প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, সমাজ > লেবাননে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য নজির

লেবাননে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য নজির

অক্টোবর 14, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

city-beirutমাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ : আরব বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দেশ লেবানন। লেবাননের আবহাওয়া বেশ মনোরম। সেখানে রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থান। ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো প্রতিবছরই পর্যটকদের টানে লেবানন ভ্রমণে। লেবাননের পর্যটন খাতে দেশটির জনশক্তির মোট ৬৫ শতাংশ জড়িয়ে আছে। ভূমধ্যসাগরের পাড়ে হাজারো বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বমহিমায় অবস্থান করছে পাহাড়ময় লেবানন। হাজারো বছরের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য ঘিরে রেখেছে লেবাননকে। ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে লেবাননের পশ্চিম দিকের রয়েছে ২২৫ কিলোমিটারের বিশাল সখ্য। এছাড়া সিরিয়া লেবাননকে ঘিরে আছে পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে ৩৭৫ কিলোমিটার জুড়ে। দক্ষিণে আছে ইসরায়েল।

লেবাননের বেশির ভাগ স্থান জুড়েই আছে পাহাড়। সামান্য উপকূলীয় অঞ্চল ও বেকা উপত্যকা ছাড়া পাহাড় এড়ানো যায়নি কোথাও। পাহাড়মুক্ত এ অংশটুকুই লেবাননের কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত। লেবাননের আবহাওয়ার মধ্যে রয়েছে ভূমধ্যসাগরের ব্যাপক প্রভাব। উপকূলীয় এলাকায় শীতকাল বেশ ঠাণ্ডা ও বৃষ্টিময়। আর গ্রীষ্মকাল গরম ও আর্দ্র। উঁচু স্থানগুলোতে তাপমাত্রা অত্যধিক ঠাণ্ডা, কখনো সেখানে ভারী তুষারপাত হয়।

লেবানন ছিল ফিনিশীয়দের আবাসস্থল। তাদের সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করেছে ইংরেজি সাল গণনার আগের ২৫০০ বছর ধরে। এরপর একে একে অনেকেই এসেছে, শাসন করেছে লেবাননকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লেবাননের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফ্রান্সের ওপর। ১৯৪৩ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৪৬ সালে লেবানন থেকে ফ্রান্স সব সৈন্য সরিয়ে নেয়। সে সময়ই লেবাননে প্রতিষ্ঠিত হয় পুরোপুরি অন্য রকম এক রাজনৈতিক পদ্ধতি—যাকে ‘কনফেসনালিজম’ বলা হয়। ধর্মীয় জনসংখ্যানুপাতের ভিত্তিতে আসন বণ্টনের এমন রীতি লেবানন ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। ২০০৯ সালের জুলাইয়ের বিবরণ অনুযায়ী লেবাননের মোট জনসংখ্যা ৪,০১৭,০৯৫ জন। তাতে লেবাননের আশপাশ থেকে আসা উদ্বাস্তুর সংখ্যা হচ্ছে ৩,৭৫,০০০। এর মধ্যে ফিলিস্তিন থেকে আসা উদ্বাস্তুর সংখ্যা সর্বাধিক ২,৭০,০০০। এ ছাড়া ৫০,০০০ জন এসেছে ইরাক থেকে ও ৪,৫০০ জন সুদান থেকে আগত উদ্বাস্তু।

লেবাননে সুন্নি মুসলমানের অনুপাত ২৮ শতাংশ, শিয়া মুসলমান ২৮ শতাংশ, ম্যারোনেইট খ্রিস্টান ২২ শতাংশ, গ্রিক অর্থোডক্স ৮ শতাংশ, দ্রুজ ৫ শতাংশ ও গ্রিক ক্যাথলিক রয়েছে ৪ শতাংশ। আগে খ্রিস্টানদের সংখ্যা মুসলমানদের চেয়েও বেশি ছিল। কিন্তু তারা বিভিন্ন দেশে চলে যাওয়ায় তাদের সংখ্যা মুসলমানদের চেয়ে কমে গেছে।

আরব দেশ হলেও দেশটিতে রাজতন্ত্র কিংবা পরিবারতন্ত্র নেই। এখানে দেখা যায়, ধর্মীয় সংস্কৃতির চমৎকার সমঝোতার অনুপম চর্চা। এমন উদাহরণ পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। কারণ সরকারের সর্বোচ্চ পদগুলো আনুপাতিক হারে ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতাদের জন্য নির্ধারিত। কেননা লেবানন ধর্ম ও গোষ্ঠীগতভাবে বিভক্ত একটি রাষ্ট্র। এখানে খ্রিস্টান, সুুন্নি ও শিয়া মুসলমানরা একত্রে বাস করে। গোষ্ঠীগুলো লেবাননের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যাপারে চুক্তি করে নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী লেবাননের রাষ্ট্রপতি হবেন একজন ম্যারোনীয় খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী হবেন সুন্নি মুসলমান ও স্পিকার হবেন শিয়া মুসলমান। সংসদের আসনগুলোও অর্ধেক খ্রিস্টান ও অর্ধেক মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত। লেবাননের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল গোষ্ঠী বা গোত্রভিত্তিক। এখানে সব গোষ্ঠী বা দল তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও অধিকার সমানভাবে পেয়ে থাকে।

আধুনিক লেবানন হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতি লালন করে আসছে। মূলত ফিনিশীয়দের এ আবাসভূমি কখনো আসিরীয়রা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, আবার কখনো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে পারসিয়ানরা, কখনো গ্রিক, কখনো রোমান, কখনো আরব, কখনো ক্রুসেডার, কখনো ওসমানি খেলাফত আবার কখনো বা তাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে ফ্রান্স। ফলে লেবাননের সংস্কৃতিতে এর কিছু না কিছু প্রভাব রয়েছে। লেবাননে তাদের আসাযাওয়া, নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি ও আগতদের ধর্মীয় কৃষ্টি—এগুলোর সবই দেশটির উৎসব, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে লেবাননে উৎসব হিসেবে মুসলিম ও খ্রিস্টান উৎসব সমান গুরুত্ব পায়। ছুটির দিনগুলোও নির্ধারিত হয় সেই নিয়মে।

বর্তমানে লেবাননে ভূমধ্যসাগরীয় ইউরোপের সংস্কৃতির হাওয়াটা একটু বেশি। আর লেবানন এমন অবস্থানে আছে যে পশ্চিম এশিয়ার জন্য লেবাননকে ইউরোপের প্রবেশদ্বার আর ইউরোপের জন্য একে পশ্চিম এশিয়ার প্রবশদ্বার বিবেচনা করা হয়। ফলে সংস্কৃতির আসাযাওয়াটাও সে রকমই।

লেবাননে মোট ১৮টি ধর্মীয় গোষ্ঠী বিদ্যমান। কিন্তু তাদের মধ্যে নজিরবিহীন সমঝোতা বিদ্যমান। দেশে বিদ্যমান ১৮টি দলের মধ্যে সংসদীয় আসন ভাগ করা হয়। দেশের সংসদ চার বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। সংসদ দুইতৃতীয়াংশ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন।

লেবাননের বিচারিক ব্যবস্থায়ও বৈচিত্র্যের ছাপ দেখা যায়। এ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ওসমানি আইন, নেপোলিয়ান কোড, গির্জার আইন ও বেসামরিক আইনের সমন্বয়ে। লেবাননের আদালত তিন স্তরের। প্রথমত, প্রারম্ভিক পর্যায়, দ্বিতীয় পর্যায়টি হলো আপিলের, তৃতীয় পর্যায়টি হলো চূড়ান্ত ফয়সালা বা মীমাংসার। সাংবিধানিক আদালত আইন ও নির্বাচনী প্রতারণার বিষয়গুলো দেখে। এ ছাড়া সেখানে ধর্মীয় আদালত আছে। সেখানে সব ধর্মের লোকেরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন অনুযায়ী বিয়ে, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে বিচার পেতে পারে।

লেখক : শিক্ষক, মাদ্রাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৪ অক্টোবর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: