প্রথম পাতা > অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, শিল্প > নতুন চীন, নতুন নেতৃত্ব, নতুন অভিযাত্রা

নতুন চীন, নতুন নেতৃত্ব, নতুন অভিযাত্রা

অক্টোবর 14, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

xiapingমাহফুজ উল্লাহ : একবিংশ শতাব্দীতে যে ক’টি রাষ্ট্র পৃথিবীর বিরাজমান পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলে, চীন তার অন্যতম। বিগত শতাব্দীতে পৃথিবী বিভক্ত ছিল দুই মেরুতেএকদিকের নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক বনে গিয়েছিল। বর্তমান সময়ে চীনের চোখ ধাঁধানো উত্থান সেই একক নেতৃত্বে পরিবর্তন এনেছে। চীনের অগ্রগতির কারণেই পৃথিবী এখন বহুমুখী কেন্দ্রে বিভক্ত। সেই চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে আসছেন। সংক্ষিপ্ত হলেও উভয় দেশের জন্যই সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। চীন বাংলাদেশকে কী দেবে আর নেবে এবং বাংলাদেশ কী দেবে আর পাবে তার একটি স্থায়ী ভিত্তি তৈরি হবে এই সফরের মাধ্যমে। শি জিনপিংএর জন্য বাংলাদেশ নতুন দেশ নয়। এর আগে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও তার রয়েছে ব্যক্তিগত পরিচিতি। বর্তমান বছরেই পূর্তি হয়েছে বাংলাদেশ চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪১ বছর। সেই প্রেক্ষাপটে এ সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যময়।

.
গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে, চার আধুনিকায়নেরকৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতে, স্লোগান গ্রহণ করার পরই চীনের চেহারা পাল্টে যেতে থাকে। অবশ্য এই স্লোগান গ্রহণ করার জন্য ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিকে কম অন্তর্দ্বন্দ্ব সহ্য করতে হয়নি। ১৯৭৩ সালে এই স্লোগান গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ১৯৭৮ সালে তা সরকারি ও দলীয় অনুমোদন লাভ করে। যে সময়ে এই স্লোগানের সূত্রপাত, তখনও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রেশ মুছে যায়নি, চার কুচক্রীর ক্ষমতা খর্ব হয়নি। কিন্তু পরিবর্তনের, উন্নয়নের চাহিদা এত তীব্র হয়ে ওঠে যে, কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে সেটা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। অতীতে কয়েকটি উন্নয়ন স্লোগানের ব্যর্থতার পর এই স্লোগানটি সম্পর্কেও উদ্বেগের অন্ত ছিল না।

অনেকে মনে করেন, ১৯৭১ সালে চীনমার্কিন সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও উন্নয়নের ফলে যে সুযোগ তৈরি হয় সেটাও এই আধুনিকীকরণ স্লোগানের গ্রহণযোগ্যতাকে সামনে নিয়ে আসে। চীনের কোটি কোটি মানুষ উপলব্ধি করছিলেন, বিপ্লবের জন্য যে কষ্ট তারা সহ্য করেছেন তার প্রতিদান তারা পাননি। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন করে এবং পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চীন ততদিনে পৃথিবীব্যাপী এক নতুন মর্যাদা লাভ করেছে। সে সময়টিতে চীন বিভিন্ন দেশে গেরিলাদের অস্ত্র সাহায্য দিয়েছে এবং চীনা নেতৃবৃন্দের একটি উপলব্ধি ছিল চীনের একাকিত্ব মোচনের জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চীনের সমর্থনপুষ্ট সরকার প্রয়োজন। এ সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকাও চীনের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইন্দোচীনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের বিস্তৃতি। অবশ্য আন্তর্জাতিকভাবে একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখেও চীন তার অবস্থান থেকে সরে যায়নি।

চীনের আধুনিকীকরণের কাহিনী গল্পের মতো। কর্মজীবন শেষে ১৯৮০ সালে যখন সে দেশ থেকে ফিরে আসছি, তখন মাত্র নির্মাণযজ্ঞ শুরু হয়েছে। মাত্র দু’দশকের মধ্যে ফিরে গিয়ে চীনকে মনে হয়েছে অচেনা চীন। সর্বত্র চেহারা পাল্টে গেছে, বিভিন্ন কাঠামোর সৌন্দর্য মনকে আকৃষ্ট করছে। সেই থেকে চীনের অগ্রগতির যাত্রা আজও অব্যাহত। অনেক অর্থনীতিবিদের কাছেই অগ্রগতির এই চমকের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই। কারণ দূর থেকে দেখে চীনের রাজনীতি, সমাজ ও জীবনকে বোঝা যায় না। অনেকে বলেন, প্রবাসী চীনাদের অঢেল অর্থ বিনিয়োগের ফলে এই উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। অনেক উত্থানপতনের পথ পেরিয়ে ছোটখাটো অবয়বের তেং শিয়াও পিং ক্ষমতায় স্থিত হয়েই প্রবাসী চীনাদের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেন এবং তাদের নিশ্চয়তা দেন যে, অতীতের মতো তাদের সম্পদ আর বাজেয়াপ্ত করা হবে না। তেং শিয়াও পিং অবশ্য প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কোনো দোষণীয় নয়, ব্যক্তিগত আরামআয়েশও বর্জনীয় নয়। শুধু প্রবাসী চীনাদের বিনিয়োগের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে তাই নয়। জাতি হিসেবে চীনারা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক, বিদেশীদের ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ এবং নিজেদের নিয়ে চলতে অভ্যস্ত। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির শৃংখলা ও নিয়মানুবর্তিতা। এই ব্যাখ্যা চীনকে জানার জন্য যথেষ্ট নয়। দেশ হিসেবে চীন রহস্যে ঘেরা এবং অনেকেরই উপলব্ধির বাইরে। পৃথিবীতে সম্ভবত চীন একমাত্র রাষ্ট্র যার সম্পর্কে লেখার পরিমাণ কোটি কোটি শব্দ ছাড়িয়ে গেছে। চীন এক মহান সভ্যতা এবং মানব সভ্যতার বিকাশে চীনের অবদান অতুলনীয়। পৃথিবীতে যে দেশগুলো প্রথম সংগঠিতভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চর্চা করেছে চীন তাদের অন্যতম। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছর আগে হোয়াং হো নদীর দু’তীরে গড়ে ওঠা বসতির কাছে কৃষি ছিল মূল উৎপাদন কর্মকাণ্ড এবং সে সময়ই এরা সংগঠিত পশুপালনের চর্চা করত। চীনের সভ্যতা নির্মাণে পানি এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। তাদের সেই প্রয়োজন আজও ফুরিয়ে যায়নি। যে কারণে চীন এখন ইয়ারলুং সাং পো (ব্রহ্মপুত্র) নদীর পানি ব্যবহারে উৎসাহী হয়ে উঠেছে।

china-traffic-jamবর্তমান পৃথিবীতে চীন তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। গত কয়েক দশকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল চোখ ধাঁধানো। অবশ্য অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণভাবে দারিদ্র্য, বৈষম্য সবই বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে দুর্নীতি। এক হিসাবে দেখা যায়, পৃথিবীর দরিদ্রদের প্রায় ২০ শতাংশ চীনে বসবাস করে এবং শহর ও গ্রামের আয়ের অনুপাত ৫:১।

অর্থনীতির সাফল্য চীনকে অভ্যন্তরীণভাবে যে স্বস্তি দিয়েছে তার চেয়ে বেশি সুবিধা দিয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। চীন বর্তমানে তার কূটনীতিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় খাতেই প্রবাহিত করছে। মার্কিন অর্থনীতিতে চীনের সক্রিয় উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। এমনকি, মার্কিন মুদ্রা দিয়ে তৈরি যে স্যুভেনির বাজারে কিনতে পাওয়া যায় তাও চীনের তৈরি।

চীন তার অর্থনৈতিক কূটনীতিকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করেছে আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকা ও এশিয়ায়। এই তিনটি মহাদেশে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ ব্যাপক। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই সমাপ্তির পথে এবং অনেকগুলো হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালে এগুলোকে নেহাতই অর্থনৈতিক প্রকল্প মনে হতে পারে; কিন্তু অধিকাংশ প্রকল্পই চীনের জন্য রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান, মিয়ানমার ও শ্রীলংকায় চীন যে তিনটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে সেগুলো তার ভারত মহাসাগরে নিরাপদে চলাচলের নিশ্চয়তা দেবে। মেরিটাইম সিল্ক রুটের যে প্রকল্প চীন গ্রহণ করেছে তাতে সমুদ্রপথে চলাচলের নিরাপত্তা অনেক জরুরি। একইভাবে, সমুদ্র সম্পদের ওপর নির্ভর করে যে ব্লু ইকোনমি গড়ে তোলার কথা হচ্ছে, সে ক্ষেত্রেও সাগরমহাসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সাগরের সম্পদ এবং সম্প্রসারিত সমুদ্রসীমার নিশ্চয়তাও চীনের জন্য প্রয়োজনযে কারণে দক্ষিণ চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা থেকে চীন দূরে সরে যায়নি। সমুদ্রসীমা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের একটি রায় সম্প্রতি ফিলিপাইনের পক্ষে গেলেও চীন সেটাকে গ্রহণ করছে না। তাই বলে সব বিরোধকে যুদ্ধে রূপান্তরিত করার ব্যাপারেও চীন আগ্রহী নয়। সীমানা সংক্রান্ত অনেক বিরোধকেই চীন মনে করে এগুলো বর্তমানেই সমাধা করতে হবে এমনটা নয়। যেটা ঘটেছে ভারতের সঙ্গে অরুণাচলের মালিকানা প্রসঙ্গে। অথচ সীমান্ত বিরোধের জেরেই ১৯৬২ সালে চীনভারত যুদ্ধ হয়েছিল এবং সে যুদ্ধে ভারত মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়েছিল।

জাতীয় প্রয়োজনে চীন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে সফলতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে। হংকংএর ব্রিটিশ মালিকানা চলে যাওয়ার সময় ‘এক দেশদুই ব্যবস্থার’ মতো নীতিমালা চীনা নেতাদের পক্ষেই উদ্ভাবন করা সম্ভব। অবশ্য হংকং ও ম্যাকাওএর বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখাই চীনের জন্য লাভজনক। কারণ হংকং চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং বাইরের পৃথিবীকে বোঝাতে পারে একদলীয় শাসনের দেশ হলেও চীন ভিন্নমতের মর্যাদা দেয়।

অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে চীন নিজেই অত্যন্ত সক্রিয়। অনেকে মনে করেন, হাজার হাজার বছর ধরে যে সমাজে এক ধরনের ব্যবস্থা টিকে ছিল, সেখানে আধুনিকীকরণের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এরা যুক্তি হিসেবে অতীতে চীনা সভ্যতার উৎকর্ষকে উদাহরণ হিসেবে টানেন। চীনারা অবশ্য মনে করে, পশ্চিমকে অতিক্রম করতে হলে পশ্চিমের অনেক কৌশল করায়ত্ত করতে হবে। মাও সে তুং বলেছিলেন, নাশপাতির স্বাদ বুঝতে হলে তা খেয়ে দেখতে হবে।

গত কয়েক দশকে চীন পাশ্চাত্যের অনেক কিছুকেই করায়ত্ত করেছে। মার্কিন অর্থনীতির দুইতৃতীয়ংশ এখন চীনের নিয়ন্ত্রণে। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এখন আর চীনের একাকিত্ব নেই। অনেক বিষয়ে সে এখন অপ্রত্যাশিত অবস্থান গ্রহণ করেযেমনটি করেছে মার্কিনিদের বিরুদ্ধে সিরিয়ায়।

এক সময় সমীকরণের ভিত্তিতে চীনের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হতো। এখনও সেই অবস্থান চীন ধরে রেখেছে। বর্তমানে চীন জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্বার্থ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি অবলোকন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এবং এই উভয় ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা শক্তি নিয়ামক ভূমিকা পালন করে।

.
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পারস্পরিক প্রয়োজনের ওপর নির্ভরশীল। যদিও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চীনের ভূমিকা সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। সেই সময়ে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, হংকং ইত্যাদি প্রতিকূল রাষ্ট্র পরিবেষ্টিত চীনের জন্য বহির্বিশ্বে যোগাযোগের সবচেয়ে নিরাপদ ও নিশ্চিত পথ ছিল পাকিস্তান। চীন সেই বন্ধুত্বকে নষ্ট করতে চায়নি। অবশ্য এখনও সেই সম্পর্ক অটুট আছে। অপরদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের বক্তব্যকেও সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কেন্দ্র করে চৌ এন লাই মন্তব্য করেছিলেন, ভারত যে পাথর তুলেছে সেটা তার পায়ে পড়বে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চীনের ভিন্ন অবস্থানের জন্য ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এ দেশে বহু চীনবিরোধী স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে, অনুষ্ঠিত হয়েছে সভাসমাবেশ। এটা স্পষ্ট ছিল দুই রাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ বিচ্ছিন্নতা আছে, যদিও ভেতরে ভেতরে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টা চলছিল। ১৯৭৪ সালে চীনের জাতিসংঘ সদস্যপদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের প্রতি চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। কিন্তু সম্পর্ক কূটনৈতিক স্বীকৃতির পর্যায়ে পৌঁছায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যান, সেই থেকে চীনের সঙ্গে সামরিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সূত্রপাত।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের উষ্ণ সম্পর্ক প্রতিবেশীদের উৎকণ্ঠার কারণ না হলেও ভারতের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি করেছে বিগত দিনগুলোতে। বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ, ব্যবসাবাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণ এবং অব্যাহত সামরিক সহযোগিতা সবকিছুতেই ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা অস্বস্তি বোধ করে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন ক্রয়। সাবমেরিন দুটি এখনও এসে না পৌঁছলেও ভারত বুঝতে চায় কেন এই কেনাকাটা। ভারত মনে করে, এর ফলে বঙ্গোপসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বর্তমানে যে ভারসাম্য আছে তা বদলে যাবে। অবশ্য ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যে অবস্থা আছে তাতে আরও পরিবর্তন আসবে। কারণ বঙ্গোপসাগরের চারধারের ২৬টি দেশ এই উপসাগরের সম্পদ ব্যবহারে সমানভাবে আগ্রহী। আগামী দিনে, ভারত মহাসাগরকে শান্তি এলাকা হিসেবে মর্যাদা দিতে না পারলে আরও অনেক উত্তেজনা তৈরি হবে।

chinese_worldwide_reachভারতের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক থাকলেও তা ভারতকে কূটনৈতিকভাবে বাড়তি সুবিধা দেয়নি। পাকিস্তানের জৈশমোহাম্মদীর নেতাকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করার জন্য ভারতীয় উদ্যোগের ব্যাপারে চীনের কট্টর বিরোধিতা লক্ষণীয়। চীন জাতিসংঘের স্থায়ী পরিষদের নতুন সদস্য হিসেবে ভারতকে এখনও মেনে নিতে রাজি নয়। এছাড়া, সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে চীন বলেছে, সন্ত্রাসবাদের কথা বলে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছেযা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সন্ত্রাসবাদ ভারতের একক সমস্যা নয়, চীনেও এই সমস্যার বিস্তৃতি ঘটছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সামরিক সহযোগিতার পরিমাণ টাকার অংকে জানা না গেলেও, অনুমান করা যায় পুরনো ধারা অব্যাহত আছে। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক সম্প্রসারিত করেছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় বাণিজ্যে অবিশ্বাস্য রকমের ভারসাম্যহীনতা। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে পারবে এমনটা মনে করার কারণ নেই। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুণগত মানের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য চীনের ওপর বাংলাদেশের চাপ প্রয়োগ করা জরুরি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় সরকারের আমলেই দামি প্রকল্পে অংশগ্রহণ করলেও সেসব প্রকল্পের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুণগত মানের ব্যাপারে চীন সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।

চীনের প্রেসিডেন্টের বর্তমান সফরের সময় যেসব মেগা প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ ও সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, সেখানে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের (কোয়ালিটি কন্ট্রোল) বিষয়ে বাংলাদেশ প্রয়োজনে ধারা সংযোজন করতে পারে। অথবা চুক্তির বিষয় চূড়ান্ত হয়ে গিয়ে থাকলে ভবিষ্যতে তা উত্থাপন করা যেতে পারে। চীনের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে প্রকল্পে বহু সামগ্রী বাধ্যতামূলকভাবেই চীন থেকে আমদানি করতে হয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে চীনের বিভিন্ন অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা জাতীয় বাস্তবতা দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে। তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, যে চীন এক সময় কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত না, আজ আর সে অবস্থা নেই। তবে চীন এখনও সরকারসরকার সম্পর্কে অনেক আগ্রহী।

.
চীন প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। চীনের নেতৃত্ব, চীনের রাজনীতি, চীনের অবস্থান সবকিছুতেই পরিবর্তন আসছে। যে প্রজন্ম চীনের মুক্তি সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা নেই। গত শতাব্দীর শেষের দিকে মনে হতো চীন হাঁটতে শিখছে। আর আজকে পৃথিবীতে চীন দৃপ্তপদভারে দৌড়াচ্ছে। এই দৌড়ের কৃতিত্ব অনেকটাই শি জিনপিংএর প্রাপ্য। বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণে তিনি সিদ্ধহস্ত। এ কারণেই, গত কয়েক বছরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবে যে অভিযান চালিয়েছেন তা লক্ষ্য করার মতো। এই অভিযানে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী নেতাও শাস্তি পেয়েছেন। অবশ্য এতকিছুর পরও দেশের ভেতরে দ্বিমতের উপস্থিতি এখনও অগ্রহণযোগ্য।

চীনের প্রেসিডেন্ট বর্তমানে যে কয়টি দেশ সফর করবেন তার সংখ্যা বেশি নয়। কিন্তু এই সফরের তাৎপর্য অনেক। চীন কখনও ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেনিকিন্তু তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী। তাই চীনের সমাজতন্ত্রের ষাট বছর পূর্তিতে কিউবার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন ‘চীনের সমাজতন্ত্রের অগ্রযাত্রা না থাকলে মানুষের ইতিহাস আজ ভিন্ন হতো।’

মাহফুজ উল্লাহ : সাংবাদিক এবং বাংলাদেশচীন গণমৈত্রী সমিতির অন্যতম সহসভাপতি

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১৪ অক্টোবর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: