প্রথম পাতা > অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, বাংলাদেশ, রাজনীতি, শিল্প > চীনের ঋণ, প্রকল্প ও চুক্তি নিয়ে কিছু পর্যালোচনা

চীনের ঋণ, প্রকল্প ও চুক্তি নিয়ে কিছু পর্যালোচনা

সাংবাদিক গোলাম মোর্তজার সাথে বিভিন্ন ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছেন রেজোয়ান সিদ্দিকী । প্রকৃত অবস্থা এ দুটি পর্যালোচনার মাঝামাঝি । চীনের চুক্তিগুলোতে শর্তগুলো আপাতদৃষ্টিতে বৈষম্যমূলক মনে হলে-ও বাংলাদেশের মতো দুর্নীতিবাজদের দেশের জন্য খুব বেশী ক্ষতিকরকারক নয় । তাছাড়া, ঐ শর্তগুলো প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়িত হতে সাহায্য করবে — আমাদের যেখানে সময়মতো প্রকল্প শেষ বা শুরু করতে বাজে রেকর্ড আছে এবং অনেক সময় দাতা দেশের অর্থ পর্যন্ত তাদের কাছে ফেরত যায় । কাঁচামালের সরবরাহকারী নির্বাচনে-ও আমরা স্বচ্ছতার আশ্রয় নেই বা যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেই না ।

চীনের ঋণ, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, শ্রীলংকার দৃষ্টান্ত ও ভারতের দৃষ্টি

 

sino-bangla-mortozaগোলাম মোর্তোজা : চীনের প্রেসিডেন্টের আগমনে বাংলাদেশে তো বটেই, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় আলোড়ন তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন, বাংলাদেশের শত্রু পাকিস্তান। বাংলাদেশের হৃদ্যতা ভারতের সঙ্গে, পাকিস্তাননেপাল এবং সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের নানা টানাপোড়েন।

শ্রীলঙ্কায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ নিয়ে কিছুটা জটিলতায় চীন। মায়ানমারে ভারতের আগমন, আমেরিকার সমর্থন ভারতের প্রতি। চীনের দীর্ঘদিনের মিত্র মায়ানমারে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য কিছুটা কমছে। শ্রীলঙ্কার গভীর সমুদ্র বন্দর নিয়ে চীনভারতশ্রীলঙ্কা টানাপোড়েন চলছে। শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ‘মানবাধিকারমত প্রকাশ’ বিষয়ক মার্কিন চাপ তুচ্ছ করে আকাশমুখী চীনের অর্থনীতি। এমন একটি অবস্থায় বাংলাদেশ সফরে এলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন । সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা।

.

রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনা সরকারের জন্যে এটা একটা বিরাট সাফল্য। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ, ‘একমুখী ভারতনীতি’র। ভোটারবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভারতের সমর্থন নিয়ে তিনি তার সরকার টিকিয়ে রেখেছেন। ভারতের থেকে কিছু পাচ্ছেন না, শুধু দিয়ে যাচ্ছেনবিনিময়ে ক্ষমতায় থাকছেন। এই অভিযোগ যখন জোরালো এবং দৃশ্যমান, তেমন একটা সময়ে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশে আগমন, শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্য তো বটেই, আশীর্বাদও।

চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেকে অন্য উচ্চতার রাষ্ট্র প্রধানের মর্যাদায় নিজেকে পরিচিত করতে পেরেছেন। চীনের প্রেসিডেন্টের সফরকে তীক্ষ্ণভাবে নজর রাখছিল ভারত এবং ভারতের গণমাধ্যম। ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’র কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার ঢাকা এসে কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারটি ‘দ্য হিন্দু’ প্রকাশ করেছে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশে আগমনের দিন, ১৪ অক্টোবর। একজন পরিপক্ব রাষ্ট্রনায়ক আঞ্চলিকআন্তর্জাতিক এবং দ্বিপাক্ষিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ে যতটা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে, পরিশীলিত দৃঢ়তায় কথা বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠিক ততটা যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন।

সার্ক বর্জন, ভারত এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, বাংলাদেশ এখন চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে কিনাবিষয়ক প্রশ্নগুলোর জবাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ভাষায় দিয়েছেন, এর চেয়ে ভালো জবাব আর কিছু হতে পারত বলে মনে হয় না। (যদিও এই সাক্ষাৎকারেই দেশের রাজনীতি নিয়ে যা বলেছেন, তার সঙ্গে বড়ভাবে দ্বিমত আছে। সেই আলোচনা আজকের এই লেখায় আনছি না।) ভারত ছাড়া আর কাউকে বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে না, চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে এবং শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে, এই অভিযোগের অনেকটাই খণ্ডন করা গেছে।

.

রাজনৈতিককূটনৈতিক সাফল্য শেখ হাসিনাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ, তা আবারও প্রমাণ হলো। জাপানচীনভারতের সম্মিলিত আগ্রহ, তা প্রমাণ করছে। চীনের অর্থনৈতিক ঋণ সহায়তার বিষয়গুলো, সরকার কিভাবে কাজে লাগাবে বা লাগাতে পারবে, তার উপর সামগ্রিক সাফল্যের অনেক কিছু নির্ভর করবে। এখন পর্যন্ত ঋণ চুক্তি গুলো অস্বচ্ছ এবং গোপণীয়। যত দূর জানা গেছে, চীনের ১৩টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের ১১টি বেসরকারি, ২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ১৩৬০ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে। আরও বেশ কিছু চুক্তি আগামী দিনে হবে। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে অনেকগুলো।

মোট ঋণ সহায়তা কত বিলিয়ন ডলারের, তা নিশ্চিত করে এখনও জানা যায়নি। ইতিপূর্বে বাংলাদেশকে ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিল ভারত। জাপান ৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। চীনের ঋণ সহায়তার পরিমাণ ভারতের ২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় তো বটেই, জাপানের ৬ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও দুই বা তিনগুণ বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারত ২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ২০ লাখ ডলার পদ্মাসেতুর জন্যে অনুদানের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু বাকি অর্থ ছাড়ে কঠিন শর্ত এবং নজীরবিহীন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা করছে। ফলে ভারতীয় ঋণে বাংলাদেশের কোনো উন্নয়নই দৃশ্যমান হয়নি। ঋণ ছাড়ের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন না করে, ট্রানজিট সুবিধা নেয়ায় ভারতের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশে। এমন অবস্থায় চীনের বিশাল ঋণ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এ ধরনের ঋণে ভারতই যে শুধু কঠিন শর্ত দিয়েছে, তা নয়।

চীনকোরিয়া এমনকি জাপানও কঠিন শর্ত দেয়। ইতিপূর্বে এমন কঠিন শর্তে ঋণ দিয়েছে, সুইডেনসহ ইউরোপের কিছু দেশও। ঋণের শর্ত সহজকঠিন বিষয়টি নির্ভর করে দর কষাকষির যোগ্যতাসততাসক্ষমতার উপর। অবিশ্বাস্য হলেও কঠিন সত্যি এই যে, এই তিনটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ভয়ানক রকমের দুর্বলতা আতঙ্কজনকভাবে লক্ষণীয়।

.

চীনের ঋণ সহায়তার সুদের হার কত হবে, তা জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে সুদের হার হতে পারে ২ শতাংশ। কত বছরে এসব ঋণ শোধ করতে হবে, তা এখনও জানা যায়নি। কমিটমেন্ট ফি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কোনো প্রকল্পই ঠিক সময়ে শেষ করতে পারে না। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না করতে পারলে, কমিটমেন্ট ফি বড় বিপদের কারণ হতে পারে। চীনের বিনিয়োগের আরেকটি চরম নেতিবাচক দিক, অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে তা বড় ভূমিকা রাখে না।

পদ্মাসেতুর বিশাল বিনিয়োগের মূল কাজ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান। অর্থের তুলনায় অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে তা বড় ভূমিকা রাখছে না। কারণ সেতুর স্টিল অবকাঠামোর মূল কর্মযজ্ঞ চলছে চীনে। যা জাহাজে করে এনে কংক্রিটের সেতুর উপর স্থাপন করা হবে। পুরো প্রক্রিয়া চীনাদের দ্বারাই সম্পন্ন হবে। ভারতীয় ঋণে যেমন ৭৫% জিনিস ভারত থেকে কেনার শর্ত থাকে, চীনের শর্তও প্রায় তেমনই।

বাংলাদেশে যা সহজলভ্য তেমন জিনিসও ঋণদানকারী দেশ থেকে কিনতে হয়। ৫ টাকার জিনিস ১০ বা ১৫ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। ভারতীয় বা কোরিয়া ঋণে ঠিকাদার হতে হয় ভারতীয় বা কোরীয়। চীনের ঋণেও একমাত্র চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানই কাজ করতে পারবে। এক্ষেত্রের শর্তটা ভয়ানক কঠিন। কোনো টেন্ডার আহ্বান করা যায় না। চীনেরও একাধিক প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয় না।

চীন যে প্রতিষ্ঠানটিকে ঠিক করে দেয়, সেই প্রতিষ্ঠানকে তাদের নির্ধারিত মূল্যে কাজ দিতে হয়। এযাবতকালে বাংলাদেশে চীনের ঋণে এই প্রক্রিয়াতেই কাজ হয়ে আসছে। প্রত্যাশিত ছিল চীনের প্রেসিডেন্টের আগমনের এই সময়ে বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা বা দরকষাকষি করে চুক্তি স্বাক্ষর করবে। বাস্তবে এমন আলোচনা হয়েছে, তা জানা যায়নি। যতদূর জানা গেছে, এমন কোনো আলোচনা হয়নি।

.

চীনের ঋণ সহায়তায় বড় বড় অনেক প্রকল্প হবে। দেশের অর্থনীতিতে একটা গতিশীলতা আসবে। প্রশ্ন হলো, শেষ পর্যন্ত এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের কতটা বাস্তবায়ন হবে? এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাপ্রদ নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরকালে অনেকগুলো চুক্তিসমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছিল। বাস্তবে অগ্রগতি তেমন একটা জানা যায়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় প্রায় ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছিল। এক্ষেত্রেও অগ্রগতির অবস্থা বড়ই করুণ।

চীনের ক্ষেত্রে কী ঘটবে তা আগামীতে জানা যাবে। পরবর্তী মনিটরিং, বাস্তবায়নে বাংলাদশের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বা হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যাবে, আশা করাটা ঠিক হবে বলে মনে হয় না। ফলে চীনের প্রেসিডেন্টের এত আলোড়ন তোলা সফর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগাতে পারবে, তা নিয়ে বড় সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

.

xi-hasina-2সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, আইএসএফ এবং বিভিন্ন দেশ থেকে। দেশীয় কর্মীদের পাঠানো অর্থে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। ঋণের অর্থে অনেক প্রকল্প চলছে। অর্থনীতিতে গতিশীলতা আছে। কঠিন প্রতিযোগিতায়ও দেশীয় পোশাকসহ অনেক শিল্প যোগ্যতার সঙ্গে টিকে আছে, ভালো করছে। কৃষক উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। দমনপীড়ন, জঙ্গিবাদের ভয়াবহতা থাকলেও, রাজনীতিতে দৃশ্যমান অস্থিরতা নেই। শিল্পব্যবসাবাণিজ্যের জন্যে যা সহায়ক। যদিও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা আশঙ্কাজনক পর্যায়ের অন্যায়অনিয়মদুর্নীতিতে পরিপূর্ণ।

এমন অবস্থায় কঠিন শর্তের এসব ঋণ সঠিক পথে, প্রয়োজনীয় প্রকল্পে ব্যবহার করতে পারা না পারার উপর দেশের ভবিষ্যতের অনেক কিছু নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে শ্রীলঙ্কার প্রেক্ষাপট। শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজা পাকসে গৃহযুদ্ধের মতো ভয়ঙ্কর কঠিন বিপদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে পেরেছেন। জনগণের আস্থাও অর্জন করেছিলেন। বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা চালিয়েছেন কয়েক বছর ধরে। শ্রীলঙ্কার অবকাঠামোগত উন্নয়নেও মূল বিনিয়োগ ছিল চীন নির্ভর।

শ্রীলঙ্কায় চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার। রাস্তা, ফ্লাইওভার, ব্রিজ, পাঁচ তারকা হোটেল, স্টেডিয়াম, এয়ারপোর্টনির্মিত হয়েছে চীনের ঋণে। সমুদ্র ভরাট করে শ্রীলঙ্কাকে দুবাই বানানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন রাজা পাকসে। তার নিজের এলাকা হামবানতোতাকে একটি আন্তর্জাতিক নগরীতে পরিণত করেছেন। একাধিক ফাইভ স্টার হোটেল, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম, বিমানবন্দর তৈরি করেছেন।

বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে এর পেছনে। একটা আন্তর্জাতিকমানের দৃষ্টিনন্দন শহরে পরিণত করেছেন তার এলাকাকে। এসব কাজ হয়েছে চীনের ঋণ এবং বুদ্ধিতে। আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরটিকে এখন বলা হয় ‘এম্পটি এয়ারপোর্ট’। খালি পড়ে থাকে এয়ারপোর্ট, ব্যবহার নেই কিন্তু পরিচালনার বিপুল খরচ আছে। পাঁচ তারকা হোটেলগুরোর অবস্থাও প্রায় একই রকম। ঋণের অর্থ সঠিক পথে বা পরিকল্পনায় ব্যবহার হয়নি।

এত উন্নয়নকরেও রাজা পাকসে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। এখনকার প্রেসিডেন্ট সমুদ্র ভরাট প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছেন, পরিবেশের ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে। চীনের ঋণে শ্রীলঙ্কা গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করেছে। ভারত তাতে অখুশি। চীনের বিপুল ঋণের কাজে স্থানীয় কর্মসংস্থান না হওয়া এবং গভীর সমুদ্র বন্দর করায় ভারতের খুশি না হওয়া, রাজা পাকসের পরাজয়ের কারণ বলে ধারণা করা হয়। এখন বিপুল ঋণের ভারে শ্রীলঙ্কা জর্জরিত।

বাংলাদেশ চীনের থেকে তো ঋণ নিচ্ছেই, রাশিয়ার থেকেও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে। চীনের সঙ্গে যে ১৩৬০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছে, প্রায় এই পরিমাণ ঋণ চুক্তি করেছে রাশিয়ার সঙ্গে একটি পারমাণবিক প্রকল্পের জন্যে। জাপানের ঋণে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা আছে বাংলাদেশের। যদিও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষমতার ৩০% ব্যবহার করতে পারে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম এবং সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবহার খুবই সীমিত। কোনো বিবেচনাতেই নতুন আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে না। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র শুধু ঝুঁকিই নয়, অর্থনৈতিক বিবেচনাতেও লাভজনক নয়। চীনের ঋণের কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ। দেশের ভেতরে ভারতীয় বিনিয়োগের রামপাল নিয়ে যেমন প্রতিবাদপ্রতিরোধ আছে।

চীনের বিনিয়োগের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নিয়েও নানা জটিলতা, প্রতিবাদ আছে। রাজা পাকসের বিরুদ্ধে ঘুষদুর্নীতির অভিযোগ ছিল, যা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েছিল বলে বলা হয়। এসব ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশে সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি। বড় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না বাংলাদেশ। ঋণের অর্থে বাংলাদেশ কি শ্রীলঙ্কার পরিণতি বরণ করবে না, সত্যিকার অর্থেই বিদ্যুৎ খাত ও অবকাঠামো উন্নয়ন করে এগিয়ে যাবে? প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ নয়। কপালে বড় ভাঁজ পড়ার মতো দুশ্চিন্তা আছে।

.

বাংলাদেশের জন্যে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর অপরিহার্য, চীন তা করতেও চেয়েছিল। ভারত চায়নি, চীন বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র বন্দর করুক। ফলে বাংলাদেশ চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরে বিষয়টি আলোচনাই করতে পারল না। ভারতের বাধায় বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র বন্দর করতে না পেরে বসে থাকেনি চীন। মায়ানমারে গভীর সমুদ্র বন্দর করে ফেলেছে চীন। যা বাংলাদেশের প্রস্তাবিত স্থান সোনাদিয়া থেকে খুব দূরে নয়। মায়ানমারের আগে গভীর সমুদ্র বন্দর করতে না পেরে বড় ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

শ্রীলঙ্কায় গভীর সমুদ্র বন্দর এবং সেখানে চীনের সাবমেরিনের উপস্থিতি ভারত তার নিরাপত্তার জন্যে হুমকি মনে করে। আমেরিকাও ভারত মহাসাগরে চীনের এই সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাশা করে না। বাংলাদেশেও যদি চীন গভীর সমুদ্র বন্দর করে, তা ভারতের জন্যে ভালো হবে না বলে ভারত মনে করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মনে করা খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। বাংলাদেশ গভীর সমুদ্র বন্দর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

শ্রীলঙ্কার গভীর সমুদ্র বন্দরের কাছে চীনের সাবমেরিনের আগমন, রাজা পাকসের পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে বা ভারতকে রাজি করিয়ে চীনকে দিয়ে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের দিকে যেতে পারে কিনা, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাহলে বাংলাদেশের আমদানিরপ্তানি তথা ব্যবসাবাণিজ্যের গতি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।

আশঙ্কার কথা, শ্রীলঙ্কা এবং মায়ানমারের গভীর সমুদ্র বন্দরের পর, এই অঞ্চলে আর একটি গভীর সমুদ্র বন্দর আদৌ লাভজনক প্রকল্প হবে কিনা! কারণ একটি গভীর সমুদ্র বন্দর বাংলাদেশ একা ব্যবহার করলে, তা লাভজনক হবে না। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সম্ভাব্য গভীর সমুদ্র বন্দর ইতিমধ্যেই অনেকটা গুরুত্ব হারিয়েছে কিনা!

.

কঠিন শর্তের ঋণে অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন,অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের আধিক্য এবং দুর্নীতি কমাতে না পারলে, এত বিপুল ঋণ বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্যে সঙ্কটজনক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রাজনৈতিককূটনৈতিক সাফল্য দিয়ে, ঋণের বোঝা হালকা করা যাবে না।

গোলাম মোর্তোজা : সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

চীনের ভূরাজনৈতিক উদ্যোগ

 

sino-bangla-flagsরেজোয়ান সিদ্দিকী : চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২২ ঘণ্টার এক ঐতিহাসিক সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন গত শুক্রবার দুপুরে। বাংলাদেশের সাথে তিনি ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন। গত ৩০ বছরের মধ্যে কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের এটিই বাংলাদেশ সফর। জনাব শি চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। বর্তমানে শি জিনপিং একাধারে চীনের প্রেসিডেন্ট, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল। ফলে চীনে তিনি এখন প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী। চীনে অর্থনৈতিক আকার ও প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় হারে বেড়েছে। ফলে চীনে দুর্নীতিও পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছিল। জনাব শি এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আর তার ফলে চীনে দুর্নীতি এখন বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু ব্যবসাবাণিজ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। একসময় বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় ব্যবসায়িক পার্টনার ছিল ভারত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সে চিত্র বদলে গেছে। এখন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। বাংলাদেশ চীন থেকে প্রতি বছর ১০০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। বিপরীতে বাংলাদেশ চীনে রফতানি করে ৮০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। আরো পণ্য রফতানির যে সুযোগ চীন দিয়ে রেখেছে, আমরা তার সদ্ব্যবহার করতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে চীনের বাণিজ্য নীতিতে ভারতের মতো কোনো ফেরেববাজি নেই। অশুল্ক বাধা নেই। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য কেবল বেড়েই চলেছে। উপরন্তু বাংলাদেশের অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও চীন রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কেবল বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে চীন করে দিয়েছে বুড়িগঙ্গা সেতু, বাংলাদেশচীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রসহ আরো অনেক কিছু। অথচ ভারত সিডরদুর্গত এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশকে কদলি প্রদর্শন করেছে। আবার বাংলাদেশের খাদ্য সঙ্কটের সময় চালের মূল্য টনপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি বাড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলেছে। এখনো প্রতিনিয়ত ফেলছে। সীমান্তে পাখি হত্যার মতো প্রতিদিন বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করছে। সরকারও ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে ভারতের এসব বর্বরতা নীরবে মেনে নিচ্ছে।

সরকারের ভারত তোষণ নীতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, বাংলাদেশকে এখন অনেকেই আর সার্বভৌম দেশ মনে করছেন না। বরং তারা বাংলাদেশকে ভুটানের মতো ভারতের একটি ‘প্রজারাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করছেন। খোঁড়া যুক্তিতে বাংলাদেশের সার্ক সম্মেলনে যোগদান না করার সিদ্ধান্তও তার প্রমাণ। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কাশ্মির ইস্যু নিয়ে সম্প্রতি যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে ভারত পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানে অস্বীকৃতি জানায়। তাকে অনুসরণ করে ভুটান ও বাংলাদেশ। সার্কের বিধান অনুযায়ী কোনো সদস্যরাষ্ট্র শীর্ষ সম্মেলনে যোগ না দিলে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় না। সেভাবে ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৬, ১৯৯৯, ২০০০, ২০০১, ২০০৩, ২০০৯, ২০১৫ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৯২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ভারতপাকিস্তান সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। এ সময়েই হয়েছিল ভারতপাকিস্তানের মধ্যে কারগিল যুদ্ধ। তার পরও সার্ক সম্মেলনে সব দেশ যোগ দিয়েছিল। সার্কের বর্তমান চেয়ারম্যান নেপাল। ভারত চেয়েছিল, নেপাল যেন সার্ক সম্মেলন বাতিল করে দেয়। কিন্তু নেপাল এই সম্মেলন বাতিল না করে স্থগিত করে দিয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার গলা ফুলিয়ে বলেছে যে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। অতএব তারা বাংলাদেশের শত্রু। কিন্তু চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ১৯৭১ সালে সমর্থন করেনি। অতএব চীনকে চাই না, এমন কথা বলার মুরোদ সরকারের নেই।

শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের আমলে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। কারণ চীন বাংলাদেশকে মনে করেছে ভারতের একটি স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৭৭ সালে চীনের স্বীকৃতি আদায় করেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্বীকৃতিও পাওয়া যায় শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের পতনের পর। ফলে যত দূর বোঝা যায়, জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে চীনের প্রেসিডেন্টের কাছে কুৎসিত কোনো অভিযোগ করেনি শেখ হাসিনার সরকার। তবে শি জিনপিংয়ের এই সফরকালে চীনা ব্যবসায়ীরা বলেছেন, তারা বাংলাদেশে ১৩০৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। তা ছাড়া চীন তার বিনিয়োগ নীতিতে কোনো জবরদস্তি করে না, যা ভারত করে। ভারত বাংলাদেশে যে ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয় তার শর্তগুলো বড় অদ্ভুত। এই ঋণে যে কাজ হবে তার জন্য কোনো আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা যাবে না। সে টেন্ডারে শুধু অংশ নিতে পারবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। পরামর্শক নিতে হবে কেবল ভারত থেকে। ভারতীয় ঋণের প্রকল্পে ইট, কাঠ, সিমেন্ট, যন্ত্রপাতি, যানবাহন সব কিছু আনতে হবে ভারত থেকে। আর তার দাম নির্ধারণ করে দেবে ভারত। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হবে না।

xi-hasina-3কার্যত বাংলাদেশ ভারতীয় ঋণ প্রকল্পে শুধু কিছু মজুর নিয়োগ করতে পারে। আবার ভারতীয় এই ঋণ প্রকল্পে অদ্ভুত কিছু ব্যাপার লক্ষ করা গেছে রেলওয়ে ওয়াগন আমদানির ক্ষেত্রে। ভারত বাংলাদেশে যে যাত্রীবাহী ওয়াগন রফতানি করেছে, তার সবই প্রায় ভারতীয় রেলওয়ের পুরনো ওয়াগন। এগুলোতে রঙ করে একটা ল্যাপছ্যাপ দিয়ে বাংলাদেশে রফতানি করা হয়েছে। সরকার চুপ। তাতে রেল ওয়াগনের গেটে হিন্দি ভাষায় লেখা আছে বিভিন্ন নির্দেশিকা। ওয়াগনের ভেতরে যে ফ্যান রয়েছে, তাতেও হিন্দি ভাষায় লেখা আছে বিভিন্ন কথা। তবে কি বাংলাদেশ ভারত হয়ে গেছে? অর্থাৎ প্রতারণাই এখানে ভারতীয় ঋণের মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুটে নাও বাংলাদেশ এই হলো ভারতীয় নীতি।

চীন থেকে যে বিপুল অঙ্কের ঋণ পাওয়া যাবে আগামী পাঁচ বছর ধরে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সুসংবাদ। তার ওপর ‘লুটে নাও’ চীনের নীতি নয়। তারা প্রদত্ত ঋণে সত্যি সত্যি সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়ন চায়। দক্ষিণ এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত প্রায় সব দেশের সব চেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। শুধু এশিয়া নয়, চীন তার উদ্বৃত্ত অর্থ আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায়ও বিনিয়োগ করছে। এসব দেশের কেউই চীনা ঋণে ফতুর হয়নি, বরং তাদের জীবন মানে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অরুণাচল ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে ভারতের সাথে চীনের বিরোধ থাকলেও বাণিজ্য সম্প্রসারিতই হচ্ছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনাকালে বলেছেন, বাংলাদেশচীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেল। তিনি বলেছেন, চীন বাংলাদেশের ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু ও ভালো অংশীদার। তিনি মনে করেন, তার এই সফর দুই দেশের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বৈঠক শেষে শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট শির সাথে তার দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একটি ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয়ে বিভিন্ন চুক্তি সই হয়েছে। আমরা খুবই ঘনিষ্ঠভাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।
এখানে আরো একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আর তা হলো রওশন এরশাদের জাতীয় পার্টিকে চীন বিরোধী দল হিসেবে কোনোরূপ স্বীকৃতিও দেয়নি বা রাজনৈতিক দল হিসেবে গোনায় ধরেনি। সরকার যত হল্লাচিল্লাই করুক না কেন, চীন নিশ্চিত যে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিই। আর তাই তার সফরসূচিতে আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল যে, তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করবেন। শেখ হাসিনার সাথে ৪৫ মিনিটের বৈঠকের পর জনাব শি বেগম খালেদা জিয়ার সাথেও ৪০ মিনিটের একঠি বৈঠক করেন। শুধু বিরোধী দল বলেই নয়, চীন জানে, ভবিষ্যতে যদি ক্ষমতার পালাবদল হয়, তাহলে বিএনপিই আবার ক্ষমতায় বসবে। সেখানে তার এই বিপুল বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।
এ আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে ভূরাজনীতি প্রসঙ্গ।। এই বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাতে চীন আশা করেছে, ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকাকে বাংলাদেশ সমর্থন করবে। এই ভূরাজনীতির বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ভূরাজনীতির সাথে জড়িত আছে, চীনপাকিস্তান সম্পর্ক, ভারতপাকিস্তান সম্পর্ক, চীনভারত সম্পর্ক, ভারতবাংলাদেশ সম্পর্ক, টেকনাফ থেকে মিয়ানমার হয়ে এশিয়ান হাইওয়ে প্রভৃতি। নেপালও এর বাইরে নয়। এখন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ অবস্থা। এমনকি সীমিত পরিসরে এ যুদ্ধ বাধলেও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে। ভারতপাকিস্তান যুদ্ধ বাধলে স্বাভাবিকভাবেই সিল্ক রুট দিয়ে পাকিস্তানি বন্দর থেকে চীনে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে। চীন সে পরিস্থিতি কিছুতেই মেনে নেবে না। সে ক্ষেত্রে এ যুদ্ধে চীনের জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। চীন যদি সে যুদ্ধে জড়িয়েই পড়ে, তবে তা কেবল কাশ্মির সীমান্তে সীমিত থাকবে না। যুদ্ধ শুরু হবে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও। আবার তা এগিয়ে আসবে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যেও। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ভারত কোনো দেশের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নেবে। তা হলে চীনের আঘাতের লক্ষ্যবস্তু হবে বাংলাদেশও। আমরা কি তা সামাল দেয়ার ক্ষমতা রাখি?

আরো একটা বিষয় এখানে লক্ষণীয়। আর তা হলো, চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর ও এই বিপুল ঋণ সহায়তার ঘটনা ঘটল মাত্র এক মাসের মধ্যে। যখন ভারতপাকিস্তান উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। যুদ্ধ যদি বাধেই তাহলে বাংলাদেশকে নিজের অস্তিত্বের স্বার্থেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে হবে বা চীনকে সহযোগিতা করতে হবে অথবা ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। এই সফর ও সহযোগিতা সেটি স্মরণ করিয়ে দেয়ার উপলক্ষও বটে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

মেড ইন চায়না, বেশিদিন যায় না’

 

sino-bangla-3প্রভাষ আমিন : ভেতরে ভেতরে হয়তো আরও আগে থেকেই প্রস্তুতি চলছিল। তবে চীনের দৃশ্যমান বদলটা ২৫ বছরের। আমাদের ছেলেবেলায় বিশ্ব চীনসর্বস্ব ছিল না। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে ‘চাইনিজ জিনিস’ বলতে পাওয়া যেত মোরগ মার্কা মশার কয়েল, সেভেন ও ক্লক ব্লেড, সুইয়ের মতো কিছু আইটেম। তখন জাপানি জিনিসের খুব চাহিদা ছিল। মান উন্নত, দামও বেশি। জাপানি জিনিসের মধ্যে সবচেয়ে সহজলভ্য ছিল ‘রেডলিফ’ বল পেন। তবে সেটাও আমাদের কাছে মহার্ঘ্য ছিল। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, এখনকার মতো তখন বল পেন ওয়ানটাইম ছিল না। একটা বল পেনে বছর পেরিয়ে যেত। ‘রেডলিফ’এর দাম ছিল সম্ভবত ১২ টাকা। আর এর রিফিল পাওয়া যেত ৫ টাকায়। এখন শুধু বল পেন নয়, জীবনের প্রায় সবকিছুই ওয়ানটাইম।

৯০ দশকের শুরু থেকেই শুরু হয় চীনের সর্বগ্রাসী ও সর্বব্যাপী বাণিজ্য। আপনার চাহিদামতো সবচেয়ে কম দামে, আপনি যা চান, তাই বানিয়ে দেবে চীন। ব্র্যান্ডের কোনও বালাই নেই। প্রয়োজনে আপনার নামে প্রোডাক্ট বানিয়ে দেবে। তাদের চাই শুধু অর্থ। ‘মেড ইন চায়না’ই সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডিং। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই এখন চীন নির্ভর। সুই থেকে জাহাজ; সবই বানায় তারা। এখনও রাজনীতির মতো বিশ্ব অর্থনীতিও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক। তবে চীন দ্রুতই মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যে ভাগ বসাতে এগিয়ে যাচ্ছে। বছর পাঁচেক আগে একবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে মনটানার মতো নিরিবিলি রাজ্যের গ্রামের বিরান ভূমিতে গিয়েও চীনা পণ্য দেখে চমকে গিয়েছিলাম। এই যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্প ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান দিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে চাইছেন; তার সেই স্লোগান লেখা ক্যাপ উল্টেপাল্টে খুঁজলে দেখবেন কোথাও না কোথাও ‘মেড ইন চায়না’ লেখা। ফেসবুকে এক বন্ধু বললেন, এমনকি সৌদি আরব থেকে আমরা যে টুপি, তসবি, জায়নামাজ কিনে আনি; তাও চীনের বানানো। খালি একটাই বদনাম, ‘মেড ইন চায়না, বেশিদিন যায় না’। কিন্তু দাম এত কম যে মান নিয়ে মাথা ঘামানোর টাইম নেই কারও। এ কথায়ও আপত্তি জানালেন এক বন্ধু।

চীনের মহাপ্রাচীর তো টিকে আছে হাজার বছর ধরে। আসলে চীন সব পারে। তারা দীর্ঘস্থায়ী মহাপ্রাচীরও বানাতে পারে, আবার আইফোনের ওয়ানটাইম কপিও বানাতে পারে।

একটা কৌতুক বলি, এক ছাত্র পরীক্ষার খাতায় ‘অরিজিনাল’ শব্দের বিপরীত শব্দ লিখেছে ‘চাইনিজ’। কৌতুক কৌতুকই। সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। আসল ব্যাপারটা হলো আপনি কী চান, কত দামে চান? এই যে কাস্টমাইজ বাণিজ্য, এটাই তাদের এগিয়ে দিয়েছে অনেক। চীনের অর্থনীতি ফাটকাবাজির নয়; শিল্পের, উৎপাদনের। তাই পণ্যের মান যাই হোক; চীনের অগ্রগতি, উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই।

একাত্তরে চীন আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পরই কেবল তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এখন চীন আমাদের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সব মেগা প্রকল্পেই আছে চীনের ছোঁয়া। উন্নয়নের রাজপথে এগিয়ে যেতে চীনকে এখন বাংলাদেশের পাশেই চাই। স্বার্থটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময় সামনে তাকানোর, তবে অতীতটা মনে রাখতে হবে। তবে কেউ যেন একাত্তর প্রসঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার আর পাকিস্তান প্রসঙ্গ গুলিয়ে ফেলবেন না। তাদের অপরাধ আর চীনের ভূমিকা এক নয়।

শুধু বাণিজ্য নয়, চীন এখন রাজনীতিতেও আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। বাংলাদেশের যেমন চীনকে দরকার, তেমনি চীনেরও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশকে দরকার। চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশের দরকার ভারতকেও। তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনভারত সম্পর্কটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাই চীনকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে যেন ভারত গাল না ফোলায় সেটাও মাথায় রাখতে হবে। ভারতীয় মিডিয়া সূত্রে আমরা জানি, চীনা রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফরকে গভীর মনোযোগ দিয়ে ফলো করছে ভারত। চীনভারতের ক্ষেত্রে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করে পাকিস্তানকে একটা দারুণ শিক্ষা দিতে পারে বাংলাদেশ।

নব্বই দশকের শুরুতে ভেঙে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন, পতন ঘটে সমাজতন্ত্রের। কিন্তু তখন থেকেই নবযাত্রা চীনের। চীন খুব কৌশলে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের বদলে নিয়েছে। তাই এখনও সেখানে টিকে আছে সমাজতন্ত্র। চীনে সমাজতন্ত্র টিকে আছে, কিন্তু তা উত্তর কোরিয়ার মতো বন্ধ নয়। টিকে থাকার, এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রটা এখানেই। যে খোলা হাওয়া ঝড় হয়ে উড়িয়ে নিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র, উন্নয়নের পালে সেই খোলা হাওয়া লাগিয়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। সমাজতন্ত্রে থেকেও বাজার অর্থনীতির চতুর খেলোয়াড় চীন।

ছেলেবেলায় আমরা চীনকে চিনতাম দুটি কারণেমহাপ্রাচীর আর সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ। আরেকটা কৌতুক বলিবিশ্বে দুর্ভিক্ষ শুরু হবে কবে? যেদিন থেকে চীনের লোকজন কাঠি ফেলে হাত দিয়ে খাওয়া শুরু করবে। এই কৌতুকও এখন বদলে গেছে। চীন এখন আর দুর্ভিক্ষের শঙ্কা নয়, সমৃদ্ধির উদাহরণ। চীনে এখন ১৩০ কোটি মানুষের ২৬০ কোটি কর্মীর হাত।

কোনও কোনও পণ্যের ক্ষেত্রে সত্যি হলেও সব ক্ষেত্রে শিরোনামটি সত্যি নয়। মহাপ্রাচীর তার মহাপ্রমাণ। আশা করি, বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও শিরোনামটি মিথ্যা প্রমাণিত হবে। চীনের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক হাজার বছরের পুরনো। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাংলাদেশ সফরের প্রাক্কালে তার এক লেখায় এ সম্পর্কের ইতিহাস টেনেছেন। চীনের ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। আবার বাংলাদেশের অতীশ দীপঙ্কর চীনে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পথ ধরে বাংলাদেশচীন সম্পর্ক এখন বাণিজ্যে বসত গড়ুক। চীনের প্রেসিডেন্ট তার লেখায় উল্লেখ করেছেনবাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০০ সালে ছিল ৯০ কোটি ডলার। ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৭০ কোটি ডলার। বার্ষিক বৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ। তবে এ বাণিজ্যে ঘাটতি অনেক। ঘাটতি কমিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে চীনের সহায়তা প্রয়োজন। চীনের বিশাল বাজারে যদি প্রবেশাধিকার পায় বাংলাদেশ, তাহলেই কেবল ভারসাম্য আসবে। আশা করি বাংলাদেশচীন সম্পর্ক ভারসাম্য নিয়ে টিকে থাকবে যুগ যুগান্তরে। সমৃদ্ধির স্বার্থেই চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ নীতিতে সংযুক্ত হব সবাই। চীনের রাষ্ট্রপতির সফরের প্রাক্কালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই সফরে সহযোগিতার নতুন যুগ শুরু হবে। আর চীনের রাষ্ট্রপতি তার লেখাটি শেষ করেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, চীন ও বাংলাদেশের যৌথ প্রচেষ্টায় দুই দেশের সহযোহিতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সম্প্রসারিত হবে এবং এ সহযোগিতার সোনালি ফসল ঘরে তুলতে আমরা সক্ষম হব।’ এই আশাবাদ ব্যক্ত করে। আমাদেরও তাই বিশ্বাস।

তিন দশক পর চীনের কোনও প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে স্বাক্ষরিত হয়েছে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। উদ্বোধন হয়েছে ৬টি প্রকল্পের। টাকার অংকে যা ছাড়িয়ে গেছে ২ হাজার কোটি ডলার। এসব চুক্তি ও সমঝোতা ব্যবসা ও বিনিয়োগ, সাগর অর্থনীতি, ভৌত অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃষি বিষয়ে। উদ্বোধন করা ছয়টি প্রকল্প হলোকর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ, শাহজালাল সার কারখানা, ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার, পায়রা ও চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট স্থাপন। এর মধ্যে কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণের যে উদ্যোগ, তা বাংলাদেশের নতুন যুগে পদার্পণের স্মারক হয়ে থাকবে।

তবে অর্থ নয়, সাহায্য নয়; সবচেয়ে ভালো হয় আমরা যদি তাদের ২৫ বছরে বদলে যাওয়ার গল্পটা আমরা শিখে নেই। তাদেরও মানুষ বেশি, আমাদেরও। জনসংখ্যাকে বোঝা না বানিয়ে সম্পদ বানানোর জাদুটা শিখতে পারলে আর চীন কেন কারও সাহায্য লাগবে না আমাদের। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশও উন্নয়নের রাজপথে পা রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়েছে। হতদরিদ্র মানুষ কমেছে। প্রায় সব সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি বিস্ময়কর। পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প আমরা নিজেদের টাকায় করতে পারছি। এখন প্রয়োজন জনসংখ্যাকে সম্পদ বানিয়ে উন্নয়নের ট্রেনকে আরও গতিশীল করা।

প্রভাষ আমিন : অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

চীন ও জাপানকে একসঙ্গে সামলাতে পারবে তো রূপসী বাংলা?

 

xi-hasina-1সাজেদা হক (চ্যানেল আই) : ভৌগলিক দিক দিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবগুলো দেশ। জল, স্থলপথে বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় দেশ। এদেশের এঁটেলদোঁআশ মাটি, পরিশুদ্ধ বাতাস আর মিঠা পানির চাহিদা বিশ্বজুড়েই। রূপসী বাংলা এক অর্থে তাই পুরুষতান্ত্রিক শাসক গোষ্ঠীর কুনজরে। অন্য অর্থে অনেকটা নিরীহ, অভাগা, দরিদ্র দেশ হিসেবেও দখলে রাখতে চায় অনেকেই। তা কেবল বাংলাদেশের ওপর আধিপত্যই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই প্রভাব বিস্তারের জন্য।

বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীও বাণিজ্যের জন্য সহায়ক। নতুন যে কোনো প্রডাক্ট দেনযাচাই বাছাই ছাড়াই তা লুফে নেয় একমাত্র বাঙ্গালীই। এজন্য হয়তো হুজুগে জাতিও বলা হয় আমাদেরকেই। আর কোনো দেশের এই তকমা আছে কি না আমার জানা নেই। তাছাড়া স্বল্প মজুরিও একটা বড় কারণ। আরো একটা কারণ হলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কএর একটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বাংলাদেশ। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগর কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এ নিয়ে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে প্রতিযোগিতা। বলা হয়ে থাকে, বঙ্গোপসাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র বন্দর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভূমিকা রাখবে। যে কারণে বাংলাদেশের পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত।

বাংলাদেশে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক দুই দিক থেকেই বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন। দেশটির সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহু পুরনো। কালের পরিক্রমায় চীন এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম বড় অংশীদারও। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের বড় যোগানদাতাও চীন। তাই দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন নীতি পর্যালোচনা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন অথবা এসডিজি বাস্তবায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে একমত দুই দেশ। চীনের অখন্ডতার প্রশ্নেও দেশটিকে সমর্থন দিচ্ছে বাংলাদেশ। তাইওয়ান কিংবা তিব্বত চীনেরই অংশএ নিয়ে বাংলাদেশের কোন দ্বিমত নেই। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ নিয়ে কখনো প্রশ্নও তোলেনি।

১৯৯০’র দশকের শেষ দিক থেকে ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংকে চীনা বাজারের প্রবেশপথ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর লিংকেজ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। পক্ষান্তরে চীন বাংলাদেশকে দেখে ভারতের সঙ্গে সংযোগের নল হিসেবে। পাকিস্তানে ব্যাপক নির্মাণ প্রকল্পে জড়িত রয়েছে চীন। এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল হিসেবে বাংলাদেশ সারাবিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। জাপান এর ব্যতিক্রম নয়। জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটাও বন্ধুপ্রতীম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর প্রথম যে কয়টি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছিলো, জাপান ছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম।

জাপানের পার্লামেন্ট ও বুদ্ধিজীবী মহল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করার জন্য ব্যাপক অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে জাপান ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল জাপান সরকার। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার জাপান। গুলশান ট্রাজেডির সাময়িক উৎকন্ঠা কাটিয়ে দেশটির আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জাইকা বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে সাহায্য অব্যহত রাখার আশ্বাসও দিয়েছে। উন্নয়ন সহযোগি রাষ্ট্র হিসেবে বছরে অর্থ সহায়তা পেয়ে থাকে বাংলাদেশ পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপ রাষ্ট্রটির কাছ থেকে। রাষ্ট্রীয় থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের অনেকেই অংশীদার দুই দেশের এই সুসম্পর্কের ভিত রচনায়।

xi-hasina-4স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য জাপান সহায়তা দিয়ে আসছে। ১৯৮০ সালের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশকে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা দানকারী দেশগুলোর মধ্যে জাপান সর্বোচ্চ দাতা দেশ। জাপানের সহায়তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ যমুনা সেতু। জাপান ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের স্থিতিশীল উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে সহযোগিতা করারও ইচ্ছে পোষণ করে। বিশেষ করে, জ্বালানি খাতসহ অন্য যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রয়েছে, সেই সব ক্ষেত্রে জাপান সহযোগিতা জোরদার করতে চায়।

পক্ষান্তরে জাপান ও চীনের মধ্যে শত্রুতা দীর্ঘদিনের। অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাশত্রুতাসহ নানান আঞ্চলিক স্বার্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলে আসছে এশিয়ার এ দুই প্রবল ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের মধ্যে। বিশেষ করে গত এক দশকে চীন ও জাপানের মধ্যে সমুদ্র সীমানা নিয়ে বিরোধ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিরোধ নিষ্পত্তিতে কূটনৈতিক চেষ্টাও কম হয়নি। একদিকে জাপানের সঙ্গে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থের বিরোধ রয়েছে। চীনের ক্রমাগত পরাশক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা এই বিরোধকে স্থিতিশীল করার চাইতে বরং আরো উস্কে দিচ্ছে। মূলত দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা ও বিরোধের প্রধান কারণ ৩টি। চীন ও জাপানের মধ্যে স্থায়ী এই বিরোধের মূল মনঃস্তাত্ত্বিক কারণ হলো যুদ্ধের তিক্ত ইতিহাস।

যে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে চীনের বিরুদ্ধে জাপানের যুদ্ধের স্মৃতি দেশটির প্রতি চীনা শত্রু মানসিকতা সবসময়ই কাজ করে। তাই এ বিরোধ কমিয়ে আনা চীনজাপানের জন্য বেশ কঠিন। দুই দেশই তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অটল। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি না। এছাড়া দুই দেশের বিরোধের এই সময়টাতে এশিয়াপ্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সুযোগ ও সম্ভাবনাকে কার্যকর করার পথে মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে চীন ও জাপান। এমন পরিস্থিতি জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক, আবার চীনের বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা নিবিঢ় হবে তা নিয়ে ভাবতে হবে বাংলাদেশকে। লাভলোকসানের হিসেবটা টাকার অংকে না করে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।

যদিও বলা হচ্ছে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ব্যবসা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এটাও সত্য। বিশেষ করে স্থলপথে পূর্ব এশিয়ার সাথে দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগের গেটওয়ে বা প্রবেশ পথ বলা হচ্ছে বাংলাদেশকে। দক্ষিণ এশিয়ার নতুন জোট বিবিআইএন কিংবা বিসিআইএম এর অর্থনৈতিক করিডোরকে বাস্তব রূপ দিতে বাংলাদেশের কোন বিকল্প নেই। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই সময়োপযোগী সমঝোতা বা চুক্তিই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

বাংলা কথায়, কার বউ, কার দাসী হবে এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে রূপসী বাংলাকেই। কারণ স্বার্থের কারণেই তার চারপাশে ঘুরঘুর করছে পরাশক্তিরা। কখনও অর্থের লোভ, কখনওবা সম্মানের লোভ দেখাচ্ছে। বিচক্ষণতা তখনই হবে, যখন কৌশলে সকলকেই আঁচলে বেধেঁ রাখতে রাখতে পারবে অপরূপা? সবাই থাকবে, জানবে একে অপরের কথা অথচ কেউ বিদ্রোহ করবে নাকেবল মাত্র এমন পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলেই লাভবান হবে বাংলা। না হলে, কুল ও শ্যাম দুটোই হারাতে বেশি সময় লাগবে না। আমরা কৌশলী রূপসী বাংলার পক্ষে।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: