প্রথম পাতা > অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, বাংলাদেশ, রাজনীতি > চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যে ভারসাম্য আনয়ন প্রয়োজন

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যে ভারসাম্য আনয়ন প্রয়োজন

sino-bangla-flagsবর্তমান ভারসাম্যহীনতা হ্রাসে চীনের বাজারে বাংলাদেশের সব পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার কামনা করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রপতি হামিদ বলেন, ‘বর্তমান বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা হ্রাসে আমরা চীনের বাজারে বাংলাদেশের সব পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের অনুমতির জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’ সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা স্থায়ী এ বৈঠকে শি চিনপিং বলেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে চীন তার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়টি তাঁর দেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

বাংলাচীন সম্পর্কের নতুন দিগন্ত

 

মহিউদ্দিন আহমদ : চীন মনে হচ্ছে দুনিয়াটাকে কাঁপাতে শুরু করেছে। চীনের এই নতুন ভূমিকা বাংলাদেশেও বেশ ভালোভাবে অনুভূত হচ্ছে। এশিয়াআফ্রিকাল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতেও চীনের এই ফরোয়ার্ড মার্চ কয়েকটি পশ্চিমা দেশকেও নার্ভাস করে তুলেছে বলে মনে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে ২০ ট্রিলিয়ন ডলার (১০০০ মিলিয়নে ১ বিলিয়ন, ১০০০ বিলিয়নে ১ ট্রিলিয়ন) জাতীয় ঋণ; এর বিপরীতে চীনে ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো এবং তা দিন দিন বাড়ছেও। গত ৩৫ বছর ধরে চীনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ, দুনিয়ার মাত্র দু’তিনটি দেশে এমন প্রবৃদ্ধি কয়েক বছরের মধ্যে দেখা গেছে। ১৯৮০ সালে দেং জিয়াও বিং ক্ষমতায় এসে যখন কমিউনিজমের নীতিআদর্শ বাদ দিয়ে এক ধরনের মডিফাইড ক্যাপিটালিজম তার দেশের জন্য গ্রহণ করলেন, তখন থেকেই চীনের এই মার্চ শুরু এবং তা অব্যাহত আছে। চীনকে দুনিয়ার ফ্যাক্টরি বলেও বর্ণনা করা হচ্ছে।

১৯৮০ সালে ভারত ও চীনদুটো দেশেরই মাথাপিছু আয় ছিল ৩০০ ডলার। এখন সেটা বেড়ে চীনের হয়েছে ৬০০০ এবং ভারতের ২০০০ ডলার। এসব সূচকে চীনের সাফল্য যেমন উদ্ভাসিত, তেমনি চীনের জন্য এসব সাফল্য এক ধরনের চাপও সৃষ্টি করেছে। চীনের এসব সাফল্য ধরে রাখতে হলে কাঁচামালসহ বিভিন্ন ধরনের জোগানও দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু এসব কাঁচামাল বিশাল পরিমাণে কয়টি দেশ সরবরাহ করে দিতে পারবে? অস্ট্রেলিয়ার ওপর চীন অনেক রকমের খনিজ সম্পদের ব্যাপারে নির্ভরশীল। অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে কোনো রকমের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে বা অস্ট্রেলিয়ার জাহাজগুলো যদি সরবরাহ নিয়ে চীনের দিকে আসতে কোনো কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয় তাহলে চীনের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হবে, প্রবৃদ্ধিও কমে যেতে পারে।

কোনো কোনো অঞ্চল এখন দুনিয়ার টালমাটাল অবস্থার মধ্যে আছে, সে কারণে চীনের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা যেমন অপরিহার্য, আমাদের মতো ছোট ছোট দেশের জন্যও তা প্রয়োজন। আমরা যে ভৌগোলিক অবস্থানে আছি, আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত এবং কাছের আরেক বৃহৎ শক্তি চীন। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দুনিয়ার শান্তিশৃংখলা যেমন অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যে কোনো ধরনের টেনশন আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

উদীয়মান শক্তি হিসেবে সামনের দিনগুলোয় চীন দুনিয়াতে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে তা অবশ্যই প্রত্যাশিত, কিন্তু আমাদের অঞ্চলে এ ভূমিকাটি আরও বেশি হবে বলে আমরা আশা করি। প্রতিবেশীদের স্বার্থে, বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর কথা বিবেচনা করে চীনকে হয়তো অতিরিক্ত কিছু ত্যাগও করতে হতে পারে, কোনো রকমের রেসিপ্রোসিটি ছাড়াই। তিব্বত থেকে উত্তরদক্ষিণ, পূর্বপশ্চিমে এতসব নদনদী বেরিয়েছে যে, এসব নদীর গতিপথ বা জলধারা যদি সামান্যতম পরিবর্তন করে চীন, তাহলে নিুাঞ্চলের দেশগুলো সংকটে পড়তে পারে। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা এমন মাত্র দুটো উদাহরণ, যেগুলোর ওপর চীন যদি কোনো বাঁধ নির্মাণ করে, তাহলে ভারতবাংলাদেশ দুটো দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীন থেকে যে মেকং নদী বেরিয়েছে, সেটিকে তো দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ৬/৭টি দেশ অতিক্রম করে সমুদ্রে পড়েছে। এই নদীটি যেমন একটি বড় সম্ভাবনা, তেমন দেশগুলোর জন্য একটি সমস্যাও হতে পারে।

চীনের প্রেসিডেন্টের ১৪০০ শব্দের যে লেখাটি গতকাল ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছে, সেটিতে তিনি বাংলাদেশ ও চীনের সঙ্গে অতীত ও বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন। এ লেখাটি পড়ে অনেকের মতো আমিও মুগ্ধ হয়েছি। তিনি বঙ্গবন্ধুর দু’বার চীন সফরের কথা উল্লেখ করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, শেখ হাসিনাও ছয়বার চীন সফর করেছেন। বাংলাদেশ থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে কে কতবার চীন সফর করেছেন, তা কৌতূহলোদ্দীপকই বটে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সরকারপ্রধান হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর চীন সফরে যান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রীও ফিরতি সফরে আসেন ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। এই সফরকালে চৌ এন লাই ১০ দিন পাকিস্তানে অবস্থান করেন। আজকালকার প্রেসিডেন্টপ্রাইম মিনিস্টারদের কেউই এত লম্বা সময় নিয়ে অন্য একটি দেশ সফর করেন না। স্পষ্ট মনে আছে, ১৯৬৩ কী ’৬৪তে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র থাকাকালে আমরা দল বেঁধে তেজগাঁও বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম চৌ এন লাইকে সংবর্ধনা জানাতে। তখন তিনি বিমানবন্দরের বাইরে আসেননি, খুব সম্ভব ঢাকা দিয়ে ট্রানজিট করেছিলেন। প্রাসঙ্গিক বলে আরও উল্লেখ করি, ১৯৭০ সালের সেই মহাপ্লাবন ও জলোচ্ছ্বাসের মাত্র কয়েকদিন পর প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান চীন থেকে ঢাকা হয়ে ইসলামাবাদ ফিরেছিলেন; কিন্তু তিনি উপকূল অঞ্চলের লাখ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দেখতে যাননি। এতে আমাদের ক্ষোভ আরও বেড়েছিল।

চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার এত বড় যে, আমাদের বর্তমান গার্মেন্ট সামগ্রীর সবটুকুই যদি রফতানি করি, তাতেও তাদের চাহিদা মিটবে না। আমাদের রফতানি এখন মাত্র ৯০০ মিলিয়ন ডলার অথচ আমদানি ১০১২ বিলিয়ন। খুবই একপেশে আমাদের দু’দেশের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্য। চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরকালে একটি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে। ১ বিলিয়ন ডলার রফতানি বাড়াতে পারলে ২০২৫ হাজার নতুন চাকরির সৃষ্টি হয়। আমাদের রফতানি বাড়াতেই হবে। কিন্তু রফতানি বাড়ানোর জন্য যে ভৌত অবকাঠামো, তার তীব্র অভাব অনুভব করেন আমাদের রফতানিকারকরা। এই কাঠামো পাল্টাতে চীনের সাহায্যসহযোগিতা, পরামর্শ আমাদের জরুরি প্রয়োজন। চীনের বিশ্বব্যাপী যে অভিযান আমরা দেখতে পাচ্ছি তাতে আমাদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। ১৯৭১এ চীনের ভূমিকার কারণে যে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল, তার নিরসনে চীনের নেতারা উদার হবে বলেও আশা করি।

শিউলীতলা’, শুক্রবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৬

মহিউদ্দিন আহমদ : সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১৫ অক্টোবর ২০১৬

sino-bd-commercechinese-loan-jg-1achinese-loan-jg-1b

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: