প্রথম পাতা > ইতিহাস, বিচিত্র > ভয়নিচ বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় পান্ডুলিপি !

ভয়নিচ বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় পান্ডুলিপি !

voynichএম এস শহিদ : অনেকেই ‘ভয়নিচ পান্ডুলিপিকে’ বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় পান্ডুলিপি বলে মনে করেন। কারো কারো মতে, এটি নাকি ভিনগ্রহের মানুষ পৃথিবীতে রেখে গেছে। ভয়নিচ পান্ডলিপি নিয়ে গবেষণা থেকে জানা যায়, ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮ সালের ভেলাম বা চামড়ার তৈরী কাগজে লেখা হয় এই পান্ডুলিপি। বই ব্যবসায়ী উইলফ্রিড ভয়নিচের নামানুসারে এটির নাম রাখা হয়েছে। এই বই ব্যবসায়ী ১৯১২ সালের দিকে এই রহস্যময় পান্ডুলিপি ক্রয় করেছিলেন।

২৪০ পৃষ্ঠার এই পান্ডুলিপিটি লেখা হয়েছে এমন এক ভাষায় যার মর্ম উদ্ধার করতে পারছেন না ভাষাবিদরা। তাই এ পান্ডুলিপিকে ঘিরে রহস্যের যেনো শেষ নেই। মানুষের জানা কোনো বর্ণমালার সাথে এটির সামান্যতম মিলও নেই। এটির পাতায় পাতায় আছে অদ্ভূত সব ছবি আর রেখাচিত্র। আরও আছে এমন সব বৃক্ষবাজির ছবি যেগুলো আমাদের জানা কোনো বৃক্ষ প্রজাতির সাথে সাদৃশ্য নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বহু নামকরা পন্ডিত ভয়নিচ পান্ডুলিপির মর্মবাণী উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা সফল হতে পারেননি।

পন্ডিতদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এটি এক ধরনের চিকিৎসা শাস্ত্র সম্পর্কিত বিশ্বকোষ, যেখানে মধ্যযুগীয় নানা চিকিৎসার বর্ণনা আছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি অ্যালকেমিস্টদের [মধ্যযুগের অপরসায়নবিদ, যারা নানা গুপ্ত বিদ্যা জানতেন বলে দাবি করতেন] একটি পাঠ্যপুস্তক। এই পান্ডুলিপিতে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কীয় অনেক ছবি আছে।

আরো আছে জীববিদ্যার সাথে সম্পর্কিত নানা ড্রয়িংও। এ কারণে কিছু পন্ডিতের ধারণা, ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীরা এই পান্ডুলিপির রচয়িতা। কারো কারো অভিমত, কেউ ঠাট্টা বা তামাশা করার জন্য এটি রচনা করেছিলেন। তবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই এ ধারণার সাথে একমত নন। তারা বলেছেন, যে দীর্ঘ সময় ও শ্রম ব্যয় করে এটি তৈরী করা হয়েছে এবং এটি এতো বিস্তৃতভাবে রচনা করা হয়েছে যে তাতে মনে হয় এটি নিছক ভুয়া বা অমূলক নয়।

পান্ডুলিপিটির রচয়িতা কে, তা নিয়েও ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি রচনা করেছেন ক্রয়োদশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজি দার্শনিক রজার বেকন। আবার কারো কারো মতে, এই পান্ডুলিপিটি ষষ্ঠদশ শতকের বিখ্যাত ইংরেজি তান্ত্রিক এডওয়ার্ড কেলির লেখা। পান্ডুলিপিটির রচয়িতার আসল পরিচয় বা পাঠোদ্ধার করা না গেলেও কিছু কিছু জিনিস অনুমান করা যায়। যেমন, এটি লেখা হয়েছে বাম থেকে ডানে, কখনো কখনো বাম দিকের মার্জিনের আগে তারকাচিহ্ন ধরনের বুলেট দেয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এতে কোনো বিরামচিহ্ন বা কাটাকুটি কিংবা সংশোধনের চিহ্ন নেই বলেই মনে হয়।

এতে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার স্বতন্ত্র চিহ্ন আছে, প্রতিটির মাঝখানে আছে একটু ফাঁক। দুই থেকে দশ অক্ষরের সমন্বয়ে পান্ডুলিপিটির প্রতিটি শব্দ গঠিত। শব্দের মধ্যে অক্ষরের বিন্যাসও বেশ অদ্ভুত। কোনো কোনো অক্ষর ব্যবহৃত হয়েছে শব্দের প্রথমে আবার কোনটি শুধু শেষে, কোনটি ব্যবহৃত হয়েছে কেবল শব্দের মাঝখানে।

বিশেষজ্ঞরা পান্ডুলিপিটির ছবিগুলো পর্যালোচনা করে এটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ব্যাপক গবেষণার পর তাদের কাছে মনে হয়েছে, পান্ডুলিপিটি ছয়টি ভাগে বিভক্ত, প্রতিটি ভাগের বিষয় ও লেখার বিন্যাস ভিন্ন। এই ছয়টি ভাগ হচ্ছে ভেষজবৃক্ষ, জ্যোতির্বিদ্যা, মহাবিশ্বতত্ত্ব, ওষুধশাস্ত্র ও ওষুধের ব্যবস্থাপত্র বা প্রস্তুত প্রণালী।

১৯৩০ সালে উইলফ্রিড ভয়নিচ মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী ইথেল লিলিয়ান ভয়নিচ এই পান্ডুলিপিটির মালিক হন। ১৯৬? সালে ইথেল লিলিয়ান ভয়নিচ মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে এই পান্ডুলিপিটি তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অ্যান নিলকে দিয়ে যান। অ্যান নিল হ্যান্স ক্রাউস নামের এই বই ব্যবসায়ীর কাছে এটি বিক্রি করে দেন।

ক্রাউশ ১৯৬৯ সালে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন। বর্তমানে এটি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুষ্প্রাপ্য বই ও পান্ডুলিপি বিভাগে সযত্নে রক্ষিত আছে।

ভয়নিচ পান্ডুলিপি নিয়ে এ পর্যন্ত বহু গবেষণা ও লেখালেখি হয়েছে। এই পান্ডুলিপিকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি উপন্যাসও রচিত হয়েছে। যার মধ্যে রাজ কানিংহামের ‘দ্য ভয়নিচ এনিগমা, এনরিক জোভেনএর দ্য বুক অব গড অ্যান্ড ফিজিক্স ও রাসেল বেক এর ‘দ্য ভয়নিচ সাইফার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: