প্রথম পাতা > ইতিহাস, ভ্রমণ, রাজনীতি > পানিপথের যুদ্ধ ময়দান ভ্রমণ

পানিপথের যুদ্ধ ময়দান ভ্রমণ

panipat-historical-placesখন রঞ্জন রায় : পানিপথ একটি ঐতিহাসিক নাম, জগদ্বিখ্যাত স্থান। অবিশ্বাস্য কিছু ঘটনার জন্মদাতা। দুঃসাহসিক অভিযাত্রার লালন ক্ষেত্র। চাঞ্চল্যকর সংঘাত সংঘর্ষে বর্ণাঢ্য ইতিহাসখ্যাত। খরস্রোতা প্রমত্তা উত্তাল যমুনা নদী তীরবর্তী ঐতিহাসিক রোমাঞ্চস্থান ‘পানিপথ’। প্রত্যক্ষভাবে অখন্ড ভারতের রাজনৈতিক ভাগ্য তিন তিনবার নিয়ন্ত্রিত ও নির্ধারিত হয়েছিল।

পানিপথের প্রান্তরে তিনটি যুদ্ধই হয়েছিল সাম্রাজ্য স্থাপনে, আর সাম্রাজ্য দখল পুনর্দখলে। প্রথম যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে। ভারত সাম্রাজ্যের লালনকর্তা তখন ইব্রাহিম লোদি। শৌর্যবীর্যের বিচক্ষণ অপ্রতিরোধ্য লোদি বাহিনীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পরে সম্রাট বাবরের। অতর্কিত আক্রমণে শৃঙ্খলাপরায়ণ শান্তিপ্রিয় সুশিক্ষিত লোদি বাহিনীর পরাজয় ঘটে। প্রতিষ্ঠা পায় মোগল সাম্রাজ্য।

লোদির অনুগত কিছু বাদশা তখনো বিচ্ছিন্নভাবে রাজ্য পরিচালনা করছিল। এর অন্যতম বাদশা মোহাম্মদ আদিল শাহ। তিনি একটি দুর্ধর্ষ বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে তখন মোগল সম্রাট আকবর। আকবরের প্রধান সেনাপতি বৈরাম খান। তার অধীনস্থ বাহিনী হিমু। তাদের অভিলাষ জাগে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ও আ’দিলি শাহকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করা। স্থান হিসাবে যথারীতি পানিপথ। সকল চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে আদিল শাহদের উত্থান ধূলিসাৎ করে উপমহাদেশে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল সুদৃঢ় হয়। এই যুদ্ধের তান্ডবলীলাই পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ হিসাবে অপ্রতিরোধ্য ইতিহাসখ্যাত হয়ে মোগল সাম্রাজ্যের বিজয় পতাকা সদর্পে উত্তোলিত হয়।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলার একচ্ছত্র অধিপতি নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজ্যহারা হন। মীর জাফর গংদের কুমানসের শিকার সিরাজউদ্দৌলা পলাশীর যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন। তখন সর্বভারতে সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হিসাবে উত্থান ঘটে ‘মারাঠা শক্তির’। রঘুনাথ রাওয়ের নেতৃত্বে পাঞ্জাবী মারাঠারা পাঞ্জাবের অধিকর্তা তৈমুরকে বিতাড়িত করে লাহোর দখল করে। পরবর্তীতে টুকোজিহোলকার ও সাবাজি সিন্ধিয়ার যৌথ প্রয়াস ও আক্রমণে সকল দুর্ভেদ্য দুর্গে মারাঠাদের বিজয় পাতাকা উত্তোলিত হয়। তারা পুরো ভারতবর্ষের অ্যাটাক থেকে কটক, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত দোর্দন্ড প্রতাপে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকে। কামানসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত বাহিনীর দ্বারা অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হয়। মারাঠা সাম্রাজের বিস্তৃতি রোধকল্পে, অত্যাচার নিপীড়ন ও লুণ্ঠন থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার প্রত্যয় নেন আফগান বংশোদ্ভূত আহমদ শাহ আবদালি। তিনি মারাঠা সাম্রাজ্য পুনর্দখল স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেন।

১৭৬১ খ্রিস্টাব্দ দিল্লি থেকে ৯০ কিলোমিটার পাঞ্জাবমুখী দূরত্বের ঐতিহাসিক স্থানের নাম পানিপথ। বর্তমানে অখন্ড ভারতের বহুধাবিভক্ত প্রশাসনিক রাজ্যের হরিয়ানায় অবস্থিত। ১২৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ১২ লাখ লোকের ৯৪৯ জনঘনত্বের বসতিতে শিক্ষার যার ৭৭, সরকারি দাপ্তরিক ভাষা পাঞ্জাবী নিয়ে পানিপথ একটি স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা ভোগ করছে।

পৌরাণিক কাহিনীর জন্মদাতা মহাভারতের ভগবত গীতা অংশেও ধর্মক্ষেত্র হিসাবে পানিপথের ধর্মীয় অবস্থান সুলিখিত আছে। সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ হিসাবে এখানে রয়েছে পানিপথ মিউজিয়াম, সম্রাট বাবর সমাধিক্ষেত্র, কাবুলশাহ মসজিদ, ব্ল আলী শাহ কালান্দর দরগাহ, ইব্রাহিম লোদির সমাধি স্থান, সেনাপতি হিমু মৃতুক্ষেত্র, বিখ্যাত দুর্গামন্দিরসহ অসংখ্য পুরা ও প্রত্মতাত্বিক নিদর্শনক্ষেত্র। প্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগের সঙ্গমস্থল প্রমত্তা যমুনা তীরবর্তী স্থান এটি।

অসাধারণ রণকৌশলের অধিকারী দুর্ধর্ষ মারাঠা প্রধান গোবিন্দ রাও বান্দেল। তার অনুগত সদাশিব রাও এবং বিশ্বাস রাও বিচক্ষণ রণচাতুর্যের কঠোর পরিশ্রমী যোদ্ধা। আশ্বারোহী, গোলান্দাজ , ফরাসি প্রশিক্ষিত ৯ হাজার সুদক্ষ সৈন্যসহ ২০০ কামান আর নিয়মিত ৩ লাখ মারাঠা সৈন্যের অপ্রতিরোধ্য সুবিশাল বাহিনী। পক্ষান্তরে আহমদ শাহ আবদালির কামান সংখ্যা ৩০ এবং নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা ৪০ হাজার। কিন্তু শৃঙ্খলাপরায়ণ দুর্দমনীয় সাহসিকতা আর রাজ্য পুনর্দখলের আদর্শে উদ্দীপ্ত অমিত তেজের অধিকারী বিশাল মারাঠা বাহিনী। আহম্মদ শাহ আবদালির বাহিনী পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়। মরণপণ চাতুর্যে অমিত বিক্রম ক্ষুদ্র আবদালি বাহিনীর কাছে রণকৌশলে ব্যর্থ হয় বিশাল বীরত্বের মারাঠা বহর। মারাঠারা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পর্ণরূপে পরাজিত হয়। সদাশিব রাও, বিশ্বাস রাও ও ১৭ জন সেনাপতিসহ প্রায় ২ লাখ সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হয়।

১৪ জানুয়ারি ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দের একচ্ছত্র মারাঠা নিশ্চিহ্নের এই যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী। শোক হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে ধূলিসাৎ হয় অখন্ড ভারতে মারাঠা উত্থান। যুদ্ধবিজয়ী আহম্মদ শাহ আবদালি ভারত শাসন কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে মনোনিবেশ করেননি। প্রাণপ্রিয় আফগানিস্তানের আম্মু দরিয়া থেকে সিন্ধুনদ পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজের উন্নতিতে মনোনিবেশ করেন। ভারতবর্ষের শাসনক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টির পরবর্তীতে ব্রিটিশদের ভারতে সুবিস্তৃত সাম্রাজ্য স্থাপনের পথ প্রশস্ত ও সুগম হয়। (সংক্ষেপিত)

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ১২ অক্টোবর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: