আছে, আখেরি জমানায় ইসলামের নামে অনেক মতপথের সৃষ্টি হবে। ইসলামের নামে ইসলামকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হবে। ওহাবি আন্দোলন ও সালাফি মতাদর্শের বিতর্কিত কার্যক্রম এ সত্যতাই স্পষ্ট করছে। এসব মতাদর্শী যত দিন যাচ্ছে ততই উগ্র হচ্ছে। কারণ এসব মতবাদের নায়কদের কাছে ধর্ম হচ্ছে ঢাল। প্রকৃত অর্থে তারা চান ইহজাগতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা।

ওহাবি মতাদর্শী হাজী শরীয়তুল্লাহ উনিশ শতকে ফরায়েজি আন্দোলন করেছিলেন নানা ধর্মসংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুসলমানদের বের করে এনে ঐক্যবদ্ধ করতে। কিন্তু এ কাজে তিনি কোনো উগ্রপন্থা গ্রহণ করেননি। এ যুগে এসে জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোও ওহাবি মতাদর্শের আলোকে নিজেদের রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। আর পথ চলতে উগ্রবাদী পন্থাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।

আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, ইরান এমন নানা দেশে যখন জঙ্গিরা রেলস্টেশন, শপিংমল, মসজিদঈদগাহে বোমা মেরে, গুলি করে সাধারণ মানুষ, শিশু, ধার্মিক মুসলমানকে নির্বিচারে খুন করছে, তখন প্রশ্ন জাগে এরা কোরআন ও হাদিসের আলোকে সত্যিই মুসলমান কিনা! অবশ্য মহান আল্লাহই এর বিচার করবেন। এ অসুস্থ ধারাটিই সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশেও আমদানি করা হল। অসাম্প্রদায়িক চেতনার ও মানবিক মূল্যবোধ লালনকারী দেশে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে মানুষ খুন করার মতো উগ্রবাদীও তৈরি হয়েছে। যারা এ অধর্ম করছে তারা হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসেনি। সবাই আমাদের চারপাশে বেড়ে ওঠা চেনা মানুষই।

judge-murdered-by-ansarএসব দেখে এ দেশের সহজসরল মানবতাবাদী মানুষ আহত হয়েছে, বিস্মিত হয়েছে এই ভেবে, কেমন করে তরুণ থেকে বয়সী মানুষ পর্যন্ত এমন ভয়ংকর জঙ্গিবাদে দীক্ষা পেল! এতদিনের সামাজিক সাংস্কৃতিক শিক্ষা কী করে ভুলে গেল! কারা এমন শক্তিমান আর কুশলী যে, এ সমাজ বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসা মানুষদের একাংশের চিন্তা ও বোধশক্তিকে নষ্ট করে দিতে পারল। বাবামা, ভাইবোন, পরিবারপরিজনকারও কথা না ভেবে কীসের মোহে ভয়ংকর খুনি হয়ে গেল? সরলভাবে এর উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে খণ্ড খণ্ড উদাহরণ নিলে একেবারে যে উত্তর পাওয়া যাবে না তেমন নয়। যেমনমধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক মুসলিম ঐক্য তৈরি না হতে দেয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক চক্র সব সময়ই সক্রিয় ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ইসরাইলকেন্দ্রিক ইহুদিবাদ ও মার্কিন শক্তি এ দিকে গভীর নজর রাখছিল। ধীরে ধীরে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মুসলমানকে। এসব তেলসমৃদ্ধ দেশের অর্থশক্তিকে বিপন্ন করার জন্য পথে নেমেছে। ইসলামকে বিশ্ববাসীর সামনে শান্তির ধর্ম নয়একটি উগ্রবাদী অমানবিক ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করানোর ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। আর তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিদের ঘাড়ে চেপে এ কাজে অনেকটাই সফল হয়েছে।

অধুনা এদের অপচ্ছায়া বাংলাদেশকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে। তবে এটি সামগ্রিক নয়, একটি প্রাসঙ্গিক কারণ মাত্র। বাংলাদেশের মুসলমান বরাবরই ধর্মপ্রবণ। পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন। হঠাৎ যখন দেখা গেল এ দেশের প্রশাসন ও রাজনীতিকে দুর্নীতি গ্রাস করেছে, কালো টাকা জড়ো হচ্ছে অনেকের হাতে, তখন এ ধারার পরিবারের মধ্যে পোশাকী মুসলমান হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেল। এটি প্রভাবিত করল আশপাশকেও। একটি ধর্মবণিক রাজনৈতিক গ্রুপের পুরুষ ও মহিলা সদস্যরা ‘তালিম’ দেয়ার ছলে ঢুকে পড়ল সমাজের ভেতরে। এদের তৎপরতা প্রতিরোধে সামাজিকসাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় না হওয়ায় ধর্মের নামে বদ্ধ চিন্তায় ডুবে যেতে লাগল সমাজের একটি অংশ। এদেরই ধর্মের নামে খুব সহজে বিভ্রান্ত করা গেল।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতায় যারা যুক্ত আছে, ধরা পড়ছে, নিহত হয়েছেতাদের শ্রেণীকরণ করা যেতে পারে। এদের একটি অংশ মাদ্রাসা এবং অংশত স্কুলকলেজে পড়ুয়া সাংস্কৃতিকভাবে অনগ্রসর দরিদ্র পরিবারের সন্তান। একটি অংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কলেজে পড়ুয়া তরুণ, আরেক অংশ ইংরেজি মাধ্যমে পড়া স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আবার বিচ্ছিন্ন অংশ শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য। সমাজ জীবনে এদের অবস্থানের বিষয়ে একটু নিরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। এর আগে কয়েকটি সাম্প্রতিক উদাহরণ উপস্থাপন করব। একদেড় সপ্তাহ আগে টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছিল সম্ভবত জামালপুরের একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোককে। জানলাম তিনি বাংলাভাইদের অর্থ জোগানদার ছিলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্দ্বিধায় বললেন, জঙ্গিরা কোনো অন্যায় করছে না। কাফের হত্যা করে তারা ধর্মের দায়িত্ব পালন করছে। অর্থাৎ গ্রামের এ স্বল্পশিক্ষিত মানুষটির মনে ধর্মের নামে এ ভুল ব্যাখ্যাটি সফলভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, যে কারণে মানুষ হত্যা করায় তার মধ্যে কোনো গ্লানি বোধ নেই।

দ্বিতীয় উদাহরণটি সম্প্রতি গাজীপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত এক জঙ্গি প্রসঙ্গে। গ্রামের গরিব বাবামা সন্তানের লাশ নেবেন না। কান্নাভেজা কণ্ঠে বাবামা তাদের সন্তানকে যারা বেপথে নিয়েছেন তাদের শাস্তি দাবি করলেন। মা দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, তার জঙ্গি ছেলে দেশের শত্রু, সমাজের শত্রু, তাই তারা অমন ছেলের লাশ গ্রহণ করবেন না। এভাবেই জঙ্গিদের প্রতি মুক্ত বিবেকের মানুষদের ঘৃণা তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয় উদাহরণটি একটু ভিন্ন। ১১ অক্টোবর দুর্গাপূজা সামনে রেখে যুগান্তরে আমার একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। এখানে ধর্মীয় বিষয় নয়, ঐতিহাসিকভাবে দুর্গাপূজাকে অনুষঙ্গ করে ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি একটি উৎসবের আনন্দ খুঁজে তাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি সমাজ বাস্তবতা। এ উৎসবে যুক্ত হয়ে অহিন্দু বাঙালি নিজ ধর্মকে ছোট করেনি। যেমন করে মুসলমানের ঈদ উৎসবে যুক্ত হয়েছে সনাতন ধর্মবিশ্বাসীরাও। অধিকাংশ পাঠক ইমেইল ও ফেসবুকে একে স্বাগত জানালেও দু’একজন মানুষ ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে উপস্থিত করেছেন। এর সঙ্গে অনাবশ্যকভাবে কোরআনহাদিসের ব্যাখ্যা যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। আমি অবশ্য এতে খুব অবাক হইনি।

ধর্মসংস্কৃতিসমাজ আমার গবেষণা ক্ষেত্রের বিষয়। একবার আমার এক অনুসন্ধিৎসু ছাত্র উদ্বুদ্ধ হয়ে কোরআন শরিফের বহু খণ্ডে লেখা তাফসির পড়ার চেষ্টা করল। সে বোখারি শরিফ ভালো করে পড়ল। তারপর বলল, স্যার আমার কাছে এখনও সব পরিষ্কার হল না। আমি বললাম, ধর্মতত্ত্বের গভীরতা এত সহজে পাওয়া যায় না। এজন্য তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পড়তে হবে। অন্য ধর্মের গ্রন্থগুলোও চর্চা করো। তারপর নিজ ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব অনুভব করতে পারবে। কোনো সূরার শাব্দিক তরজমা এর অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যাকে স্পষ্ট করবে না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমাজ বাস্তবতায় ও প্রয়োজনে সূরা অবতীর্ণ হয়েছে।

আমার মনে হয়, আমরা প্রকৃত অর্থে চর্চা না করে সাধারণ মানের বই পড়ে আর অর্ধশিক্ষিত ধর্ম ব্যাখ্যাকারীর ধর্ম সম্পর্কিত বক্তব্য শুনে অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। এগারো শতক থেকে বাংলায় ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছিল। যদি বিদগ্ধ ইসলামী চিন্তাবিদ সুফিদের মধ্যে রক্ষণশীলতা কাজ করত, তাহলে এদেশে প্রবলভাবে ইসলাম সম্প্রসারিত হতে পারত না।
এ দুর্বল জায়গাটিকেই ব্যবহার করছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতালোভী জঙ্গিদের গডফাদাররা। তারা নিজেরা নিরাপদ দূরত্বে থাকছে। তরুণদের প্রকৃত ইসলাম চর্চা থেকে দূরে রেখে এদের মুক্ত বিবেক নষ্ট করে দিচ্ছে। এ বিভ্রান্ত তরুণরা ‘কাফের’ নামে মানুষ মেরে ‘ঈমানি’ দায়িত্ব পালন করছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, তারা এত সহজে এদের অমানুষ করতে পারছে কীভাবে? এর উত্তর পাওয়া যাবে উপরের উদাহরণগুলোতে। যে দরিদ্র ঘরের সন্তান স্কুলমাদ্রাসায় পড়ছে পারিবারিক শিক্ষা ও পরিবেশগত কারণে তাদের আধুনিক সমাজের উচ্চতায় ওঠার সুযোগ কম। বদ্ধ জলাশয়ে থাকায় কোনো উচ্চাশা জন্ম নেয়নি। বরঞ্চ নানা রকম হতাশা এদের নিত্যসঙ্গী। এসব কিশোরতরুণের সামনে জঙ্গি গুরুরা একটি স্বপ্নিল জীবনের খোঁজ দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত করে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা। এসব তরুণ যখন ইহজগতে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ, তখন তাদের পরজগতের মধ্যে যাওয়ার সহজ পথ দেখায়। এ কারণে তারা মানুষ মারতে ও নিজেরা মরতে ভয় পায় না। যাপিত জীবনের কষ্টের চেয়ে বেহেশতের হাতছানি এদের প্রলুব্ধ করে।

দ্বিতীয় উদাহরণ থেকে আমরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়া সম্পন্ন পরিবারের সন্তানদের বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ খুঁজতে পারি। উপরের ব্যাখ্যার সঙ্গে এখানেও মিল আছে। এলেভেল এবং ওলেভেলে এরা যে কারিকুলামে পড়ে এসেছে, সেখানে জীবনজগৎ, দেশসংস্কৃতি স্পষ্ট নয়। পারিবারিক জীবনও অনেকের ছন্নছাড়া। এরা যখন মনস্তাত্ত্বিকভাবে মুক্তির পথ খোঁজে, তখন তাদের সামনে এসে উপস্থিত হয় এসব অন্ধকারের জীব। জঙ্গিদের গডফাদাররা এ সুযোগটি গ্রহণ করে। বিভ্রান্ত তরুণদের সামনে আনন্দময় জীবনের স্বপ্ন দেখায়। একইভাবে বিভ্রান্ত পরিবারগুলো সার্টিফিকেটে শিক্ষিত হলেও তাদের ব্যক্তিজীবনের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট দুর্বল। এদের মধ্যে যারা সেয়ানা, তারা ইহজাগতিক জীবনের লাভলোভের খোঁজ পেয়ে যায়। যাদের মধ্যে মূর্খতাবশত করে, তারা পতঙ্গের মতো ঝাঁপ দেয় অগ্নিকুণ্ডে।

সুতরাং আমরা মনে করি, শক্তি প্রয়োগে চূড়ান্তভাবে জঙ্গি দমন সম্ভব নয়। জঙ্গি জন্ম নেয়ার আঁতুড়ঘরে আঘাত হানতে হবে। সমাজকর্মীসাংস্কৃতিক কর্মীদের সক্রিয় হতে হবে। পৃষ্ঠপোষকতার হাত বাড়াতে হবে সরকারকে। মাদ্রাসা থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সর্বত্র কারিকুলামকে আধুনিক করতে হবে। দক্ষ মেধাবী শিক্ষকদের হাতে তুলে দিতে হবে শিক্ষা দেয়ার ভার। দরিদ্র পরিবারগুলোকে শিক্ষিত ও সচ্ছল হওয়ার পথ দেখাতে হবে। জীবনধারায় হতাশ হওয়ার পথ বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষকে সঠিক পথ চেনার জন্য প্রণোদিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অন্ধকার দূর না করে আলোকিত ভুবন পাওয়ার ইচ্ছে বাতুলতা মাত্র।

. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১৮ অক্টোবর ২০১৬

militancy-indoctrination-jg-1amilitancy-indoctrination-jg-1b

নব্য জেএমবির অর্থদাতা রোকন, জাহিদ , তানভীর

এস এম আজাদ : বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়া নব্য জেএমবির তহবিলের প্রধান অর্থদাতা ওই সংগঠনেরই নেতৃস্থানীয় কয়েক ব্যক্তি। মূলত নাশকতা চালানোর লক্ষ্যেই ওই তহবিল গঠন করা হয়। নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগদানকারী চিকিৎসক রোকনুদ্দীন খন্দকার একাই ৮০ লাখ টাকা দিয়েছেন। গত ১০ জুলাই সপরিবারে সিরিয়ায় যাওয়ার আগে নব্য জেএমবির তহবিলে দেওয়ার জন্য এই ৮০ লাখ টাকা তিনি তাঁর স্বজন ও সহযোগীদের কাছে দিয়ে যান। রাজধানীর রূপনগরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নিহত মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার সময় পেনশন বাবদ পাওয়া কোটি টাকার পুরোটাই দিয়ে দেন জঙ্গি তহবিলে। আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নিহত তানভীর কাদেরী উত্তরায় তাঁর ফ্ল্যাট বিক্রি করে পাওয়া প্রায় কোটি টাকা দান করেন নব্য জেএমবির তহবিলে। এ ছাড়া দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ১৪ লাখ টাকা আসে। রাজধানীর গুলশানে ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার খরচ মেটানো হয় ওই তহবিল থেকেই। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এসব তথ্য জানিয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ডা. রোকনসহ তিনজনের তহবিল গঠনের ব্যাপারে জানান। পরে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ডা. রোকন যাদের কাছে টাকা দিয়েছিলেন তারা পুরো টাকা সংগঠনের তহবিলে দেয়নি।

অন্যদিকে র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, আশুলিয়ায় অভিযানের সময় নিহত আবদুর রহমান ওরফে নাজমুল হোসেনসহ অন্তত ১২ জন ৩০ লাখ টাকা অর্থায়ন করে নব্য জেএমবির তহবিলে। তবে এখনো প্রকৃত নামপরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় রহমানের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি সিটিটিসি ইউনিট।

সিটিটিসি ইউনিটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া টাকা খরচ করেই গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলা চালানো হয়। এ ছাড়া দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ১৪ লাখ টাকা আসে, যা তামিমসহ অন্য জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে। তামিম ছাড়া পলাতক জঙ্গি বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ওরফে রাহুল টাকা সংগ্রহ করে। এক কর্মকর্তা জানান, এ পর্যন্ত তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলায় বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়নি। দেশীয় উেসর টাকায়ই এসব হামলা চালানো সম্ভব হয়েছে। বিদেশি উৎস থেকে নব্য জেএমবির কাজের জন্য কিছু অর্থ আসারও তথ্য মিলেছে।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুলশান হামলাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নব্য জেএমবির অর্থসংস্থানের ব্যাপারে আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। সপরিবারে সিরিয়ায় যাওয়ার আগে ডা. রোকন ৮০ লাখ টাকা দিয়ে গেছেন। দেশে থাকা অবস্থায় নব্য জেএমবির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হয়। দেশ ছাড়ার আগে টাকা দিয়ে সংগঠনের কাজে ব্যবহারের কথা বলে যান তিনি। তবে যাদের দিয়েছেন তারা পুরো টাকা সংগঠনে দেয়নি।’ মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘নিহত জঙ্গি মেজর (অব.) জাহিদ তাঁর পেনশনের পুরো টাকা দিয়েছেন। একইভাবে তানভীর কাদেরী তাঁর উত্তরার ফ্ল্যাট বিক্রি করে টাকা দেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা প্রায় ১৪ লাখ টাকা বাশারুজ্জামান গ্রহণ করেন। এগুলোও ব্যবহার করা হয়েছে। গুলশানে হামলা বা শোলাকিয়ার ঘটনায় বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়নি। ফলে ধারণা করছি, এসব টাকায়ই তারা চলেছে। বড় অঙ্কের বিদেশি কোনো অর্থায়নের তথ্য মেলেনি। এ বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে।’

সিটিটিসি ইউনিট সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় ঈদ উদ্যাপন করার কথা বলে গত ১০ জুলাই পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়েন ডা. রোকনুদ্দিন খন্দকার। তিনি ছিলেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক বিভাগের স্লিপিং ডিসঅর্ডারের চিকিৎসক। দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে তিনি ওই চাকরিতে ইস্তফা দেন। তাঁর স্ত্রী নাইমা আক্তার নিলু যশোর সরকারি এমএম কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। দেশ ছাড়ার আগে তিনি বিদেশে ভ্রমণ করবেন বলে কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেন। তাঁদের সঙ্গে দেশ ছাড়ে দুই মেয়ে রেজোয়ানা রোকন ও রামিতা রোকন এবং রেজোয়ানার স্বামী সাদ কায়েস ওরফে শিশির। রোকন রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ায় তাঁর ৪১১/বি নম্বর পাঁচতলা ভবন, চেম্বারসহ বেশ কিছু সম্পত্তিও স্বজনদের দান করে যান। বড় মেয়ে রেজোয়ানা রোকন ও তাঁর স্বামী সাদ কায়েস শিশির নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে পড়তেন। ২০১৪ সালের মার্চে তাঁরা নিজেরাই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শিশিরের বাড়ি শনির আখড়া এলাকায় একটি কিন্ডারগার্টেনের পাশে। ডা. রোকনের ছোট মেয়ে রামিতা রোকন ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ছিল। তবে পরীক্ষার আগেই সে মাবাবা ও বোনের সঙ্গে দেশ ছেড়ে চলে যায়।

সূত্র মতে, পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া হয়ে সিরিয়ায় পাড়ি জমান ডা. রোকন। তারা এখন রাকা শহরে আইএস ঘাঁটিতে অবস্থান করছে। সেখানে আইএস জঙ্গিদের শিশুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন রোকন। তাঁর স্ত্রী নাইমা আইএস মতাদর্শীদের শিক্ষাবিষয়ক কাজে সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশে অবস্থানকারী নব্য জেএমবির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব তথ্য জানান রোকন।

সিটিটিসি ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর উত্তরায় অবস্থানকালে মেজর (অব.) জাহিদ নব্য জেএমবির আদর্শ গ্রহণ করেন। এরপর তামিম চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। কথিত জিহাদে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি পেশাগত জীবন ও পরিবার ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। ওই সময় তাঁর পেনশনের পুরো টাকা তিনি সংগঠনে দেন। এসব টাকা তামিম ও আস্তানার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা গ্রহণ করে। জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা এখনো পলাতক। আজিমপুরে নিহত তানভীর কাদেরী পরিবার নিয়ে উত্তরায় ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর বাড়িতে নিজ ফ্ল্যাটে থাকতেন। নব্য জেএমবিতে যুক্ত হওয়ার পর ওই ফ্ল্যাট বিক্রি করে তিনি রূপনগরে চলে যান। ফ্ল্যাট বিক্রির পুরো টাকাই সংগঠনে বিনিয়োগ করেন তিনি। এরপর বারিধারা হয়ে সর্বশেষ আজিমপুরে লালবাগ রোডের ২০৯/৫ নম্বর বাসায় ছিলেন। তানভীর কাদেরী আগে ডাচ্বাংলা মোবাইল ব্যাংকিং, রবি ও কল্লোল গ্রুপে এবং তাঁর স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা মুসলিম এইড, সেভ দ্য চিলড্রেনে চাকরি করেছেন। ফলে তাঁদের ব্যাংক হিসাবেও বেশ কিছু টাকা ছিল। আবেদাতুল ফাতেমা আজিমপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত সোমবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সূত্র মতে, রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার বাসিন্দা বাশারুজ্জামান ওরফে আবুল বাশার ওরফে রাহুল ওরফে চকলেট অনেক দিন ধরে নিখোঁজ। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বাশারুজ্জামান এখন নব্য জেএমবির অর্থ ও পরিকল্পনার সমন্বয়ক। হুন্ডির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ১৪ লাখ টাকার একটি চালান তিনিই গ্রহণ করেন। আজিমপুরের আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তাঁর স্ত্রী শায়লা আফরিনও গত সোমবার আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

এদিকে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, আশুলিয়ার বাইপাইলে অভিযানের পর নব্য জেএমবির তহবিলে অর্থায়নকারী অন্তত ১২ জনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের সময় ভবন থেকে পড়ে নিহত আব্দুর রহমানের প্রকৃত পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তিনি রহমান ছাড়াও এনামুল, মুক্তার, নাজমুল, সরোয়ার, বাবু, রকিবুল ও প্রকাশ ইত্যাদি ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেন তিনি। তাঁর স্ত্রী শাহনাজ আক্তার রুমিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং ৩০ লাখ টাকা উদ্ধার করার পর নব্য জেএমবির অর্থদাতাদের ব্যাপারে তথ্য মেলে।

এসব অর্থদাতার ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আব্দুর রহমান বা এ রকম কারো অর্থায়নের তথ্য আমরা পাইনি। জেনেছি, ওই ব্যক্তির নামপরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হয়ত সেও অর্থদাতাদের কেউ হতে পারে।’

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৯ অক্টোবর, ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: