প্রথম পাতা > ইতিহাস, ইসলাম, জীবনযাপন, ধর্মীয়, Uncategorized > আলবেনিয়ায় মুসলমানদের হাল-চাল

আলবেনিয়ায় মুসলমানদের হাল-চাল

albania-eid-sep24-2015তাইসির মাহমুদ, তিরানা (আলবেনিয়া) থেকে ফিরে : ভিয়েনা থেকে সরাসরি ফ্লাইটে তিরানা পৌঁছতে সময় লাগলো প্রায় দেড় ঘণ্টা। এয়ারপোর্টে পৌঁছে হাতঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম স্থানীয় সময় রাত ১২টা। বৃটিশ পাসপোর্ট থাকায় ইমিগ্রেশনে বেশি সময় লাগলো না। আধ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাগেজসহ বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে গিয়ে যাতে ঝামেলায় পড়তে না হয় তাই এয়ারপোর্টের ভেতরেই আমরা পাউন্ড চেঞ্জ করে নিলাম। এক পাউন্ডের বিপরীতে পাওয়া গেলো ১৬২ লেক। হিসাব কষে দেখলাম, বাংলাদেশি টাকা আলবেনিয়ান মুদ্রার চেয়ে অনেক বড়। ১ টাকায় ১.৫৫ লেক হয়। মুদ্রার হিসেবে আলবেনিয়ার লোকজনের বাংলাদেশে চাকরি করা লাভজনক। আলবেনিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ও কিছুটা বেশি। বাংলাদেশে যেখানে একজন পুলিশ অফিসারের মাসিক বেতন কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা, সেখানে আলবেনিয়ায় ১০ হাজার টাকারও কম।

দুইদিন রাজধানী তিরানায় অবস্থানকালে কোনো বাঙালির দর্শন পাইনি। সম্ভবত মুদ্রামান বাংলাদেশের চেয়ে ছোটো হওয়াটাই মূল কারণ। আমাদের জন্য দুটো গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন আলবেনিয়ান দুজন ট্যাক্সি ড্রাইভার। বাইরে বেরুতেই তাদের সাক্ষাৎ পেলাম। প্রথম সাক্ষাতে স্বভাবতই ইংরেজিতে কুশল বিনিময় করতে চাইলাম। কিন্তু দেখলাম, তাদের তরফ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। একেবারে সাধারণ ইংরেজি ‘হাউ আর ইউ’ বা ‘থ্যানক ইউ’ও বুঝেন না। লক্ষ্য করলাম, সহযাত্রী ব্যারিস্টার নাজির আহমদ খাঁটি সিলেটিতে কথা বলছেন। জিজ্ঞেস করলাম, তারা কি সিলেটি বুঝেন। সহাস্যে বললেন, ইংরেজিতে কথা বলা আর সিলেটি ভাষায় কথা বলা দুটোই তো সমান। তারা তো কোনো ভাষাই বুঝে না। কী বললাম সেটা বিষয় নয়, ইশারাইঙ্গিতে নৈপুণ্য প্রদর্শনই মূল বিষয়। তাই দুই দিনের সফরের অধিকাংশ সময়ই আমাদেরকে ইশারার ওপর নির্ভর থাকতে হয়েছিলো।

albania_religion_2011_censusগাড়ি দু’টো ছুটলো রাজধানী তিরানা অভিমুখে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম তিনদিনের অস্থায়ী ঠিকানা মেরি গেস্ট হাউজে। হোটেল ম্যানেজার স্বাগত জানিয়ে প্রত্যেককে নিজ নিজ রুম দেখিয়ে দিলেন। চোখে ঢুলুঢুলু ঘুম। ক্লান্তশ্রান্ত দেহ বিলিয়ে দিলাম বিছানায়। তবে ওয়াইফাই সার্ভিস ফিরে পাওয়ায় ওয়াটসআপ আর ফেসবুকের সর্বশেষ স্ট্যাটাসগুলো এক নজরে দেখে নিলাম। নিরাপদে আলবেনিয়া পৌঁছার খবর জানিয়ে দিলাম লন্ডনে পরিবারকে। পরদিন সকাল ১০টায় ট্যুর গাইডসহ একটি মিনিবাস আমাদের নিয়ে যেতে আসবে। হোটেল থেকে বের হবো এগারোটার আগে। তাই নাস্তা সেরে আগেভাগেই প্রস্তুত থাকতে বলা হলো।

সকালে সময়মতো গাড়ি এসে পৌঁছলো। গাড়িতে উঠতেই প্রথম সাক্ষাৎ ট্যুর গাইড ডোনালডএর সঙ্গে। হালকা পাতলা গড়নের যুবক। বয়স পঁচিশ কিংবা ছাব্বিশ হবে। তিরানা ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে দ্বিতীয় মাস্টার্স করছেন। নম্র ভদ্র স্বভাবের প্রফেশনাল গাইড। তিরানা শহরের কোথায় কী আছে, সব কিছুই যেনো তার মুখস্থ। গাড়িতে উঠে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ফুটবল ম্যাচের ধারা ভাষ্যকারের মতো তিরানা শহরের কোথায় কী আছে, বর্ণনা দিতে শুরু করলেন। এক পর্যায়ে তার সঙ্গে পরিচিত হলাম। তিনি ধর্মে মুসলমান ও খ্রিষ্টানের মাঝামাঝি। বাবা মুসলমান, মা খ্রিষ্টান। তাই দুই ধর্মেই বিশ্বাস। ধর্মের প্রতি সম্মান আছে। কিন্তু এ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই।

দ্যা মুসলিম কমিউনিটি অব আলবেনিয়ার চেয়ারম্যান মুফতি সিকান্দর ব্রেবসিকএর আমন্ত্রণে আমাদের আলবেনিয়া যাওয়া। দুপুর ১২টায় তার কার্যালয়ে বৈঠক। আধঘণ্টার মধ্যেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মুফতির কার্যালয়ে পৌঁছে গেলাম। মুফতির প্রধান সহকারী এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। এরপর নিয়ে গেলেন কনফারেন্স হলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবেশ করলেন মুফতি। যেহেতু মুফতির সঙ্গে সাক্ষাৎ তাই ধারণা ছিল, মাথায় রঙিন পাগড়ি ও লম্বা জোববা পরিহিত কারো সাক্ষাতের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। কিন্তু তিনি যখন কনফারেন্স রুমে ঢুকলেন তখন বুঝতে অসুবিধা হলো, আমরা যার অপেক্ষা করছি আসলে তিনিই এই ব্যক্তি। শার্টট্রাউজার তো পরেছেন উপরন্তু ক্লিন সেভড। রুমে ঢুকে যখন করমর্দন ও কুশল বিনিময় শুরু করলেন তখনই বুঝতে পারলাম তাহলে তিনিই মুফতি। তবে পোশাক দেখে খুব একটা আশ্চর্য হইনি। কারণ এর আগে মরক্কো ও বসনিয়ায় ভ্রমণ করেছি। সে সব দেশেও অনেক দাড়িবিহীন আধুনিক মুফতির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে।

এসব দেশে মসজিদের মেহরাবের কাছাকাছি একটি রুমে নামাজ পড়ার জন্য এক বিশেষ ধরনের জোববা ও টুপি থাকে। শার্টট্রাউজার পরিহিত ইমাম মসজিদে এসে প্রথমে ওই রুমে ঢুকেন। পরনের শার্ট ও ট্রাউজারের উপর জোব্বাটি পরে নেন। তারপর ইমামতি করেন। তাই আলবেনিয়ায় এসব নতুন মনে হলো না। সে যাক, বৈঠকে আলোচনায় স্থান পেলো নানা বিষয়। মুফতি সিকান্দার আলবেনিয়ায় কমিউনিজমের শাসনামল ও মুসলিম কমিউনিটির বর্তমান অবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরলেন।

lead-mosque-in-shkoder-albania-6আলবেনিয়া ইউরোপে অবস্থিত মাত্র ১১ হাজার বর্গমাইলের ছোট একটি দেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে পাঁচ ভাগের এক ভাগ। আর জনসংখ্যা মাত্র ৩০ লাখ। এর মধ্যে চাকরির সুবাদে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। মুসলিম কমিউনিটি অব আলবেনিয়া প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৩ সালে। এই সংগঠনের কার্যক্রম চলে কমিউনিজম সরকার আসার পূর্ব পর্যন্ত। ১৯৬৭ সালে কমিউনিজম আসার পরেই সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই সালেই কমিউনিজম আলবেনিয়াকে নাস্তিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে মসজিদ ও গির্জাসহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয় ধ্বংস করে দেয়া হয়। অথচ ১১২৭ সাল থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত আলবেনিয়ায় মসজিদ ও মুসলমানদের সুদৃঢ় অবস্থান ছিল। কমিউনিজমের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মাত্র কয়েকটি মসজিদ রক্ষা পেয়েছিলো। তাও গুদাম, ওয়ারহাউজ ও পরিত্যক্ত ঘর হিসেবে। ওই সময়কার ইমাম ও মুফতিদের গ্রেপ্তার করে জেলে বন্দি রাখা হয়। শুধু ইসলামিক হওয়ার কারণে বারোজন সুখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদকে ফাঁসি দেয়া হয়। অনেকেই আবার জেলে মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৯০ সালে কমিউনিজম সরকার চলে যাওয়ার পর মুসলিম কমিউনিটি অব আলবেনিয়ার কার্যক্রম আবার শুরু হয়। মুসলমানরা ধর্মকর্ম চর্চা শুরু করেন। গত ২৬ বছর সময়ে সারা দেশে ৭শ’ মসজিদ ও দশটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মাদরাসার ছাত্রসংখ্যা ৫ হাজারেরও কম। মসজিদ ও মাদরাসাগুলো মুসলিম কমিউনিটি অব আলবেনিয়া পরিচালনা করে থাকে। এতে সরকারি তরফ থেকে ২৫ শতাংশ গ্রান্ট দেয়া হয়। ২৫ শতাংশ আসে ডোনেশন থেকে আর বাকি ৫০ শতাংশ পরিচালিত হয় সংগঠনের নিজস্ব ফান্ড থেকে।

১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ধর্মহীন কমিউনিজমের শাসনের ফলে মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা নাজুক বলা চলে। মুসলমানদের সংখ্যা এখন প্রায় ৬৫ শতাংশ। কিন্তু প্রাকটিসিং অর্থাৎ নিজেদের জীবনে ইসলামের নিয়মকানুন মেনে চলেন এমন মুসলমানের সংখ্যা ৫ শতাংশেরও কম। মুসলমানেরা হালালহারামের তেমন তোয়াক্কা করেন না। নারীপুরুষের অবাধ চলাফেরা ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতোই। হিজাবের প্রচলন একেবারেই কম। মেয়েরা স্কার্ট পরে পুরুষের হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোও খুব স্বাভাবিক।

বৈঠকে মুফতি সিকান্দার ব্রেবসিকএর বক্তব্য শেষ হলে আমাদের পক্ষ থেকে বৃটেনের মুসলিম কমিউনিটির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। প্রায় ঘণ্টাখানেক স্থায়ী হলো বৈঠক। আলোচনা শেষে মুফতি সিকান্দর ব্রেবসিক তাদের অফিস ঘুরে দেখালেন। এরই মধ্যে খাবার চলে এলো। এরপর বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। শুক্রবার, জুমার নামাজ পড়তে হবে। ট্যুর গাইড ডোনালড আমাদেরকে নিয়ে গেলো রাজধানীর সবচেয়ে পুরনো মসজিদটিতে।

নামাজে গিয়ে কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন হলো। প্রথমত মসজিদে দাড়িওয়ালা মুসল্লি নেই বললেই চলে। ইমাম সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেখলাম তার অবস্থাও প্রায় একই। পরনে শার্ট ট্রাউজার। দাড়ি আছে খুবই সামান্য। তবে অন্যান্য মসজিদে অনেক ইমামের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাদের অধিকাংশেরই দাড়ি নেই। দাড়ি রাখা বা না রাখা তাদের দৃষ্টিতে কোনো বিষয় নয়। মসজিদের পৃথক হলে কিছু মহিলা মুসল্লির উপস্থিতি টের পেলাম। সাধারণত মহিলারা মসজিদে পর্দা করেই যান। কিন্তু সেখানকার মহিলাদের পর্দার প্রচলন নেই। আধুনিক পোশাকে যেভাবে শহরে ঘুরে বেড়ান, মসজিদেও তেমনই।

সূত্রঃ দৈনিক মানবজমিন, ৫ অক্টোবর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: