Archive

Archive for অক্টোবর, 2016

কার্টুন-রসঃ জীবন যেমন -৪

অক্টোবর 31, 2016 মন্তব্য দিন

misc-jokes-10misc-jokes-11misc-jokes-12misc-jokes-13

আইসল্যান্ডের জলদস্যুরা এবার তাড়াবে দুর্নীতিবাজদের

অক্টোবর 31, 2016 মন্তব্য দিন

iceland-pirates-party-piciceland-pirates-party

প্রবাসে বাংলাদেশীদের নামের ভোগান্তি

অক্টোবর 31, 2016 মন্তব্য দিন

কে এম শামীম হায়দার, সিডনি (অস্ট্রেলিয়া) : ডা. কনক আপা ফোনে জানালেন, সম্প্রতি আমাদের এখানে বাংলাদেশে থেকে একটি পরিবার এসেছেন। পরিবারের কর্তার নাম শাফায়েত আর মোবাইল নম্বর দিয়ে অনুরোধ করলেন, অন্যান্য বারের মতো এবারও যাতে স্থানীয় কাজের তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে যেন এ পরিবারটিকে প্রাথমিকভাবে থিতু হতে সাহায্য করি। যেহেতু খুব আনন্দের সঙ্গে এ কাজটি গত কয়েক বছর ঘণ্টার পর ঘণ্টা করে এসেছি, তাই ফুরফুরে মেজাজে মোবাইল ফোন তুলে শাফায়েত সাহেবের নম্বরে কল করলাম। রিং শেষ হয়ে এক সময় ওনার ভয়েস মেইল বক্সে প্রবেশ করল। আবুল খায়ের মোহাম্মদ শাফায়েত আলী খান ইজ আন অ্যাভেলেবল নাউ, প্লিজ লিভ ইওর নেম অ্যান্ড নম্বর আই উইল কল ইউ ব্যাক।

এত দীর্ঘ নাম শুনে খানিকটা চমকেই উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে আশঙ্কা হলো আমাদের এ বাংলাদেশি ভাই এত বড় নামের কারণে না আবার কোথাও ফরম পূরণ করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েন।

পরবর্তীতে এ পরিবারটির সঙ্গে অসম্ভব আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক হলো। ভদ্রলোক আমার বয়সীই। সংক্ষেপে শাফায়েত ভাই বলে সম্বোধন করি। একদিন সাহস করে জিজ্ঞাসা করলাম শাফায়েত ভাই এই দীর্ঘ নাম নিয়ে এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াতে কোনো সমস্যায় পড়েছেন কিনা। শাফায়েত ভাইয়ের চেহারায় একটা হতাশ ভাব ফুটে উঠল। তিনি গড়গড় করে বলতে লাগলেন যেখানেই কাগজে কলমে নাম লিখতে হয় সেখানেই ঝামেলা হয়। কারণটা আমি আগেই আঁচ করেছিলাম।

সারা দুনিয়াতে এখন নাম লেখার প্যাটার্ন হলো গিভেন নেম বা নামের প্রথম অংশ এবং সার নেম বা বংশের নাম। পুরো নামটি লিখতে হয় দুটি শব্দে। যেমন মাইকেল ক্লার্ক। এখানে মাইকেল হলো গিভেন নেম এবং ক্লার্ক হলো সার নেম। কিন্তু আমাদের দেশে আকিকা করে যে দীর্ঘ নাম রাখার রেওয়াজ তাকে সারা দুনিয়ার বর্তমান প্যাটার্ন বা ফরম্যাটে ফেলাটা অসম্ভব। কিন্তু এখানকার ফরম্যাটের বাইরেতো লেখারও কোনো সুযোগ নেই। তাই ভোগান্তি অনিবার্য।

চাকরির দরখাস্ত, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিমান টিকিট সব জায়গাতেই নাম দেখেই প্রথমে ভ্রু কুঁচকে ফেলেন গ্রাহক সেবাদাতা। শাফায়েত ভাই জানালেন, একবার ঢাকা থেকে রাশিয়াতে একটি প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে যেতে হবে। রাশিয়ার ভিসা স্টিকারে তাঁর নাম কোনোভাবেই এক লাইনে লেখা ছাপানো যাচ্ছে না। আসল ব্যাপার হলো ওদের কম্পিউটার সিস্টেমে ভিসা প্রার্থীর নাম এক লাইনেই লিখতে হবে। ঢাকার রাশিয়ান অ্যাম্বাসি পড়ল মহা ফাঁপরে। পরে তারা রাশিয়ার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ডায়গোনালি বা কোনাকুনিভাবে শাফায়েত ভাইয়ের নাম ছেপে বের করেন। কিন্তু এতে করে এতটা সময় লেগেছিল যে, শাফায়েত ভাইয়ের ট্রেনিংয়ে যাওয়াটাই ভেস্তে যেতে বসেছিল।

অনেকবার বহু বিদেশি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন তোমাদের দেশে কি বেশির ভাগ ছেলেদের গিভেন নেম মোহাম্মদ? প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবিনি। কিন্তু পরে দেখেছি ওরাই অফিস বা কাজের জায়গাতে ডাকছে এই মোহাম্মদ শোন, আবার অন্যজনকেও ডাকছে মোহাম্মদ। এর কারণ হলো ধরা যাক কারও নাম মোহাম্মদ ফারুক, কারও নাম মোহাম্মদ মাসুম, কারও নাম মোহাম্মদ আলী। সারা দুনিয়ায় প্রচলিত আধুনিক নামের প্যাটার্নে তাই মোহাম্মদ হলো ফার্স্ট নেম বা গিভেন নেম আর ফারুক, মাসুম বা আলী হলো তাহলে সার নেম বা বংশের নাম! এখন ভেবে দেখুন আসলেই কি ফারুক, মাসুম বা আলী কি কোনো বংশের নাম?

ইদানীংকালে বাংলাদেশে ছোট আধুনিক ঘরানার নাম রাখা হচ্ছে। তবে সেখানে উপেক্ষিত হচ্ছে বংশের নাম। যেমন ফাইয়াজ আদনান, মাসুদ করিম, জাহিদ মাহমুদ। লক্ষ্য করুন এখানে কোনোভাবেই নামের দ্বিতীয় অংশটি কোনো সার নেম বা বংশের নাম নয়। সুতরাং আন্তর্জাতিক প্যাটার্ন অনুযায়ী কিন্তু আধুনিক নামগুলো রাখা হচ্ছে না। মজার ব্যাপার হলো যখন এ ধরনের নামের অধিকারীরা একই পরিবার থেকে বিদেশে আসার জন্য দরখাস্ত করে অথচ তাদের বংশের নাম আলাদা আলাদা এ বিষয়টি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে দারুণভাবে ভাবায়। যেমন কারও বাবার সার নেমের সঙ্গে সন্তানের সার নেমের কোনো মিল নেই! আপন ভাইয়ে সার নেমের সঙ্গে অন্য ভাইয়ের মিল নেই! ধরা যাক আধুনিক নামের অধিকারী দুই ভাই অস্ট্রেলিয়াতে পড়তে আসবে। এদের একজনের নাম আদনান মাসুদ ও অপরজন ফাইয়াজ হাসান। এখন আপন দুই ভাইয়ের সার নেম কীভাবে আলাদা হয়। এটা এদের কাছে কিন্তু অবিশ্বাস্য। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে স্টিভ ওয়াহ আর মার্ক ওয়াহর কথা। দেখুন এরা আপন দুই ভাই ও এদের সার নেম ওয়াহ কিন্তু একই।

আরও এক ধরনের নামজনিত সমস্যা আছে। বছর দুয়েক আগে একবার বাংলাদেশ থেকে বিমানের টিকিট কিনতে গিয়ে অভিনব এক সমস্যায় পড়েছিলেন এক বাংলাদেশি। তার পাসপোর্ট নাম আসাদুজ্জামান। কোন সারনেম নেই! অথচ প্লেনের টিকিটিং সিস্টেমে সারনেম ছাড়া কোনো অবস্থাতেই টিকিট ইস্যু হচ্ছিল না। অবশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় তাঁর টিকিট হয়েছিল।

সবশেষ ধরনের নামের ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া যাক। অবশ্য দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এ ক্যাটাগরিতে আমি নিজেই পড়ি। দিন কয়েক আগে এক বাংলাদেশি ভাইয়ের নামের আবেদন ফরম পড়ছিলাম। তার গিভেন নেম হলো এবিএম আর সার নেম হলো রুহুল। তিনি যেখানে ফরমটি জমা দিয়েছেন ফরম জমা নেওয়ার সময় কাস্টমার সার্ভিসের লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন এবিএম তো কোনো অর্থবোধক কিছু নয়। এটিই কি সঠিক গিভেন নেম? বেচারা রুহুল সাহেব একটু দমে গিয়ে বললেন, আসলে আবুল বাসার মোহাম্মদের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো এবিএম। শুনে কাস্টমার সার্ভিসের লোকটি হেসে বললেন, তোমাদের নামগুলো এত বড় হয় কেন বল তো? কিছুটা বিরক্ত হলেও যথাসম্ভব হাসি হাসি মুখে রুহুল সাহেব উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন, ছোটবেলায় নাম রাখার জন্য দুটো ছাগল জবাই করে আকিকা করে মানুষ কেন ছোট নাম রাখবে তুমিই বল? বাংলাদেশে দুটো ছাগলের দাম কত তোমার কোনো ধারণা আছে? দুটো ছাগলের দাম যেমন বেশি তাই নামও তত লম্বা! শুনে কাস্টমার সার্ভিসের লোকটি বললেন, ফেয়ার এনাফ!

তাই নাম রাখার ক্ষেত্রে আমাদের আরেকটু সচেতনতা প্রয়োজন। সারা দুনিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরা আধুনিক হচ্ছি। আর তাই আন্তর্জাতিক প্যাটার্নে সংক্ষেপে নাম রাখাটাই বাঞ্ছনীয়। যেখানে নামের প্রথম অংশটিই হবে আসল নাম আর দ্বিতীয় অংশে থাকবে বংশের নাম। নতুবা বাংলাদেশ থেকে বের হওয়ার পর থেকেই নাম নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলার সম্ভাবনা কিন্তু রয়েই যাবে।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ৩০ অক্টোবর ২০১৬

সুকুমার রায় ও শিশু সাহিত্য

অক্টোবর 31, 2016 মন্তব্য দিন

sukumarহেড আফিসের বড় বাবু লোকটি বড়ই শান্ত,

তার যে এমন মাথার ব্যামো কেউ কখনও জান্‌ত ?

দিব্যি ছিলেন খোস্‌‌মেজাজে চেয়ারখানি চেপে,

একলা বসে ঝিমঝিমিয়ে হঠাৎ গেলেন ক্ষেপে !

আঁৎকে উঠে হাত পা ছুঁড়ে চোখটি করে গোল ….

শিশুদের জন্য এমনি অনেক মজার ছড়া লিখে গেছেন সুকুমার রায়। ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’ এমন আজগুবি অথচ সার্থক রচনা ছিলো সুকুমার রায়ের।

আবোলতাবোল’ গ্রন্থের ভূমিকায় নিজেই লিখেছিলেন, ‘যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার। ইহা খেয়াল রসের বই, সুতরাং সে রস যাঁহারা উপভোগ করিতে পারেন না, এ পুস্তক তাঁহাদের জন্য নহে।’

মানুষের বয়সের ভিন্নতায় চিন্তার ধরণও ভিন্ন। বড় এবং ছোটদের চিন্তা এক হওয়া কখনও সম্ভব নয়। বড়রা মনমানষিকতায় জটিল হলেও ছোটদের ভাবনা সহজসরল। ছোটদের জগত ভিন্ন, আলাদা। শিশু ও কিশোর মনের উপযোগি যে সাহিত্য রচিত হয় মূলত তাই শিশু সাহিত্য। তাদের উপযোগী করে সাহিত্য রচনা করে সহজেই ছোটদের মন আকর্ষণ করানোর মধ্যদিয়ে তাদের ভাবনার রাজ্যের প্রসারতা বৃদ্ধি ও উন্নত চরিত্র গঠন সম্ভব ।

সপ্তম শতকে ল্যাটিন ভাষায় আদি শিশু সাহিত্য রচিত হয়। ঊনবিংশ শতকে জার্মান রূপকথা, এডওয়ার্ড লিয়ারের ‘বুক অব ননসেন্স’, ‘লুইস ক্যারলের’ ‘আজব দেশে এলিস’ প্রভৃতি শিশু সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। প্রায় দু’শ বছর আগে অথ্যাৎ ১৮১৬ সালে বাংলা ভাষায় ছোটদের জন্যে সাহিত্য রচনা শুরু হয়। অবশ্য শিশুসাহিত্যকে সাহিত্যের ভিন্ন বিষয় হিসাবে ভাবা হয়েছে আরো অনেক পরে। ১৮৯৯ সালে যোগীন্দ্রনাথ সরকার (১৮৬৬১৯৩৭) সংকলিত বাংলা ভাষার প্রথম উদ্ভট ছড়াগ্রন্থের ভূমিকাতে ‘শিশুসাহিত্য’র প্রথম সন্ধান মেলে। ভূমিকাতে রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী (১৮৬৪১৯১৯) শিশুসাহিত্য শব্দটি ব্যবহার করেন।

১৮৯১ সালে প্রকাশিত ‘হাসি ও খেলা’ নামে যোগীন্দ্রনাথ সরকার রচিত গ্রন্থটি আদর্শ শিশুতোষ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বোদ্ধা মহলের অনেকেই গ্রন্থটিকে বাংলায় লেখা প্রথম শিশুতোষ গ্রন্থ বলে মনে করেন। যোগীন্দ্রনাথ সরকারের অন্যান্য শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে ছিল ‘রাঙাছবি’ (১৮৯৬), ‘হাসিখুশি’ (১ম ভাগ ১৮৯৭) প্রভৃতি।

বর্ণমালা ও হাতের লেখা শেখার জন্য ১২ পৃষ্ঠার ‘লিপিধারা’ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। বইটিকে বাংলা শিশুসাহিত্যের প্রথম পাঠ হিসেবে অনেকে মনে করেন। বাংলা ভাষায় পাঠ্যবই রচনা সেই সময়ই শুরু হয়। অবিভক্ত বাংলায় আধুনিক বিদ্যালয় না থাকলেও ঢাকার ছোট কাটরায় খ্রিষ্টান মিশনারিজদের উদ্যোগে পূর্ববঙ্গের প্রথম ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বেশ কিছু সনাতন পাঠশালার অস্তিত্বও ছিল। ছাত্রছাত্রীদের জন্যে উপযুক্ত পাঠ্যবই না থাকায় ১৮১৭ সালের মে মাসে ‘স্কুল বুক সোসাইটি’ এবং ১৮১৮ সালের জুলাই মাসে ‘ক্যালকাটা বুক সোসাইটি’র গোড়াপত্তন হয়।

১৮১৮ সালে ‘নীতিকথা’ নামে ১৮টি উপদেশমূলক গল্প নিয়ে প্রকাশিত পাঠ্যবইটিকে অনেকেই বাংলা শিশু সাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করেন। ‘স্কুল বুক সোসাইটি’র সহোযোগীতায় বইটির রচনায় রাধাকান্ত দেব বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। ‘নীতিকথা’ প্রকাশের ক্ষেত্রে সে সময়ের অন্যতম সমাজসেবক পণ্ডিত রামকমল সেন এবং তরুণীচরণ মিত্রের সঙ্গে ‘স্কুল বুক সোসাইটি’র সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়।

১৮৩৯ সালের ১৪ জুন প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলা পাঠশালা’, ১৮৪৬ সালের ১ মার্চ তারিখে প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দু হিতার্থী বিদ্যালয়’, ১৮৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রিটিশইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন’ এবং ১৮৪৩ সালের ২ মে প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজ’ প্রতিষ্ঠায় রাধাকান্ত দেবের অসামান্য অবদান ছিল, ‘বাংলা পাঠশালা’ এবং ‘তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা’ থেকেও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮২১ সালে রাধাকান্ত দেব ‘বাঙ্গলা শিক্ষা গ্রন্থ’ রচনা করেন। তবে বাংলা শিশুসাহিত্যের প্রকৃত বিস্তার লাভ করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০১৮৯১), মদন মোহন দত্ত (১৮১৭১৫৫৮), এবং অয় কুমার দত্তের ‘চারুপাঠ’এর তিনটি খণ্ড প্রকাশের মাধ্যমে।

শিশুগ্রন্থ হিসেবে খণ্ড তিনটি ভীষণ জনপ্রিয় হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বোধোদয়’ শীর্ষক অনুবাদগ্রন্থ (১৮৫১), ‘বর্ণ পরিচয়’ (১ম ও ২য় ভাগ ১৮৫৫), ‘ঈশপের নির্বাচিত গল্পের অনুবাদ’, ‘কথামালা’ (১৮৫৬), অনুবাদ গ্রন্থ ‘আখ্যাণমঞ্জুরী’ (১৮৬৩) এবং মদন মোহন তর্কালঙ্কারের তিনভাগে ‘শিশুশিা’ মোদ্দাপাঠ হিসেবে বিবেচিত হয়।

উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর (১৮৬৩১৯১৫) ‘ছোটদের রামায়ন’ (১৮৯৪১৮৯৫), ‘সে কালের কথা’ (১৯০৩), ‘ছোটদের মহাভারত’ (১৯০৯), ‘মহাভারতের গল্প’ (১৯০৯) ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ বাংলা শিশু সাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ।

শিশুসাহিত্যের সমৃদ্ধ ধারায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। (১৮৬১১৯৪১)। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১১৯৫১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯১৯৭৬), যোগীন্দ্রনাথ সরকার (১৮৬৬১৯৩৭), নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য (১৮৫৯১৯৩৯), দণিারঞ্জন মিত্র মজুমদার (১৮৭৭১৯৫৭), যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত (১৮৮২১৯৬৫), সুকুমার রায়, (১৮৮৭১৯২৩), দীনেন্দ্র কুমার রায় (১৮৬৯১৯৪৩), খগেন্দ্রনাথ মিত্র (১৮৮৪১৯৭৮), সৌরীন্দ্র মোহন মুখোপধ্যায় (১৮৮৪১৯৬৬) শরবিন্দু বন্দোপাধ্যায় (১৮৯৯১৯৭০), হেমেন্দ্র কুমার রায় (১৮৮৮১৯৬৪), সুনির্মল বসু (১৯০২১৯৫৭), বিভুতিভুষণ মুখোপধ্যায় (১৮৯৪১৯৮৭), শিবরাম চক্রবর্তী (১৯০৩১৯৮০), রবীন্দ্রলাল রায় (১৯০৫১৯৭৮), বিমল ঘোষ (১৯১০১৯৮২), নীহার রঞ্জণ গুপ্ত (১৯১১১৯৮৬), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপধ্যায় (১৮৯৮১৯৭১), এয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৮১৯৪০), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৫১৯৮৮), বন্দে আলী মিয়া, (১৯০৬১৯৭৯), মোহাম্মদ মোদাব্বের (১৯০৮১৯৮৪), খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীন (১৯০১১৯৮১), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮১৯৭৮), নারায়ণ গঙ্গোপধ্যায়, অখিল নিয়োগী, লীলা মজুমদার, হরিসাধণ মুখোপাধ্যায়, কুদুমরঞ্জন মল্লিক, কাজী কাদের নেওয়াজ, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, হোসনে আরা, আবদুর রহমান, সাজেদুল করিম, রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই), আতোয়ার রহামান, আলমগীর জলিল, গোলাম রহমান, আবদুল্লাহ আল মূতী শরীফুদ্দিন, কাজী আবুল হোসেন, সুকুমার বড়ুয়াসহ অনেকেই বাংলা শিশু সাহিত্যকে সমৃদ্ধি দান করেছেন।

১৯২৬ সালে ডিএম লাইব্রেরি কর্তৃক প্রকাশিত ‘ঝিঙে ফুল’ এবং ১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘সাতভাই চম্পা’ কিশোর কাব্যগ্রন্থে গানকবিতাগুলো সংযেজিত হয়ে বাংলা শিশু সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

বিক্রমপুরের কৃতিসন্তান যোগেন্দ্র নাথ গুপ্ত (১৮৮২১৯৬৫) শুধু বাংলার নয় ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাসমূহের মধ্যেই শিশুসাহিত্যের প্রথম এনসাইকোপেডিয়া বা কোষগ্রন্থ রচনা করেন। তিনি যার নামকরণ করেন ‘শিশু ভারতী’।

তবে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে অকাল প্রয়াত সুকুমার রায়ের (১৮৮৭১৯২৩) মৃত্যুর ৯ দিন পর তাঁর মৌলিক সাহিত্যকর্ম উদ্ভট কবিতার বই ‘আবোলতাবোল’ প্রকাশ হবার পর শিশুসাহিত্যে সাড়া পড়ে যায়।

১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলার মসূয়া গ্রামে সুকুমার রায়ের জন্ম। তার পিতা ছিলেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়। সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিৎ রায়ও স্বমহিমায় বাংলা সাহিত্য ও বাংলা চলচ্চিত্রকে সারাবিশ্বে পরিচিত করেছেন।

পড়াশোনার শুরুতে শিশু সুকুমার রায় ভর্তি হন কলকাতা সিটি স্কুলে। কলকাতা সিটি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে সুকুমার রায় ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র অবস্থাতেই সুকুমার রায়ের শিশুসাহিত্যের প্রতিভার বিকাশ ঘটে। এ সময় তিনি ‘ননসেন্স কাব’ প্রতিষ্ঠা করেন। যার মুখপাত্র ছিল ‘সাড়েবত্রিশ বাজা’। এই কলেজ থেকেই তিনি রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে বি.এস.সি ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯১১ সালের গুরুপ্রসন্ন বৃত্তি লাভের মাধ্যমে ফটোগ্রাফি ও প্রিন্টিং টেকনোলজিতে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ইংল্যান্ড গমন করেন।

ইংল্যান্ড থেকে উচ্চ শিক্ষা শেষে দেশে ফিরে পিতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইউ.রায় এন্ড সন্স কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। ১৯১৫ সালে বাবা উপেন্দকিশোর রায়ের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক নিযুক্ত হন। এ সময়ই তিনি ‘মানডে’ ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৫১৯২৩ সাল পর্যন্ত তিনি সন্দেশ পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

সুকুমার রায় একাধারে শিশুসাহিত্যিক, রম্যরচনাকার, লেখক, ছড়াকার, নাট্যকার এবং কার্টুনিস্ট। নিজের লেখায় কালিকলমের আঁচড়ে চমৎকার সব কার্টুন ও ড্রয়িং এই প্রতীভার উজ্জ্বলতাকে ভাবায়। তিনি ছিলেন জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সন্তান এবং তাঁর পুত্র খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ রায়ের লেখালেখিতেও পিতার অলংকরণের প্রভাব লক্ষ্যনীয়। সত্যজিৎও তার মতো শিশুকিশোরদের জন্য লেখা ফেলুদা ও প্রফেসর শঙ্কু সিরিজের প্রায় সবকটি বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ নিজেই করেছিলেন। তারও লেখার সঙ্গে আঁকার মাধ্যম ছিল পিতার মতো কালিকলম।

তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো

আবোল তাবোল
পাগলা দাশু
হেশোরাম হুশিয়ারের ডায়েরি
খাইখাই
অবাক জলপান
লক্ষণের শক্তিশেল
ঝালাপালা ও অনান্য নাটক
হ য ব র ল
শব্দ কল্প দ্রুম
চলচ্চিত্তচঞ্চরী
বহুরুপী
ভাষার অত্যাচার

ছড়াকার হিসেবে বাংলা সাহিত্য তাঁর স্থানটি আজো শীর্ষে। শুধু জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিকই নন, বাংলা ভাষায় ননসেন্স্এরও প্রবর্তক তিনি । মৃত্যুর পর একে একে প্রকাশিত ‘আবোলতাবোল’ (১৯২৩), ‘ল’ (১৯২৪), ‘পাগলা দাশু’ (১৯৪০), ‘বহুরূপী (১৯৪৪), ‘খাই খাই’ (১৯৫০) বাংলা শিশু সাহিত্যের অমর সৃষ্টি হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ সেপ্টেম্বর কালাজ্বরে (লেইশ্মানিয়াসিস) আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে সুকুমার রায় মৃত্যুবরণ করেন। সেই সময় এই রোগের কোনো চিকিৎসা ছিল না। তাঁর মৃত্যু হয় একমাত্র পুত্র সত্যজিত রায় এবং স্ত্রীকে রেখে। সত্যজিত রায় পরবর্তীতে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার হিসেবে স্বীকৃতি পান। নিজের মৃত্যুর ৫ বছর আগে ১৯৮৭ সালে তিনি বাবা সুকুমার রায়কে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। মৃত্যুর ৯১ বছর পরও সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিকদের অন্যতম।

সূত্রঃ সাহস২৪ ডট কম, ৩০ অক্টোবর ২০১৬

কিশোরী-তরুণীর ওপর সহিংসতার ধরন পাল্টেছে

অক্টোবর 31, 2016 মন্তব্য দিন

women-repression-1-artআহমদ নূর : কিশোরী ও তরুণীদের ওপর সহিংসতার ধরন পাল্টে গেছে। তবে অপরাধীদের নিষ্ঠুরতা আগের মতোই ভয়াবহ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে ইভটিজিং বা মেয়েদের উত্যক্ত করার ক্ষেত্রে ধরনটা ছিল প্রাথমিক অবস্থায় ভয় দেখানো, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে খারাপ ইঙ্গিত দেওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিল মেয়েদের চুলের আগা বা বেণির আগা কেটে নেওয়া বা ওড়না টেনে নেওয়া। সর্বশেষ ছিল এসিড নিক্ষেপ যা এখনো আছে। বর্তমানে ছুরি বা চাপাতি দিয়ে হামলার মতো ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৩৭৪টি। এর মধ্যে ৪৯টি হত্যা, ১৩টি হত্যার চেষ্টা, ৩২টি উত্যক্তের ঘটনা, উত্যক্তের কারণে ৩টি আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

গত ২৪ আগস্ট রাজধানীর কাঁকরাইলে ছুরিকাঘাতে নিহত হয় উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার রিশা। হত্যাকারী যুবক ওবায়দুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় রিশাকে তিনি ছুরিকাঘাত করেছেন।

প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সিলেট মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজা বেগমকে গত ৩ অক্টোবর সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে কুপিয়ে আহত করেন শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলম। ৪ অক্টোবর থেকে খাদিজা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ১৯ অক্টোবর মিরপুরে বিসিআইসি কলেজের ছাত্রীকে বখাটেরা মারধর করে। একই দিন সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদী খান এলাকায় দশম শ্রেণির ছাত্রী তাহমিনা জাহান আঁখিকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। ২৩ অক্টোবর রাজধানীর দক্ষিণখানে অস্ত্রের মুখে পরিবারের সামনে এক কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা নারী নির্যাতন বা কিশোরীদের উত্যক্ত করে তারা তাদের পরিবার থেকে মূল্যবোধের শিক্ষা পায়নি। এ জন্য তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। যখন একটি ঘটনা ঘটে তখন সেটি অন্য একজন মানুষের মনের ওপর অপরাধ প্রবণতার প্রভাব ফেলে। এ জন্য ওই ব্যক্তিও হিংস্র হয়ে ওঠে। যার ফলে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

অন্যদিকে সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, বিশেষ করে চলচ্চিত্র ও নাটকের মানহীন গল্পকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চলচ্চিত্রে অনেক চরিত্র থাকে যা অনেকে নকল করার চেষ্টা করে বা অনুসরণ করে। আর বর্তমানে যেসব চলচ্চিত্র বা নাটক তৈরি হয় তাতে অনেক চরিত্র থাকে যা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও হিংস্রতা ফুটিয়ে তোলে। আর এই বিষয়গুলো থেকে মানুষ অপরাধ করতে উৎসাহ পায়।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, ‘যখন কোনো ঘটনা ঘটে তখন সেটি বারবার ঘটতে থাকে। সেই সময় যারা অপরাধ করতে চায়, তারা শাস্তির বিষয়ে চিন্তা করে না। সে ভাবে, যেভাবেই হোক মনের ক্ষোভ মেটাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর আগে দেশে এসিড সন্ত্রাসের মাত্রা ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল, যদিও এটি সামাজিকভাবে প্রতিহত করা অনেকখানি সম্ভব হয়েছে। তখন আমরা একটা বিষয় লক্ষ করেছি যে, একটা জায়গায় এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটার সাথে সাথে সারা দেশে এর প্রভাব পড়েছিল। কিশোরী বা তরুণীর প্রতি হিংস্র অপরাধের ক্ষেত্রে সবাই এসিড ব্যবহার করত। এসিডের ব্যবহারের ওপর যখন নিষেধাজ্ঞা আনা হয় তখন অপরাধীরা অন্য পন্থা অবলম্বন করে। এখন তারা চাপাতি ব্যবহার করছে। চাপাতি বা ছোরা সহজে পাওয়া যায়, দামও কম, বহনেও ঝামেলা নেই। তাই তারা অপরাধ করতে চাপাতি বেশি ব্যবহার করছে। চাপাতির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আনা প্রয়োজন।’

সামাজিক অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে গণমাধ্যমকে দায়ী করছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান। তিনি বলেছেন, ‘সম্প্রতি যে কয়েকটি হামলা হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এসব টার্গেট ওরিয়েন্টেড। আর যারা ঘটাচ্ছে তারা পেশাদার না। তাহলে নিশ্চয়ই তারা এই বিষয়টি কোথাও না কোথাও থেকে শিখেছে। তারা ভাবছে, কম টাকার একটা চাপাতি কিনে দুই থেকে তিনটা কোপ দিয়ে একজন মানুষকে হত্যা করা যায়। এটাকে তারা ভালো অস্ত্র হিসেবে নিচ্ছে। এ ব্যাপারে আমার অবজারভেশন হলোঅপরাধীরা গণমাধ্যম থেকে শিখছে যে, সহজ উপায়ে কীভাবে মানুষ হত্যা করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘যত দিন যাচ্ছে মানুষ তত নির্মম হচ্ছে। আগে ইভটিজিংয়ের ক্ষেত্রে দেখা যেত বখাটেরা মেয়েকে হুমকি দিচ্ছে, পথে দাঁড়িয়ে বিরক্ত করছে। এরপর দেখা গেল ছেলেরা মেয়েদের প্রেমের প্রস্তাব করলে যদি রাজি না হয় তাহলে তার চুল কেটে দিয়েছে, ওড়না ধরে টানছে ইত্যাদি। গত কয়েক বছর আগে ছিল এসিড নিক্ষেপ করে পালিয়ে যাওয়া। এখন তো প্রকাশ্যে ছুরি বা চাপাতি দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘দেশে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে ২০১৩ সাল থেকে। এর প্রায় প্রতিটিতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে চাপাতি। এসব বিষয় নিয়ে টিভিতে টকশো হচ্ছে, রক্ত পড়ে আছে বা চাপাতির দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। যা দেখার পর যারা অপরাধ করতে চায় তাদের অবচেতন মনে একটা প্রভাব পড়ছে এবং এখন তারা বাস্তবে তা প্রয়োগ করছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, ‘সময়ের পরিক্রমায় ইভটিজিং ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতার ধরন বদলেছে। অপরাধীদের মনোভাবও চরম বিকৃত হয়ে উঠেছে।’ তিনি বলেন, ‘যার যার বেড়ে ওঠার ওপর তার আচার আচরণ, তার মনের সংকীর্ণতা, উদারতা প্রতিফলিত হয়। যারা মেয়েদের ওপর এসিড নিক্ষেপ করে, হত্যার উদ্দেশ্যে যারা চপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে তাদের বেড়ে ওঠা সুন্দর হয়নি। তাদের মধ্যে কোনো মূল্যবোধ বা পারিবারিক শিক্ষা নেই। এমনকি জাগতিক শিক্ষাও নেই। তাদের ভেতরে কখনো মানবিক মূল্যবোধ জাগেনি এবং তারা ভালো পরিবেশে বড় হয়নি। কারণ, একজন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকলে সে মানুষকে কোপানোর মতো কাজ করত না।’

সম্প্রতি যেসব সামাজিক অপরাধ ঘটছে তা বন্ধ করতে গণমাধ্যম ও সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন সৈয়দ মাহফুজুল হক ও সালমা আলী। অন্যদিকে নেহাল করিম মনে করেন, বিচারের প্রতি যদি মানুষের শ্রদ্ধা বাড়ানো যায় তাহলে অপরাধের মাত্রা অনেকাংশেই কমে আসবে। মাহফুজুল হক বলেন, ‘সমাজে মানুষের ওপর প্রভাব ফেলবে বা অপরাধ প্রবণতা বাড়াবেএমন কন্টেন্ট গণমাধ্যমে পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে নাটকসিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে অস্ত্রের ব্যবহারে সেন্সর আরোপ করতে পারলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।’

সালমা আলী বলেন, ‘২০ বছর আগের সিনেমা বা নাটকগুলোতে নায়কের চরিত্র থাকত এমন যে, নায়ক নিয়মিত কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, পড়ালেখায় মনযোগী, সমাজ ও দেশের পরিবর্তন সৃষ্টিকারী ব্যক্তি। বর্তমানে সিনেমানাটকে নায়কের কাজ থাকে মেয়েদের ওড়না ধরে টান দেওয়া, মেয়েকে কিডন্যাপ করা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে উত্যক্ত করা। বিনোদনের জন্য যারা এই নাটক বা সিনেমা দেখে তারা কী শিখবে?’

নেহাল করিম বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতিটি অপরাধের বিপরীতে আইন আছে কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ নেই। এ জন্য আমরা কেউ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না। ফলে অনৈতিক ও অসামাজিক কাজগুলো ঘটছে। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন অপরাধ করেও রাজনৈতিক খুঁটির জোরে পার পেয়ে যাবে।’

সূত্রঃ রাইজিং বিডি, ৩১ অক্টোবর ২০১৬

চরম গ্লানিকর এই মেনে নেয়া

girl-victimsএ কে এম শাহনাওয়াজ : জটিল যান্ত্রিক যুগ সমাজের শক্ত বুনট নড়বড়ে করে দিয়েছে। আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। চোখের সামনে দস্যুতা হলেও আমরা এগিয়ে আসার সাহস দেখাচ্ছি না। পাড়ার উঠতি মাস্তান আমাদের কারও না কারও সন্তান। তার দাপটে দরজায় খিল আঁটছি। প্রতিবাদ করতে পারছি না। মায়ের সামনে মেয়ের হাত ধরে টানছে বখাটে। মায়ের বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, পরিবার অসহায়ভাবে তাকাচ্ছে সমাজের দিকে। সমাজের মানুষ কানে তুলো গুঁজছে। চোখের পাতা বন্ধ করছে। আর এভাবেই পুঁচকে বখাটে আজদাহা হচ্ছে।

মিছিল ক্রমে বড় হচ্ছে। তরুণী থেকে শিশু ধর্ষণের যেন বীভৎস উল্লাস চলছে ধর্ষকদের মধ্যে। ধর্ষকের তালিকায় নাম লেখাচ্ছে কিশোর থেকে পৌঢ়। নির্যাতিতা ধর্ষিত হয়েও রেহাই পাচ্ছে না; অনেক ক্ষেত্রে খুনও করা হচ্ছে। কখনও প্ররোচিত হয়ে আবার কখনও গ্লানি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করছে ফুটফুটে ধর্ষিতা শিশুটিও। ওরা মূল্যবোধহীন এই পরিবেশের প্রতি তীব্র ঘৃণা জানিয়ে অনন্ত শান্তিলোকে চলে যাচ্ছে। যেন বলছে, তোমাদের নরক তোমরা গুলজার কর, জীবন থেকে পালিয়ে তবু আমরা বাঁচি। পুরুষশাসিত সমাজে এখনও নারী অধিকার প্রশ্নটি যোগ্য অবস্থান নিতে পারেনি। এর মধ্যে সমাজে তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত নানা অস্থিরতা। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে ঠিকই; কিন্তু পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে গেছে অনেক আগেই। এ অসাম্য থেকে রেহাই নেই। নষ্ট রাজনীতি দল ও নেতৃত্বের সুবিধাবাদকে নিশ্চিত করতে প্রতিদিন তৈরি করছে নতুন নতুন দুর্বৃত্ত। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে এভাবেই। সামাজিক অনুশাসনগুলো কার্যকর হতে পারছে না। জীবনের দায় সবচেয়ে বড়। মানুষ সব থেকে বেশি ভালোবাসে নিজেকে। তাই বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা এত তীব্র হয়। তারপরও কাঁচা বয়সের কিশোরীতরুণীরা কতটা বিপন্ন হলে জীবনের চরম সিদ্ধান্তটি নিতে পারে একাকী! আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে তারা। নাকি মূল্যবোধহীন সমাজ তাদের ঠেলে দেয় অমন মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিতে?

এমন নয় যে স্কুলের গণ্ডিতে থাকা অভিমানী কিশোরী মায়ের বকুনি খেয়ে অথবা বাবা লাল জামার আবদার মেটাতে পারেনি বলে আবেগে বিধ্বস্ত হয়ে হঠাৎ আত্মহত্যা করে বসেছে। তাহলে এই যে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে সেগুলো কি স্বেচ্ছামৃত্যু? না, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বখাটেরা পৃথিবীকে মাত্র চিনতে শেখা চপলমতি মেয়েটির চেনা জগৎটাকে বিষাক্ত করে দিয়েছিল। এ বিষমুক্তির জন্য সমাজ এগিয়ে আসেনি। শক্তি আর সান্ত্বনার ছায়া নিয়ে কিশোরী আর তার পরিবারের পাশে কেউ এসে দাঁড়ায়নি। তাই নিজের এ অরক্ষিত জীবন থেকে একসময় মুক্তি পেতে চেয়েছে লাঞ্ছিত বোনরা। দুর্বৃত্তদের হাত থেকে নিজ পরিবারকে রক্ষার দায় নিজেকেই গ্রহণ করতে হয়েছে। অনন্যোপায় হয়েই সে একসময় চরম সিদ্ধান্তটি নেয়। আত্মোৎসর্গ করে। কিন্তু না, এ কোমলমতি মেয়েরা কেউ নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করে না। ওরা সবাই খুন হয়। এ খুনের দায় অভিযুক্ত বখাটেদের একার নয়, এ দায় নিতে হবে নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা প্রত্যেককে।

জটিল যান্ত্রিক যুগ সমাজের শক্ত বুনট নড়বড়ে করে দিয়েছে। আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। চোখের সামনে দস্যুতা হলেও আমরা এগিয়ে আসার সাহস দেখাচ্ছি না। পাড়ার উঠতি মাস্তান আমাদের কারও না কারও সন্তান। তার দাপটে দরজায় খিল আঁটছি। প্রতিবাদ করতে পারছি না। মায়ের সামনে মেয়ের হাত ধরে টানছে বখাটে। মায়ের বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, পরিবার অসহায়ভাবে তাকাচ্ছে সমাজের দিকে। সমাজের মানুষ কানে তুলো গুঁজছে। চোখের পাতা বন্ধ করছে। আর এভাবেই পুঁচকে বখাটে আজদাহা হচ্ছে।

আতরক্ষায় রক্ষায় সদাব্যস্ত সমাজের মানুষের নানা রকমফের আছে। অতি সাধারণ যারা তারা এসব অনাচারে ব্যথিত হচ্ছেন, ক্ষুব্ধ হচ্ছেন; কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে মুখবুজে সব সয়ে যাচ্ছেন। নির্বাক হয়ে দেখে যাচ্ছেন। পারিবারিক শাসন আর তেমনভাবে কার্যকর থাকছে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে অভিভাবক একাধিকবার বখাটে যুবকের বিরুদ্ধে নালিশ করেছে তার বাবামায়ের কাছে। এরা সময়মতো পুত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা হয়তো ঘটত না। পুত্র নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে ততদিনে। বাবামাকে থোড়াই কেয়ার করে। অথবা বাবামা কীর্তিমান পুত্রের গর্বে সমাজে দাপুটে অবস্থান নিয়ে থাকতে চান। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তো এভাবেই দৃশ্যমান হয়। বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ, সর্বজন শ্রদ্ধেয়রা এখন আর সমাজের পতি হন না। বিবর্ণ গণতন্ত্রের খোলসে এখন সমাজের বিধায়ক হন রাজনীতি অঞ্চলের মানুষ। তাদের বড় অংশ সমাজ রক্ষার বদলে নিজ নিজ দল রক্ষা, পেশি স্ফীত করা এবং ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষাকে জরুরি মনে করে। তাই বখাটে উঠতি মাস্তানরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাছে প্রশ্রয় পায়। বিচারআচারও হয় দলীয় বিবেচনায়। এ কারণে অন্যায়ের কাছে মাথানত করতেই হয় সাধারণ মানুষকে। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে উৎপীড়নকারী বখাটের হাত থেকে রক্ষা পেতে সরকারদলীয় সমাজপতিদের কাছে অভিভাবকরা যান। সামাজিক বিচার করে স্বস্তি ফিরিয়ে দেয়া কি কঠিন? এসব দায়িত্ব পালন তো তাদের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার সময় বা ইচ্ছে তাদের কোথায়? তারা দেখিয়ে দিয়েছেন পুলিশের কাছে ডায়েরি করার পথ। এ জ্ঞান সবারই আছে। তাহলে সমাজপতির কাছে যাওয়া কেন! ওয়ার্ড কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেম্বার, নানা নামপদের জনপ্রতিনিধিরা থাকেন কেন? স্থানীয় রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা তো প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষভাবে জনপ্রতিনিধি। এরা নিজেরা সামাজিক সংকটের মোকাবেলা না করে প্রথমেই পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দেন কেন? নিজেদের চেষ্টা নিষ্ফল হলে তাদেরই ডেকে আনার কথা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। মানুষ কোন ভরসায় থানায় যাবে? কতটুকু আস্থা রাখতে পারে তারা পুলিশের ওপর?

স্বাধীন এবং একটি সভ্য দেশে (যদি মনে করে নেই) বসবাস করে সমাজের কাছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে আমাদের সরাসরি প্রশ্নআমাদের মেয়েবোনদের এমন লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে কেন? অমনভাবে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হচ্ছে কেন? কোনো মৃত্যুই তাৎক্ষণিক ঘটনার ফল নয়। দিনের পর দিন ক্রমাগত উৎপীড়িত হয়ে, মানসিক নির্যাতনে বিপর্যস্ত হয়ে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় সন্ত্রস্ত হয়ে, ব্যক্তি ও পরিবারের অপমানে বিধ্বস্ত হয়ে কিশোরীতরুণী চরম হতাশায় নিপতিত হওয়ার পর একসময় আত্মহননের চেয়ে নিরাপদ আর কিছু ভাবতে পারে না। এ হতভাগ্য মেয়েরা তাদের পরিবারকে কাঁদিয়ে, সমাজের মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষের বুকে অক্ষমতার গুরুভার চাপিয়ে দিয়ে সমাজ থেকে, জীবন থেকে পালিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কখনও কখনও তো বেশক’টা দিন বা মাস পেরিয়ে যায়। একটা সময়ে কি কেউ পাশে এসে দাঁড়াতে পারেনি? শক্তিধর বখাটেদের রাশ টেনে ধরতে পারেনি? নাকি এসব আমাদের রাষ্ট্র আর রাজনীতির পরাজয়ের মতোই।

বিশাল জনসমর্থন নিয়ে আসা আওয়ামী লীগ সরকারের পরিচালক হওয়ার পরও এবং এতদিনে দৃঢ় অবস্থানে থাকার পর এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগ ও দলীয় কর্মীর দুর্বৃত্তপনার রাশ টানতে পারলো না। গতকাল টিভিতে দেখছিলাম (৩০ অক্টোবর) যুবলীগ কর্মী তাদের দলীয় নেতা এক মুক্তিযোদ্ধকে প্রকাশ্যে কোপাচ্ছে। দলীয় সভানেত্রী থেকে শুরু করে ছোটবড় নেতানেত্রীরা ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়ে ক্রমে সাধারণ মানুষের কাছে খেলো হয়ে যাচ্ছেন। এসব ফাঁকা বুলির যে বাস্তবায়ন নেই তা অন্তত চাঁদাবাজ দলীয় সন্ত্রাসীরা বুঝে গেছে। এ যদি হয় জাতীয় পর্যায়ের অবস্থা তাহলে পাড়ার উঠতি মাস্তানদের প্রতিরোধ করবে কে? সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার স্খলন এবং আইনশৃংখলার অবনতির সুযোগে মাদক গ্রাস করছে চারদিক। মাদকাসক্ত বখাটেরা নৈতিকতার পাঠ অনেক আগেই চুকিয়েছে। তাই অপ্রতিরোধ্য এরা নানা অনাচার করে যেতে পারছে অনেকটা প্রকাশ্যেই।

আমরা যারা নিজেদের প্রগতিবাদী বলে ভাবছি, তারাও এক ধরনের তত্ত্ব আর ঘোরে আটকে থেকে সমাজশৃংখলার কথা ভুলতে বসেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের কথা উঠে আসছে। এসবের মধ্যে কয়টা বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দৃশ্যমান হয়েছে, আর কয়টা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে, তা প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকারী দায়িত্বশীলরা তলিয়ে দেখি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রায়ই হতাশা প্রকাশিত হলেও এ অবস্থার উত্তরণে তেমন একটা দায়িত্ব নিয়ে কেউ এগিয়ে আসি না। হঠাৎ কখনও নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশিত হলে তোলপাড় হয় ঠিকই; কিন্তু প্রতিবিধান নিয়ে তেমন ভাবা হয় না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অঘটন ঘটলে শিক্ষার্থী, বিশেষ করে ছাত্রীদের নিরাপত্তার দাবিটি সোচ্চার হয়। কিন্তু সমাধানের প্রস্তাবে অনেককেই পাওয়া যায় না। ৭২০ একরের এ অরক্ষিত, অনেকটা নিরিবিলি ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীদের সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা কোনো প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব নয়। এসব কারণেই কিছু আচরণবিধি ও শৃংখলাবিধি মেনে চলতে হয়। এক সময় ছাত্রীদের সন্ধ্যার মধ্যে হলে ফেরার নিয়ম ছিল। তারপর আন্দোলন করে সময় বাড়াতে বাড়াতে রাত ১০টা, বিশেষ অনুমতিতে আরও পরে হলে ফেরা মেনে নেয়া হয়। এক সময় বলা হয়েছিলরাত ৮টায় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার সঙ্গে মিল রেখে হলে ফেরার সময় নির্দিষ্ট করা হবে। আর মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠান থাকলে বিশেষ অনুমতিতে বিলম্বে হলে আসা যাবে। এরপরও ছাত্রীদের অধিকার ক্ষুন্ন করার জন্য প্রতিবাদ হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং তাদের নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। সামান্য কিছুসংখ্যক অতি স্বাধীনতাপ্রিয় ব্যক্তি পরিবেশের ওপর কালিমা লেপন করছে। এ ধরনের সংকট রয়েছে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই। কিন্তু নৈতিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে যৌক্তিক নীতি নির্ধারণে দায়িত্ববানদের কখনও প্রশাসনের পাশে এসে দাঁড়াতে দেখিনি।

পরিবহন মালিকশ্রমিকদের ওপর সরকারের কখনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমার এক গবেষক ছাত্র ক্ষোভ আর কষ্টের সঙ্গে টেলিফোন করলো। কাগজে বেপরোয়া গাড়ির চাকায় পিষ্ট হওয়া এক স্কুল ছাত্রের খবর ছাপা হয়েছে। এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। গবেষক ছাত্রটির প্রশ্নএমন লাগাম ছাড়া দুর্ঘটনার প্রতিবিধান কি রাষ্ট্র করতে পারে না? কী জবাব দেব আমি? মাঝে মধ্যেই তো দেখা যায়, কোনো অন্যায় করে গাড়ির ড্রাইভার, হেলপার পুলিশের হাতে ধরা পড়লে একাট্টা হয়ে যায় পরিবহন শ্রমিকরা। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়। অন্যায় দাবি মেনে আপস করতে হয় সরকারযন্ত্রকে। এক সময় ভাবা হতো রাজনৈতিক সরকার থাকলে এসব সমস্যা বড় হয় না। কারণ সব পেশাজীবীর ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকে। কিন্তু রাজনীতির চরিত্র যখন জনকল্যাণের বদলে দলীয় সুবিধাবাদে আটকে যায়, তখন অনেক ধরনের সুতাই নিয়ন্ত্রকের হাতে থাকে না। এ কারণে সামাজিক অস্থিরতা এখন পাড়ামহল্লা থেকে শুরু করে ক্যাম্পাস, রাজপথ সব জায়গায়ই দৃশ্যমান।

এক অরাজক অবস্থার মধ্যেই যেন আমাদের বসবাস। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির সূচক ওপরে উঠছে। অনেক সময় আমরা বলছি, উন্নয়ন আগে, গণতন্ত্র পরে। ধরে নিচ্ছি সব ঠিক আছে; কিন্তু সমাজ যখন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, পাষণ্ড দুর্বৃত্তরা নানাভাবে প্রশ্রয় পেয়ে চারপাশের অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তখন হতাশা বাড়বেই। আমরা দায়িত্বশীলরা বক্তৃতার শব্দ বুননে সবকিছুর যখন ইতি টানি, তখন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শেষ পর্যন্ত খুব আশাবাদী হওয়া যায় না।

এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১ নভেম্বর ২০১৬

কিশোর বদাভ্যাস রোধে অভিনব উদ্যোগ রূপগঞ্জে

অক্টোবর 31, 2016 মন্তব্য দিন

night-coaching

ইতিহাসের সাক্ষী ‘উত্তরা গণভবন’

অক্টোবর 31, 2016 মন্তব্য দিন

uttara-gonobhabanনাজমুল হাসান : ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিঘাপতিয়া রাজবাড়িকে ‘উত্তরা গণভবন’ হিসেবে ঘোষণা করেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তখন থেকেই গণভবনে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ ছিল। স্থানীয় জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর গণভবন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই দূরদূরান্তের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে রাজবাড়ির আঙ্গিনা।

নাটোরের মাদ্রাসা মোড় থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি তথা উত্তরা গণভবনের অবস্থান। দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দয়ারাম রায়। দয়ারাম ছিলেন নাটোরের রানী ভবানীর অধীনস্থ নায়েব। তিনি তাকে এত বিশ্বাস করতেন যে, রানীর পক্ষে দয়ারাম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও স্বাক্ষর করতেন। তাকে দিঘাপতিয়া পরগনার জমিদারি উপহার দেন রানী। ১৭৩৪ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর দয়ারাম রায় স্থাপত্যকলার অন্যতম নিদর্শন এই দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেন। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে প্রাসাদটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেলে রাজবাড়িটি

পুনর্নির্মাণ করা হয়। দিঘাপতিয়া রাজবংশের রাজারা ১৭১০ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিঘাপতিয়া রাজবাড়িকে ‘উত্তরা গণভবন’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর বেশ কয়েকবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এখানে।

দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয় সব বয়সী মানুষ। এর দৃষ্টিনন্দন মূল ফটকের ওপরে রয়েছে ইতালির ফোরেন্স থেকে আনা বিশালাকার ঘড়ি, যা এখনও সঠিক সময় দিচ্ছে এবং এর ঘণ্টাধ্বনি বহু দূর থেকে শোনা যায়। প্রতি বুধবার দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তি চাবি ঘোরান। এমনিভাবেই চলছে বছরের পর বছর। চারদিকে সুউচ্চ প্রাচীর ও সুগভীর পরিখা পরিবেষ্টিত রাজবাড়ির ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধান প্রাসাদ ভবন, কুমার প্যালেস, কাচারি ভবন, তিনটি কর্তারানী বাড়ি, রান্নাঘর, মোটর গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা। প্যালেসের দক্ষিণে রয়েছে ইতালিয়ান গার্ডেন, যাতে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন মূল্যবান মার্বেল পাথরে কারুকাজ করা ভাস্কর্য। দেশিবিদেশি নানা জাতের শোভা বর্ধনকারী গাছ। ভাস্কর্যগুলো একটা পাথর খণ্ড কেটে তৈরি। অত্যন্ত নিপুণ হাতের কারুকাজ। মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে যায়। প্রধান ভবনের সামনে ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশদের নির্মিত দুটি কামানসহ রাজবাড়িতে মোট ছয়টি কামান রয়েছে। মূল রাজপ্রাসাদে প্রবেশের পথে সিঁড়ির দু’পাশে দুটি কালো কৃষ্ণমূর্তি ছিল। দর্শনার্থীর অসতর্কতায় একটি ভেঙে যাওয়ার পর অপরটি ভবনের মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ গণভবনের বিভিন্ন স্থানে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করে ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর জনপ্রতি ১০ টাকা প্রবেশ মূল্যের বিনিময়ে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত গণভবন দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পরে প্রবেশ মূল্য বাড়িয়ে জনপ্রতি ২০ টাকা করা হয়। তবে ইতালিয়ান গার্ডেন এবং ভবনের ভেতরের অংশ দেখতে আগেভাগেই জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়।

নাটোরের সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন ‘জেগে ওঠো’র আহ্বায়ক কবি রফিকুল কাদির জানান, গণভবনের সামনের জায়গায় বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এগুলো সরিয়ে গণভবনের জায়গা দখলমুক্ত করা দরকার। গণভবন হল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটা রক্ষা করা অতিব জরুরি।

নাটোরের জেলা প্রশাসক সাহিনা খাতুন জানান, নাটোরকে পর্যটন নগরী হিসেবে সেই সঙ্গে ‘দ্য সিটি অব কুইন’ হিসেবে পরিচিত করে তুলতে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই গণভবন আরও দৃষ্টিনন্দন করতে কাজ শুরু করা হয়েছে। উত্তরা গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে যাতে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক করানো যায় সে বিষয়ে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সূত্রঃ দৈনিক সকালের খবর, ৩০ অক্টোবর ২০১৬